সকল দেবতার রূপধারী পরমেশ্বর শিব‌ই - গণেশ রূপ‌‌ ধারণ করেন

 


🕉️ সকল দেবতার রূপধারী পরমেশ্বর শিব‌ই - গণেশ রূপ‌‌ ধারণ করেন
______________________________________________
🔰 ভূমিকা — বেদ তথা অনান্য মান্য শাস্ত্র অনুযায়ী, একমাত্র পরমেশ্বর শিব‌ই সকল দেবদেবীর রূপ ধারণ করে লীলা করছেন। এবিষয়ে শাস্ত্র থেকে বহু তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু ভগবান গণেশের তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি, তাই এই প্রবন্ধে এই বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।
শিবমহাপুরাণের রুদ্র সংহিতার কুমার খণ্ডের ১৮ অধ্যায়ে বলা হয়েছে —
দেবতারা মুণ্ডহীন গণেশের দেহের জন্য একটি হাতির মস্তক এনে যুক্ত করে তাতে প্রাণ দানের জন্য পরমেশ্বর শিবের কাছে প্রার্থনা করে  গণেশের মধ্যে শিবচেতনাত্মক আত্মজ্যোতির তেজ প্রবেশের মাধ্যমে গণেশকে পুনর্জীবিত করবার প্রার্থনা করেন, এখানে দেবতাদের উল্লেখ করা বিশেষ বক্তব্য রয়েছে, তা আমাদের আলোচ্য বিষয়। চলুন তা জেনে নেওয়া যাক এবং এবিষয়ে অনান্য তথ্য‌ও উপস্থাপন করা হল।
______________________________________________
🕉️ পরমেশ্বর শিবের জ্যোতিই ভগবান গণেশের রূপে স্থিত —

ঊচুস্তে চ তদা তত্র ব্রহ্মবিষ্ণুসুরাস্তথা ।
প্রণম্যেশং শিবং দেবং স্বপ্রভুং গুণবর্জিতম্ ॥ ৫৩ ॥
যস্মাত্ত্বত্তেজসঃ সর্বে বয়ং জাতা মহাত্মনঃ ।ত্বত্তেজস্তৎসমাযাতু বেদমন্ত্রাভিযোগতঃ ॥ ৫৪ ॥
ইত্যেবমভিমন্ত্রেণ মন্ত্রিতং জলমুত্তমম্ ।
স্মৃত্বা শিবং সমেতাস্তে চিক্ষিপুস্তৎকলেবরে ॥ ৫৫ ॥
তজ্জলস্পর্শমাত্রেণ চিদ্যুতো জীবিতো দ্রুতম্ ।তদোত্তস্থৌ সুপ্ত ইব স বালশ্চ শিবেচ্ছয়া ॥ ৫৬ ॥
[শিবমহাপুরাণ/রুদ্র সংহিতা/কুমার খণ্ড/১৮ অধ্যায়/৫৩-৫৬ ক্রমাঙ্ক শ্লোক]

✅ অর্থ : তখন সেই সময়ে সেখানে উপস্থিত ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং অন্যান্য দেবতারা তাঁদের প্রভু, ত্রিগুণাতীত (সত্ত্ব, রজ ও তম গুণের ঊর্ধ্বে) পরমেশ্বর ভগবান শিবকে প্রণাম করলেন এবং বলতে লাগলেন — "হে মহাত্মন! আপনার যে দিব্য তেজ থেকে আমরা সকলে উৎপন্ন হয়েছি, আপনার সেই তেজ এখন বেদমন্ত্রের প্রয়োগ ও প্রভাবে এই (বালকের) শরীরে পুনরায় প্রবেশ করুক।"
এই প্রকার মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে সেই উত্তম জলকে অভিমন্ত্রিত করে, ভগবান শিবকে স্মরণ করতে করতে সেই সমস্ত দেবতারা মিলে জলটি বালকের শরীরে (কলেবরে) ছিটিয়ে দিলেন। সেই অভিমন্ত্রিত জলের স্পর্শ মাত্রই সেই বালক চেতনাযুক্ত হয়ে শীঘ্রই জীবিত হয়ে উঠল। তারপর ভগবান শিবের ইচ্ছায় সেই বালক (ভগবান গণেশ) এমনভাবে উঠে দাঁড়াল, যেন সে গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠেছে।
______________________________________________
এবার দেখুন,

♦️ যুদ্ধরত অবস্থায় থাকা গণেশের বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে গণেশ হল শিবের‌ই রূপ —

যুযুধেঽথ হরিস্তেন মহাবলপরাক্রমঃ ।
মহাদেব্যায়ুধো বীরঃ প্রবণঃ শিবরূপকঃ ॥ ৪ ॥
যষ্ট্যা গণাধিপঃ সোঽথ জঘানামরপুঙ্গবান্ ।
হরিং চ সহসা বীরঃ শক্তিদত্তমহাবলঃ ॥ ৫ ॥
[শিবমহাপুরাণ/রুদ্র সংহিতা/কুমার খণ্ড/১৭ অধ্যায়/৪-৫ ক্রমাঙ্ক শ্লোক]

✅ অর্থ : পরাক্রমশালী মহাবলসম্পন্ন হরি সেই বালক গণেশের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। তখন মহাদেবীর (মাতা পার্বতী) দেওয়া অস্ত্রে সজ্জিত, শিবস্বরূপ বীর বালক গণাধিপ গণেশও  লাঠি দিয়ে শ্রেষ্ঠ দেবতাদের প্রহার করতে লাগলেন। শক্তির (পার্বতীর) দ্বারা প্রদত্ত মহাবলসম্পন্ন সেই বালক হঠাৎ বিষ্ণুর ওপরেও প্রহার করতে লাগলেন ॥ ৪-৫ ॥

🔶 লক্ষ্য করুন — ভগবান গণেশ কে পরমেশ্বর শিবের একটি রূপ বলা হয়েছে।

______________________________________________
♦️ গণেশ যুদ্ধ করবার সময়ে শিবকেই স্মরণ করতেন, ফলে তার প্রহার অপ্রতিরোধ্য হতো —

পুনর্বীরবরঃ শক্তিসুতঃ স্মৃতশিবো বলী ।
গৃহীত্বা যষ্টিমতুলাং তয়া বিষ্ণুং জঘান হ ॥ ৩২ ॥
[শিবমহাপুরাণ/রুদ্র সংহিতা/কুমার খণ্ড/১৭ অধ্যায়/৩২ ক্রমাঙ্ক শ্লোক]

✅ অর্থ : শ্রেষ্ঠ বীর শক্তিপুত্র বিনায়ক গণেশ পরমেশ্বর শিবকে স্মরণ এক অতুলনীয় লাঠি ধারণ করে তা দিয়ে বিষ্ণুকে আঘাত করলেন।

🔶 বিশ্লেষণ : গণেশ রূপ পরমেশ্বর শিবের শক্তিতেই বলীয়ান, তাই গণেশ নিজ আত্মরূপ ষিবকেই স্মরণ করে যুদ্ধ করেছিলেন।
______________________________________________
♦️ শুক্ল-যজুর্বেদ সংহিতার ১৬ তম অধ্যায়ের শতরুদ্রিয় সূক্ত নামক রুদ্রের শত নাম উল্লেখ করার সময় দুঃখবিনাশী পরমেশ্বর শিবকে - গণপতি নামে চিহ্নিত করা হয়েছে —

নমো গণেভ্যো গণপতিভ্যশ্চ বো নমো..॥
[শুক্ল-যজুর্বেদ সংহিতা/১৬ অধ্যায়/২৫ মন্ত্র]

✅ অর্থ : পরমেশ্বর শিবের গণসমূহকে নমস্কার এবং গণেদের অধিপতি গণপতিরূপী শিবকে নমস্কার।

🔶 বিশ্লেষণ — এখানে গণপতি বলতে গণেদের পতি অর্থাৎ স্বামী বলতে সরাসরি পরমেশ্বর শিবকে বোঝায় আবার গণপতি শব্দে গণেদের অধ্যক্ষ গণেশকেও বোঝায়,
আবার গণ বলতে শিবের অনুসারী জীব অথবা সাধারণ জীব কে বোঝায়, সেই সকল জীবের পতি - শিবকেই বোঝায়।]
______________________________________________
♦️ পরমেশ্বর শিবের একটি মুখের নাম - তৎপুরুষ, বেদে গণেশকে তৎপুরুষের অর্থাৎ শিবের প্রতি ভক্তকে প্রেরিত করবার প্রার্থনা রয়েছে —

তৎপুরুষায় বিদ্মহে বক্রতুণ্ডায় ধীমহি ।
তন্নো দন্তিঃ প্রচোদয়াৎ ॥
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় আরণ্যক/১০/১/২৫]

✅ অর্থ : সেই তৎপুরুষ নামক শিব কে জেনে প্রাপ্ত করবার জন্য আমরা বক্রতুণ্ড গজমুখের ধ্যান করি। ঐ ধ্যানে দন্তধারী গণেশ আমাদের প্রেরিত করুন।

🔶 বিশ্লেষণ : পরমেশ্বর শিবকে লাভের জন্য, তার পরোক্ষরূপ গণেশের কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে।
______________________________________________
এই বেদ মন্ত্রের বিষয়টি পুরাণ শাস্ত্রেও বলা হয়েছে, গণেশ ভক্তি হবার পর ভক্ত ব্যক্তি ক্রমশ শিবের পথেই অগ্রসর হয়ে শৈব হন ও মোক্ষ প্রাপ্তি করেন —
বিঘ্নরাজস্য দেবস্য কার্যসিদ্ধিরবিঘ্নতঃ ।
ষণ্মুখস্য প্রসাদেন সর্বসিদ্ধিরযত্নতঃ ॥ ২৩ ॥
ভারত্যাশ্চ প্রসাদেন বাগ্বিভূতিরযত্নতঃ ।
শ্রীদেব্যাস্তু প্রসাদেন সর্বৈশ্বর্যমযত্নতঃ ॥ ২৪ ॥
দুর্গাদেব্যাঃ প্রসাদেন সর্বত্র বিজয়ো ভবেৎ ।
কামিনাং দেবতাঃ সর্বাঃ সাংসারিকফলপ্রদাঃ ॥ ২৫ ॥
কামনারহিতানাং তু শুদ্ধিদ্বারেণ দেবতাঃ ।
মহাদেবপ্রসাদস্য হেতুভূতা ভবন্তি হি ॥ ২৬ ॥
মহাদেবপ্রসাদস্তু ন হেতুঃ কস্যচিদ্ দ্বিজাঃ ।
স্বয়ং ভুক্তিকরঃ পুংসাং কামিনামচিরেণ তু ॥ ২৭ ॥
স্বয়ং মুক্তিকরঃ সাক্ষাৎ কামনারহিতস্য তু ।
চিরেণৈব তু কালেন শিবস্যৈব প্রসাদতঃ ॥ ২৮ ॥
দেবতা ভুক্তিদা এব মুক্তিদা ন স্বতন্ত্রতঃ ।
মহাদেবপ্রসাদেন সমঃ কশ্চিন্ন বিদ্যতে ॥ ২৯ ॥
[স্কন্দ পুরাণ/সূতসংহিতা/যজ্ঞবৈভবখণ্ড/পূর্বভাগ/২৩ অধ্যায়]

✅ অর্থ : বিঘ্নরাজ বিনায়কের প্রসন্নতায় সমস্ত কার্য নির্বিঘ্নে সিদ্ধ হয়। কার্তিকেয়ের কৃপায় বিশেষ চেষ্টা ছাড়াই সমস্ত সিদ্ধি লাভ হয় ॥ ২৩ ॥

সরস্বতীর প্রসাদে অনায়াসে বাগ্বৈভব লাভ হয়। লক্ষ্মীর কৃপায় বিশেষ পরিশ্রম ছাড়াই সর্বপ্রকার ঐশ্বর্য লাভ হয় ॥ ২৪ ॥

দুর্গার কৃপায় সর্বত্র বিজয় লাভ হয়। যাঁদের কামনা রয়েছে, সকল দেবতা সেই সকাম ব্যক্তিদের সাংসারিক ফল প্রদান করেন। আর যাঁরা নিষ্কাম সাধক, তাঁদের সকল দেবতা চিত্তশুদ্ধি দান করে মহাদেবের কৃপালাভে সহায়ক হয়ে ওঠেন ॥ ২৫–২৬ ॥

মহাদেবের কৃপা স্বয়ং অমোঘ ; তাকে অন্য কারও সাহায্যের অপেক্ষা করতে হয় না। সকাম ব্যক্তিদের শিবকৃপা অচিরেই ভোগ প্রদান করে। আর নিষ্কাম সাধকদের এই কৃপাই স্বয়ং মোক্ষ দান করে ॥ ২৭ ॥

অন্যান্য দেবতারা ভোগ ও মোক্ষ — উভয়ই শিবকৃপার মাধ্যমেই প্রদান করতে সক্ষম হন ; তাই তাঁদের ক্ষেত্রে ফললাভে বিলম্ব ঘটে। কিন্তু শিবকৃপা কারও উপর নির্ভরশীল নয় ; তাই এর ফল তৎক্ষণাৎ লাভ হয়। অতএব, মহাদেবের কৃপার সমতুল্য আর কিছুই নেই ॥ ২৮–২৯ ॥

🔶 বিশ্লেষণ : পরমেশ্বর শিব হলেন অন্তিম লক্ষ্য, তাঁকে লাভ করবার জন্য জীবকে ক্রমশঃ বহু দেবতার কৃপা লাভের মাধ্যমে পরমেশ্বর শিবের কাছে এসে যাত্রা সমাপ্ত করে লীন হয়ে যান। ঐ যাত্রার ক্রমের মধ্যে গণেশ হলেন শিবলাভের পথে সহায়ক ভূমিকা পালনকারী।
______________________________________________
♦️ শিব‌ই কৃপা করে তার ভক্তকে গণেশ পদে স্থিত করে গণেশ দেবতা হিসেবে পূজিত হবার সৌভাগ্য দান করেন —

গণেশশ্চ গণেশত্বমনেন বিধিনা গতঃ ।
সিতচন্দনতোয়েন লিঙ্গং স্নাপ্য শিবং শিবাম্ ।
শ্বেতৈর্বিকসিতৈঃ পদ্যৈঃ সম্পূজ্য প্রণিপত্য চ ॥ ৮ ॥
[শিবমহাপুরাণ/বায়বীয় সংহিতা/উত্তরখণ্ড/৩৩ অধ্যায়/৮ শ্লোক]

✅ অর্থ : গণেশও এই বিধানের দ্বারা গণেশত্ব লাভ করেছেন। শ্বেতচন্দন-মিশ্রিত জলে লিঙ্গকে স্নান করিয়ে, শ্বেতবর্ণের প্রস্ফুটিত পদ্ম দ্বারা শিব ও শিবাকে পূজা করে প্রণাম করতে হবে ॥ ৮ ॥

🔶 বিশ্লেষণ : পরমেশ্বর শিব তার ভক্তকে গণেশ পদে গণেশ হবার কৃপা করেন, তাই যিনি গণেশ হন তিনি শিবের কৃপা লাভ করেই গণেশত্ব প্রাপ্তি করেন, এই পরম সত্য উপস্থাপিত হয়েছে শিবমহাপুরাণে।
______________________________________________
🔥 সিদ্ধান্ত : ভগবান গণেশের রূপ পরমেশ্বর শিব‌ই ধারণ করে লীলা করছেন, কারণ বেদ বলছে - সর্বো বৈ রুদ্রঃ [কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় সংহিতা/১০/২৪] - সকল কিছুর অন্তর্যামী রূপে থাঅআ দুঃখনাশকারী পরমেশ্বর শিব‌ই বিদ্যমান। সুতরাং, বেদ পুরাণ অনুযায়ী পরমব্রহ্ম শিবের‌ই একটি বিশেষ লীলারূপ গণেশের মাধ্যমে সংসারে প্রকটিত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত কারোর ব্যক্তিগত নয়, শাস্ত্র বচনের নির্দেশনা অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত প্রতিপাদিত হয়েছে।
______________________________________________
🚩 তথ্য সংগ্রহ ও লেখনীতে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীপাদযুক্ত শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব 🚩

©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥

শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩

#রুদ্র #সনাতনধর্ম #শিবালয় #shiva #শিব #পরমেশ্বরশিব  #Shivalaya #শৈবধর্ম #শিবশাসন #পুরাণ #বেদ #গণেশচতুর্থী #বেদ #কৃষ্ণযজুর্বেদ #গণেশ #গণপতি #শিবমহাপুরাণ #শতরুদ্রিয় #উপনিষদ

Ai generated image.


মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ