শুক্ল-যজুর্বেদের ১৬ অধ্যায়ের দয়ানন্দ কৃত ৪১ নং মন্ত্র- “নমঃ শম্ভবায় চ…..শিবায় চ শিবতরায় চ” কৃত্রিম ও কপোলকল্পিত ভাষ্যের খণ্ডন

 🚩 যজুর্বেদের ১৬তম অধ্যায় শতরুদ্রীয় হোম প্রকরণের উপর দয়ানন্দ কৃত ৪১ নং মন্ত্র- “নমঃ শম্ভবায় চ…..শিবায় চ শিবতরায় চ” কৃত্রিম ও কপোলকল্পিত ভাষ্যের খণ্ডন —




- বেদের মন্ত্রকে সঠিক ভাবে বোঝার জন্য আমাদের প্রাচীন আচার্যরা বেদের ভাষ্য করে গেছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সায়ণ, উব্বট, মহীধর আদি আদি। একই ভাবে শুক্ল-যজুর্বেদের শতরুদ্রীয় প্রকরণের উপরও আমাদের প্রাচীন তিন আচার্য শাস্ত্রের নিয়ম মেনেই ভাষ্য করে গেছেন৷ উক্ত তিন আচার্যই শতরুদ্রীয় প্রকরণকে হোম প্রকরণ বলেই ভাষ্য করেছেন, যা সম্পূর্ণরূপে শুদ্ধ। কারণ, শতপথ ব্রাহ্মণ, কাত্যায়ন শ্রৌতসূত্র ও আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্রে শতরুদ্রীয় প্রকরণকে অগ্নিচয়ন প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবেই ব্যাখ্যা করেছেন৷ এই অবধি সবই ঠিক থাকলেও পরবর্তীতে আর্যসমাজের প্রতিষ্ঠাতা দয়ানন্দ সরস্বতী নিজের করা যজুর্বেদ ভাষ্যে শতরুদ্রীয় প্রকরণ হোম প্রকরণ না মেনে রাজধর্ম প্রকরণ বলেই উল্লেখ করেছেন। এবং উক্ত শতরুদ্রীয় হোম প্রকরণের প্রতিটা মন্ত্রের মনগড়া ভাষ্য করেছেন যা, পূর্বের কোনো আচার্যের ভাষ্যে সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় সাথে ব্যাকরণগতও নয়৷ নিরাকারবাদকে প্রচার করতে গিয়ে দয়ানন্দ সরস্বতী শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত না মেনেই ভাষ্য করেছেন যা অত্যন্ত লজ্জাজনক বিষয়।

এই শতরুদ্রীয় হোম প্রকরণে ৪১ নং মন্ত্রের উপর দয়ানন্দ যা ভাষ্য করেছেন তা রীতিমতো হাস্যকর। পূর্বের তিন আচার্য সায়ণ, উব্বট ও মহীধর উক্ত মন্ত্র পরমেশ্বর রুদ্রের প্রতিই সমর্পিত হয়ে ভাষ্য করেছেন। কিন্তু, আধুনিক কালে দয়ানন্দ সরস্বতী এবং তাঁর আর্যসমাজ এই প্রাচীন ধারাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে মন্ত্রটির একটি অদ্ভুত ও লৌকিক অর্থ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন - এখানে নাকি সমাজের ‘সেনাধ্যক্ষ’, ‘রাজা’ বা ‘বিদ্বান’ মানুষদের সম্মান জানানোর কথা বলা হয়েছে।

​যদিও “স্থালীপূলকন্যায়” দ্বারা দয়ানন্দের শতরুদ্রীয় প্রকরণের ভাষ্য যে সম্পূর্ণ ভুল তা প্রমাণিত হয়ে যায়। যদিও “দূর্জনতোষন্যায়” অনুযায়ী দয়ানন্দের ভাষ্যকে গ্রহণ করা হয়, তারপরেও দয়ানন্দের এই দাবিটি কেন সম্পূর্ণ ভুল এবং মনগড়া, তা কেবল অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে নয় বরং পাণিনীয় ব্যাকরণের নিয়ম, শতপথ ব্রাহ্মণ এবং প্রাচীন বৈদিক প্রমাণ দিয়ে এই নিবন্ধে হাতেনাতে প্রমাণ করা হলো। প্রথমে উক্ত মন্ত্রের উপর দয়ানন্দের ভাষ্য দেখে নেওয়া যাক  —

❌ দয়ানন্দের বেদ ভাষ্য —

“​নমঃ শম্ভবায় চ ময়োভবায় চ। নমঃ শঙ্করায় চ ময়স্করায় চ। নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ” ॥৪১॥

পদার্থ —  ​যে সকল মানুষ— ​(শম্ভবায়) — সুখের দাতা পরমেশ্বর (চ) — এবং (​ময়োভবায়) — সুখ প্রাপ্তির হেতু বা কারণ স্বরূপ বিদ্বানদের (চ) — ও (নমঃ) — সৎকার (আদর-সম্মান) করেন, ​(শঙ্করায়) — কল্যাণকারী পুরুষদের (চ) — এবং (​ময়স্করায়) — সমস্ত প্রাণীকে সুখ প্রদানকারীদের (চ) — ও (নমঃ) — সৎকার করেন, (​শিবায়) — মঙ্গলকারী পুরুষদের (চ) — এবং (​শিবতরায়) — অত্যন্ত মঙ্গলস্বরূপ পরমাত্মার (চ) — ও (নমঃ) — সৎকার ও ভক্তি করেন, ​তাঁরা জীবনের পরম কল্যাণ লাভ করেন। ॥৪১॥

​ভাবার্থ- ​মানুষের উচিত অত্যন্ত ভক্তির সাথে সমস্ত মঙ্গলের দাতা পরমেশ্বরের উপাসনা করা এবং (সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত) সেনাধ্যক্ষ বা সৎ নেতাদের যথোপযুক্ত সম্মান করা, যেন নিজেদের সমস্ত অভীষ্ট (কাঙ্ক্ষিত) লক্ষ্য ও কর্ম সিদ্ধ হয়। ॥৪১॥

[দয়ানন্দ ভাষ্য/ শুক্ল-যজুর্বেদ/ ১৬ অধ্যায়/৪১ নং শ্লোক]


✅ মহাপাশুপত অদ্বৈত শৈবপক্ষ কর্তৃক খণ্ডন —

​পাণিনীয় ব্যাকরণের নিয়ম এবং বৈদিক পরিভাষার আলোকে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর এই ভাষ্যটি কেন শাস্ত্রীয় ও ব্যাকরণগতভাবে খণ্ডিত হয়, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো —

​ 'অধিকার' এবং 'প্রকরণ' লোপের ব্যাকরণগত ত্রুটি
​পাণিনীয় ব্যাকরণ এবং মীমাংসা শাস্ত্রে কোনো পদের অর্থ নির্ধারণের জন্য প্রকরণ এবং সামর্থ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাণিনীয় সূত্রে বলা হয়েছে —

​"তদশিষ্যং সংজ্ঞাপ্রমাণত্বাৎ" (অষ্টাধ্যায়ী ১/২/৫৩)

অর্থাৎ- লোকপ্রসিদ্ধি এবং শাস্ত্রীয় প্রকরণই শব্দের প্রকৃত অর্থ নির্দেশ করে, কেবল শাব্দিক ব্যুৎপত্তি নয়।

সিদ্ধান্তকৌমুদী ভাষ্যকার ভট্টোজী দীক্ষিত বলেছেন— “যুক্তবদ্বচনং ন কর্তব্যং সংজ্ঞানাং প্রমাণত্বাৎ” ॥ অর্থাৎ- “সংজ্ঞাসূচক শব্দগুলিকে তাদের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ধরে ব্যবহার বা ব্যাখ্যা করা সমীচীন নয়, কারণ সংজ্ঞা নিজেই প্রমাণস্বরূপ এবং তার অর্থ নির্ধারণে স্বতন্ত্র কর্তৃত্ব রাখে।”

​শতপথ ব্রাহ্মণের ৯ম কাণ্ডের ১ম অধ্যায় স্পষ্ট বলছে- “অথাতঃ শতরুদ্রীয়ং জুহোতি" অতএব এখন শতরুদ্রীয় হোম করা হচ্ছে এবং "স এষোঽত্র রুদ্রো দেবতা" এখানে রুদ্রই দেবতা। কাত্যায়ন শ্রৌতসূত্র (১৮/১) একে অগ্নিচয়ন যজ্ঞের উত্তরপক্ষের হোম হিসেবে নির্দেশ করেছে - “শতরুদ্রিয়হোম উত্তরপক্ষস্যাঽপরস্যাং স্রক্ত্যাং পরিশ্রিৎস্বর্কপর্ণেনাঽর্ককাষ্ঠেন শাতয়ন্ত্সন্ততং জর্তিলমিশ্রান্গবেধুকাশক্তূনজাক্ষীরমেকে তিষ্ঠন্নুদঙ্ নমস্ত ইত্যধ্যায়েন”।।

পাণিনীয় পদ্ধতি অনুযায়ী, যেখানে যজ্ঞীয় প্রকরণ বা হোম-প্রকরণ নিশ্চিত (শতপথের প্রামাণ্যে), সেখানে জোরপূর্বক 'রাজধর্ম' বা 'সেনাধ্যক্ষ' অর্থ টানা ব্যাকরণের নিয়মকে লঙ্ঘন করে। যখন যজ্ঞাগ্নিতে আহুতি দেওয়া হচ্ছে, তখন দৃশ্যমান কোনো লৌকিক রাজাকে ডেকে "নমঃ" বলা যজ্ঞের ক্রিয়ার সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গত।
পাণিনীয় ব্যাকরণের সূত্র —

“নমঃস্বস্তিস্বাহাস্বধালংবষড্যোগাচ্চ” (অষ্টাধ্যায়ী ২/৩/১৬)।।

এই সূত্রানুযায়ী— নমঃ, স্বস্তি, স্বাহা, স্বধা, অলম্ এবং বষট্ শব্দের যোগে চতুর্থী বিভক্তি হয়। বৈদিক প্রয়োগে এই সূত্রটি মূলত যজ্ঞীয় উপাস্য বা দেবতার উদ্দেশ্যে প্রযুক্ত হয় (যেমন- অগ্নয়ে স্বাহা, রুদ্রায় নমঃ)।

শতপথ ব্রাহ্মণ (৯/১/১/১৪) স্পষ্টাক্ষরে বলছে - "নমস্তে রুদ্র মন্যব ইতি... তস্মা এতন্নমস্করোত্যুতো" ।। অর্থাৎ, রুদ্রের যে ক্রোধ ব্যাপ্ত ছিল, তাকে শান্ত করতেই দেবতারা এই নমস্কার বা আহুতি দিচ্ছেন।

​পাণিনীয় নিয়মে যজ্ঞীয় ক্ষেত্রে "নমঃ" শব্দের যোগে যে চতুর্থী বিভক্তি (শম্ভবায়, শঙ্করায়) হয়েছে, তা শতপথের অনুশাসন অনুসারে কেবল যজ্ঞভুক্ দেবতা রুদ্রেরই বাচক হতে পারে। দয়ানন্দ এখানে লৌকিক সেনাধ্যক্ষ বা মানুষের অর্থ করে "নমঃ" শব্দটিকে যজ্ঞীয় মহিমা থেকে বিচ্যুত করে সাধারণ লৌকিক "আদর-সম্মান" অর্থে নামিয়ে এনেছেন, যা শ্রৌতসূত্রের প্রয়োগের বিরোধী।

​ব্যাকরণে শব্দের তিন প্রকার অর্থ হয়- যৌগিক, রূঢ় এবং যোগরূঢ়।

​দয়ানন্দ কেবল যৌগিক অর্থের (যেমন- শম্ ভবতি যস্মাৎ = যা থেকে সুখ উৎপন্ন হয়, সুতরাং তিনি বিদ্বান বা সেনাধ্যক্ষ) আশ্রয় নিয়েছেন। ​কিন্তু পাণিনীয় ও বৈদিক ব্যাকরণের নিয়ম হলো- "যোগাদ্‌রূঢ়ির্বলীযসী" - যৌগিক অর্থের চেয়ে রূঢ় বা ঐতিহ্যগত প্রসিদ্ধ অর্থ বলবান।

​শঙ্কর বা শিব শব্দ দুটি যজুর্বেদের এই প্রকরণে যোগরূঢ়। শতপথ ব্রাহ্মণ স্বয়ং রুদ্রকে এই যজ্ঞের দেবতা নির্দেশ করায়, এই শব্দগুলি রুদ্রেরই ভিন্ন ভিন্ন কল্যাণময় রূপের বাচক (রূঢ় অর্থ), কোনো লৌকিক মানুষের নয়। দয়ানন্দের ব্যাখ্যায় বৈদিক শব্দের এই "রূঢ়ি" বা শাস্ত্রীয় প্রসিদ্ধিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে।

​মন্ত্রে শিব এবং শিবতর দুটি পদ পাশাপাশি আছে। পাণিনীয় সূত্রানুযায়ী —

“দ্বিবচনবিভজ্যোপপদে তরবীয়সুনৌ” (অষ্টাধ্যায়ী ৫/৩/৫৭)।

এই সূত্রানুযায়ী- অতিশয় বা শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে 'তর' এবং 'তম' প্রত্যয় হয়।

সিদ্ধান্তকৌমুদী ভাষ্য - দ্বয়োরেকস্যাতিশয়ে বিভক্তব্যে চোপপদে সুপ্তিঙন্তাদেতৌ স্তঃ। পূর্বয়োরপবাদঃ। অয়মনয়োরতিশয়েন লঘুর্লঘুতরঃ। লঘীয়ান্। উদীচ্যাঃ প্রাচ্যেভ্যঃ পটুতরাঃ। পটীয়াংসঃ॥

অর্থাৎ- দুই বস্তুর মধ্যে একটির উৎকর্ষ (অতিশয়) প্রকাশ করতে হলে এবং তুলনার বিষয় (বিভাজ্য) উপপদরূপে উপস্থিত থাকলে, সুপ্ বা তিঙ্-অন্ত শব্দের পরে তরপ্ ও ঈয়সুন্ এই দুই প্রত্যয় হয়।
এটি পূর্ববর্তী সূত্রদ্বয়ের (তমপ্ ও ইষ্ঠন্ বিধান) অপবাদ (ব্যতিক্রম)।

উদাহরণ- অয়ম্ অনয়োঃ অতিশয়েন লঘুঃ- এ ব্যক্তি/বস্তু এই দুটির মধ্যে অধিক লঘু। লঘুতরঃ- অপেক্ষাকৃত লঘু, আরও লঘু। লঘীয়ান্- অধিক লঘু।
আরও উদাহরণ- উদীচ্যাঃ প্রাচ্যেভ্যঃ পটুতরাঃ- উত্তরদেশীয়রা পূর্বদেশীয়দের তুলনায় অধিক দক্ষ।
পটীয়াংসঃ- অধিক দক্ষ বা অপেক্ষাকৃত দক্ষ।

অর্থাৎ, তম/ইষ্ঠ দ্বারা বহু বস্তুর মধ্যে সর্বোচ্চ উৎকর্ষ বোঝায়, আর তর/ঈয়স্ দ্বারা দুই পক্ষের মধ্যে তুলনামূলক উৎকর্ষ বোঝায়।

​স্বামী দয়ানন্দ শিবায় অর্থ করেছেন লৌকিক "মঙ্গলকারী পুরুষ" (মানুষ) এবং শিবতরায় অর্থ করেছেন "অত্যন্ত মঙ্গলস্বরূপ পরমাত্মা" (ঈশ্বর)।

​ব্যাকরণগত আপত্তি হলো- একই বাক্যে, একই বিভক্তির প্রবাহে, দুটি পদের একটিকে মানুষের ক্ষেত্রে এবং তার অতিশয় রূপটিকে ঈশ্বরের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা ব্যাকরণগত অন্বয়ের পরিপন্থী। ​প্রকৃত ব্যাকরণসম্মত অন্বয় হলো- রুদ্রের দুটি রূপ। তিনি যেমন লৌকিক স্তরে রোগ নিরাময় ও শান্তি দিয়ে শিব (মঙ্গলময়), তেমনই পরমার্থিক স্তরে জীবকে মোক্ষ বা মুক্তি দিয়ে তিনি শিবতর (অত্যন্ত মঙ্গলময়)। এখানে শিবায় (চতুর্থী বিভক্তি) এবং শিবতরায় (চতুর্থী বিভক্তি) দুটি পদই একই বিভক্তিযুক্ত এবং এদের মাঝে কোনো বিভাজক পদ নেই।

​ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী- যেহেতু পদ দুটিতে একই চতুর্থী বিভক্তি রয়েছে, তাই এরা একই সমানাধিকরণের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ- শিব এবং শিবতর দুটি ভিন্ন সত্ত্বা (মানুষ ও ঈশ্বর) হতে পারে না। এরা একটিই অভিন্ন সত্ত্বাকে (পরমেশ্বর রুদ্রকে) নির্দেশ করছে। ​এখানে শিব হলো পরমেশ্বররুদ্রের শান্ত বা মঙ্গলময় রূপ, আর শিবতর হলো তাঁর মোক্ষপ্রদায়ী চরম রূপ। আধার বা সত্ত্বা এখানে একটিই তিনি রুদ্র।

​স্বামী দয়ানন্দ এখানে একই বিভক্তিযুক্ত পদের এই অভিন্ন আধার বা সত্ত্বাকে ভেঙে একটিকে "মানুষ" ও অন্যটিকে "ঈশ্বর" করেছেন, যা ব্যাকরণের এই সমানাধিকরণ্য নিয়মটির সম্পূর্ণ বিরোধী।

​শতপথ ব্রাহ্মণ এবং কাত্যায়ন শ্রৌতসূত্রের প্রমাণের সামনে স্বামী দয়ানন্দের ভাষ্যটি মনগড়া প্রমাণিত হয়। কারণ —

১. শতপথ ব্রাহ্মণ নিশ্চিত করেছে এটি হোম ও রুদ্র প্রকরণ, রাজধর্ম প্রকরণ নয়।

২. পাণিনীয় সূত্রানুসারে, যজ্ঞের প্রেক্ষাপটে নমঃ যোগে যে চতুর্থী বিভক্তি হয়েছে, তার লক্ষ্য কেবল যজ্ঞের অধিষ্ঠাতা দেবতা রুদ্র।

৩. দয়ানন্দ সরস্বতীর ভাষ্যটি ব্যাকরণের শাব্দিক ব্যুৎপত্তি স্পর্শ করলেও, তা বৈদিক বিনিযোগ, প্রকরণ এবং ব্রাহ্মণ-গ্রন্থের অনুশাসনকে সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করায় শাস্ত্রীয় ও ব্যাকরণগতভাবে "মনগড়া" বা অপ্রামাণিক হিসেবেই গণ্য হয়।

👉 তাহলে উক্ত মন্ত্রের সঠিক অর্থ হলো —

“​নমঃ শম্ভবায় চ ময়োভবায় চ। নমঃ শঙ্করায় চ ময়স্করায় চ। নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ” ॥৪১॥

অন্বয় - (​শম্ভবায়) - শম্ অর্থাৎ ইহলৌকিক বা জাগতিক সুখের যিনি ভব অর্থাৎ উৎপত্তিস্থল, সেই পরমেশ্বর রুদ্রকে নমস্কার। ​(ময়োভবায়) - ময়স্ অর্থাৎ পারলৌকিক বা আধ্যাত্মিক (মোক্ষরূপ) সুখের যিনি উৎপত্তিস্থল, তাঁকে নমস্কার। ​(চ) - এবং ​(নমঃ) - আমাদের প্রণতি বা যজ্ঞীয় আত্মসমর্পণ।
​(শঙ্করায়) - শম্ অর্থাৎ ইহলোকের সুখ যিনি কর অর্থাৎ বিধান করেন বা ভক্তকে দান করেন, তাঁকে নমস্কার।
(​ময়স্করায়) - ময়স্ অর্থাৎ মোক্ষসুখ যিনি বিধান করেন, তাঁকে নমস্কার। (​শিবায়) - যিনি স্বভাবতই পরম শান্ত এবং পরম মঙ্গলময়, তাঁকে নমস্কার। ​{(শিবতরায় (তরপ্ প্রত্যয়যোগে)} -  যিনি ভক্তকে নিজের সাথে একাত্ম করে দিয়ে অত্যন্ত বা চরম মঙ্গল সাধন করেন, সেই পরমাত্মাকে নমস্কার।।
শাস্ত্রসম্মত শুদ্ধ অনুবাদ- ​"যিনি ইহলৌকিক সুখের উৎপত্তিস্থল এবং যিনি পারলৌকিক বা মোক্ষসুখের আধার, সেই পরমেশ্বর রুদ্রের উদ্দেশ্যে আমাদের নমস্কার। যিনি জগতের সমস্ত জীবের জাগতিক কল্যাণ সাধন করেন এবং যিনি আধ্যাত্মিক পরম কল্যাণ বিধান করেন, সেই পরমেশ্বরকে নমস্কার। যিনি নিত্য মঙ্গলস্বরূপ এবং যিনি জীবকে পরম মুক্তি দান করে অত্যন্ত মঙ্গলময় রূপ ধারণ করেন, সেই পরম শিবকে আমাদের বারবার নমস্কার বা আত্মসমর্পণ।"

👉 এবার উক্ত মন্ত্রের উপর ভাষ্যকারদের ভাষ্যও দেখে নেওয়া যাক —

​উব্বট ভাষ্য- নমঃ শং ভবায় চ মযোভবায় চ। 'শম উপশমে'। অস্য। শং সুখনাম। শম্ভাবয়তীতি শম্ভবঃ। যদ্বা। শমা সুখেন বা ভাবয়তীতি শম্ভবঃ। শং চ আনন্দরূপশ্চ। কালদেশানবচ্ছিন্নং ভবনং তচ্ছক্তিশ্চ। আনন্দবিজ্ঞান ইত্যর্থঃ। ইয়মেব ব্যাখ্যা মযোভুবশব্দস্য। নমঃ শঙ্করায় চ মযস্করায় চ। শং করোতীতি শঙ্করঃ। মযঃ করোতীতি মযস্করঃ। নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ শিবঃ শান্তো নির্বিকারঃ। শিবতরস্ততোঽপ্যধিকো নিরতিশয়-সর্বজ্ঞবীজঃ ॥ ৪১ ॥

মহীধর ভাষ্য - শং সুখং ভবত্যস্মাদিতি শম্ভবঃ। যদ্বা শং সুখরূপশ্চাসৌ ভবঃ সংসাররূপশ্চ মুক্তিরূপো ভবরূপশ্চ তস্মৈ। মযঃ সুখং ভবত্যস্মান্মযোভবঃ সংসারসুখপ্রদঃ তস্মৈ। শং লৌকিকসুখং করোতি শঙ্করঃ তস্মৈ। মযো মোক্ষসুখং করোতি মযস্করঃ তস্মৈ। স্রক্চন্দনাদিরূপেণ লৌকিকসুখকারিত্বং [পূর্বাভ্যাং] পদাভ্যাং সাক্ষাত্সুখকারিত্বং পূর্বাভ্যাং তদ্বারা কারয়িতৃত্ব-শাস্ত্রাদিরূপেণ জ্ঞানপ্রদত্বান্মোক্ষসুখকারিত্বমিত্যর্থঃ। এতাত্যাং মিতি বিবেকঃ। শিবঃ কল্যাণরূপো নিষ্ণাপঃ তস্মৈ। শিবতরোঽত্যন্তং শিবো ভক্তানপি নিষ্ণাপান্করোতি তস্মৈ। অস্যাং কণ্ডিকায়াং ষড্ যজূংষি পূর্বস্যাং দশোক্তেঃ ॥ ৪১ 

[শুক্ল-যজুর্বেদ/ উব্বট-মহীধর ভাষ্য/ ১৬/৪১]

অনুবাদ- ​"যিনি দেশ ও কালের সীমানা-অতীত নিত্য আনন্দ-বিজ্ঞানস্বরূপ, এবং যা হতে জীবের জাগতিক সুখ ও পরম মোক্ষসুখ উৎপন্ন হয় (যিনি একই সাথে সংসার ও মুক্তি উভয়েরই আধার), সেই পরমেশ্বর রুদ্রকে নমস্কার। যিনি (জগতে চন্দন, পুষ্পমালা ইত্যাদির মতো অনুকূল রূপ ধারণ করে) জীবকে সরাসরি ইহলৌকিক সুখ প্রদান করেন এবং যিনি বেদ-শাস্ত্রের দিব্যজ্ঞানের মাধ্যমে সাধককে পরম মোক্ষসুখ দান করেন, সেই কল্যাণবিধাতা শঙ্করকে নমস্কার। যিনি স্বয়ং পরম শান্ত, নির্বিকার, নিষ্পাপ ও সর্বকল্যাণের আদি উৎস এবং যিনি কেবল নিজেই পরম পবিত্র নন, বরং নিজের পরমকারুণিক রূপের দ্বারা শরণাগত ভক্তদেরও সর্বপ্রকার পাপ ও কলুষতা থেকে মুক্ত করে নিজের মতো নিষ্কল্মষ করে তোলেন সেই নিরতিশয় সর্বজ্ঞবীজ পরম শিবের চরণে আমাদের সর্বস্ব সমর্পণ বা বারবার নমস্কার।"

সায়ণ ভাষ্য- “​শং সুখং ভাবয়ত্যুৎপাদয়তীতি শম্ভুঃ। ময়ঃ সুখং ভাবয়তীতি ময়োভূঃ। একং বিষয়সুখমপরং মোক্ষসুখমিতি তয়োর্বিবেকঃ। পিত্রাদিরূপেণ শং লৌকিকসুখং করোতীতি শঙ্করঃ। আচার্য-শাস্ত্রাদিরূপেণ মোক্ষসুখং করোতীতি ময়স্করঃ। সাক্ষাত্সুখকারিত্বমেতাভ্যাং পদাভ্যামুক্তমেতন্মুখেন কারয়িতৃত্বং পূর্বাভ্যাং পদাভ্যামিতি বিবেকঃ। শিবঃ কল্যাণরূপঃ স্বয়ং নিষ্কল্মষ ইত্যর্থঃ। অতিশয়েন শিবঃ শিবতরঃ স্বভক্তানপি নিষ্কল্মষান্করোতীত্যর্থঃ”।।

[তৈত্তিরীয় সংহিতা/ সায়ণভাষ্য/ ৪/৫/৯]

​অনুবাদ- ​"যিনি (জগতে পিতা-মাতার রূপ ধারণ করে) ইহলৌকিক বা জাগতিক সুখের সৃষ্টি করেন এবং যিনি (আচার্য ও শাস্ত্রের রূপ ধারণ করে) পারলৌকিক বা মোক্ষসুখের উদগাতা, সেই পরমেশ্বর রুদ্রকে নমস্কার। যিনি জগতের সমস্ত জীবকে সরাসরি জাগতিক কল্যাণ ও স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করেন এবং যিনি সাধককে পরম মোক্ষসুখ দান করেন, সেই বিঘ্নবিনাশকারী শঙ্করকে নমস্কার। যিনি স্বয়ং পরম শান্ত, নিষ্কল্মষ ও নিত্য মঙ্গলস্বরূপ এবং যিনি নিজের শরণাগত ভক্তদেরও সমস্ত কলুষতা ও পাপ থেকে মুক্ত করে নিজের মতো পবিত্র ও মুক্ত করে তোলেন, সেই অতিশয় মঙ্গলময় পরম শিবের চরণে আমাদের সর্বস্ব সমর্পণ বা বারবার নমস্কার।"

✅ ​অতএব, নির্দ্বিধায় বলা যায় যে- সায়ণ, উব্বট এবং মহীধরের ভাষ্যই এই মন্ত্রের একমাত্র শুদ্ধ, সনাতন এবং ব্যাকরণসম্মত প্রামাণ্য ব্যাখ্যা। পক্ষান্তরে, দয়ানন্দের ভাষ্যটি বৈদিক প্রকরণ-বহির্ভূত, পাণিনীয় সমানাধিকরণ্য-বিরোধী এবং প্রাচীন আচার্যদের সিদ্ধান্ত-বিরোধী একটি আধুনিক ও মনগড়া ব্যাখ্যা মাত্র, যা শাস্ত্রীয় বিচারে কোনোভাবেই গ্রাহ্য নয়।


🙏সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু🙏

নমঃ শিবায়ৈ 🙏
নমঃ শিবায় 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্‌ ✊🚩

✍️ অপপ্রচার দমনে— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।

🌻 বিশেষ কৃতজ্ঞতা— আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।

📣 কপিরাইট ও প্রচারে— Shivalaya

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ