শিব মহাপুরাণে শিবভক্তকে বৈধ মাংস আহার করতে নিষেধ করা হয়নি
🍗 শিব মহাপুরাণে শিবভক্তকে বৈধ মাংস আহার করতে নিষেধ করা হয়নি। অবৈধ আমিষ (উদ্ভিজ্জ বা প্রাণীজ) আহার নিষেধ 🐠
__________________________________________________
🔰 ভূমিকা — বর্তমানে বাংলায় একদল এমন শৈবদের আগমন ঘটেছে যারা শুধুমাত্র নিজের মন মতো কিছু শাস্ত্র মান্য করে, আর যা তাদের মন মতো নয় সেই সকল শাস্ত্রের বচনকে অবহেলা করে। বাংলায় ইদানিং উদয় হওয়া শৈব সিদ্ধান্ত মার্গের কট্টর দ্বৈতবাদী পরম্পরার এই কর্মকাণ্ডী ব্যক্তিবর্গ শিবমহাপুরাণের বচনকেই শুধুমাত্র গ্রহণ করে, আর নিজেদের সুবিধা মতো শৈব আগমশাস্ত্রকে ব্যবহার করছে। কখনো অনুবাদ বিকৃত করে, কখনো অপপ্রচার করে, কখনো আবেগ দেখিয়ে, কখনো আক্ষরিক অর্থ দেখিয়ে ছি সকল কাণ্ডকারখানা করে বেড়াচ্ছে। এদেরই দলের এক নব্য শিবমহাপুরাণের একটি শ্লোকের ভুল অনুবাদ করে, নিরামিষবাদীদের অহংকারে আরো ঘিরূপী অনর্থকারী অর্থ প্রচার করে দিয়ে অহংকার বৃদ্ধি করছে। আর যারা শাস্ত্রের বচনের স্থান-কাল-পাত্র ভেদ অনুসারে কোথায় কোন বচন কিভাবে প্রয়োগ হয়ে কোন অর্থ প্রকাশ করছে এই বিষয়টি না বুঝতে পেরে ঐ কর্মকাণ্ডী দ্বৈতবাদীর পাতা নিরামিষাশী এজেন্ডার ফাঁদে পড়ে ভাবতে থাকে শিবভক্তদের হয়তো মাংস আহার করা সম্পূর্ণ ভাবেই নিষেধ।
সমগ্র শাস্ত্রের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রেখেই যেকোনো শাস্ত্রের বচন প্রয়োগ হয় - এবিষয়টি যাদের জানা নেই তারা দিনরাত নিরামিষের শ্রেষ্ঠত্ব আর আমিষাশীদের নিকৃষ্ট দেখাবার চেষ্টা করতে গিয়ে বেদ-স্মৃতি-ইতিহাস শাস্ত্রের সাথে পুরাণশাস্ত্রের বিরোধ বাধিয়ে বসে থাকে, আর বলতে থাকে - শুধুই শিবপুরাণ মানবে তারা, আর বাকি শাস্ত্রের বচন নাকি তাদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। এমন মহা অজ্ঞানীদের অবিবেচকের মতো ভাবনার শিকার হয়েছে যায় সেই সকল মানুষ যাদের সনাতন ধর্মের দার্শনিক জ্ঞান নেই।
এই প্রবন্ধে শিবমহাপুরাণের উক্ত আলোচ্য শ্লোকের প্রকৃত অর্থ উপস্থাপন করে, কট্টর নিরামিষবাদী দের অজ্ঞতা প্রমাণিত করা হল।
__________________________________________________
❌ নিরামিষবাদী দ্বৈতবাদী অজ্ঞ তথাকথিত নব্য শৈব ব্যক্তির দাবী —
আমিষং শিবভক্তানামভক্ষ্যস্য চ ভক্ষণম্ ॥ ৩৩ ॥
ইতি পাপানি ঘোরাণি ব্রহ্মহত্যাসমানি চ ॥ ৩৫॥
[শিবমহাপুরাণ/উমা সংহিতা/৫ অধ্যায়/৩৩,৩৫ ক্রমাঙ্ক শ্লোক]
অর্থ : শিবভক্তকে মাংস খাওয়ানো, নিজে অভক্ষ্য বা নিষিদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করা এবং অকারণে নিরপরাধ প্রাণী হত্যা করা -এই সমস্ত পাপকে ব্রহ্মহত্যার সমতুল্য বলা হয়েছে।
🔥 মহাপাশুপত অদ্বৈতবাদী শৈব পক্ষ দ্বারা খণ্ডন —
এখানে শ্লোকের অর্থের সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট করেছে এই অজ্ঞব্যক্তি।
প্রথমে আমিষ শব্দকে শুধুই মাংস অর্থ বলে সীমাবদ্ধ করেছে। আমিষ অর্থ ‘দেহসার’ অর্থাৎ যা দেহকে বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এই পদার্থ উদ্ভিদেও আছে আবার প্রাণীর মধ্যেও আছে।
দেখুন উদ্ভিজ্জ খাবারগুলির নাম এবং প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা/শুকনো উপাদানে আমিষের আনুমানিক শতকরা হার উপস্থাপন করলাম —
সয়াবিন ও সয়া চাঙ্কস (৩৬% থেকে ৫২%)
মিষ্টি কুমড়োর বীজ (প্রায় ৩০%)
চীনাবাদাম (প্রায় ২৬%)
মসুর ডাল (প্রায় ২৫%)
মুগ ডাল (প্রায় ২৪%)
মাষকলাই ডাল (প্রায় ২৪%)
ছোলা ও ছোলার ডাল (প্রায় ২২%)
কাঠবাদাম (অ্যালমন্ড) (প্রায় ২১%)
অড়হর ডাল ( ২১% থেকে ২২%)
রাজমা বা কিডনি বিনস (শুকনো - ২২%, সেদ্ধ - ৯%)
শিমের দানা বা বীজ (প্রায় ২০% থেকে ২২%)
চিয়া বীজ (১৭% থেকে ১৯%)
তিল (প্রায় ১৮%)
কিনোয়া (প্রায় ১৪%)
ওটস (প্রায় ১৩% থেকে ১৬%)
টোফু বা সয়া পনির (প্রায় ৮% থেকে ১০%, এতে জলের পরিমাণ বেশি থাকে)
সবুজ মটরশুঁটি (প্রায় ৫% থেকে ৬%)
মাশরুম (প্রায় ৩% থেকে ৪%)
ব্রোকলি (প্রায় ২.৮% থেকে ৩%)
পালং শাক (প্রায় ২.৫% থেকে ৩%)
— যদি আমিষ আহার সম্পূর্ণ ভাবেই শিবভক্তদের জন্য নিষেধ হয়, তবে উদ্ভিজ্জ এই সকল আমিষ সমন্বিত খাদ্যগুলি চিরতরে আহার করা বন্ধ করতে হবে। শুধুমাত্র মাংসকে আমিষ বলে চিহ্নিত করে মাংস আহার কেন বারণ হবে ?
শ্লোকে ‘আমিষ’ শব্দ আছে, ‘মাংস’ বলা হয়নি। তাই আমিষ — শব্দ দেখলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে “মাংস” অর্থে নেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।
আমিষ উদ্ভিজ্জেও আছে। তাই আমিষের অর্থ — অভিধানগত অর্থ, শাস্ত্রীয় ব্যবহার এবং প্রসঙ্গ দেখে নির্ধারণ করতে হবে ; নিজের ইপ্সিত নিরামিষবাদ প্রচারের জন্য অর্থের অনর্থ ঘটিয়ে দেওয়া কখনোই একজন প্রকৃত শিবভক্ত, পণ্ডিত বা ধার্মিকের লক্ষণ হতে পারে না।
তাহলে আমিষ বলতে — উদ্ভিজ্জ ও প্রাণীজ খাদ্যকেই বোঝায় বলে প্রমাণিত হল। এখন সংশয়ের বিষয় হল — শিবভক্তরা যদি সম্পূর্ণভাবে আমিষ অর্থাৎ ‘দেহসার’ আছে এমন বস্তু আহার না করে তাহলে তাদের শরীর কি বেশিদিন স্থায়ী হবে ?
না, বেশিদিন জীবিত থাকা সম্ভব নয়। তাহলে আমিষ শব্দের অর্থ যদি এমন করা হয় যে, আমিষ মাত্রেই শিবভক্তের আহর নিষেধ, তাহলে এমন অর্থ গ্রহণ করে শিবভক্তকে স্বাস্থ্যহানির পথে ঠেলে দেওয়া বোঝায়। তাই এই অপকর্ম - যে অর্থ গ্রহণের দ্বারা হচ্ছে সেই অর্থ-ই গ্রহণযোগ্য নয়।
🚫 তাহলে উক্ত আমিষের প্রয়োগ কেমন হবে ?
✅ উত্তর — এখানে সেই সকল আমিষ জাতীয় খাদ্য শিবভক্ত কে আহার করতে বারণ করা হয়েছে যে সকল আমিষ জাতীয় খাদ্যকে আহার করবার জন্য শাস্ত্রে অনুমোদন দেওয়া হয়নি, বরং অভক্ষ্য বলা হয়েছে। কিন্তু যে সকল আমিষ জাতীয় খাদ্যকে শাস্ত্রে ভক্ষ্য অর্থাৎ আহার করবার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সেই সকল আমিষ জাতীয় খাদ্য অবশ্যই আহার করা যাবে। এটিই সামঞ্জস্য বিধান।
নচেৎ আমিষ পদার্থ যে যে উদ্ভিজ্জে আছে সেগুলিও আহার করা শিব ভক্তের জন্য নিষিদ্ধ - এমন অর্থ গ্রহণ করতে হবে, এতে শিবভক্তের স্বাস্থ্যহানী হয়ে অকাল মৃত্যু নিশ্চিত হবে। যা ঘোর পাপ।
তাই অর্থের অনর্থ করে মাংসকে নিষিদ্ধ করবার যে অনুবাদ বৈষ্ণবঘেষা নিরামিষবাদী ‘গীতাপ্রেস প্রকাশনী’ তাদের অনুবাদিত শিবপুরাণে করেছে, আর সেটিকে বিচার বিবেচনা না করেই যে দ্বৈতবাদী অজ্ঞব্যক্তি প্রচার করে বেড়াচ্ছে তারা সমগ্র জগতের সকল শিবভক্তদের মৃত্যুমুখে পতিত করবার মতো চক্রান্তকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এই পাপ থেকে এদের কল্প কল্প কালেও মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
আলোচ্য শ্লোকের প্রকৃত অনুবাদ ও ভাবার্থ দেখুন 👇
আমিষং শিবভক্তানামভক্ষ্যস্য চ ভক্ষণম্ ॥ ৩৩ ॥
ইতি পাপানি ঘোরাণি ব্রহ্মহত্যাসমানি চ ॥ ৩৫॥
[শিবমহাপুরাণ/উমা সংহিতা/৫ অধ্যায়/৩৩,৩৫ ক্রমাঙ্ক শ্লোক]
✅ প্রকৃত অর্থ : শিবভক্তদের জন্য [যা অভক্ষ্য অর্থাৎ শাস্ত্রবিধিতে ভক্ষণীয় নয় এমন নির্দিষ্ট উদ্ভিজ্জ ও প্রাণীজ] আমিষ তথা অভক্ষ্য বস্তু ভক্ষণ — এই [সমস্ত কর্ম] ঘোর পাপ, যা ব্রহ্মহত্যার সমতুল্য।
_________________________________________________
🔥 বিচার — এখানে শিবভক্তের উদ্দেশ্যে সেই সকল নির্দিষ্ট অভক্ষ্য আমিষ বস্তুর কথা বলা হয়েছে, যা শাস্ত্রে অনুমোদিত নয় তথা এমন সকল অভক্ষ্যনীয় অনান্য খাদ্যকে আহার করতে বারণ করা হয়েছে। শাস্ত্র দ্বারা অনুমোদিত শাস্ত্রবিহিত মাংস আহারের বিষয়ে এখানে নিষেধাজ্ঞা কোথায় আছে ? - না, নেই।
শাস্ত্রে যে সমস্ত আমিষ সমন্বিত প্রাণী মাংসকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, তাঁর শাস্ত্রীয় প্রমাণ এবার দেখুন, মনুসংহিতা থেকে —
পাঠীনরোহিতাবাদ্যৌ নিযুক্তৌ হব্যকব্যয়োঃ ।
রাজীবান্ সিংহতুণ্ডাশ্চ সশল্কাশ্চৈব সর্বশঃ ॥ ১৬ ॥
[মনুস্মৃতি/৫ অধ্যায়/১৬ শ্লোক]
✅ অর্থ : ‘পাঠীন’ (বোয়াল/শোল) ও ‘রোহিত’ (রুই) মাছ দেবতা ও পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে (হব্য ও কব্য) উৎসর্গ করে খাওয়া যায়। এছাড়া রাজীব ও সিংহতুণ্ড ইত্যাদি সশল্ক বা আঁশযুক্ত মাছ সাধারণত খাওয়ার যোগ্য।
শ্বাবিধং শল্যকং গোধাং খড়গকূর্মশশাংস্তথা ।
ভক্ষ্যান্ পঞ্চনখেষ্বাহুরনুষ্ট্রাংশ্চৈকতোদতঃ ॥ ১৮ ॥
[মনুস্মৃতি/৫ অধ্যায়/১৮ শ্লোক]
✅ অর্থ : শজারু, শল্যক, গোধা (গোসাপ), গণ্ডার, কচ্ছপ এবং খরগোশ — এই প্রাণীগুলিকে পাঁচ-নখযুক্ত প্রাণীদের মধ্যে ভক্ষণযোগ্য বলা হয়েছে; এবং এক-পাটি দাঁতবিশিষ্ট প্রাণীদের মধ্যে উটকেও ভক্ষণযোগ্য বলা হয়েছে।
❇️ যে সকল পশু মাংস আহারে অভক্ষ্য তথা শাস্ত্রে নিষেধ আছে, সেই বিষয়ে শাস্ত্রের বচন —
ছত্রাকং বিড়বরাহঞ্চ লশুনং গ্রামকুক্কুটম্ ।
পলাণ্ডুং গৃঞ্জনঞ্চৈব মত্যা জগ্ধ্বা পতেদ্দ্বিজঃ ॥ ১৯ ॥
[মনুস্মৃতি/৫ অধ্যায়/১৯ শ্লোক]
✅ অর্থ : ছত্রাক, গ্রাম্যশূকর, রসুন, গ্রাম্যকুক্কুট, পেঁয়াজ ও গৃঞ্জন (গাঁজর), জেনে খেলে দ্বিজ পতিত হন।
সুতরাং শাস্ত্রে ভক্ষ্য ও অভক্ষ্য দুই প্রকারের উদ্ভিজ্জ ও মাংসের উল্লেখ আছে, যা অভক্ষ্য তা শিবভক্তের আহার করা উচিত নয়।
এবার দেখুন সকল মাংস আহার বৈধ নাকি নিষিদ্ধ —
🔥 মনুসংহিতাতে বলা হয়েছে — শাস্ত্রবিহিত প্রাণীর মাংস আহার বৈধ।
❇️ আহারের যোগ্য যে সকল প্রাণী তাদের মাংস আহারে দোষ নেই —
নাত্তা দূষ্যত্যদন্নাদ্যান্ প্রাণিনেইহন্যঽন্যপি ।
ধাত্রৈব সৃষ্টা হ্যাদ্যাশ্চ প্রাণিনোইত্তার এব চ ॥ ২৯ ॥
[মনুস্মৃতি/৫ অধ্যায়/২৯ শ্লোক]
✅ অর্থ : ভক্ষণকারী ব্যক্তি ভক্ষণযোগ্য জীবকে প্রতিদিন হত্যা করে ভক্ষণ করলেও তাতে তিনি (শাস্ত্র সম্মত হবার কারণে) দোষী হন না। কারণ, সৃষ্টিকর্তা নিজেই একদল প্রাণীকে ভক্ষণযোগ্য এবং অন্যদলকে ভক্ষণকারী রূপে সৃষ্টি করেছেন ॥ ২৯ ॥
❇️ আহারের যোগ্য যে সকল প্রাণী তাদের মাংস শাস্ত্র বিধি অনুসারে আহার করলে কোনো রকমের দোষ হয় না —
প্রোক্ষিতং ভক্ষয়েণ্মাংসং .. যথাবিধি নিযুক্তস্ত্ত ॥ ২৭ ॥
[মনুস্মৃতি/৫ অধ্যায়/২৭ শ্লোক]
✅ অর্থ : মন্ত্রপূত প্রোক্ষিত মাংস ভক্ষণ করবে, যথা বিধি সংস্কৃত মাংস ভক্ষ্য করা যাবে ॥ ২৭ ॥
❇️ যারা বাজার থেকে মাংস কিনে এনে খায় তাতেও কোনো দোষ লাগে না —
ক্রীত্বা স্বয়ং বাপ্যুৎপাদ্য পরোপকৃতমেব বা ।
দেবান্ পিতৃংশ্চার্চয়িত্বা খাদম্মাংসং ন দুষ্যতি ॥ ৩২ ॥
[মনুস্মৃতি/৫ অধ্যায়/৩২ শ্লোক]
✅ অর্থ : বাজার থেকে কিনে আনা বৈধ প্রাণীর মাংস বা নিজে পশুপালন করে তার মাংস বা অন্য কারোর দেয়া পশুমাংস দেবগণ ও পিতৃগণকে অর্চনা করে ভক্ষণ করলে দোষভাগী হয় না ॥ ৩২ ॥
প্রাণস্যান্নমিদং সর্বং প্রজাপতিরকল্পয়ৎ ।
স্থাবরং জঙ্গমঞ্চৈব সর্বং প্রাণস্য ভোজনম্ ॥ ২৮ ॥
[মনুস্মৃতি/৫ অধ্যায়/২৮ শ্লোক]
✅ অর্থ : সকল স্থাবর (উদ্ভিদ্) ও জঙ্গম (প্রাণী) ব্রহ্মা প্রাণীর প্রাণধারণের জন্য সৃষ্টি করেছিলেন। (সুতরাং এইগুলি সবই প্রাণ ভোজ্য ॥ ২৮ ॥
[দেখুন এইখানে সনাতন শাস্ত্র বাস্তুতন্ত্র কে স্বীকৃতি দিয়েছে]
❇️ শাস্ত্রবিধি মেনে প্রাণীর মাংস আহার করলে তাতে কোনো দোষ নেই —
অসংস্কৃতান্ পশন মন্ত্রৈর্নাদ্যাদ্বিপ্রিঃ কদাচন ।
মন্ত্রৈস্ত্ত সংস্কৃতানদ্যাচ্ছাশ্বতং বিধিমাস্থিতঃ ॥ ৩৬ ॥
[মনুস্মৃতি/৫ অধ্যায়/৩৬ শ্লোক]
✅ অর্থ : ব্রাহ্মণ কথনও অমন্ত্রপূত পশুমাংস ভক্ষণ করবেন না। কিন্তু নিত্যসিদ্ধ (পশুগাদিতে) মন্ত্র দ্বারা সংস্কৃত মাংস ভোজন করতে পারেন ॥ ৩৬ ॥
এই স্মৃতিশাস্ত্রের প্রমাণ ও বিধানকে অস্বীকার করে পুরাণের শ্লোকের অর্থ কে বিকৃত করে নিজের ইচ্ছেমতো অশাস্ত্রীয় অর্থ বের করে প্রচার করলে টা গ্রহণযোগ্য নয়।
আর কোনো মহা অজ্ঞ ব্যক্তি যদি বলে বেড়ায় যে, “শিবমহাপুরাণ শিবের বলা বচন হওয়ায় শুধুমাত্র শিবমহাপুরাণের বাক্যই মান্য করবেন তাঁরা, অন্য আর কোন স্মৃতিশাস্ত্র বা শ্রুতিশাস্ত্র, মহাভারতাদি ইতিহাস শাস্ত্র মানবেন না”,
তবে তাঁরা ভালো করে শিবমহাপুরাণই অধ্যয়ন করেননি। কারণ, শিব মহাপুরাণে পরমেশ্বর শিব নিজেই বলেছেন যে স্মৃতিশাস্ত্র, শ্রুতিশাস্ত্র অর্থাৎ বেদ, মহাভারতাদি ইতিহাস শাস্ত্র তথা সকল শাস্ত্রই পরমেশ্বর শিবের বচন। প্রমাণ —
🔹 পরমপবিত্র শিবমহাপুরাণের বায়বীয় সংহিতার পূর্বখণ্ডের অন্তর্গত ১ম অধ্যায়ের ২৫ থেকে ২৭ নং শ্লোকে বলা হয়েছে -
অঙ্গানি বেদাশ্চত্বারো মীমাংসা ন্যায়বিস্তরঃ ।
পুরাণং ধর্মশাস্ত্রং চ বিদ্যাশ্চৈতাশ্চতুৰ্দশা ॥২৫
আয়ুর্বেদো ধনুর্বেদো গান্ধর্বশ্চেত্যনুক্রমাৎ ।
অর্থশাস্ত্রং পরং তস্মাদ্বিদ্যা হ্যষ্টাদশ স্মৃতাঃ ॥২৬
অষ্টাদশানাং বিদ্যানামেতাসাং ভিন্নবর্ত্মনাম্ ।
আদিকর্তা কবিঃ সাক্ষাৎ শূলপাণিরিতি শ্রুতিঃ ॥২৭
[তথ্যসূত্র - শিবমহাপুরাণ/বায়বীয়সংহিতা/পূর্বখণ্ড/১ম অধ্যায়]
অর্থ - ছয় বেদাঙ্গ, চার বেদ, মীমাংসা, বিস্তারিত ন্যায়শাস্ত্র, পুরাণ এবং ধর্মশাস্ত্র - এই চোদ্দটি হল বিদ্যা। এরই সাথে আয়ুর্বেদ, ধনুর্বেদ, গন্ধর্ববেদ(অর্থাৎ সঙ্গীতশাস্ত্র) ও অর্থশাস্ত্রকে - একত্রে ধরে এই বিদ্যা আঠারোটি হয়। এগুলি পরস্পর ভিন্ন, এই সব বিদ্যার আদিকর্তা অর্থাৎ প্রকাশকারী হলেন সাক্ষাৎ পরমেশ্বর শূলপানি শিব, তিনি মহান কবি - ইহাই শ্রুতির বক্তব্য ॥২৫-২৭
✳️ উপরোক্ত শিবমহাপুরাণের বচনে - ধর্মশাস্ত্র অর্থাৎ মনুসংহিতা ইত্যাদি সকল স্মৃতিশাস্ত্র কে শিবেরই বচন বলা হয়েছে। বেদও শিবেরই বচন। শুধুমাত্র শিবমহাপুরাণই শিবের বচন নয়, বরং এখানে সকল পুরাণকেই শিবের বচন বলা হয়েছে।
🔹 বেদ স্বয়ং নিজে বলছে — ॐ ঈশানঃ সর্ববিদ্যানাং ॥
[তথ্যসূত্র - কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় আরণ্যক/১০ম প্রপাঠক-পরিশিষ্ট ভাগ/২১নং অনুবাক]
✅ অর্থ — উর্দ্ধমুখ ঈশান সর্ব বিদ্যার (সকল প্রকারের শক্তি তথা জ্ঞানের) প্রকাশক।
আরও দেখুন..
শুক্ল-যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণের শ্রুতি মন্ত্রে সকল শাস্ত্র কে পরমেশ্বর শিবের দ্বারাই উৎপন্ন হয় - বলা হয়েছে 👇
স যথার্দ্রৈন্ধাগ্নেরভ্যাহিতস্য পৃথগ্ধূমা বিনিশ্বরন্ত্যেবন্বারেঽস্য মহতো ভূতস্য নিশ্বসিতমেতদ্যদৃগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদোঽথর্বাঙ্গারস ইতিহাসঃ পুরাণং বিদ্যা উপনিষদঃ শ্লোকাঃ সূত্রাণ্যনু ব্যাখ্যানানি ব্যাখ্যানান্যস্যৈবৈতানি সর্বাণি নিশ্বসিতনি ॥
[শুক্ল-যজুর্বেদ/শতপথ ব্রাহ্মণ/১৪ প্রপাঠক/৪কাণ্ড/১০ নং মন্ত্র]
অর্থ — যেমন প্রকারে ভেজা উপাচার বস্তুর সংযোগে অগ্নি থেকে নানা প্রকারের ধোয়া প্রকট হয়ে থাকে সেই প্রকারে সেই পরমাত্মা(শিব)-এর দ্বারা ঋক্, যজু, সাম ও অথর্ববেদ, ইতিহাস, পুরাণ, বিদ্যা, উপনিষদ, শ্লোক, সূত্র, ব্যাখ্যান, অনুরূপাখ্যান এই সমস্ত কিছু তারই শ্বাস থেকে উৎপন্ন হয়েছে।
✳️ উপরোক্ত বেদ বচনে ইতিহাস অর্থাৎ রামায়ণ মহাভারতাদি শাস্ত্র কে শিবেরই বচন বলা হয়েছে। বেদও শিবের বচন।
মহামূঢ় দ্বৈতবাদীদের যে বিচার বিবেচনা করবার মতো কাণ্ডজ্ঞান নেই, তার আরো স্পষ্ট প্রমাণ দেখাচ্ছি।
♦️ শ্রীকৃষ্ণ পরম শৈব ছিলেন - বলছে শিবমহাপুরাণ।
কৃষ্ণঃ শৈবসত্তমঃ ।..॥ ১১
[শিবমহাপুরাণ/শতরুদ্রসংহিতা/৩৬ অধ্যায়/১১ নং শ্লোক]
✅ অর্থ : শ্রীকৃষ্ণ হলেন শ্রেষ্ঠ শিবভক্ত শৈব ।
এবার ইতিহাস পুরাণ থেকে শাস্ত্র থেকে প্রমাণ দেখুন,
সেই শ্রেষ্ঠ শৈব শ্রীকৃষ্ণের কি রকমের আচরণ করছেন —
🔶 পশু শিকার করে শ্রীকৃষ্ণ আনন্দ লাভ করেন, বলছে মহাভারত —
বাসুদেবস্তু পার্থেন তত্রৈব সহ ভারত! ।
উবাস নগরে রম্যে শক্রপ্রস্থে মহামনাঃ ॥ ৬৩ ॥
ব্যচরদ্ যমুনাতীরে মৃগয়াং স মহাযশাঃ।
মৃগান্ বিধ্যন্ বরাহাংশ্চ রেমে সার্দ্ধং কিরীটিনা ॥ ৬৪ ॥
[হরিদাস সিদ্ধান্ত বাগীশ দ্বারা অনুবাদিত বিশ্ববানী প্রকাশনীর ‘মহাভারত/অদিপর্ব/সুভদ্রাহরণপর্ব/২১৪ অধ্যায়/৬৪ শ্লোক’]
✅ অর্থ — কিন্তু বাসুদেব-শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের সহিত সেই মনোহর ইন্দ্রপ্রস্থনগরেই রইলেন ॥ ৬৩ ॥
তিনি মৃগয়া করতে করতে যমুনাতীরে বিচরণ করতেন এবং অর্জুনের সহিত মিলিত হয়ে হরিণ ও শূকর বিদ্ধ করে আনন্দিত হতেন ॥ ৬৪ ॥
🔶 শ্রীকৃষ্ণ মাংস ভক্ষণ করেন, বলছে মহাভারত —
যজনান্তে তদন্নং তু তৎ পয়ো দধি চোত্তমম্ ।
মাংসং চ মায়য়া কৃষ্ণো গিরির্ভূত্বা সমশ্রুতে ॥ ২১ ॥
[মহাভারত/হরিবংশ পুরাণ/বিষ্ণুপর্ব/১৭ অধ্যায়/২১ শ্লোক]
✅ অর্থ — যজ্ঞের শেষে অন্ন, দুধ, দই সহ মাংস ভক্ষণ করলেন শ্রীকৃষ্ণ, তিনি গিরিরূপ ধরেছিলেন মায়া প্রকাশের দ্বারা ॥ ২১ ॥
মহামূঢ় দ্বৈতবাদীর কথা অনুযায়ী সমস্তপ্রকার আমিষ আহার যদি শিবভক্তের জন্য নিষিদ্ধ হতো তাহলে শ্রীকৃষ্ণ শৈব হয়ে কিভাবে তা আহার করলেন ?
আরো দেখুন
🔥 সত্যের প্রতিক ধর্মসম্রাট যুধিষ্ঠির নিজে মাংস দিয়ে পরমেশ্বর শিবের পূজা করেছেন, এটি মহাভারত বলেছে —
মোদকৈঃ পায়সেনাথ মাংসৈশ্চোপাহরদ্বলিম্ ॥ ৪ ॥
[হরিদাস সিদ্ধান্ত বাগীশের অনুবাদিত ‘মহাভারত/আশ্বমেধিক পর্ব/৮৩ অধ্যায়/৪ শ্লোক’]
✅ অর্থ — ক্রমে তিনি (যুধিষ্ঠির) মন্ত্রপূত পুষ্প গ্রহণ করে মোদক, পায়স ও মাংস দ্বারা শিবকে উপহার দিলেন ॥ ৪ ॥
তাহলে যুধিষ্ঠির একজন শিবভক্ত হয়ে কিভাবে মাংস দিয়ে পূজা করলেন ?
পূজা করলে ঐ প্রসাদ ফেলা হয় না। কারণ, মনুসংহিতার ৫ অধ্যায়ের ৩২ শ্লোক অনুযায়ী দেবতাকে দিয়ে তারপর আহার করতে হয়, এখানে বাহ্যিক পূজা করে যুধিষ্ঠির আহার করেছেন। তাছাড়া যুধিষ্ঠির ও তার ভ্রাতাগণ যে মাংস আহার করতেন তার প্রমাণ মহাভারতের বনপর্বের ৪২ অধ্যায়ে ৩-১২ ক্রমাঙ্ক শ্লোকে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
তাই, শিব মহাপুরাণের উক্ত শ্লোকের আমিষ শব্দ দেখা মাত্রই সেই পদের অর্থকে শুধু ‘মাংস’ বলা কখনোই যুক্তিযুক্তি নয়। কারণ, এমন অর্থ করার ফলে ইতিহাস তথা স্মৃতিশাস্ত্ররূপী শিববচনের সাথে শিবমহাপুরাণরূপী শিববচনের পরস্পর চরম বিরোধ বাঁধে, পরমেশ্বর শিব কখনো কি পরস্পর স্ববিরোধী অসামঞ্জস্যপূর্ণ কথা বলতে পারেন ?
আর যদি এমন হয় তাহলে নিরামিষবাদ কে সঠিক প্রমাণ করতে গিয়ে শিবমহাপুরাণকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে অজ্ঞ মহামূঢ় দ্বৈতবাদীরাই বিরম্বনায় পড়বে।কারণ, স্মৃতিশাস্ত্র যেহেতু মাংস আহারের ক্ষেত্রে অনুমতি দিয়েছে, সেক্ষেত্রে শিবমহাপুরাণের উক্ত বচন স্মৃতিশাস্ত্রের কাছে দুর্বল হয়ে যাবে। কারণ —
🔹 ব্যাস সংহিতা/১/৪ - বলছে যে,
পুরাণের সাথে স্মৃতিশাস্ত্রের মধ্যে বিরোধপূর্ণ স্থানে পুরাণের বচনের চেয়ে স্মৃতিশাস্ত্রের বচন বলবান ও গ্রহণযোগ্য। সেক্ষেত্রে উক্ত পুরাণের বচন অগ্রহণযোগ্য।
অর্থাৎ, কাণ্ডজ্ঞানহীন মহামূঢ় দ্বৈতবাদীদের নিরামিষের কট্টরটা বজায় রাখতে গিয়ে শিবমহাপুরাণের শ্লোকের অনর্থ করা অর্থকে সঠিক প্রমাণ করতে গিয়ে শিবমহাপুরাণের বচনের প্রামাণিকতা ও গ্রহণযোগ্যতার উপর প্রশ্ন উঠে গেল।
♦️ সত্য যুগে একটিই পুরাণ ছিল, যা পরমেশ্বর শিবেরই বচন। কিন্তু দ্বাপর যুগে তা ১৮ ভাগে বিভক্ত করেন ব্যাসদেব, এই কথা শিবমহাপুরাণের বিদ্যেশ্বর সংহিতার ২য় অধ্যায়ে বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধুমাত্র শিবমহাপুরাণ নয়, সকল পুরাণই শিববচন ও সকল সনাতনীর জন্য বাধ্যতামূলক ভাবে মান্য। শিববচন কূর্মপুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণে আমিষ জাতীয় মাছ-মাংস আহারের জন্য বৈধ প্রাণী আহারের উল্লেখ —
🐠 মাছ খাওয়ার অনুমতি —
রাজীবান(শফরং) সিংহতুণ্ডাংশ্চ তথা পাঠীনরোহিতে। মৎস্যাশ্চৈতে সমুদ্দিষ্টা ভক্ষণীয়া মুনীশ্বরাঃ ॥ ৩৯ ॥
[তথ্যসূত্র – কূর্মপুরাণ/উপরিভাগ/(ব্যাসগীতা)/১৭ অধ্যায়/৩৯ শ্লোক]
✅ অর্থ : হে মুনিগণ ! রাজী সিংহতুণ্ড (শকুলমৎস্য), পাঠীন ও রোহিত(রুই) ইত্যাদি মাছ সমূহ ভক্ষণ করা উত্তম ।
🍗 মাংস খাওয়ার অনুমতি —
শশকঃ কচ্চপো গোধা শ্বাবিৎ খড়েগাহথ পুত্ৰক ॥ ২॥
ভক্ষ্যা হোতে তথা বর্জ্যো গ্রামশূকর-কুক্কুটৌ ।..॥ ৩ ॥
[তথ্যসূত্র – মার্কণ্ডেয় পুরাণ/৩৫ অধ্যায়/২-৩ শ্লোক]
✅ অর্থ : শশক(খরগোশ), কচ্ছপ, গোধা, সজারু ও খড়্গযুক্ত প্ৰানী ইত্যাদির মধ্যে ইচ্ছানুসারে মাংস ভক্ষণ করা যাবে। বর্জ্য পদার্থ গ্রহণ করবার কারণে গ্রাম্য শূকর ও গ্রাম্য কুক্কুট ত্যাগ করে বন্য শূকর ও বন্য মোরগ/মুরগী জাতীয় প্রাণীর মাংস ভক্ষণ করা উত্তম ।
এই পুরাণগুলির বচন মনুসংহিতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যাদের প্রাথমিক শাস্ত্র বিচারের বোধ জন্মায়নি তাঁরা সমাজকে ধর্মপথ দেখাতে নেমে নিজেরাই শিবমহাপুরাণ কে অগ্রহণযোগ্য প্রমাণিত করে দিয়েছে নিজেদের অজান্তে। এই ধরণের অজ্ঞ দ্বৈতবাদীদের গোঁড়ামীর জন্যই শাস্ত্র সম্পর্কে না জানা অনান্য মানুষেরা সঠিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত ও ভ্রমিত হয়ে সংকীর্ণ সীমাবদ্ধ ভাবনা চিন্তায় মগ্ন হয়ে প্রকৃত জ্ঞান থেকে দূর হয়ে যায়।
উক্ত শ্লোকের সঠিক অর্থ নির্বাচন করার জন্য সঠিক শাস্ত্রীয় তথ্য প্রমাণ যুক্তি দেয়া হল। অথর্ববেদের অন্নপূর্ণা উপনিষদ/৪/৩৪ শ্রুতিতেও এই কথাই বলা হয়েছে।
কিন্তু মহামূঢ় দ্বৈতবাদীর কথা অনুযায়ী তাদের অর্থ মান্য করলে সকল পুরাণ বেদ স্মৃতি ইতিহাস সকল বচনে বিরোধ বাঁধে। তাই আদিশঙ্করাচার্যকে শিবাবতার বলে মেনে নিজের পরম্পরার মুখে চুনকালি লাগিয়ে বসে থাকা দ্বৈতবাদী তথাকথিত শৈব ব্যক্তি তথা তার সমর্থকদের আবেগী অশাস্ত্রীয় নিরামিষাশী কাণ্ডকারখানার প্রামাণিকতা শিবমহাপুরাণ থেকেই খণ্ডিত হল।
_________________________________________________
যেহেতু আমাদের শিবালয়কে সমাজের কাছে পরোক্ষভাবে বদনাম করতে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠেছে তথাকথিত নিরামিষ বাদী। তাই সমগ্র খণ্ডনের শেষে আমাদের পক্ষ থেকেও রইল পাল্টা জবাব —
☘️🥴 নিরামিষাশীরা লতাপাতা হত্যা করে খাওয়ার পাপ থেকে মুক্ত হতে পরবর্তী তিনদিন সম্পূর্ণ নিরাহারে থাকতে হবে, জলও খেতে পারবে না — বলছে মহাভারত। প্রমাণ —
তির্য্যগ্ যোনিবধং কৃত্বা দ্রুমাংশ্ছিত্বেতরান্ বহূন্ ।
ত্রিরাত্রং বায়ুভক্ষঃ স্যাৎ কর্ম চ প্রথয়ন্নরঃ ॥ ৩৪ ॥
[হরিদাস সিদ্ধান্ত বাগীশ ভট্টাচার্য অনুবাদিত বিশ্ববাণী প্রকাশিত মহাভারত/শান্তিপর্ব/চার্বাকনিগ্রহ উপপর্ব/৩৫ অধ্যায়/৩৪ শ্লোক]
✅ অর্থ : মানুষ ক্ষুদ্র পশু-পক্ষি-বধ বা বিভিন্ন ক্ষুদ্র লতা বা বৃক্ষ ছেদন করে, নিজের সেই সেই কৰ্ম প্রকাশ করতে থেকে, তিন দিন উপবাস করতে হবে ॥ ৩৪ ॥
আমাদের জ্ঞানমার্গী অদ্বৈতশৈব বাদের বিরোধীতা করে যারা এত আচার পরমধর্ম বলে প্রচার করে, তারা শিববচন ইতিহাস অনুযায়ী ‘তিন দিন উপবাস’ থাকবার আচার পালন করবে তো ? নাকি এই ক্ষেত্রে আচার পালন ঘুমোতে যাবে ?
যারা নিজের রসনাতৃপ্তির জন্য লালসাবশত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভিদ অর্থাৎ লতাপাতা আহার করে নিজেকে বড়ই অহিংস ও পবিত্র মনে করেন, তারাও মূলত প্রাণহত্যাকারীই বটে — এই কথা বলছে সাক্ষাৎ মহাভারত। মহাভারত অবশ্যই মান্য। কারণ, ভগবদ্গীতা ও পরমেশ্বর শিবের ভক্তরূপে শ্রীকৃষ্ণের শিবভক্তিমূলক কাহিনী সমৃদ্ধ এই মহাভারত নামক ইতিহাস শাস্ত্র। তাই সেই মহাভারতের বচন কে অস্বীকার করা অসম্ভব।
যারা রক্তমাংসের জীবকে আমিষাশীদের কাছে আহার হতে দেখে মায়াকান্না জুড়ে দিয়ে বলতে থাকে যে, প্রাণীবধ মহাপাপ, তারা এটা ভুলে যায় যে, উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে, ছকথা মহাভারতে, পুরাণে, স্মৃতিশাস্ত্রে প্রমাণিত, তাই তাদের আহার করলেও জীবহত্যার পাপই লাগে।
তাই সেই পাপ থেকে মুক্ত হতে আগামী তিনদিন নির্জলা ভাবে নিরাহারে থেকে উপবাস করে কাটাতে হবে — এইকথা বলছে স্বয়ং মহাভারত।
কিন্তু আত্মজ্ঞানীদের জন্য সবেতেই প্রাণ আছে, তাই শাস্ত্র বিহিত পদ্ধতিতে ঈশ্বরের জ্ঞান দৃষ্টিতে সমর্পণ করে আহারে উদ্ভিদ বা মাছ-মাংস আহারেও দোষ হয়না। কিন্তু দ্বৈতবাদীরা সেই অদ্বৈতশৈব মার্গের সিদ্ধান্তকে বিরোধীতা করেন, ফলে তাদের জন্য অবশ্যই তিনদিনের উপবাসের কর্মকাণ্ডমূলক আচার পালন করা উচিত। যদি পালন না করেন তবে তারা হলেন জীবহত্যাকারী মহাপাপী ও স্ববিরোধী অনাশ্রয় দোষে স্বয়ং নিজেরাই কলঙ্কিত। আমিষাশীদের দোষ ধরার আগে নিজেদের দোষের প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত। অর্থাৎ একদিন উদ্ভিদ আহার করে তিনদিন উপবাস করে তারপর পুনরায় উদ্ভিদ আহার করে পুনর্বার তিনদিন উপবাস থাকতে হবে। আবার শাস্ত্রে এটিও বলা আছে যে, যদি পাপ করে প্রায়শ্চিত্ত করবার পর পুনরায় সেই পাপ করা হয়ে তবে তার প্রায়শ্চিত্ত বৃথা, সে মহাপাপী (সৌরপুরাণ/৫৩ অধ্যায়/৬৫-৬৮ শ্লোক)।
অর্থাৎ নিরামিষাশীরা মহা ধর্মসংকটে। এই জন্য বলি, যে দর্শন যে যুক্তি যে সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত নিরুত্তর হয়ে যায়, উভয় সংকট তৈরী করে সেই সিদ্ধান্ত সর্বদাই কাল্পনিক বলে জানা উচিত। কারণ, সেই সিদ্ধান্ত মান্যকারী ব্যক্তি ও তার অনুসারী সকলকেই ভ্রমিত করে, উভয় সংকটে ফেলে দেয়, শেষ পর্যন্ত অধর্মই করেই ক্ষান্ত হন তারা। এতে নরক প্রাপ্তিই ঘটে।
কোনো নিরামিষবাদী তথাকথিত ছদ্মশৈব কে আমিষ আহারের বিরোধিতা করতে দেখলে তাকে এই মহাভারতের এই বিধান টা দেখাবেন।
পরমেশ্বর শিবের কৃপায় খণ্ডন সম্পন্ন হল।
__________________________________________________
🔥 সিদ্ধান্ত —
শিবমহাপুরাণে — শাস্ত্রে অনুমোদিত আছে এমন নির্দিষ্ট উদ্ভিজ্জ বা প্রাণীজ আমিষ জাতীয় খাদ্য গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়নি। কিন্তু যেসব উদ্ভিজ্জ ও প্রাণীজ আমিষ জাতীয় বস্তুকে আহার করতে নিষেধ করে অভক্ষ্য বলেছে শাস্ত্র, সেই সকল নির্দিষ্ট অভক্ষ্য আমিষ বস্তু কখনোই একজন শিবভক্ত যেন আহার না করে — এই কথাই শিবমহাপুরাণে বলা হয়েছে।
যারা শিবমহাপুরাণ প্রচারের অজুহাতে বিকৃত তথ্য প্রচার করছে তারা শিবমহাপুরাণকে বিকৃত করার পাপে জর্জরিত, এরাই শিবমহাপুরাণের নিন্দুক, ধর্মের মুখোশ পড়ে অধর্মকারী পাপী অধার্মিক এরা।
সনাতনী ভক্তবৃন্দ সচেতন হোন।
শিব ভক্ত শৈবগণ সচেতন হোন।
__________________________________________________
__________________________________________________
🚩 তথ্য সংগ্রহ ও সত্য উন্মোচনে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক শ্রীপাদযুক্ত আচার্যপরমাধিকারী শ্রীশ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব জী 🚩
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
পরমেশ্বর শিবের ও সনাতন শৈবধর্মের বিষয়ে এমন গুহ্য সত্য রহস্য ও সত্য উন্মোচনমূলক লেখা আরো পেতে অবশ্যই আমাদের Shivalaya ফেসবুক পেজ Follow করে Favourite করে রাখুন। এই তথ্য দ্বারা যদি আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি হয়ে থাকে তবে অবশ্যই এই লেখাটি শেয়ার করুন, যাতে সত্য প্রকাশ্যে আসে।
#হিন্দুধর্ম #সনাতনধর্ম #শিবালয় #Shivalaya #sanatandharma #খাদ্যাভ্যাস #শৈবধর্ম #আমিষ #নিরামিষ #মাংসাহার #মহাভারত #মনুস্মৃতি #ব্যাসস্মৃতি #শিবমহাপুরাণ #মাংস #উদ্ভিদ
[এই পোস্টটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত।এখানে ব্যবহৃত চিত্রটি কেবল বিষয়টি সহজে উপস্থাপনের জন্য Ai-সহায়তায় নির্মিত একটি প্রতীকী চিত্র, এই ছবিটির মধ্যে কিছু লেখা আলাদা ভাবে লেখা হয়েছে। সকল শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতি ও তথ্য যথাসম্ভব মূল গ্রন্থ অনুসারে ছবি উপস্থাপিত হয়েছে।]


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন