একমাত্র শিব‌ই জন্মমৃত্যুহীন সর্বোচ্চ পরমসত্তা — বলছে মহোপনিষদ



🕉️ একমাত্র শিব‌ই জন্মমৃত্যুহীন সর্বোচ্চ পরমসত্তা — বলছে মহোপনিষদ

__________________________________________________

🔰 ভূমিকা — মহোপনিষদ কি সত্যিই শিবকে অস্বীকার করে?

বৈষ্ণবদের মধ্যে মহোপনিষদের প্রথম মন্ত্রকে উদ্ধৃত করে একটি দাবি করা হয় — আদিতে যখন একমাত্র নারায়ণ ছিলেন, তখন শিবের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন হল, একটি উপনিষদের একটি বিশেষ বাক্যকে তার সম্পূর্ণ বক্তব্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলেই কি সেই উপনিষদের পরমতত্ত্ব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া যায়?

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল — যদি একই মহোপনিষদের পরবর্তী অংশে এমন এক পরমতত্ত্বের কথা বলা হয়, যিনি জন্মহীন, মৃত্যুহীন, অক্ষয়, অজর, অনাদি, অনন্ত ও শাশ্বত; যাঁকেই শিব বলা হয়েছে এবং যাঁকেই নিত্য আত্মা বলা হয়েছে — তাহলে সেই বক্তব্যের সঙ্গে প্রথম মন্ত্রের প্রকৃত সম্পর্ক কী ?

এখানেই বিষয়টি অত্যন্ত গভীর হয়ে ওঠে। কারণ মহোপনিষদ কেবল কোনো দেবতার উপাসনার কথা বলেই থেমে যায়নি ; বরং জীবের প্রকৃত স্বরূপ কী, পরমাত্মা কে, বন্ধনের কারণ কী এবং মুক্তির প্রকৃত জ্ঞান কী — এই প্রশ্নগুলিরও উত্তর দিয়েছে।

উপনিষদের অদ্বৈত শিক্ষায় মানুষকে নিজের দেহ, মন, ইন্দ্রিয় কিংবা জাগতিক পরিচয়কে প্রকৃত ‘আমি’ না মনে করে নিজের অন্তর্নিহিত আত্মস্বরূপকে জানতে বলা হয়েছে। আর সেই আত্মস্বরূপের প্রকৃত জ্ঞানই যখন উদিত হয়, তখন জীব উপলব্ধি করেন — যাঁকে এতদিন বাহিরে পরমেশ্বর বলে অনুসন্ধান করা হচ্ছিল, সেই পরম তত্ত্বই নিজের নিত্য আত্মস্বরূপ।

তাহলে মহোপনিষদের মতে সেই নিত্য আত্মার স্বরূপ কী? সেই অনাদি পরমতত্ত্বকে কি সত্যিই শিব বলা হয়েছে? তাঁকে কি সর্বেশ্বর বলা হয়েছে? জীবের আত্মস্বরূপ এবং সেই পরম শিবের মধ্যে কী সম্পর্ক নির্দেশ করা হয়েছে? এবং ‘আমি ব্রহ্ম’ — এই জ্ঞানকে কেন মোক্ষের কারণ বলা হয়েছে?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর মহোপনিষদের পরবর্তী মন্ত্রগুলির মধ্যেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। তাই এবার প্রচলিত দাবিটির পরিবর্তে মহোপনিষদের সম্পূর্ণ বক্তব্যের মধ্যেই দেখে নেওয়া যাক — শিব সম্পর্কে এই উপনিষদ আসলে কী শিক্ষা দিয়েছে।

__________________________________________________

♦️ অজর, অমর সত্তা একমাত্র শিব। সকল কিছু বিনাশ হলেও অন্তিমে একমাত্র শিব‌ই অস্তিত্বযুক্ত —

ততঃ স্তিমিতগম্ভীরং ন তেজো ন তমস্ততম্ ।

অনাখ্যমনভিব্যক্তং সৎকিঞ্চিদবশিষ্যতে ॥ ৬৫ ॥

ন শূন্যং নাপি চাকারি ন দৃশ্যং নাপি দর্শনম্ ।

ন চ ভূতপদার্থৌঘসদনন্ততয়া স্থিতম্ ॥ ৬৬ ॥

কিমপ্যব্যপদেশাত্মা পূর্ণাৎপূর্ণতরাকৃতিঃ ।

ন সন্নাসন্ন সদসন্ন ভাবো ভাবনং ন চ ॥ ৬৭ ॥

চিন্মাত্রং চৈত্যরহিতমনন্তমজরং শিবম্ ।

অনাদিমধ্যপর্যন্তং যদনাদি নিরাময়ম্ ॥ ৬৮ ॥

[সামবেদ/মহোপনিষদ/২ অধ্যায়/৬৫-৬৮ শ্রুতি]

✅ অর্থ — সমস্ত দৃশ্য জগৎ শান্ত ও বিলীন হয়ে যাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে—তা অত্যন্ত স্থির ও গভীর; তা না আলো (তেজ), না অন্ধকার। তা নামহীন (অনাখ্য), অপ্রকাশিত (অনভিব্যক্ত) এবং কেবল এক অনির্বচনীয় পরম অস্তিত্ব (সৎ) মাত্র  ॥ ৬৫ ॥
সেই পরম তত্ত্ব শূন্যতা (খালিভাব) নয়, আবার তার কোনো নির্দিষ্ট আকারও নেই। তা কোনো দেখার বস্তু (দৃশ্য) নয়, আবার তা দেখার ক্রিয়া (দর্শন)-ও নয়। তা পঞ্চভূত বা জড় পদার্থের সমষ্টিও নয়, অথচ তা সর্বত্র অনন্ত রূপে স্থিত ॥ ৬৬ ॥
তিনি এক অবর্ণনীয় পরমাত্মা, যিনি পূর্ণ থেকেও পরম পূর্ণ (পূর্ণাৎপূর্ণতর)। তাঁকে জাগতিক অর্থে সৎ বলা যায় না, অসৎ-ও বলা যায় না, আবার দুইয়ের মিশ্রণও বলা যায় না। তিনি কোনো অবস্থা নন এবং মনের কোনো চিন্তাভাবনাও নন ॥ ৬৭ ॥

তিনি কেবল শুদ্ধ জ্ঞান বা বিশুদ্ধ চেতনা মাত্র (চিন্মাত্র), যা সমস্ত চিন্তনীয় বিষয় থেকে মুক্ত (চৈত্যরহিত)। তিনি অন্তহীন (অনন্ত), ক্ষয়হীন (অজর) এবং পরম মঙ্গলময় শিব। যাঁর কোনো আরম্ভ, মধ্য বা শেষ  নেই — তিনিই সর্বদোষমুক্ত অনাদি সত্তা ॥ ৬৮ ॥


সারকথা — মহোপনিষদ অনুযায়ী নারায়ণের‌ও উৎপত্তি কর্তা পরমশিব বা সদাশিব এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্ম। কারণ, মহোপনিষদে নারায়ণকে প্রাকৃত প্রলয়ের শেষে একমাত্র দেবতারূপে থাকার অবস্থার কথা উল্লেখ করলেও, নাম রূপ হীন তথা সর্বতোভাবে অপ্রকাশিত ভাবে পরমচৈতন্যরূপে অনাদি শিবের অস্তিত্ব কে স্বীকার করা হয়েছে। সুতরাং, এখানে সামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্য হল - একমাত্র দেবতারূপে বিরাজমান নারায়ণ, আর সর্বোচ্চ পরমসত্তা শিব প্রকাশহীন ভাবে অবস্থিত। তাই নারায়ণ ছাড়াও যে শিবের অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে তা মহোপনিষদের বচন থেকেই প্রমাণিত। 

আরো দেখা যাক, 

♦️ পরমেশ্বর শিব নির্গুণ ব্রহ্ম চৈতন্য শাশ্বত সত্তা, তিনি সকল দেবতার আরাধ্য —

তদ্ব্রহ্মানন্দমদ্বন্দ্বং নির্গুণং সত্যচিদ্ঘনম্ ।

বিদিত্বা স্বাত্মনো রূপং ন বিভেতি কদাচন ॥ ৭০॥

পরাত্পরং যন্মহতো মহান্তং স্বরূপতেজোময়শাশ্বতং শিবম্ ।

কবিং পুরাণং পুরুষং সনাতনং সর্বেশ্বরং সর্বদেবৈরুপাস্যম্ ॥ ৭১ ॥

অহং ব্রহ্মেতি নিয়তং মোক্ষহেতুর্মহাত্মনাম্ ।

দ্বে পদে বন্ধমোক্ষায় নির্মমেতি চ মমেতি চ ।

মমেতি বধ্যতে জন্তুর্নির্মমেতি বিমুচ্যতে ॥ ৭২ ॥

[সামবেদ/মহোপনিষদ/২ অধ্যায়/৭০-৭২ শ্রুতি]

✅ অর্থ — সেই ব্রহ্ম আনন্দস্বরূপ, অদ্বৈত, নির্গুণ এবং সত্য-চৈতন্যে পরিপূর্ণ। তাঁকে নিজের আত্মস্বরূপ বলে জেনে মানুষ কখনও ভীত হয় না ॥ ৭০॥ 

সেই কল্যাণস্বরূপ শিব - পরাৎপর, মহতেরও মহান, স্বরূপতেজোময়, শাশ্বত ; তিনি সর্বজ্ঞ, অনাদি, সনাতন পুরুষ, সর্বেশ্বর এবং সকল দেবতার উপাস্য ॥ ৭১ ॥

‘আমি সেই ব্রহ্মরূপ শিব’—এই অটল জ্ঞান মহাত্মাদের মোক্ষের কারণ। বন্ধন ও মোক্ষের জন্য দুটি শব্দ রয়েছে—‘মম’ (আমার) এবং ‘নির্মম’ (আমার নয়)। [জীব - নিজের দেহকে স্বয়ং আমি ধারণা করে, সব কিছু] ‘আমার’ এই ভাবের দ্বারা জীব আবদ্ধ হয়, আর [দেহের মধ্যে থাকা আত্মা স্বয়ং আমি ধারণা করে, দেহ কে অনাত্মা জেনে, এই দেহের সাথে সম্পর্কিত জাগতিক দেহ তথা কোনো পদার্থ] ‘আমার নয়’ এই ভাবের দ্বারা মুক্ত হয় ॥ ৭২ ॥

 

♦️ সেই নির্গুণ ব্রহ্ম শিবকেই জানার চেষ্টা করেন ব্রহ্মজ্ঞানীগণ, সকল সৃষ্টি একমাত্র শিবের‌ই বিলাস মাত্র —

মরুভূমৌ জলং সর্বং মরুভূমাত্রমেব তৎ ।

জগৎ ত্রয়মিদং সর্বং চিন্মাত্রং স্ববিচারতঃ ॥ ৮৪ ॥

লক্ষ্যালক্ষ্যমতিং ত্যক্ত্বা যস্তিষ্ঠেত্কেবলাত্মনা ।

শিব এব স্বয়ং সাক্ষাদয়ং ব্রহ্মবিদুত্তমঃ ॥ ৮৫ ॥

অধিষ্ঠানমনৌপম্যমবাঙ্মনসগোচরম্ ।

নিত্যং বিভুং সর্বগতং সুসূক্ষ্মং চ তদব্যয়ম্ ॥ ৮৬ ॥

সর্বশক্তের্মহেশস্য বিলাসো হি মনো জগৎ ।

সংযমাসংযমাভ্যাং চ সংসারঃ শান্তিমন্বগাত্ ॥ ৮৭ ॥

[সামবেদ/মহোপনিষদ/৪ অধ্যায়/৮৪-৮৭ শ্রুতি]

✅ অর্থ — মরুভূমিতে সমস্ত জলই মরুভূমিমাত্র ; তদ্রূপ স্ববিচারের দ্বারা এই সমগ্র ত্রিভুবনই কেবল চৈতন্যস্বরূপ বলে প্রতীয়মান হয় ॥ ৮৪ ॥

লক্ষ্য ও অলক্ষ্য-বিষয়ক বুদ্ধি পরিত্যাগ করে যে কেবল আত্মস্বরূপে অবস্থান করেন, তিনিই স্বয়ং সাক্ষাৎ শিব ; তিনিই শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মজ্ঞ ॥ ৮৫ ॥

সেই পরমতত্ত্বই সমস্ত কিছুর অধিষ্ঠান ; তাঁর কোনো তুলনা নেই। তিনি বাক্য ও মনের বিষয়ের অতীত। তিনি নিত্য, সর্বব্যাপী, সর্বত্র বিরাজমান, অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং অবিনশ্বর ॥ ৮৬ ॥

এই জগৎ সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর মহেশের (শিবের) একটি সামান্য ইচ্ছার বিলাস মাত্র। সংযম (ধারণা, ধ্যান, সমাধি) এবং সংযমের (অন্তর্জ্ঞান) মাধ্যমে এই সমস্ত জাগতিক বিষয় থেকে সাধক ব্যক্তি শান্তি লাভ করে ॥ ৮৭ ॥


♦️ শিব কারোর উপর অবলম্বন করেন না, তার কোনো উৎপত্তিরূপ কারণসত্তা নেই —

সর্বশান্তং নিরালম্বং ব্যোমস্থং শাশ্বতং শিবম্ ।

অনাময়মনাভাসমনামকমকারণম্ ॥ ৪৫ ॥

[সামবেদ/মহোপনিষদ/৫ অধ্যায়/৪৫ শ্রুতি]

✅ অর্থ — কল্যাণস্বরূপ পরমেশ্বর শিব - সর্বতোভাবে শান্ত, নিরালম্ব (অন্যের উপর অবলম্বন করেন না), আকাশের ন্যায় সর্বব্যাপী, শাশ্বত ও ; যিনি রোগ-দুঃখহীন, প্রকাশের অতীত, নামহীন এবং কারণহীন।


♦️ শিব‌ই পরমপুরুষ, তিনি ঈশানরূপী রুদ্র হন, শিব অদ্বিতীয় পরমব্রহ্ম, শিবের শক্তিতেই সমগ্র জগৎ উৎপন্ন হয়েছে —

শিবঃ পুরুষ ঈশানো নিত্যমাত্মেতি কথ্যতে ॥ ৬১ ॥

দ্বৈতাদ্বৈতসমুদ্ভূতৈর্জগন্নির্মাণলীলয়া।

পরমাত্মময়ী শক্তিরদ্বৈতৈব বিজৃম্ভতে ॥ ৬২ ॥

[সামবেদ/মহোপনিষদ/৬ অধ্যায়/৬১-৬২ শ্রুতি]

✅ অর্থ — শিবই পুরুষ, শিবই ঈশান ; তিনিই নিত্য আত্মা বলে কথিত হন ॥ ৬১ ॥

সেই শিবের অদ্বৈতরূপে পরমাত্মময়ী শক্তির থেকেই উদ্ভূত দ্বৈত ও অদ্বৈতরপী  এই জগতের নির্মাণলীলা প্রকাশিত ও বিকশিত হয় ॥ ৬২ ॥

__________________________________________________

🔱 সিদ্ধান্ত — মহোপনিষদের সামগ্রিক বক্তব্য কী বলে?

মহোপনিষদের ২য় অধ্যায়ের ৬৫–৬৮ মন্ত্রে পরমতত্ত্বকে “অনন্তমজরং শিবম্”—অনন্ত, অজর ও শিব বলা হয়েছে। ৭০–৭২ মন্ত্রে তাঁকে অদ্বৈত, নির্গুণ, সত্যচিদ্ঘন এবং “শাশ্বতং শিবম্”, সনাতন পুরুষ, সর্বেশ্বর ও সকল দেবতার উপাস্য বলা হয়েছে; পাশাপাশি “অহং ব্রহ্ম” জ্ঞানকে মোক্ষের কারণ বলা হয়েছে। ৪র্থ অধ্যায়ের ৮৪–৮৭ মন্ত্রে আত্মবিচারের মাধ্যমে যে ব্যক্তি কেবল আত্মস্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হন, তাঁকেই “শিব এব স্বয়ং সাক্ষাৎ” এবং শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মজ্ঞ বলা হয়েছে। ৫ম অধ্যায়ের ৪৫ মন্ত্রে শিবকে শাশ্বত, অনাময়, অনাভাস, অনামক ও অকারণ বলা হয়েছে। সর্বশেষ ৬ষ্ঠ অধ্যায়ের ৬১ মন্ত্রে সরাসরি ঘোষণা—“শিবঃ পুরুষ ঈশানো নিত্যমাত্মেতি কথ্যতে”—শিবই পুরুষ, শিবই ঈশান এবং তিনিই নিত্য আত্মা।

অতএব, এই মন্ত্রসমূহকে একত্রে বিচার করলে মহোপনিষদের পরবর্তী অংশে শিবকে কোনো নশ্বর বা অন্যের দ্বারা সৃষ্ট সত্তা হিসেবে নয়, বরং অনাদি, অজর, অনন্ত, শাশ্বত, সর্বেশ্বর এবং নিত্য আত্মারূপ পরমতত্ত্ব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে অদ্বৈত আত্মজ্ঞানে নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে উপলব্ধি করাকেই মুক্তির পথ হিসেবে নির্দেশ করা হয়েছে।

সুতরাং মহোপনিষদের একটি মন্ত্রকে বিচ্ছিন্নভাবে নিয়ে “নারায়ণ একমাত্র ছিলেন, তাই শিবের অস্তিত্ব ছিল না”—এমন সিদ্ধান্ত করার আগে সমগ্র উপনিষদের পরবর্তী শিবতত্ত্ব ও অদ্বৈত আত্মজ্ঞানের বক্তব্যও অবশ্যই বিবেচনা করা প্রয়োজন।


প্রশ্ন : যদি শিব নিত্য সত্তা হন, তাহলে মহোপনিষদে  একমাত্র নারায়ণ বর্তমান থাকাকালীন প্রসঙ্গে প্রথম মন্ত্রে যে ঈশান এবং ব্রহ্মার অস্তিত্ব ছিল না বলা হয়েছিল, সেই ঈশান কে ?

উত্তর - মহোপনিষদের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম মন্ত্র টি দেখা যাক -

তদাহুরেকো হ বৈ নারায়ণ 

আসীন্ন ব্রহ্মা নেশানো নাপো নাগ্নীষোমৌ 

নেমে দ্যাবাপৃথিবী ন নক্ষত্রাণি ন সূর্যো ন চন্দ্রমাঃ।

[সামবেদ/মহোপনিষদ/১ অধ্যায়/১ মন্ত্র]

অর্থ - তখন একমাত্র নারায়ণই ছিলেন — এমনই বলা হয়। তখন ব্রহ্মা ছিলেন না, ঈশান ছিলেন না, জল ছিল না, অগ্নি ও সোম ছিলেন না ; এই দ্যুলোক ও পৃথিবী ছিল না, নক্ষত্রসমূহ ছিল না, সূর্যও ছিল না, চন্দ্রমাও ছিল না।

 

এইখানে একমাত্র নারায়ণ ছিলেন - এই কথা বলা হয়েছে । সেই সময় নারায়ণ থেকে ব্রহ্মা ও যে সমস্ত সৃষ্টি ব্রহ্মা থেকে উৎপন্ন হয় সেগুলোর অস্তিত্ব ছিল না । তখন ব্রহ্মা থেকে রুদ্রদেব উৎপন্ন হননি, এখানে সেই রুদ্রদেবকে ঈশান নামে অভিহিত করা হয়েছে । তাই এই মন্ত্রে শিবের অস্তিত্বহীনতা প্রমাণিত হয়না। কারণ, এই মহোপনিষদেই শিবকে নিত্য, অজর, সনাতন, শাশ্বত বলা হয়েছে অর্থাৎ যার জন্ম-মৃত্যু নেই, যিনি চিরকালীন সত্তা । সুতরাং মহোপনিষদ থেকে শিবের নিত্য স্থিতি প্রমাণিত। তাই নারায়ণ থাকাকালীন অবস্থায় যে ঈশানের অস্তিত্ব ছিল না সেই ঈশানকে সম্পূর্ণরূপে শিব বলে ধারণা করা যুক্তিযুক্ত নয় । 

তাহলে যে শিব নিত্য এবং যে ঈশান নারায়ণের পূর্বে উপস্থিত ছিলেন না, সেই ঈশান এবং এই নিত্য শিব প্রকৃতপক্ষে কে, এটি এখন বিশ্লেষণ করব।

বেদের অন্যত্র শ্রুতিতে এটি স্বীকার করা হয়েছে যে, সদাশিব থেকে সৃষ্টি হয়েছেন ত্রিদেব।

♦️ বেদ থেকে প্রমাণ —

“শিবং অক্ষরং অব্যয়ং হরি-হর-হিরণ্যগর্ভ-স্রষ্টারং”

[অথর্ববেদ/ভস্মজাবাল উপনিষদ/২ অধ্যায়/৩ শ্রুতি]

✅ অর্থ : বিনাশহীন অক্ষরব্রহ্ম প্রভু শিব (সদাশিব)-ই ত্রিদেবরূপী হরি (নারায়ণ), হর (কৈলাসপতি সংহারকর্তা রুদ্র) ও হিরণ্যগর্ভ (ব্রহ্মা)-র সৃজন কর্তা।


আবার দেখুন - বৈষ্ণবদের‌ই প্রাণপ্রিয় এই মহঃ উপনিষদ ই  বলেছে যে, নারায়ণের মৃত্যু হয় । 

প্রমাণ দেখুন —

পরমেষ্ঠ্যপি নিষ্ঠাবান্‌ হীয়তে হরিরপ্যজঃ ।

ভাবোঽপ্যভাবমায়াতি জীর্য‌ন্তে বৈ দিগীশ্বরাঃ ॥ ৫১

ব্রহ্মা বিষ্ণুশ্চ রুদ্রশ্চ সর্বা বা ভূতজাতয়ঃ ।

নাশমেবানুধাবন্তি সলিলানীব বার্ডবম্ ॥ ৫২

[তথ্যসূত্র : মহ উপনিষদ/৩য় অধ্যায়/৫১-৫২ নং মন্ত্র]

অর্থ — ব্রহ্মাও বিনাশপ্রাপ্ত হন আর অজ বিষ্ণু‌ও মৃত্যুপ্রাপ্ত হন। সমস্ত ভাব অভাবে পরিনত হয়ে যায়, এই ভাবে জাগতিক সকল কিছুই নশ্বর, দিকপালেরাও মৃত্যু প্রাপ্ত হন ॥ ৫১

ব্রহ্মা-বিষ্ণু রুদ্র তথা সকল দেবতা সহ যতরকম জীব আছে সবাই নাশ হবার জন্য ধাবিত হয় সেই প্রকারে যেভাবে জল বাড়বানলের দিকে ধাবিত হয় ॥ ৫২


আমরা জানি, যার জন্ম হয় তার মৃত্যু হয়। তাই নারায়ণ এবং তাঁর থেকে উৎপন্ন হওয়া ব্রহ্মা আর ব্রহ্মার থেকে উৎপন্ন হওয়া ঈশান নামক যে রুদ্রদেব, এই তিন দেবস্বরূপ সত্তা হলেন - ত্রিদেব নামে অভিহিত। এই ত্রিদেবের জন্ম মৃত্যু রয়েছে। তা ভস্ম জাবালোপনিষদ থেকে প্রমাণিত এবং মহোপনিষদ থেকে তাদের মৃত্যুও প্রমাণিত। কিন্তু মহোপনিষদে যে শিবকে নিত্য বলা হয়েছে ভস্ম জাবালোপনিষদেও সেই শিবকেই নিত্য বলা হয়েছে, যে শিব থেকে এই ব্রহ্মা বিষ্ণু এবং রুদ্র (ঈশান) উৎপন্ন হয়।

ত্রিদেবের থেকেও ঊর্দ্ধে‌ হলেন পরমেশ্বর শিব, এটি ভস্ম জাবাল উপনিষদের অথর্বশ্রুতি বলছে, প্রমাণ দেখুন —

শিব নাম অন্যনিশমুচ্চরন্তং হিরণ্যবাহুং হিরণ্যরূপং হিরণ্যবর্ণং হিরণ্য নিধিং অদ্বৈতং চতুর্থং ব্রহ্মবিষ্ণুরুদ্রাতীতমেকমাশাস্যং ভগবন্তং শিবং প্রণম্য মুহুর্মুহুরভ্যর্চ্য

[অথর্ববেদ/ভস্ম জাবাল উপনিষদ /অধ্যায় ১/১ নং মন্ত্র]

✅ অর্থ : শিব নাম অহর্নিশি উচ্চারণ করে সেই হিরণ্যবর্ণরূপী, হিরণ্যবাহু, হিরণ্যরূপ যার সেই প্রভুই অদ্বিতীয়, তিনিই জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্তির ঊর্ধ্বে থাকা চতুর্থপদ সমাধীতে প্রাপ্ত হন যে প্রভু, যিনি নারায়ণ, ব্রহ্মা ও কালরুদ্র — এই ত্রিদেবের‌ও অতীত হলেন ভগবান শিব, সেই প্রভুকে প্রণাম করি ।


দেখুন, স্পষ্ট ভাবে পরমেশ্বর শিবের নিত্যতা প্রমাণিত, মহোপনিষদ এবং ভস্মজাবাল উপনিষদ দ্বারা স্থির সিদ্ধান্ত আসা গেল যে, 

মহোপনিষদের প্রথম মন্ত্রে “ঈশান” না থাকার কথা বলা হয়েছে বলে নিত্য পরমেশ্বর সদাশিবের অনস্তিত্ব প্রমাণিত হয় না। শৈব তত্ত্বক্রমে সদাশিবই নিত্য অক্ষর ও অব্যয় পরমতত্ত্ব; তাঁর থেকেই হরি, হর ও হিরণ্যগর্ভের প্রকাশ। অতএব মহোপনিষদের “ন ঈশানঃ” কথাটি সৃষ্টিলীলার অন্তর্গত রুদ্র-ঈশানের অপ্রকাশকে নির্দেশ করতে পারে, সাক্ষাৎ নিত্য পরমেশ্বর সদাশিবের বা পরমশিবের অনস্তিত্বকে নয়।

__________________________________________________








মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ