পরমেশ্বর শিবের আরাধনাকারী শ্রীকৃষ্ণ পরমশৈব — বলছে পদ্মপুরাণ
🕉️ পরমেশ্বর শিবের আরাধনাকারী শ্রীকৃষ্ণ পরমশৈব — বলছে পদ্মপুরাণ
___________________________________________________________________________________
🔰 ভূমিকা —
বর্তমানে অনেকের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা দেখা যায়—বৈষ্ণবীয় পুরাণে বিষ্ণুই সর্বশ্রেষ্ঠ, শৈব পুরাণে শিবই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং শাক্ত পুরাণে দেবীই সর্বোচ্চ। তাই কোনো একটি পুরাণে কোনো দেবতার মাহাত্ম্য বর্ণিত হলে, সেটিকে কেবল সেই সম্প্রদায়ের মতবাদ বলে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়।
কিন্তু শাস্ত্রের সামগ্রিক বক্তব্য বিচার করলে দেখা যায়, বিষয়টি এত সরল নয়। বিশেষত, বৈষ্ণবীয় পুরাণগুলির মধ্যেও শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা পরমেশ্বর শিবের আরাধনা, পাশুপত-ব্রত পালন, ভস্মধারণ এবং রুদ্রাধ্যয়নের সুস্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়।
এবার আমরা কোনো শৈব গ্রন্থ থেকে নয়, বৈষ্ণবীয় পুরাণ হিসেবে প্রসিদ্ধ পদ্মপুরাণেরই স্বর্গখণ্ডে বর্ণিত বারাণসীর মধ্যমেশ্বর তীর্থের মাহাত্ম্য থেকে বিষয়টি দেখব। সেখানে শ্রীকৃষ্ণকে কেবল শিবের ভক্ত হিসেবেই নয়, পাশুপত-ব্রত পালনকারী, ভস্মধারী এবং রুদ্রাধ্যয়নে তৎপর শিব-উপাসক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে যে, শ্রীকৃষ্ণ শম্ভুর আরাধনা করে মহাদেবের প্রত্যক্ষ দর্শন ও বর লাভ করেছিলেন।
অতএব, শ্রীকৃষ্ণের শিব-উপাসনার এই বর্ণনাটি কোনো পরবর্তী শৈব ব্যাখ্যার বিষয় নয়; বরং পদ্মপুরাণের নিজস্ব বর্ণনার মধ্যেই এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়েছে। একই ধরনের বর্ণনা মহাভারতের অনুসাশনপর্ব, কূর্মমহাপুরাণ এবং শিবমহাপুরাণেও পাওয়া যায়।
চলুন, প্রথমে পদ্মপুরাণে বারাণসীর মধ্যমেশ্বর তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা প্রসঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের শিব-আরাধনার সেই শাস্ত্রবচনটি দেখি।
___________________________________________________________________________________
🕉️ পরমেশ্বর শিবের আরাধনা করেছেন শ্রীকৃষ্ণ — বলছে পদ্মপুরাণ
❇️ পদ্মপুরাণে - বারাণসীর মধ্যমেশ্বর তীর্থের মাহাত্ম্য বর্ণনায় ❇️
নারদ উবাচ ।
বারাণস্যাং মহারাজ মধ্যমেশঃ পরাৎপরঃ ।
তস্মিন্ স্থানে মহাদেবো দেব্যা সহ মহেশ্বরঃ ॥ ১ ॥
রমতে ভগবান্ নিত্যং রুদ্রৈশ্চ পরিবারিতঃ ।
তত্র পূর্ব হৃষীকেশো বিশ্বাত্মা দেবকীসুতঃ ॥ ২ ॥
উবাস বৎসরং কৃষ্ণঃ সদা পাশুপতৈর্যুতঃ ।
ভস্মোদ্ধূলিতসর্বাঙ্গো রুদ্রাধ্যয়নতত্পরঃ ॥ ৩ ॥
আরাধয়ন্হরিঃ শম্ভুং কৃত্বা পাশুপতং ব্রতম্ ।
তস্য তে বহবঃ শিষ্যা ব্রহ্মচর্যপরায়ণাঃ ॥ ৪ ॥
লব্ধ্বা তদ্বদনাজ্জ্ঞানং দৃষ্টবন্তো মহেশ্বরম্ ।
তস্য দেবো মহাদেবঃ প্রত্যক্ষং নীললোহিতঃ ॥ ৫ ॥
দদৌ কৃষ্ণস্য ভগবান্ বরদো বরমুত্তমম্ ।
য়েঽর্চয়ন্তি চ গোবিন্দং মদ্ভক্তা বিধিপূর্বকম্ ॥ ৬ ॥
তেষাং তদৈশ্বরং জ্ঞানমুৎপৎস্যতি জগন্ময়ম্ ।
নমস্যোঽর্চয়িতব্যশ্চ ধ্যাতব্যো মৎপরৈর্জনৈঃ ॥ ৭ ॥
ভবিষ্যন্তি ন সন্দেহো মৎপ্রসাদাদ্ দ্বিজাতয়ঃ ।
যেঽত্র দ্রক্ষ্যন্তি দেবেশং স্নাত্বা দেবং পিনাকিনম্ ॥ ৮ ॥
ব্রহ্মহত্যাদিকং পাপং তেষামাশু বিনশ্যতি ।
প্রাণাংস্ত্যক্ষ্যন্তি যে মর্ত্যাঃ পাপকর্মরতা অপি ॥ ৯ ॥
তে যান্তি তত্ পরং স্থানং নাত্র কার্যাঃ বিচারণা ।
ধন্যাস্তু খলু তে বিজ্ঞা মন্দাকিন্যাং কৃতোদকাঃ ॥ ১০ ॥
অর্চয়িত্বা মহাদেবং মধ্যমেশ্বরমীশ্বরম্ ।
স্নানং দানং তপঃ শ্রাদ্ধং পিণ্ডনির্বপণং ত্বিহ ॥ ১১ ॥
[চৌখাম্বা প্রকাশিত 'পদ্মপুরাণ/স্বর্গখণ্ড/৩৬ অধ্যায়' বা নবভারত প্রকাশিত 'পদ্মপুরাণ/স্বর্গখণ্ড/১৮ অধ্যায়/৭৮-৮৯ শ্লোক]
✅ অর্থ — নারদ বললেন, হে মহারাজ! কাশীতে (বারাণসীতে) পরমেশ্বর, পরাৎপর “মধ্যমেশ” মহাদেব অবস্থান করেন। সেখানে দেবী পার্বতীর সঙ্গে তিনি সর্বদা বিহার করেন ॥ ১ ॥
সেই স্থানে রুদ্রপরিবারসহ মহাদেবের বসবাস রয়েছে। প্রাচীন কালে, বিশ্বাত্মা, দেবকীর পুত্র হৃষীকেশ (শ্রীকৃষ্ণ) সেখানে এক বছর যাবৎ পাশুপত সাধকদের সঙ্গে অবস্থান করেছিলেন ॥ ২ ॥
তাঁর সমগ্র দেহে ভস্ম মেখে, তিনি নিয়মিত বেদের রুদ্রাধ্যায় (শতরুদ্রিয় সূক্ত) পাঠ করতেন ॥ ৩ ॥
তিনি শ্রীমহাদেবের উপাসনা করতেন এবং বেদোক্ত পাশুপত ব্রত পালন করতেন। তাঁর অনেক ব্রহ্মচারী শিষ্য সেই সময়ে তাঁর সঙ্গী ছিলেন ॥ ৪ ॥
ভগবান শ্রীহরির মুখনিঃসৃত জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে, সেইসব শিষ্যরা শংকরের সাক্ষাৎ দর্শন লাভ করেন। শ্রীহৃষীকেশ নিজেও নীললোহিত মহেশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করেন ॥ ৫ ॥
বরদানকারী ভগবান শংকর তখন শ্রীকৃষ্ণকে উত্তম বরদান করেন। তিনি বলেন, “যে আমার ভক্তগণ নিয়মমানুসারে গোবিন্দেরও আরাধনা করেন — ॥ ৬ ॥
তাঁরা সকলেই ঐশ্বর্য এবং জ্ঞান লাভ করবেন। সুতরাং, আমার ভক্তদের উচিত পরমশৈব শ্রীহরিকেও প্রণাম করা, তাঁর ধ্যান পূর্বক অর্চনা করা ॥ ৭ ॥
এইরূপে যে ব্রাহ্মণেরা শ্রীহরির উপাসনা করবেন, তাঁরা আমার কৃপাপ্রাপ্ত হবেন। যারা এখানে (বারাণসীতে) স্নান করে শিবদর্শন করেন ॥ ৮ ॥
তাঁদের ব্রহ্মহত্যাসহ সব পাপ তৎক্ষণাৎ বিনষ্ট হয়ে যায়। এমনকি যদি কোনো পাপী ব্যক্তি এখানে দেহত্যাগ করে ॥ ৯ ॥
সে নিশ্চিতভাবেই পরম পদ (মোক্ষ) লাভ করে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই জ্ঞানী মানুষ সত্যিই ধন্য, যারা গঙ্গায় স্নান করে, গঙ্গাজল দিয়ে মধ্যমেশ্বর শিবের পূজা করেন, এবং সেখানে জ্ঞান দান ও পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান করেন। ॥ ১০-১১ ॥
___________________________________________________________________________________
___________________________________________________________________________________
🔱 সিদ্ধান্ত —
অতএব, পদ্মপুরাণের এই বর্ণনায় শ্রীকৃষ্ণকে কেবল শিবের উপাসকই নয়, পাশুপত-ব্রতধারী, ভস্মধারী এবং রুদ্রাধ্যয়নে তৎপর শিবসাধক হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। অথর্বশির উপনিষদে ভস্মধারণ-সংবলিত এই সাধনাকেই পাশুপত-ব্রত হিসেবে নির্দেশ করা হয়েছে; ফলে এখানে কৃষ্ণের পাশুপত-ব্রত গ্রহণ তাঁর সুস্পষ্ট শৈব সাধনারই পরিচায়ক। একই শ্রীকৃষ্ণের শিব-আরাধনা ও পাশুপত-ব্রতের কাহিনী মহাভারতের অনুশাসনপর্ব, কূর্মমহাপুরাণের পূর্বভাগ এবং শিবমহাপুরাণের উমাসংহিতাতেও বর্ণিত হয়েছে। আর স্কন্দমহাপুরাণেও সেই মধ্যমেশ তীর্থের উল্লেখ রয়েছে (কল্পান্তরে স্থানটি ভিন্ন হয়ে বদরিকা আশ্রমও হয়ে থাকে)। সুতরাং একাধিক শাস্ত্রের সমন্বিত সাক্ষ্যে একথা সুস্পষ্ট যে — শ্রীকৃষ্ণ শিবের পরম ভক্ত, পাশুপত-ব্রতধারী এবং শৈব সাধনায় প্রতিষ্ঠিত ছিলেন; অতএব তাঁকে শৈব বলা শাস্ত্রবিরুদ্ধ নয়, বরং শাস্ত্রসমর্থিত।
___________________________________________________________________________________
🚩 তথ্য সংগ্রহ ও লেখনীতে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীপাদযুক্ত শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব 🚩
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
#রুদ্র #সনাতনধর্ম #শিবালয় #shiva #শিব #পরমেশ্বরশিব #Shivalaya #শৈবধর্ম #শিবশাসন #পুরাণ #মহাভারত #শিবমহাপুরাণ #অনুশাসনপর্ব #শ্রীকৃষ্ণ #শৈব #পরমশৈব #পরমশৈবশ্রীকৃষ্ণ #পদ্মপুরাণ #স্কন্দমহাপুরাণ


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন