মহর্ষি বাল্মীকি ছিলেন শিবভক্ত পরমশৈব মহাপাশুপতাচার্য

 


🧡 মহর্ষি বাল্মীকি ছিলেন শিবভক্ত পরমশৈব মহাপাশুপতাচার্য

🔸 গুরু পরম্পরা : মহাপাশুপত শৈব পরম্পরা 
___________________________________________
🔰 ভূমিকা — মহর্ষি বাল্মিকী শ্রীবিষ্ণুর সপ্তম অবতাররূপী ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের জীবনীগ্রন্থ ‘রামায়ণ’ নামক ইতিহাস শাস্ত্র লিখেছেন বলে বিশ্ব সংসার বিদিত আছে। বর্তমানে অনেকেই মহর্ষি বাল্মিকীকে একজন রামভক্ত বৈষ্ণব বলে অনুমান করে থাকেন। এই ধরণের ধারণা মূলত মধ্যযুগীয় অধ্যাত্ম রামায়ণ কৃত্তিবাসী রামায়ণ নামক অপ্রামাণিক পুস্তক থেকে উদ্ভূত হয়েছে।
বর্তমান সমাজে প্রচলিত একটি কাহিনী আছে যে, বাল্মিকী পূর্বে রত্নাকর দস্যু ছিলেন, তিনি ‘মরা মরা’ উচ্চারণ করতে করতে ‘রাম রাম’ জপ করতে সক্ষম হয়ে, সর্ব পাপ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন।

কিন্তু পুরাণ শাস্ত্র ও মহাভারত নামক ইতিহাস শাস্ত্র এই কল্পকাহিনীর অনুমান কে ভিত্তিহীন বলে প্রমাণ করেছে। বাল্মিকী কার উপাসক ছিলেন এবং তিনি কোন গুরুপরম্পরা অনুসরণ করতেন সে বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য এখানে উপস্থাপন করা হল।
__________________________________________

✳️ মহর্ষি বাল্মিকীর কাহিনী প্রসঙ্গে রামায়ণ রচনা করবার কবিত্ব মূলত শিবকৃপা মাত্র বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা —

♦️ স্কন্দমহাপুরাণের আবন্ত্য খণ্ড থেকে প্রমাণ —

সনৎকুমার উবাচ ।
বাল্মীকেশ্বরমিত্যাখ্যং যস্তু দেবং প্রপূজয়েৎ ।
মৌনী ধ্যানপরো ভূত্বা স কবিত্বমবাপ্নুয়াৎ ॥ ১ ॥
ব্যাস উবাচ ।
কথমত্র সমুৎপন্নঃ কোঽসৌ বাল্মীকেশ্বরঃ প্রভুঃ।
যস্য দর্শনমাত্রেণ কবিত্বমুপজায়তে ॥ ২ ॥
সনৎকুমার উবাচ ।
আসীদ্ব্যাস পুরা বিপ্রঃ সুমতির্ভৃগুবংশজঃ ।
রূপ-যৌবনসম্পন্না তস্য ভাৰ্য্যাথ কৌশিকী ॥ ৩ ॥
তস্য পুত্রঃ সমুৎপন্নো হ্যগ্নিশর্মেতি নামতঃ ।
স পিত্রা প্রোচ্যমানোঽপি বেদাভ্যাসং ন মন্যতে ॥ ৪ ॥
ততো বহুতিথে কালে অনাবৃষ্টির জায়ত ।
তস্যাং বিপদ্গতঃ সোঽখ দক্ষিণামাশ্রিতো দিশম্ ॥ ৫ ॥
ততোঽসৌ সুমতির্বিপ্রঃ সভার্য্যঃ সসুতস্তথা ।
বিদেশং কাননং প্রাপ্তঃ কৃত্বা আশ্রমমাশ্রিতঃ ॥ ৬ ॥
আভীয়ৈর্দস্যুভিঃ সার্দ্ধং সঙ্গোঽভূদগ্নিশর্মণঃ ।
আগচ্ছন্তি পথা তেন যস্তং হন্তি স পাপকৃৎ ॥ ৭ ॥  স্মৃতির্নষ্টা গতা বেদা গতং গোত্রং গতা শ্রুতিঃ । কস্মিংশ্চিদথ কালে তু তীর্থযাত্রাপ্রসঙ্গতঃ ॥ ৮ ॥
সপ্তর্ষয়ঃ পথা তেন সুব্রতাঃ সমুপস্থিতাঃ ।
অগ্নিশর্মাথ তান দৃষ্ট্বা হন্তুকামোঽব্রবীদিদম্ ॥ ৯ ॥
বস্ত্রাণীমানি মূচ্যধ্বং ছত্রিকোপানহৌ তথা ।
হন্তব্যা হি ময়া যূয়ং গন্তারো যমসাদনে ॥ ১০ ॥
তস্য তদ্বচনং শ্রুত্বা অত্রির্বচনমব্রবীৎ ।
অস্মৎ পীড়নজং পাপং কথং তে হৃদি বৰ্ত্ততে ।
বয়ং তপস্বিনো ভূত্বা তীর্থযাত্রাকৃতোদ্যমাঃ ॥ ১১ ॥
অগ্নিশর্মোবাচ।
মমাস্তি মাতাথ পিতা সুতো ভাৰ্য্যা গরীয়সী ।
পোষয়ামি সদা তাংস্তু এতন্মে হৃদি সংস্থিতম ॥ ১২ ॥
অত্রিরুবাচ।
পীত্রাদীনাস্তু পৃচ্ছস্ব স্বকর্ম্মোপার্জিতং প্রতি ।
যদ্ষুষ্মদর্থং ক্রিয়তে পাপং তৎ কস্য কথ্যতাম্ ॥ ১৩ ॥
যদি তে কথয়ন্তি স্ব মা মৃষা প্রাণিনো হবধীঃ ॥ ১৪ ॥
অগ্নিশৰ্মোবাচ।
ন কদাচিন্ময়া তে তু সংপৃষ্টা ঈদৃশং বচঃ ।
যুষ্মাকং বচসা মেঽদ্য প্রতিবোধঃ প্রবর্ততে ॥ ১৫ ॥
গত্বা পৃচ্ছামি তান সর্বান্ কস্য ভাবশ্চ কীদৃশঃ ।
যূয়মত্রৈব তিষ্ঠধ্বং যাবদাগমনং মম ॥ ১৬ ॥
ইত্যুক্তা তান্ জগামাশু পিতরং স্বমুবাচ হ ।
ধৰ্মস্য প্রতিঘাতেন প্রাণিনাং পীড়নেন চ ॥ ১৭ ॥
সুমহদৃশ্যতে পাপং কস্য তৎ কথ্যতাং মম ।
পিতা প্রাহ তথা মাতা নাপুণ্যমাবয়োরিহ ॥ ১৮ ॥
ত্বং জানাসি যৎ কুরুষে কৃতং ভাব্যং পুনস্ত্বয়া । তয়োস্তদ্বচনং শ্রুত্বা ভার্য্যাং বচনমব্রবীৎ ॥ ১৯ ॥
তত্রাপ্যুক্তং ন মে পাপং পাপমেতত্তবৈব হি । তদ্বাক্যমব্রবীৎ পুত্র বালোঽঽমিতি সোঽব্রবীৎ ॥ ২০ ॥
তজজ্ঞাত্বা হৃদয়ং তেষাং চেষ্টিতং চৈব তত্ত্বতঃ । নষ্টোঽঽমিতিমন্বানঃ শরণং মে তপস্বিনঃ ॥ ২১ ॥
ক্ষিপ্তাথ লগুড়ং কৃষ্ণং যেন বৈ জন্তবো হতাঃ ।
প্রকীর্য্য কেশাংস্ত্বরিত ঋষীণামগ্রতঃ স্থিতঃ ॥ ২২ ॥
প্রণম্য দণ্ডপাতেন ততো বচনমব্রবীৎ ।
ন মে মাতা নচ পিতা ন ভাৰ্য্যা ন চ মে সুতঃ ॥ ২৩ ॥
সর্বৈস্তৈঃ পরিমুক্তোঽহং ভবতাং শরণং গতঃ ।
সুষ্ঠুপদেশদানান্মাং নরকাভ্রাতুমর্হথ ॥ ২৪ ॥
এবং তং বাদিনং দৃষ্ট্বা ঋষয়োঽত্রিমথাব্রুবন্ ।
ভবতো বচনাদস্য প্রতিবোধঃ সমাগতঃ ॥ ২৫ ॥

ভবতায়মনুগ্রাহ্যঃ শিষ্যো ভবতু তে মুনে ।
তথেত্যুক্ত্বাথ তান্ প্রাহ চাগ্নিং ধ্যানং সমাচর ॥ ২৬ ॥
অনেন ধ্যানযোগেন মহামন্ত্রজপেন চ ।
অনেকদুস্তরাত্যুগ্রপাপক্বজন ঘাতকঃ ।
সংস্থিতো বৃক্ষমূলে ত্বং পরা সিদ্ধিং গমিষ্যসি ॥ ২৭ ॥
ইত্যুক্ত্বা তে যষূঃ সর্বে সকামং সোঽপি তত্র বৈ ।
তদ্ধ্যানস্থোঽভবদ্ যোগী বৎসরাণি ত্রয়োদশ ॥ ২৮ ॥
তস্যোপর্য্যভবত্তত্র বল্মীকোঽবিচলস্য চ ।
নিবৃত্তান্ত পথা তেন মুনয়স্তত্র শুশ্রুবুঃ ॥ ২১ ॥
উদীরিতং ধ্বনিং তেন বল্মীকে বিস্ময়ান্বিতাঃ ।
ততঃ খনিত্বা বল্মীকং কাষ্ঠীভূতোরুশঙ্কুভিঃ ॥ ৩০ ॥
তং দৃষ্ট্বোত্থাপয়ামাসুর্মুনয়ো নয়সং তম্ ।
নমশ্চক্রেঽথ তান্ সর্বান সবিজ্ঞো মুনিপুঙ্গবান্ ॥ ৩১ ॥
তান্ প্রাহ প্রণতো ভূত্বা তপসা দীপ্ততেজসঃ ।
প্রসাদাদ্ভবতামদ্য জ্ঞানং লব্ধং ময়া শুভম্ ॥ ৩২ ॥ দীনোঽঽমুদ্ধতঃ সর্বৈর্বগ্নোঽহং পাপকর্দমে ।
শ্রুত্বা তস্যেতি তে বাক্যমূচূঃ পরমধার্মিকাঃ ॥ ৩৩ ॥
বল্মীকেঽস্মিন্ স্থিতঃ পুত্র যতস্ত্বমেকচিত্ততঃ ।
বাল্মিকীরিতি তে নাম ভুবি খ্যাতং ভবিষ্যতি ॥ ৩৪ ॥
ইত্যুক্ত্বা মুনয়ো জগ্মুঃ স্বাং দিশাং তপসান্বিতাঃ ।
গতেষু মুনিমুখ্যেষু বাল্মীকিস্তপতাং বরঃ । কুশস্থল্যামথাগম্য সমারাধ্য মহেশ্বরম্ ॥ ৩৫ ॥
তস্মাৎ কবিত্বমাসাদ্য চক্রে কাব্যং মনোরমম্ ।
রামায়ণঞ্চ যৎ প্রাহুঃ কথাং সুপ্রথমস্থিতাম্ ॥ ৩৬॥
ততঃ প্রভৃতি দেবেশো বাল্মীকেশ্বরসংজ্ঞকঃ ।
খ্যাতোঽবন্ত্যাং ততো ব্যাস নৃণাং কবিত্বদায়কঃ ॥ ৩৭ ॥
ইতি তে কথিতং লিঙ্গং বাল্মীকেশ্বরমুত্তমম্ বস্য দর্শনমাত্রেণ কবিত্বমুপপদ্যতে ॥ ৩৮ ॥

ইতি শ্রীস্কান্দে বাল্মীকেশ্বর মাহাত্ম্য বর্ণনং নাম চতুর্বিংশোহধ্যায়ঃ ॥ ২৪ ॥
[স্কন্দমহাপুরাণ/আবন্ত্য খণ্ড/অবন্তীক্ষেত্র মাহাত্ম্য/২৪ অধ্যায়]

✅ অর্থ : সনৎকুমার বললেন, বাল্মীকেশ্বর নামক শিবলিঙ্গকে যে ব্যক্তি ধ্যান পরায়ণ হয়ে পূজা করেন, তিনি কবিত্ব প্রাপ্ত হন।
ব্যাস বললেন, এখানে ঐ শিবলিঙ্গ কি ভাবে তিনি উৎপন্ন হয়েছে ? যাঁর দর্শনে কবিত্ব লাভ হয়, সেই
বাল্মীকেশ্বর প্রভু কে ? সনৎকুমার বললেন, হে ব্যাসদেব! পূর্বকালে ‘সুমতি’ নামে ভৃগুবংশীয় এক বিপ্র ছিলেন ; রূপযৌবনসম্পন্না ‘কৌশিকা’ নামে তাঁহার এক ভাৰ্য্যা ছিল। তাঁদের ‘অগ্নিশর্মা’ নামে এক পুত্র জন্মেছিল।  পিতা কর্তৃক উপদিষ্ট হয়েও পুত্র অগ্নিশর্মা বেদাভ্যাস করতেন না। এই ভাবে বহুকাল পেরিয়ে গেলে এক সময়ে অনাবৃষ্টি উপস্থিত হয়। এই অনাবৃষ্টির সময়ে সুমতি নামক বিপ্র বিপদগ্রস্ত হয়ে ভাৰ্য্যা-পুত্র সহ বিদেশে পর্যটন করে অবশেষে কাননে গিয়ে আশ্রম স্থাপিত করেন। আভীয় দস্যুদেরর সহিত সেই বিপ্রপুত্র অগ্নিশর্মার সঙ্গ হয়। ফলে, পাপাচ্ছন্ন অগ্নিশর্মার ঐ পথে যে ব্যক্তিই আসতেন তাকেই অগ্নিশর্মা হত্যা করতেন। তার শ্রুতি, বেদ, গোত্র, স্মৃতি প্রভৃতি সকল জ্ঞান‌ই বিনষ্ট হয়েছিল। একদিন তীর্থযাত্রার জন্য সুব্রত সপ্তঋষিগণ ঐ পথে উপস্থিত হলেন।
অগ্নিশর্মা তাঁদেকে হত্যা করবার জন্য এই কথা বললেন, তোমরা তোমাদের বস্ত্র, ছত্র (ছাতা) ও উপানৎ (পাদুকা/জুতো) সকল খুলে দাও, আমি তোমাদের নিহত করবো। তোমরা যমের ঘরে গমন করবে। তার বাক্য শুনে ভগবান অত্রি বললেন, আমরা তপস্বী ; তীর্থ যাত্রায় চলেছি, আমাদের হত্যাজনিত পাপ তোমার হৃদয় কি কারণে ধারণ করতে চায় ? অগ্নিশর্মা বলল, আমার মাতা, পিতা, সুত ও ভাৰ্য্যা আছে আমি তাদের পোষণ করি, এই কারণেই আমার হৃদয় পাপ ধারণ করে থাকে।১-১২।
অত্রি বললেন, তুমি গৃহে গিয়ে তোমার পিতা তথা অনান্য সকলকে জিজ্ঞাসা করো যে, তোমাদের জন্য আমি যে পাপ করছি, সেই পাপের ভাগ কার হবে ? যদি তাঁরা বলেন যে, আমাদের জন্য নয় ; তবে বৃথা কেন প্রাণিরূপ মনুষ্য বধ করবে ? অগ্নিশৰ্মা বললেন, আমি কখন‌ও তাদের জিজ্ঞাসা করিনি। তোমাদের কথায় এখনি আমার প্রতিবোধ জন্মেছে। আমি গৃহে গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করি, এবিষয়ে তাদের কার কেমন ধরণের ভাব। তোমরা এই স্থানে থাকো, যতক্ষণ না আমি ফিরে আসি। তাঁদেরকে এই কথা বলে অগ্নিশর্মা বাড়ী গিয়ে  পিতাকে জিজ্ঞাসা করলেন — ধৰ্ম প্রতিঘাত ও প্রাণযুক্ত জীবেদের পীড়া দিয়ে আমি যে পাপ অর্জন করি, ঐ পাপ কার ?
পিতা ও মাতা বললেন, পাপ আমাদের নয়। যা তুমি করছ, তা তুমিই জানো, কৃত কার্য্যের ফল তুমিই ভোগ করবে। মাতাপিতার কথা শুনে অগ্নিশর্মা নিজ ভার্য্যাকে জিজ্ঞাসা করলেন। ভার্য্যাও সেই এক‌ই উত্তর দিলেন ; ভার্য্যা বললেষ, আমি পাপভাগী ন‌ই, পাপ তোমারই। তখন অগ্নিশর্মা নিজ পুত্রকেও জিজ্ঞাসা করলো, পুত্র বললো, আমি ছেলেমানুষ, পাপপুণ্যের ধার ধারি না। তখন অগ্নিশৰ্মা তাদের হৃদয়ের মনোভাব তত্ত্বতঃ অবগত হয়ে মনে করলেন যে, আমি অধঃপাতে গিয়েছি, এখন সেই তপস্বিগণই আমার শরণদাতা। এই মনে করে অগ্নিশর্মা যার দ্বারা মনুষ্য হত্যা করতো সেই কৃষ্ণবর্ণ লগুড় সে দূরে নিক্ষেপ করে ফেলে দিল। তখন অগ্নিশর্মার চুল অগোছালো এলোমেলো হয়ে গেল, এই অবস্থায় ঋষিগণের সামনে গিয়ে দণ্ডায়মান হল। তাঁদেকে দণ্ডবৎ প্রণাম করে বললেন, না মাতা, না পিতা, না ভাৰ্য্যা, না পুত্র, কেউই আমার পাপভার গ্রহণ করলো না, তাদের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে আমি আপনাদের শরণাপন্ন হলাম। আপনারা আমাকে সদ্ উপদেশ প্রদান করে আমাকে নরকে যাওয়ার থেকে রক্ষাপূর্বক উদ্ধার করুন। তাকে এই কথা বলতে দেখে ঋষিগণ ভগবান অত্রিকে বললেন,-আপনার বাক্যে এর প্রতিবোধ হয়েছে। আপনি একে  অনুগ্রহ করে শিষ্য করে নিন। ‘তাই হোক’ - এই কথা বলে ভগবান অত্রি অগ্নিশর্মাকে বললেন, তুমি অগ্নির ধ্যান করো। তুমি অত্যন্ত দুস্তর ও অত্যুগ্র পাপকারী ও জনঘাতক। তুমি বৃক্ষতলে উপবিষ্ট হয়ে এই ধ্যানযোগে এবং মহামন্ত্রজপে সিদ্ধি লাভ করবে।

এই কথা বলে তাঁরা নিজেদের গন্তব্যস্থানে স্থানে গমন করলে, অগ্নিশর্মাও নির্দিষ্ট স্থানে গায়ে ধ্যানস্থ হলেন এবং ঐ অবস্থায় তার ত্রয়োদশ বৎসর (১৩ বছর) অতিবাহিত হল। সে অবিচল অবস্থায় তপস্থা করতে থাকলে তার শরীরের উপরিভাগে বল্মীক (উইঢিপি) উৎপন্ন হল।

তখন ঐ পথেই যখন ফিরে আসছিলেন সেই মুনিগণ, তখন তাঁরা ঐ স্থানে উপস্থিত হয়ে বল্মীক হতে উত্থিত ধ্বনি শ্রবণ করে বিস্মিত হলেন।

তারা ঐ বল্মীক (উই ঢিপি) খনন করে কাঠের মতো শরীর হয়ে যাওয়া অগ্নিশর্মাকে দেখতে পেয়ে উঠিয়ে নিলেন। অগ্নিশর্মা ঐ মুনিগণকে নমস্কার করিলেন এবং প্রণাম করে বললেন, আপনাদের প্রসাদে আমি এখন জ্ঞান লাভ করলাম। আমি দীন ; পাপের কাঁদায় আমি মগ্ন ছিলাম, আপনারা সেখান থেকে আমাকে উদ্ধার করেছেন। পরমধার্মিক ঋষিগণ তখন তার বাক্য শুনে বললেন, হে পুত্র ! তুমি বল্মীকের মধ্যে ছিলে বলে  এই পৃথিবীতে তুমি ‘বাল্মিকী’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করবে। এই কথা বলে মুনিগণ তাদের পথে চলে গেলেন। তারা প্রস্থান করলে তপোনিধি বাল্মিকী তখন কুশস্থলীতে গিয়ে মহেশ্বরের আরাধনার মাধ্যমে কবিত্ব লাভ করে মনোরম ‘রামায়ণ’ কাব্য প্রণয়ন করলেন। এই রামায়ণেই প্রথম কাব্য। তখন থেকে অবন্তীতে দেবদেব মহাদেব বাল্মীকেশ্বর নামে বিখ্যাত হয়েছেন। এই শিবলিঙ্গ মনুষ্যদের কবিত্ব প্রদান করেন। (হে ব্যাসদেব) এই আপনাকে বাল্মীকেশ্বর শিবলিঙ্গের কথা বললাম, যার দর্শন মাত্রে মনুষ্যগণ কবিত্ব লাভ করে ॥ ১-৩৮ ॥
__________________________________________

♦️ স্কন্দমহাপুরাণের কাশীখণ্ড থেকে প্রমাণ —

ইতি-হাসং প্রবক্ষ্যামি তত্র ত্রেতাযুগে পুরা ।
যথা বৃত্তং কুম্ভযোনে শ্রবণাৎপাতকাপহম্ ॥ ৪ ॥
একঃ পাশুপতশ্রেষ্ঠো বাল্মীকিরিতিসংজ্ঞিতঃ ।
তপশ্চচার স মুনিঃ কপর্দ্দীশং সমর্চয়ন ॥ ৫ ॥
একদা স হি হেমন্তে মার্গে মাসি তপোধনঃ ।
স্নাত্বা তত্র মহাতীর্থে মধ্যাহ্নে বিমলোদকে ॥ ৬ ॥
চকার ভস্মনা স্নানমাপাদতলমস্তকম্ ।
লিঙ্গস্য দক্ষিণে ভাগে কৃতমাধ্যাহ্নিকক্রিয়ঃ ॥ ৭ ॥ ন্যস্তমস্তকপাংশুশ্চ সন্ধ্যামাধ্যাত্মিকীং স্মরন্ ।
জপন পঞ্চাক্ষরীং বিদ্যাং ধ্যায়ন দেবং কপর্দ্দিনম্ ॥  ৮ ॥
কৃত্বা সংহারমার্গেন সপ্রমাণং প্রদক্ষিণম্ ।..॥ ৯ ॥

[স্কন্দমহাপুরাণ/কাশীখণ্ড/উত্তরার্দ্ধ/৫৪ অধ্যায়/৪-৯ শ্লোক]

✅ অর্থ : ভগবান স্কন্দ (কার্তিকেয়) মহর্ষি অগস্ত্য কে বললেন,
আমি পূর্বকালে ত্রেতাযুগে ঘটিত হ‌ওয়া একটি ইতিহাস বলছি যা শ্রবণ করলে পাপ বিনষ্ট হয়ে যায়। পূর্ব-কালে ত্রেতাযুগে বাল্মীকি নামে একজন পরমশৈব মহাপাশুপতী, ভগবান কপর্দ্দীশ শিবের অর্চনা রূপী তপস্যায় নিমগ্ন ছিলেন। একদিন তিনি হেমন্তকালে অগ্রহায়ণ মাসে বিমলোদক মহাতীর্থে মধ্যাহ্ন স্নান সম্পন্ন করে আপাদমস্তক ভস্মস্নান করলেন। এরপর শিবলিঙ্গের দক্ষিণ ভাগে মধ্যাহ্নকৃত্য ও মস্তকে ভস্মম্রক্ষণ করে মধ্যাহ্ন সন্ধ্যা সমাপন করে “নমঃ শিবায়” -এই পঞ্চাক্ষর মন্ত্র জপ ও কপর্দ্দীশ নামে বিখ্যাত পরমেশ্বর শিবের ধ্যান করে প্রণাম করতে করতে বামাবর্ত্তে প্রদক্ষিণ করতে লাগলেন।
__________________________________________
♦️ মহাভারত থেকে প্রমাণ —

বাল্মীকিশ্চাহ ভগবান্ যুধিষ্ঠিরমিদং বচঃ ।
বিবাদে সাগ্নিমুনিভির্ব্রহ্মঘ্নো বৈ ভবানিতি ॥ ৮ ॥
উক্তক্ষণেন চাবিষ্টস্তেনাধৰ্মেণ ভারত ।
সোঽহমীশানমনঘমমোঘং শরণং গতঃ ॥ ৯ ॥
মুক্তশ্চাস্মি ততঃ পাপৈস্ততো দুঃখবিনাশনঃ ।
আহ মাং ত্রিপুরঘ্নো বৈ যশস্তেহগ্র্যং ভবিষ্যতি ॥ ১০ ॥
[মহাভারত/অনুশাসন পর্ব/১৭ অধ্যায়/৮-১০ শ্লোক]

✅ অর্থ : ভগবান বাল্মীকিও যুধিষ্ঠিরকে এই কথা বললেন, হে ভবতনন্দন ! একসময়ে আমি বেদবিরুদ্ধ বাক্য বলার কারণে অগ্নির সহিত মুনিরা আমাকে বললেন যে, আপনি ব্রহ্মহত্যা পাপে লিপ্ত হলেন, তৎক্ষণাৎ আমি সেই পাপে লিপ্ত হলাম। তারপর আমি নিষ্পাপ ও অব্যর্থপূজন মহাদেবের শরণাপন্ন হলাম ॥ ৮-৯ ॥
এর মাধ্যমে আমি সেই পাপ হতে মুক্ত হতে সক্ষম হয়েছিলাম, তখন দুঃখনাশক মহাদেব আমাকে বললেন, ‘তোমার উৎকৃষ্ট যশ লাভ হবে’ ॥ ১০ ॥
__________________________________________
🔶 বিশ্লেষণ : সনাতন ধর্মের প্রকৃত বিধান ও ইতিহাসের জ্ঞান বেদ-বেদাঙ্গ, স্মৃতি, আগম-তন্ত্র, ইতিহাস পুরাণে বর্ণিত হয়েছে। তাই ধর্মীয় প্রধান শাস্ত্রের বচন‌ই সত্য নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একমাত্র মানদণ্ড। কোনো কবি বা গল্পরচয়িতার লিখিত পুস্তক প্রামাণিক নয়, তা সে যত‌ই জনপ্রিয় হোক।

সুতরাং, স্কন্দমহাপুরাণ ও মহাভারত শাস্ত্র থেকে প্রমাণিত হল যে,
মহর্ষি বাল্মীকি পূর্বে অগ্নিশর্মা দস্যু নামে পরিচিত ছিলেন, রত্নাকর দস্যু নামে নয় এবং মহর্ষি বাল্মীকি অগ্নিরূপী রুদ্রের ধ্যান করেছিলেন, “মরা মরা-রাম রাম” জপ করেননি। এমনকি পরমেশ্বর শিবের উপাসনা করে বাল্মিকী পরমেশ্বর শিবের বরদানের ফলে কবিত্ব অর্জন করে ‘রামায়ণ’ প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাল্মিকী শ্রীরামচন্দ্র বা শ্রীহরি বিষ্ণুর উপাসনা করেননি - বরং তিনি মহাপাশুপত ব্রতধারী হয়ে ভস্মস্নান করতেন এবং ‘নমঃ শিবায়’ পঞ্চাক্ষর মহামন্ত্র জপ করতেন - একথাও শাস্ত্র থেকে প্রমাণিত।
__________________________________________
🔥 সিদ্ধান্ত — মহর্ষি বাল্মিকী একজন শিবভক্ত পরম মহাপাশুপতী শৈব আচার্য, তিনি মহাপাশুপত শৈব পরম্পরার অন্তর্ভুক্ত।

__________________________________________
🟥 মহর্ষি বাল্মীকি-র পিতা-মাতা ও বংশ তথা পরিবার তথা ধার্মিক পরিচয় :


পিতা : বিপ্র সুমতি,
মাতা : কৌশিকা,
বংশ : ঋষি ভৃগু,
গুরু : মহর্ষি অত্রি শৈবাচার্য‌,

আরাধ্য ও ইষ্টদেব : শিব,

আরাধ্যা ও ইষ্ঠদেবী : শিবা,

গুরুপরম্পরা : মহা-পাশুপত শৈব গুরুপরম্পরা (নিগমাগম)

রচিত কাব্যগ্রন্থ : রামায়ণ।
__________________________________________

🚩 তথ্য সংগ্রহ ও লেখনীতে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীপাদযুক্ত শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব 🚩
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥

পরমেশ্বর শিবের জয়🙏
পরমশিবভক্ত মহর্ষি বাল্মীকি শৈবাচার্যের জয় 🙏
সকল শৈবগুরুর জয় 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩


শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩

পরমেশ্বর শিবের ও সনাতন শৈবধর্মের বিষয়ে এমন গুহ্য সত্য রহস্য ও সত্য উন্মোচনমূলক লেখা আরো পেতে অবশ্য‌ই আমাদের Shivalaya ফেসবুক পেজ Follow করে Favourite করে রাখুন। এই তথ্য দ্বারা যদি আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি হয়ে থাকে তবে অবশ্য‌ই এই লেখাটি শেয়ার করুন, যাতে সত্য প্রকাশ্যে আসে।

#সনাতনধর্ম #শিবালয় #shiva #শিব #পরমেশ্বরশিব #ভগবান #বাল্মীকি #শৈবাচার্য #মহাপাশুপত #শৈবপরম্পরা #স্কন্দমহাপুরাণ #মহাভারত  #Shivalaya #শৈবধর্ম #শিবশাসন


[এই পোস্টটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত।এখানে ব্যবহৃত চিত্রটি কেবল বিষয়টি সহজে উপস্থাপনের জন্য Ai-সহায়তায় নির্মিত একটি প্রতীকী চিত্র, এই ছবিটির মধ্যে কিছু লেখা আলাদা ভাবে লেখা হয়েছে। সকল শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতি ও তথ্য যথাসম্ভব মূল গ্রন্থ অনুসারে ছবি উপস্থাপিত হয়েছে।]



__________________________________________


মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ