গুরু গোরক্ষনাথ ও আচার্যের বচনের শক্যার্থ ধরে বিতণ্ডা ও কুতর্ক করা দ্বৈতবাদী শৈবের মুখোশ উন্মোচন —

 🚩 গুরু গোরক্ষ নাথ ও আচার্যের বচনের শক্যার্থ ধরে বিতণ্ডা ও কুতর্ক করা দ্বৈতবাদী শৈবের মুখোশ উন্মোচন —


🔘 পূর্বপক্ষ যখন কামিক আগমের জালিয়াতি এবং পাণিনীয় ব্যাকরণের নিয়মের সামনে সম্পূর্ণ নিরুত্তর হয়ে গেলেন, তখন তিনি নিজের পিঠ বাঁচাতে পরম শিবস্বরূপ শ্রীগুরু গোরক্ষনাথের ‘গোরক্ষবাণী’ এবং কাশ্মীর শৈব আচার্য স্বামী লক্ষ্মণজু-এর বচনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে এসেছেন।

পূর্বপক্ষ ‘গোরক্ষবাণী’র মাংস-নিষেধের বচন দেখিয়ে ভাবছেন তাঁরা পশুবলির শাস্ত্রীয় বিধি খণ্ডন করে ফেলেছেন। কিন্তু উনারা যোগ ও তন্ত্র শাস্ত্রের মৌলিক পরিভাষাই জানেন না।

​স্বয়ং পরমেশ্বর শিবের মুখনিঃসৃত ‘শ্রীগোরক্ষ তন্ত্রম্’ (৫ম অধ্যায়, শ্লোক ১৩৪)-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে —

“গোশব্দেনোচ্যতে জিহ্বা তৎপ্রবেশো হি তালুনি। গোমাংসভক্ষণং তত্তু মহাপাতকনাশনম্” ॥

​যোগ ও নাথপন্থের পরিভাষায় ‘গো’ শব্দের অর্থ গরু বা স্থূল পশু নয়, ‘গো’ শব্দের অর্থ হলো জিহ্বা। যোগী যখন খেচরী মুদ্রা দ্বারা নিজের জিহ্বাকে উল্টে তালুকুহরে প্রবেশ করান এবং সেখান থেকে নিঃসৃত সোমকলামৃত আস্বাদন করেন, তাকেই যোগমার্গে ‘গোমাংস ভক্ষণ’ বা মাংস সাধনা বলা হয়।

শ্রীগুরু গোরক্ষনাথ যখন অবধূত যোগীদের মাংস বা স্থূল আহার বর্জন করতে বলেছেন, তখন তিনি এই উচ্চকোটির খেচরী মুদ্রার সাধকদের কথা বলেছেন, যাঁরা বায়ু ভক্ষণ করে অমৃত পানের মাধ্যমে ‘যোগজ মাংস’ সাধন করেন। সেখানে স্থূল আহারের (তা প্রাণিজ হোক বা উদ্ভিজ্জ) কোনো স্থান নেই, কারণ তা যোগীর চিত্তকে অশান্ত করে। যোগশাস্ত্রের এই আধ্যাত্মিক পরিভাষাকে স্থূল পশুবলির সাথে গুলিয়ে ফেলা পূর্বপক্ষের শাস্ত্রীয় মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

🔘 পূর্বপক্ষ দাবি করছেন গোরক্ষবাণীতে মাংসাহারকে নরকের কারণ বলা হয়েছে, তাই যজ্ঞীয় বলিও পাপ। এখানে পূর্বপক্ষ মীমাংসা দর্শনের পরম নিয়ম “ন হি নিন্দা ন্যায়” বুঝতে মারাত্মক ভুল করেছেন।

(মীমাংসা-সূত্র ২/৪/২০) এর “শবর ভাষ্যে” বলা হয়েছে–

​”ন হি নিন্দা নিন্দয়িতুং প্রযুক্তে। কিং তর্হি? নিন্দিতাদিতরত প্রশংসিতুম্”।।

অর্থ- নিন্দা কেবল নিন্দা করার জন্য ব্যবহার করা হয় না। তবে কেন করা হয়? যা নিন্দিত হচ্ছে, তা থেকে ভিন্ন অন্য কিছুকে প্রশংসা করার জন্য।

​কুমারিল ভট্টের তন্ত্র-বার্তিকে বলা হয়েছে-

​”ন হি নিন্দা নিন্দ্যং নিন্দিতুং প্রবর্ততেঽপি তু বিধেয়ং স্তোতুম্”।।

অর্থাৎ- নিন্দা নিন্দনীয় বিষয়কে নিন্দা করার উদ্দেশ্যে প্রবৃত্ত হয় না, বরং যা বিধেয় (অর্থাৎ যে কাজটি করার বিধান দেওয়া হচ্ছে), তার প্রশংসা করার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।

গোরক্ষবাণীতে স্থূল মাংসের যে নিন্দা করা হয়েছে, তা আসলে বৈদিক বা তান্ত্রিক যজ্ঞীয় বলির বিরুদ্ধে নয়, বরং অবধূত যোগীদের জন্য ‘খেচরী মুদ্রা’ ও ‘অমৃত পান’ রূপ অভ্যন্তরীণ সাধনার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য প্রযুক্ত একটি ‘নিন্দার্থবাদ’ (অর্থবাদ) মাত্র। যোগীর হঠযোগ সাধনার নিয়মকে জোরপূর্বক সর্বসাধারণের আহার-বিধি বা যজ্ঞীয় বলীর ওপর প্রয়োগ করতে গেলে শ্রুতি, স্মৃতি ও মীমাংসা, তিনটিরই ‘ব্যাকোপ’ (চরম উলঙ্ঘন ও বিপর্যয়) ঘটে। কারণ বিধিবাক্য সর্বদা অর্থবাদ অপেক্ষা বলবান।

🔘 পূর্বপক্ষ নিজেদের পিঠ বাঁচাতে ‘প্রায়শ্চিত্তসমুচ্ছয়ঃ’ গ্রন্থের দোহাই দিয়ে বলেছেন যে প্রাচীন আচার্যরা প্রতীকী বলির জন্য প্রায়শ্চিত্তের বিধান দিয়েছেন। ন্যায়শাস্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী- প্রায়শ্চিত্তের বিধান তখনই প্রযুক্ত হয়, যখন কোনো শাস্ত্রীয় ক্রিয়া বা বিধি বাস্তবিকভাবে সমাজে অস্তিত্বশীল থাকে! যদি আগমশাস্ত্রে বাস্তব বলির কোনো অনুমোদনই না থাকত, সব যদি শুরু থেকেই আটা-ময়দার পুতুল হতো, তবে প্রাচীন আচার্যরা ‘প্রায়শ্চিত্তসমুচ্ছয়ঃ’ গ্রন্থে বলির প্রায়শ্চিত্তের বিধান লিখতে গেলেন কেন? ময়দার খেলনা কাটলে কি মানুষের পাপ হয় যে তার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে? প্রায়শ্চিত্তের এই শাস্ত্রীয় অস্তিত্বই প্রমাণ করে দেয় যে- বাস্তব বলীদান শৈব আচারে সম্পূর্ণ সত্য ছিল। পূর্বপক্ষ নিজেদের যুক্তি দিতে গিয়ে প্রকারান্তরে বাস্তব বলির সত্যতাকেই স্বীকার করে নিজেদের জালে নিজেরা জড়িয়ে গেছেন।

🔘 পূর্বপক্ষ বলছেন যে তাঁদের প্রাচীন আচার্যরা ‘প্রায়শ্চিত্তসমুচ্চয়ঃ’ গ্রন্থে প্রতীকী বলির প্রায়শ্চিত্তের কথা বলেছেন এবং ২৮টি মূলাগম নাকি বাস্তব বলির বিরুদ্ধে। মীমাংসা শাস্ত্রের নিয়ম হলো -

“অবিরুদ্ধম্‌ পরম্‌” (পূর্বমীমাংসা ১/২/৪৪) 

অর্থাৎ- যে ব্যাখ্যা বা অনুমান (পরম্) গ্রহণ করা হচ্ছে, তা যদি বেদের বিধান বা যুক্তির সঙ্গে বিরোধ না করে, তবে সেই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য। যদি বিরোধ হয় তবে তা গ্রহণীয় নয়। 

কোনো বিশেষ আচার্যের বচন যদি সরাসরি বেদ বা শিবোক্ত আগমের বিধিবাক্যের বিরুদ্ধে যায়, তবে সেখানে আচার্য বাক্যের ব্যাপ্তি সংকুচিত হয়ে যায়।

​কামিক আগমে শিব স্বয়ং যেখানে রাজপ্রাসাদের জন্য 'মাংসান্ন' এবং শূদ্রগৃহে 'মদ্য' বলির স্পষ্ট বিধিবাক্য দিয়েছেন, সেখানে কোনো আচার্য যদি বলেন "বাস্তব বলি নিষিদ্ধ", তবে সেই আচার্যের বাক্যটি কেবল তাঁর নিজস্ব সম্প্রদায়ের নিবৃত্তি মার্গী শিষ্যদের জন্যই সীমাবদ্ধ (সংকুচিত ব্যাপ্তি)। তাকে সার্বিক বলা যায় না। 

আর- গোরক্ষবাণীতে মাংসাহারের যে নিন্দা করা হয়েছে, তা মূলত যোগীদের একাগ্রতা রক্ষার জন্য 'নিন্দার্থবাদ' (একটি বিশেষ পথকে বড় করতে অন্য পথের নিন্দা করা)। এটি বাস্তব যজ্ঞীয় বলির বিধিবাক্যকে বাতিল করতে পারে না।

প্রথমত- তর্কের মূল বিষয় ছেড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো বিষয়ের অবতারণা করে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হলো- অর্থান্তর নিগ্রহস্থান'। বিতর্ক ছিল আগমের ‘বাস্তুদেবাবলি’ এবং পাণিনীয় ব্যাকরণের সমাস নিয়ে। পূর্বপক্ষ তার জবাব দিতে না পেরে হঠযোগের ‘গোরক্ষবাণী’ টেনে এনেছেন। যজ্ঞীয় বলির বিতর্কে হঠযোগের নিয়ম আনা ন্যায়শাস্ত্র অনুযায়ী “অর্থান্তর নিগ্রহস্থান” নামক পরাজয়ের লক্ষণ।

দ্বিতীয়ত- নাথযোগীদের অবধূত মার্গীয় ব্যক্তিগত আহার-সংযম ও ব্রহ্মচর্যের নিয়মকে সমগ্র সনাতন ধর্ম এবং শৈবাগমের সার্বিক নিয়ম বলে দাবি করা তাত্ত্বিক একদেশদর্শিতা মাত্র।

পূর্বপক্ষকে আমাদের বিনীত জিজ্ঞাসা— আপনারা নিজেদের নিরামিষ সংকীর্ণতা বাঁচাতে শ্রীগুরু গোরক্ষনাথের বাণীর দোহাই দিচ্ছিলেন? স্বয়ং শিবের বলা ‘শ্রীগোরক্ষ তন্ত্রম্’ পড়েছেন তো? সেখানে শিব স্পষ্ট বলেছেন- ‘গোশব্দেনোচ্যতে জিহ্বা’, অর্থাৎ যোগীর কাছে মাংস মানে স্থূল মাংস নয়, নিজের জিহ্বাকে তালুকুহরে প্রবেশ করিয়ে অমৃত পান করা!
​আপনারা যোগশাস্ত্রের এই তান্ত্রিক পরিভাষাই বোঝেন না, অথচ তা নিয়ে ডিবেট করতে এসেছেন! মীমাংসা শাস্ত্রের ‘ন হি নিন্দা’ ন্যায় অনুযায়ী, গোরক্ষবাণীতে মাংসের যে নিন্দা আছে, তা যোগীদের খেচরী মুদ্রার মহিমা কীর্তন করার জন্য একটি ‘অর্থবাদ’ মাত্র। যোগমার্গের এই বিশেষ নিয়মকে সার্বিক যজ্ঞীয় বলির বিধির ওপর চাপাতে যাবেন না, নচেৎ শ্রুতি ও মীমাংসা উভয়েরই ব্যাকোপ ঘটবে। আপনাদের কুতর্ক, বিতণ্ডা এবং শাস্ত্রের জগাখিচুড়ি পাকানোর চেষ্টা আজ পাণিনীয় ব্যাকরণ ও ন্যায়ের আলোতে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ!

🔘 ​পূর্বপক্ষ পূণরায় নিজের পিঠ বাঁচাতে কোনো উপায় না পেয়ে গুরু গোরক্ষনাথের বচনকে “ট্রাম্পকার্ড” হিসেবে ব্যবহার করছেন। ​পূর্বপক্ষ যেভাবে শ্রীগুরু গোরক্ষনাথের বাণীর ‘শক্যার্থ’ বা আক্ষরিক অর্থ আঁকড়ে ধরে বাস্তব বলিদান ও মাংসাহারের সার্বিক নিষেধ দাবি করছেন, তার অসারতা প্রমাণ করতে স্বয়ং প্রজাপতি ব্রহ্মার মুখনিঃসৃত একটি শ্লোক উপস্থাপন করা হলো -

​“ন স্নানেন ন দানেন ন জপ্যেন ন পূজয়া।
মল্লোকঃ প্রাপ্যতে দেবাঃ প্রাপ্যতে দ্বিজতর্পণাৎ ॥”
(স্কন্দপুরাণ/ কাশীখণ্ড/ পূর্বার্ধ/ অধ্যায় ৩/৬৭)

অর্থাৎ- কেবল স্নান, দান, জপ কিংবা পূজার দ্বারা আমার লোক প্রাপ্তি হয় না, বরং দ্বিজ বা শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণদের তৃপ্তিকরণ দ্বারাই আমার লোক প্রাপ্তি সুনিশ্চিত হয়।

পূর্বপক্ষ যেভাবে গোরক্ষবাণীর আক্ষরিক অর্থ নিয়ে মাংসকে নরকের কারণ বলছেন, সেই একই নিয়ম যদি ব্রহ্মার এই বচনে প্রয়োগ করা হয়, তবে কি তাঁদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ থেকে স্নান, জপ এবং ঈশ্বরের পূজা চিরতরে ত্যাগ করে দেওয়া উচিত?

​যদি কেউ কেবল এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ ধরে পূজা-জপ ছেড়ে দেয়, তবে তা যেমন চরম মূর্খতা হবে, ঠিক তেমনই গোরক্ষবাণীতে যোগীদের বিশেষ চিত্তশুদ্ধির প্রসঙ্গের আক্ষরিক অর্থ নিয়ে সমগ্র শাস্ত্রের যজ্ঞীয় বলীর বিধিবাক্যকে উড়িয়ে দেওয়াও সমপর্যায়ের মূর্খতা।

এখানে ব্রহ্মার উদ্দেশ্য স্নান বা পূজাকে নিষিদ্ধ করা নয়, বরং ‘দ্বিজতর্পণ’ বা ব্রাহ্মণ-সেবার মাহাত্ম্যকে সর্বোচ্চে তুলে ধরার জন্য পূজা-জপের গুরুত্বকে আপাতভাবে খাটো বা নিন্দা করা হয়েছে। একে মীমাংসা শাস্ত্রে 'নিন্দার্থবাদ' (অর্থবাদ) বলে।

ঠিক একইভাবে, শ্রীগুরু গোরক্ষনাথ যখন অবধূত যোগীদের মাংসাহারের নরক-যাতনার ভয় দেখিয়েছেন, তখন তাঁর উদ্দেশ্য বৈদিক বা তান্ত্রিক বলীর বিধিবাক্য খণ্ডন করা ছিল না, বরং অবধূতের যোগমার্গ, সম্যক্ জ্ঞান ও খেচরী মুদ্রার সাধনকে সুরক্ষিত করার জন্য স্থূল মাংসের তীব্র নিন্দা বা নিন্দার্থবাদ করা হয়েছে মাত্র।

​পূর্বপক্ষ গোরক্ষবাণীর আক্ষরিক অর্থ বা শক্যার্থ ধরে মাংসের নিষেধ দেখাচ্ছেন। আপনাদের এই নিয়ম ধরে স্বয়ং ব্রহ্মার বলা স্কন্দপুরাণ কাশীখণ্ডের পূর্ব্বাদ্ধে (৩/৬৭) শ্লোকটি বিচার করুন তো! ব্রহ্মা বলছেন- স্নান, দান, জপ বা পূজায় নাকি ভগবল্লোক পাওয়া যায় না!

​এবার বলুন, আপনাদের আক্ষরিকতাবাদের নিয়ম অনুযায়ী আমরা কি আগামীকাল থেকে স্নান করা আর শিবের পূজা করা বন্ধ করে দেব? দেব না। কারণ আমরা জানি, এখানে ব্রাহ্মণ-মাহাত্ম্য দেখানোর জন্য পূজা-জপের ‘নিন্দার্থবাদ’ করা হয়েছে। ব্রহ্মার বচনে যখন রূপক বোঝেন, তখন যোগী গোরক্ষনাথের বাণীতে অবধূতের যোগমার্গের শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর রূপক বা নিন্দার্থবাদ কেন বুঝতে পারেন না? শাস্ত্রের কোথায় আক্ষরিক অর্থ নিতে হয় আর কোথায় নিন্দার্থবাদ বুঝতে হয়, এই নুন্যতম জ্ঞানটুকু আপনাদের নেই!

🔘 একই বিষয় শিবমহাপুরাণ থেকেও দেখে নেবো -

পরমেশ্বর শিব বলছেন -

“কুসঙ্গা বহবো লোকে স্ত্রীসঙ্গস্তত্র চাধিকঃ।
উদ্ধরেৎ সকলৈর্বদ্ধের্ন স্ত্রীসঙ্গাৎ প্রমুচ্যতে” ।।
(শিবমহাপুরাণ/ রুদ্রসংহিতা/ পার্বতীখণ্ড/ অধ্যায় ২৪/৬১)

অর্থ- "সংসারে বহু রকমের কুসঙ্গ রয়েছে, তবে তার মধ্যে স্ত্রীসঙ্গই সবচেয়ে প্রবল বা অধিক। মানুষ অন্য সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারলেও, স্ত্রীসঙ্গের বন্ধন থেকে সহজে মুক্তি পায় না।"

পূর্বপক্ষ যেভাবে গোরক্ষবাণীর আক্ষরিক অর্থ নিয়ে মাংসকে নরকের কারণ বলছেন, সেই একই আক্ষরিকতাবাদের নিয়ম যদি শিবের এই বচনে প্রয়োগ করা হয়, তবে কি পূর্বপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ থেকে সংসারের সমস্ত পুরুষদের বিবাহ করা বন্ধ করে দেওয়া উচিত এবং সমস্ত গৃহস্থের নিজ পত্নী ত্যাগ করা উচিত?

​শিবের এই বচনের আক্ষরিক অর্থ (শক্যার্থ) ধরে যদি কেউ বিবাহ বা গার্হস্থ্য ধর্মকে 'সবচেয়ে বড় কুসঙ্গ' বলে ত্যাগ করে, তবে তা যেমন পরম মূর্খতা এবং সমাজবিধ্বংসী হবে, ঠিক তেমনই যোগীদের বিশেষ চিত্তশুদ্ধির প্রসঙ্গের আক্ষরিক অর্থ নিয়ে সমগ্র শাস্ত্রের বিধিসম্মত যজ্ঞীয় বা তান্ত্রিক বলীর বিধানকে উড়িয়ে দেওয়াও সমপর্যায়ের মূর্খতা।

এখানে প্রভু শিবের উদ্দেশ্য সৃষ্টি স্থিতি বা গার্হস্থ্য ধর্মকে নিষিদ্ধ করা নয়। বরং যিনি পরম বৈরাগ্যবান সাধক, যিনি নিবৃত্তি মার্গে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে চান, তাঁর কাছে নারীসঙ্গ বা আসক্তি যে কতটা বড় অন্তরায়, সেই নিবৃত্তি মার্গ ও বৈরাগ্যের মাহাত্ম্যকে সর্বোচ্চে তুলে ধরার জন্যই এখানে স্ত্রীসঙ্গকে আপাতভাবে 'সবচেয়ে বড় কুসঙ্গ' বলে তীব্র নিন্দা বা 'নিন্দার্থবাদ' (অর্থবাদ) করা হয়েছে।

​ঠিক একইভাবে, শ্রীগুরু গোরক্ষনাথ যখন অবধূত যোগীদের মাংসাহারের নরক-যাতনার ভয় দেখিয়েছেন, তখন তাঁর উদ্দেশ্য বৈদিক বা তান্ত্রিক বলীর বিধিবাক্য খণ্ডন করা ছিল না, বরং অবধূতের যোগমার্গ, সম্যক্ জ্ঞান ও খেচরী মুদ্রার সাধনকে সুরক্ষিত করার জন্য স্থূল আহারের তীব্র নিন্দা বা নিন্দার্থবাদ করা হয়েছে মাত্র।

পূর্বপক্ষ সব শাস্ত্রের আক্ষরিক অর্থ বা শক্যার্থ ধরে মাংসের নিষেধ দেখাচ্ছেন। আপনাদের এই আক্ষরিকতাবাদের নিয়ম ধরে স্বয়ং পরমেশ্বর শিবের বলা শিবমহাপুরাণের শ্লোকটি বিচার করুন তো! শিব সরাসরি বলছেন- সংসারের সবচেয়ে বড় কুসঙ্গ হলো 'স্ত্রীসঙ্গ' (নারীর সঙ্গ)!

​এবার বলুন, আপনাদের এই মূর্খতাবোধক নিয়ম অনুযায়ী আমরা কি আগামীকাল থেকে বিবাহ করা বন্ধ করে দেব? সমস্ত গৃহস্থ কি তাদের স্ত্রীকে কুসঙ্গী বলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে? দেবে না। কারণ আমরা জানি, এখানে নিবৃত্তি মার্গ ও বৈরাগ্যের মহিমা দেখানোর জন্য 'নিন্দার্থবাদ' করা হয়েছে।

​ব্রহ্মার বচনে যখন রূপক বোঝেন, শিবের বচনে যখন রূপক বোঝেন, তখন যোগী গোরক্ষনাথের বাণীতে অবধূতের যোগমার্গের শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর রূপক বা নিন্দার্থবাদ কেন বুঝতে পারেন না? শাস্ত্রের কোথায় আক্ষরিক অর্থ নিতে হয় আর কোথায় অধিকারভেদে নিন্দার্থবাদ বুঝতে হয়, এই নুন্যতম জ্ঞানটুকু আপনাদের নেই, তা আজ আপনাদের নিজেদের দেওয়া কুযুক্তি দ্বারাই চূর্ণ হয়ে গেল!

🔘 একই ভাবে গোরক্ষবাণীতে গুরু গোরক্ষনাথ বলেছেন -

“​भोगिया सूते अजहूँ न जागे । भोग नही रे रोग अभागे ॥ टेक
भोगिया कहैं भल भोग हमारा । मनसइ नारि किया तन छारा ॥ १ ॥ एक बूँद नर नारी रीधा । ताही मैं सिध साधिक सीधा” ॥ २ ॥

আপনারা গোরক্ষবাণীর ৬৪-৬৫ পদ থেকে মাংসের শক্যার্থ (আক্ষরিক অর্থ) নিয়ে লাফাচ্ছিলেন। এবার গোরক্ষবাণীর এই ৪৩ নম্বর পদটি এবং তার প্রামাণ্য হিন্দি টীকাটি দেখুন! এখানে গুরু গোরক্ষনাথ স্পষ্ট বলছেন- 

“স্ত্রীকে ঘরে রাখা মানে বাঘিনী পুষে রাখা’ এবং পত্নীর সাথে বাস করলে পুরুষ নাকি ‘নদী তীরের বৃক্ষের মতো দ্রুত বিনাশ প্রাপ্ত হয়”।

​এবার পূর্বপক্ষের কাছে আমাদের সোজা প্রশ্ন- আপনারা কি আপনাদের এই মূর্খ আক্ষরিকতাবাদের নিয়ম ধরে কাল সকাল থেকে সমস্ত গৃহস্থের স্ত্রীদের বাঘিনী বলে ঘর থেকে বের করে দেবেন? সমাজ ও পারিবারিক জীবন কি ধ্বংস করে দেবেন? দেবেন না। কারণ এখানে অবধূত যোগীর হঠযোগ সাধনায় ‘বিন্দু রক্ষা’ (বীর্য রক্ষা) এবং ‘মহারস অমৃত’ যেন ক্ষয় না হয় সেই নিবৃত্তি মার্গী ব্রহ্মচর্যের মহিমা দেখানোর জন্য রূপক বা নিন্দার্থবাদ (অর্থবাদ) করা হয়েছে মাত্র। 

দুনিয়ার সব বোঝেন, অথচ যোগীর মাংস-নিষেধের বেলায় এসে আপনাদের রূপক বা নিন্দার্থবাদ বোঝার ক্ষমতা লোপ পায়, এই দ্বিচারিতাই প্রমাণ করে আপনাদের উদ্দেশ্য শাস্ত্রের সত্য জানা নয়, কেবল নিজেদের নিরামিষ গোঁড়ামি প্রতিষ্ঠা করা!

[ পূণরায় বলছি- এখানে কেবল কুতর্ক ও বিতণ্ডা করে লাভ নেই। রোববারের লাইভে আসুন খোলামেলা আলোচনা হোক, তারপর কে অতিচালাকী করছে আর কে শাস্ত্রের অনর্থ করছে সেটা দিনের আলোর ন্যায় পরিস্কার হয়ে যাবে ]


🙏সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু🙏

নমঃ শিবায়ৈ 🙏
নমঃ শিবায় 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্‌ ✊🚩

✍️ অপপ্রচার দমনে— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।

🌻 বিশেষ কৃতজ্ঞতা— আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।

📣 কপিরাইট ও প্রচারে— Shivalaya।

বি: দ্র:— লেখাটি কপি করলে সম্পূর্ণভাবে করবেন, কোনো রকম কাটছাট করা যাবে না।

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ