যোগীব্যক্তি যোগ দ্বারা শিবে প্রবেশ করেন, তাকেই যোগযুক্ত বলা হয়

 


🕉️ যোগীব্যক্তি যোগ দ্বারা শিবে প্রবেশ করেন, তাকেই যোগযুক্ত বলা হয়

______________________________________________

🔰 ভূমিকা —

বেদ ও উপনিষদে বর্ণিত যোগতত্ত্বের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হল — যোগ কেবল চিত্তসংযম বা ধ্যানের একটি পদ্ধতি নয়; বরং যোগের পরিণতি হল পরমব্রহ্মে প্রবেশ। নাদবিন্দু উপনিষদ ঘোষণা করেছে যে, যখন মন ইন্দ্রিয় ও ত্রিগুণ অতিক্রম করে, তখন যোগী যোগযুক্ত অবস্থায় অনুপম, শান্ত, নির্মল পরমব্রহ্ম শিবে প্রবেশ করে তাঁর মধ্যেই অবস্থিত হন। অতএব, ‘যোগযুক্ত’ শব্দটি কোনো সাধারণ যোগাভ্যাসকে নির্দেশ করে না; এটি সেই পরম আধ্যাত্মিক অবস্থার নির্দেশক, যেখানে সাধক পরমেশ্বর শিবের সঙ্গে একাত্মতা লাভ করেন।

এই তত্ত্বেরই একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্বে পাওয়া যায়। সেখানে স্বয়ং যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ভগবদ্গীতার পরমব্রহ্মতত্ত্ব তিনি “যোগযুক্ত” অবস্থায় উপদেশ দিয়েছিলেন— পরং হি ব্রহ্ম কথিতং যোগযুক্তেন তন্ময়া। অন্যদিকে, নাদবিন্দু উপনিষদ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, যোগযুক্ত সাধক সর্বদা পরমব্রহ্ম শিবে প্রবেশ করে অবস্থিত হন। সুতরাং, এই দুই শাস্ত্রবচন পরস্পরের আলোকে বিচার করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, যোগযুক্ত অবস্থায় পরমব্রহ্মতত্ত্বের উপলব্ধি এবং সেই তত্ত্বের উপদেশ — উভয়েরই কেন্দ্রবিন্দু পরমব্রহ্ম পরমাত্মা শিব।

নিম্নে বেদীয় উপনিষদ ও মহাভারতের এই শাস্ত্রপ্রমাণগুলি মূল সংস্কৃত পাঠ, বাংলা অনুবাদ এবং প্রাসঙ্গিক আলোচনাসহ উপস্থাপন করা হলো।

______________________________________________

📜 বেদ মন্ত্র —

ততঃ পরতরং শুদ্ধং ব্যাপকং নির্মলং শিবম্ ।

সদোদিতং পরং ব্রহ্ম জ্যোতিষামুদয়ো যতঃ ॥ ১৭ ॥

অতীন্দ্রিয়ং গুণাতীতং মনো লীনং যদা ভবেৎ ।

অনূপমং শিবং শান্তং যোগযুক্তং সদা বিশেৎ ॥ ১৮ ॥ 

[ঋগ্বেদ/নাদবিন্দু উপনিষদ/১৭-১৮ ক্রমাঙ্ক মন্ত্র]

অর্থ : সেই (ব্রহ্মলোক) অপেক্ষাও পরম, শুদ্ধ, সর্বব্যাপী, নির্মল, মঙ্গলময় শিবই সেই পরমব্রহ্ম, যিনি সর্বদা স্বপ্রকাশ এবং যাঁর থেকেই সমস্ত জ্যোতির (প্রকাশের) উদ্ভব ঘটে। ॥ ১৭ ॥

যখন মন ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে নিবৃত্ত হয়ে অতীন্দ্রিয়, গুণাতীত তত্ত্বে লীন হয়, তখন যোগী সাধক ব্যক্তি [যোগ দ্বারা] অনুপম, শান্ত, মঙ্গলময় শিবে সর্বদা প্রবেশ করে অবস্থিত হন, এটিই যোগযুক্ত বলে অভিহিত হয় ॥ ১৮ ॥


🔷 বেদ অনুসারে - যোগযুক্ত হবার মাধ্যমে শিবেই আত্মভাব লীন হয়ে পরমব্রহ্ম শিবের সহিত একাত্ম হয়ে যান যোগীব্যক্তি। 

🔖উদাহরণ হিসেবে — পরমশৈব মহাযোগী শ্রীকৃষ্ণও যোগযুক্ত অবস্থায় পরমব্রহ্ম পরমাত্মা সেই শিবের সাথে একাত্ম হয়েই সেই ভগবদ্গীতা জ্ঞান প্রদান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। 

শ্রীকৃষ্ণ নিজেই অর্জুনকে বলেছেন👉 পরং হি ব্রহ্ম কথিতং যোগযুক্তেন তন্ময়া - মহাভারত/আশ্বমেধিক পর্ব/১৭ অধ্যায়/১৩ ক্রমাঙ্ক শ্লোক - আমি গীতাজ্ঞান প্রদানের সময় যোগযুক্ত হয়ে পরমব্রহ্মের স্বরূপ সম্পর্কে বলেছিলাম।

🔶এই বিষয়টি বিস্তারিত ভাবে দেখুন —

ততঃ প্রতীতঃ কৃষ্ণেন সহিতঃ পাণ্ডবোঽৰ্জ্জুনঃ ।

নিরীক্ষ্য তাং সভাং রম্যামিদং বচনমব্রবীৎ ॥ ৪ ॥

বিদিতং মে মহাবাহো ! সংগ্রামে সমুপস্থিতে ।

মাহাত্ম্যং দেবকীপুত্র ! তচ্চ তে রূপমৈশ্বরম্ ॥ ৫ ॥

যত্তু তদ্‌ভবতা প্রোক্তং পুরা কেশব ! সৌহৃদাৎ ।

তৎসর্বং পুরুষব্যাঘ্র ! নষ্টং মে ব্যগ্রচেতসঃ ॥ ৬ ॥

মম কৌতূহলং ত্বস্তি তেষ্ব‌র্থেযু পুনঃ পুনঃ । 

ভবাংস্তু দ্বারকাং গন্তা নচিরাদিব মাধব ! ॥ ৭ ॥

বাসুদেব উবাচ ।

শ্রাবিতস্ত্বং ময়া গুহ্যং জ্ঞাপিতশ্চ সনাতনম্ । 

ধৰ্মং স্বরূপিণং পার্থ ! সর্বলোকাংশ্চ‌ শাশ্বতান্ ॥ ৯ ৷৷ 

অবুদ্ধ্যা নাগ্রহীর্যত্ত্বং‌ তন্মে সুমহদপ্রিয়ম্ । 

ন চ সাদ্য পুনর্ভূয়ঃ স্মৃতির্ম‌ে সংভবিষ্যতি ॥ ১০ ॥ 

নূনমশ্রদ্দধানোঽসি দুৰ্মেধা হ্যসি পাণ্ডব ! । 

ন চ শক্যং পুনর্বক্তুমশেষেণ ধনঞ্জয় ! ॥ ১১ ॥ 

স হি ধৰ্মঃ সুপর্য্যাপ্তো ব্রহ্মণঃ পদবেদনে । 

ন শক্যং তন্ময়া ভূয়স্তথা বক্তুমশেষতঃ ॥ ১২ ৷৷ 

পরং হি ব্রহ্ম কথিতং যোগযুক্তেন তন্ময়া । 

ইতিহাসন্তু বক্ষ্যামি তস্মিন্নর্থে পুরাতনম্ ॥ ১৩ ৷৷

[বিশ্ববাণী প্রকাশনী প্রকাশিত হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ ভট্টাচার্য অনুবাদিত - মহাভারত/আশ্বমেধিক পর্ব/১৭ অধ্যায়/৪-৭,৯-১৩ ক্রমাঙ্ক শ্লোক]

✅অর্থ — পাণ্ডুনন্দন অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের সহিত মিলিত হয়ে সেই মনোহর সভা দর্শন করে সন্তুষ্টচিত্তে এই কথা বলেছিলেন  ॥ ৪ ॥

'মহাবাহু দেবকীপুত্র ! যুদ্ধ উপস্থিত হলে আপনার মাহাত্ম্য আমি জেনেছি এবং আপনি যে সেই [শিবের] ঐশ্বরিক রূপ তা প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেছিলাম ॥ ৫ ॥

পুরুষশ্রেষ্ঠ কেশব ! আপনি সৌহার্দ্যবশতঃ পূর্বে যে সকল কথা বলেছিলেন, আমি যুদ্ধে আসক্তচিত্ত হওয়ায় সে সমস্তই আমার লুপ্ত হইয়া গিয়েছে ॥ ৬ ৷৷

মাধব ! সেই সকল বিষয় পুনরায় শোনার জন্য আবার আমার কৌতুহল হচ্ছে‌। কারণ, আপনি অচিরকালমধ্যেই দ্বারকায় চলে যাবেন ॥ ৭ ॥

শ্রীকৃষ্ণ বললেন  পৃথানন্দন ! আমি তোমাকে গুপ্ত বিষয় শুনিয়েছিলাম এবং লক্ষণসংযুক্ত সনাতন ধৰ্ম ও শাশ্বত সমস্ত লোকের বিষয় জানিয়েছিলাম ॥ ৯ ॥

তুমি যে বৈমত্যবশতঃ সে সকল মনে রাখিতে পারোনি, এই বিষয়টি শুনে আমার গুরুতর অপ্রিয় হয়েছে। এখন সেই স্মৃতি পুনরায় আমার পূর্ণভাবে হবে না ॥ ১০ ॥

পাণ্ডুনন্দন ! নিশ্চয়ই তুমি আমার সেই সকল বাক্যে বিশ্বাস করোনি, অথবা তুমি নিশ্চয়ই দুৰ্মেধা। হে ধনঞ্জয় ! সেই বিষয়ে আবার সমস্ত বলা আমার শক্তিসাধ্য নয় ॥ ১১ ॥

সেই ধর্মটি পরমাত্মার (শিবের) স্বরূপ জানার জন্য বিশেষ পর্যাপ্ত ছিল। আমি বর্তমান সময়ে সেই সমস্ত পুনরায় বলতে সমর্থ নই ॥ ১২ ॥

সেই [ভগবদ্গীতা জ্ঞান প্রদানের] সময় আমি যোগযুক্ত হয়ে পরব্রহ্মের (শিবের) বিষয় বলেছিলাম, এখন সেই বিষয়ে প্রাচীন বৃত্তান্ত বলছি ॥ ১৩ ॥


🔷ভগবদ্গীতার জ্ঞান প্রদানের সময়ে শ্রীকৃষ্ণ পরমব্রহ্ম শিবের সহিত যোগযুক্ত হয়ে শিবে আমিত্ব স্থাপন করে শিবৈশ্বর্য সম্বন্ধীয় শিবজ্ঞান প্রদান করেছিলেন অর্জুনকে। শ্রীকৃষ্ণ নিজেই অর্জুনকে বলেছেন যে, সেই ভগবদ্গীতার জ্ঞান পরমাত্মার বিষয়ে জানার জন্য ছিল, অর্থাৎ পরমাত্মা শিবের স্বরূপজ্ঞান বিষয়েরই বিশেষ আলোচনা পর্ব ছিল। 

______________________________________________

🔥 সিদ্ধান্ত 

উপরিউক্ত শ্রুতি ও মহাভারতের শাস্ত্রবচনসমূহ একত্রে বিচার করলে প্রতীয়মান হয় যে, ‘যোগযুক্ত’ অবস্থা কোনো সাধারণ যোগাভ্যাস বা ধ্যানের স্তর নয় ; বরং এটি সেই পরম আধ্যাত্মিক অবস্থা, যেখানে যোগী মনকে ইন্দ্রিয় ও ত্রিগুণের অতীত করে পরমব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত হন। ঋগ্বেদের নাদবিন্দু উপনিষদ এই পরমব্রহ্মকে শুদ্ধ, সর্বব্যাপী, নির্মল, স্বপ্রকাশ এবং শিব বলে অভিহিত করেছে এবং ঘোষণা করেছে যে, যোগযুক্ত সাধক সর্বদা সেই শিবে প্রবেশ করে অবস্থিত হন।

অন্যদিকে, মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্বে যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে স্পষ্টভাবে বলেন যে, ভগবদ্গীতায় তিনি পরমব্রহ্মতত্ত্ব যোগযুক্ত অবস্থায় উপদেশ দিয়েছিলেন। অতএব, ঋগ্বেদের নাদবিন্দু উপনিষদে শ্রুতিতে বর্ণিত যোগযুক্ত অবস্থার স্বরূপ এবং মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের উক্তি পরস্পরের আলোকে বিবেচনা করলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, ভগবদ্গীতায় বর্ণিত পরমব্রহ্মতত্ত্ব সেই যোগযুক্ত অবস্থায় উপলব্ধ পরমেশ্বর শিবেরই ইঙ্গিত।

সুতরাং, উপস্থাপিত শাস্ত্রপ্রমাণগুলির আলোকে এই সিদ্ধান্ত প্রতীয়মান হয় যে, যোগের পরম লক্ষ্য পরমব্রহ্ম-উপলব্ধি, এবং নাদবিন্দু উপনিষদ সেই পরমব্রহ্মকে শিবরূপে নির্দেশ করেছে। সেই কারণেই যোগযুক্ত অবস্থায় পরমব্রহ্মতত্ত্বের উপলব্ধি ও তার উপদেশ — উভয়ই একই পরম সত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে এই আলোচনায় প্রতিপন্ন হয়েছে। এতে অন্তিম সিদ্ধান্ত হিসেবে পরমেশ্বর শিবের পরমত্ব ও পরমব্রহ্মত্ব নিঃসংশয় ভাবে প্রমাণিত। 

______________________________________________

🚩 তথ্য সংগ্রহ ও লেখনীতে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীপাদযুক্ত শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব 🚩 

©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥 

শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩 

ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩 

 #রুদ্র #সনাতনধর্ম #শিবালয় #shiva #শিব #পরমেশ্বরশিব  #Shivalaya #শৈবধর্ম #শিবশাসন #পুরাণ #বেদ #যোগ #নাদবিন্দু উপনিষদ্‌ #ভগবদ্গীতা #শ্রীকৃষ্ণ #যোগাচার #যোগযুক্ত #ঋগ্বেদ #উপনিষদ

Ai generated image.




মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ