দুর্মুখ গণেশের হাতে শিবের শিরোচ্ছেদ হবার হাস্যকর বেদবিরুদ্ধ কাহিনীর পর্দা ফাঁস
দুর্মুখ গণেশের হাতে শিবের শিরোচ্ছেদ হবার হাস্যকর বেদবিরুদ্ধ কাহিনীর পর্দা ফাঁস
__________________________________________
সম্প্রতি তথাকথিত গাণপত্য বাদীদের একটি ফেসবুক পেজে দুর্মুখ গণেশ নাম দিয়ে Ai দ্বারা তৈরী ছবি প্রকাশ করা হয়েছে এবং দাবী করা হচ্ছে যে, দুর্মুখ গণেশ রুদ্রদেবের শিরোচ্ছেদ করে বধ করেছিলেন।
তিনি আবার এই বিষয়টিকে একটি ভদ্রতার মুখোশ পড়ানোর জন্য লিখেছেন — “ এই শিরশ্ছেদ কোনো ব্যক্তিগত ক্রোধ বা দেবতাদের পারস্পরিক বৈরিতার কাহিনী নয়। এর তাৎপর্য হল— বিশ্বব্যবস্থার স্বার্থে স্বয়ং ঈশ্বরও নিজের লীলায় অন্য ঈশ্বররূপকে দণ্ডিত করতে পারেন। এই কঠোরতার অন্তরেও রয়েছে ধর্ম ও কালচক্রের রক্ষা।” — এমন ধরণের বক্তব্যে যেন মনে হচ্ছে রুদ্র বা শিবের মৃত্যু হওয়াটাও স্বাভাবিক। যেন ঈশ্বর হওয়াটাও হাতের মোয়া। যে কেউ যেন সাক্ষাৎ ঈশ্বর হয়ে যেতে পারেন। কলিযুগের প্রভাবে আজ সনাতন ধর্মের মূল সিদ্ধান্ত তলানিতে ঠেকেছে এই সকল নব্যদের পণ্ডিতির কারণে। এর অবসান বেদ থেকেই ঘটানোর জন্য এবার কিছু বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে নব্য গাণপত্যদের দাবী খণ্ডন করবো।
__________________________________________
প্রথমে দেখে নেওয়া যাক, ব্রহ্মের ও শিবের লক্ষণ।
উত্তর : না , ব্রহ্মসূত্রে বলা হয়েছে —
যিনি এক ও অদ্বিতীয় পরমসত্তা পরমব্রহ্ম, যার ঊর্ধ্বে আর কোনোকিছুর অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব, সেই পরমব্রহ্মের জন্ম আর অন্য কারোর থেকে হয় না, একথা ব্রহ্মসূত্রে ব্যাসদেব বলেছেন। প্রমাণ —
“ ॥ অসম্ভবস্তু সতঃ অনুপপত্তেঃ ॥ ”
(ব্রহ্মসূত্র/২য় অধ্যায়/৩য় পাদ/৯ ক্রমাঙ্ক সূত্র)
পদচ্ছেদ — সতঃ-(অন্য কারোর থেকে সর্বোচ্চ পরমসত্তা-ব্রহ্মের উৎপত্তি হওয়া), অসম্ভবঃ- (সম্ভব নয়) অনুপপত্তেঃ (কারণ, ইহা যুক্তিযুক্ত নয়)।
যিনি ব্রহ্ম, একমাত্র তার থেকে সমস্তকিছুর উৎপত্তি হয়। প্রমাণ —
জন্মাদ্যস্য যতঃ
(ব্রহ্মসূত্র/১ম অধ্যায়/১ম পাদ/২ ক্রমাঙ্ক সূত্র)
'জন্মাদি অস্য যতঃ।” অস্য (এই জগতের), জন্মাদি (জন্ম স্থিতি ও লয়), যতঃ (যাঁহা হইতে)।
অজাত ইত্যেবং কশ্চিদ্ভীরুঃ প্রপদ্যতে। রুদ্র যত্তে দক্ষিণং মুখং তেন মাং পাহি নিত্যম্ ॥
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৪ অধ্যায়/২১ নং মন্ত্র]
সাধারণ ভাবেই আমরা জানি যে — যার জন্ম আছে তার মৃত্যু আছে, কিন্তু যার জন্ম নেই তার মৃত্যুও নেই।
তবুও দেখুন
__________________________________________________
আবার কঠোপনিষদ/১.২.১৮ —এ সরাসরি বলা হয়েছে “ন জায়তে ম্রিয়তে বা বিপশ্চিন্নায়ং কু তশ্চিন্ন বভূব কশ্চিৎ ... ॥” আত্মা বা ব্রহ্মের কোনো জন্ম বা মৃত্যু হয় না।
কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/কৈবল্য উপনিষদ/৭ শ্রুতি —
তমাদিমধ্যান্তবিহীনমেকং বিভং চিদানন্দমরূপমদভূতম্ ।
তথাদিউমাসহাযং পরমেশ্বরং প্রভুং
ত্রিলোচনং নীলকণ্ঠং প্রশান্তম্ ।
ধ্যাত্বা মুনির্গচ্ছতি ভূতযোনিং
সমস্তসাক্ষিং তমসঃ পরস্তাৎ ॥ ৭ ॥
— এখানে শিবকে পরমেশ্বর ও সমস্ত সৃষ্টির মূল উৎস (ভূতযোনি) বলা হয়েছে। যিনি প্রকৃতির অতীত (তমসঃ পরস্তাৎ), আদি-মধ্য-অন্তহীন (অনাদিমধ্যান্তম্) এবং এক ও সর্বব্যাপী, তাঁর কোনো জন্ম বা বিনাশ থাকা অসম্ভব।
ॐ ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্ ।উর্বারুকমিব বন্ধনান্ মৃত্যোর্মুক্ষীয় মামৃতাৎ ॥
[ঋগ্বেদ/শাকল শাখা/৭ম মণ্ডল/৫৯ সূক্ত/১২ শ্রুতি]
এই মহামন্ত্রে স্পষ্ট ভাবে পরমেশ্বর ত্র্যম্বক শিবকে অমরত্ব দাতা বলা হয়েছে।
যিনি নিজেই মরণশীল, তিনি অন্যকে অমরত্ব বা মোক্ষ দিতে পারেন না। শিব অন্যকে মৃত্যু থেকে মুক্ত করেন, কারণ তিনি নিজে জন্ম-মৃত্যুর অতীত পরম অমৃত তত্ত্ব। তাই শিবের যে মৃত্যু হয়না তা এখান থেকেও প্রমাণিত।
_________________________________________________
এবার দেখুন
অর্হন্ বিভৰ্ষি সায়কানি ধন্বার্হন্
নিষ্কং যজতং বিশ্বরূপম্ ।
অর্হন্নিদং দয়সে বিশ্বমভ্বং ন বা
ওজীয়ো রুদ্র ত্বদস্তি ॥ ১০ ॥
[ঋগ্বেদ/শাকল শাখা/২য় মণ্ডল/৩৩ নং সূক্ত/১০নং মন্ত্র]
বেদ বচন অনুযায়ী, পরমেশ্বর শিবের শক্তি সকলের চেয়ে অধিক। বিষ্ণু, ব্রহ্মা, ইন্দ্র সহ সকল দেবদেবীর থেকেও শক্তিমান বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাই কিছু কাহিনীর ভিত্তিতে রুদ্র বা শিব — অন্য কারোর কাছে পরাজিত হন এমন ভাবনা করা জ্ঞানের অপরিপক্কতা মাত্র।
__________________________________________
সদুর্মুখ গণেশের কাহিনী বা তার নামে রচিত হওয়া যে সব নব্য তন্ত্রের বাড়বাড়ন্ত আজকাল দেখা যাচ্ছে, সেসবের গ্রহণ যোগ্যতা কি ?
আজকাল সবাই নিজের মনের মতো শ্লোক রচনা করে লিখে পাণ্ডুলিপি বলে জমা করছে, আর তা দেখিয়ে নিজের মনের ইচ্ছামতো গল্প রচনা করে নিজের পছন্দের দেবদেবীকে অন্য দেবদেবীর থেকে উৎকৃষ্ট তথা শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে লেগে পেড়েছে নব্য মতবাদীরা।
প্রকৃত সমস্যা হল : পরমেশ্বর রুদ্রের হাতে গণেশের মস্তক ছিন্ন হয়েছিল, তাই গণেশের অতি ভক্তেরা এই বিষয়টিকে অপমানজনক হিসেবে বোধ করেছে, তাই এই একই ঘটনা গণেশের হাত দিয়ে ঘটিয়ে মহাদেবের মস্তক ছিন্ন করবার মত অপপ্রচার রটাতেই নব্য তন্ত্র গুলির আগমন ঘটিয়েছে সমাজে।
কিন্তু গাণপত্যদের জন্য সমস্যা হল : কোনো তন্ত্র প্রামাণিক হতে গেলে তার সপক্ষে “শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণ, ইতিহাস” এই প্রধান ধর্মীয় শাস্ত্রে উল্লেখ থাকতে হবে, শুধু উল্লেখ থাকলেই হবে না বরং সেটি শ্রুতি সম্মত তথা উৎকৃষ্ট কিনা সে বিষয়ে শব্দ প্রমাণ থাকতে হবে। তবেই তা শাস্ত্রীয় বলে গণ্য হয়। এরপর দেখতে হবে সেই তন্ত্রের সাথে শ্রুতি বচনের সামঞ্জস্যতা আছে নাকি অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। যদি সামঞ্জস্যতা থাকে তবে সেই তন্ত্র বচন গ্রহণযোগ্য, যদি বেদের সহিত উক্ত তন্ত্রের বচনের বিরোধ বাঁধে তবে সেই তন্ত্র বচনকে সর্বকালের জন্য পরিত্যাগ করতে হবে।
একথা বেদ বলছে। প্রমাণ —
শ্রুত্যা যদুক্তং পরমার্থমেব তৎসংশয়ো নাত্র ততঃ সমস্তম্ ।
শ্রুত্যা বিরোধে ন ভবেত্ প্রমাণং ভবেদনর্থায় বিনা প্রমাণম্ ॥ ৩২ ॥
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/ব্রহ্মবিদ্যা/৩২ ক্রমাঙ্ক মন্ত্র]
শ্রুতি স্মৃতি পুরাণানাং বিরোধো যত্র দৃশ্যতে ।
তত্র শ্রৌতং প্রমাণস্তু তয়োর্দ্বৈধে স্মৃতিব্বরা ॥
[ব্যাস সংহিতা/১ম অধ্যায়/৪নং শ্লোক]
তাই গাণপত্য হাজার নব্য তন্ত্র রচনা করেও বেদ বিরোধী মতবাদকে স্থাপন করতে সক্ষম হবে না।
__________________________________________
তাই বেদ ও স্মৃতি শাস্ত্র থেকেই নিরপেক্ষ বিচার পূর্বক — নব্য গাণপত্যবাদীদের চরম খণ্ডন করে তাদের দুর্মুখ গণপতির নামের অছিলায় তৈরী হওয়া কাহিনীকে বেদ বিরুদ্ধ অশাস্ত্রীয় কাল্পনিক প্রমাণিত করে খণ্ডন করা হল।
আমাদের মহাপাশুপত অদ্বৈতবাদী শৈবদের মান্যতা হল বেদ, পুরাণ সকল শাস্ত্রই শৈবদের। কিন্তু সেই শাস্ত্রের মধ্যে যা পরমতত্ত্ব, সেটিকে তথ্যপ্রমাণ, যুক্তি ও তর্কের মাধ্যমের নির্বাচন করে তাতে মগ্ন হতে হবে। অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে ঈশ্বরের উপাসনায় রত হতে হবে।
নব্য গাণপত্যবাদীদের ব্যবহৃত তন্ত্রের বা তাদের গুরুপরম্পরার নির্দিষ্ট নাম — না সার্বজনীন প্রামাণিক বেদ, স্মৃতি, পুরাণ, ইতিহাস শাস্ত্রে উল্লেখ আছে।
যে সকল বিনায়ক তন্ত্রাদির নাম উল্লেখ করে নব্য গাণপত্যবাদীরা প্রচার করছে ঐসকল তন্ত্র কোন কোন আচার্যের মাধ্যমে গুরুশিষ্য পরম্পরায় ঈশ্বর বা গণেশ থেকে বর্তমান গাণপত্যবাদীদের হাতে এসে পৌঁছেছে , তা জানা যায় না। তাহলে এই সকল তন্ত্রাদির প্রামাণিকতা কি ?
যেখানে মধ্যযুগে গণেশপুরাণ/মুদ্গলপুরাণ নামক সাহিত্য রচিত হয়েছে, যা কিনা ১৮ মহাপুরাণ বা ১৮ উপপুরাণেরও অন্তর্ভুক্ত নয়। সেখানে এসকল তন্ত্রের প্রামাণিকতা কি ?
তাই বেদবিরুদ্ধ এসব তথাকথিত ধ্যানমন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা নেই।
বর্তমানের গুরুপরম্পরাহীন নব্য গাণপত্যদের আপ্তবচনও তো সম্ভব নয়, কারণ গাণপত্য গুরুপরম্পরার শাস্ত্রীয় ভিত্তিই উপলব্ধ নয়। তাহলে এই সকল তথাকথিত তন্ত্রের প্রামাণিকতা কি ?
যদি কোনো লেখা পাওয়া মাত্রেই তা প্রামাণিক বলে প্রচার করা বৈধ হয় তবে তো যার যা খুশি সে তাই রচনা করে একে অপরের দেবদেবীকে নিকৃষ্ট প্রমাণ করতে তৎপর হয়ে উঠবে।
যেমন - অল্লো উপনিষদ নামের একটি অশাস্ত্রীয় আষাঢ়ে গল্প ভরা পুস্তক রচনা করে, তার সাথে উপনিষদ নাম জুড়ে দিয়ে তাকে শাস্ত্র হিসেবে প্রচার করবার চেষ্টা হয়েছিল কোনো অপপ্রচারকারীদের দ্বারা। তা বলে সেটি গ্রহণযোগ্য হয়নি সনাতন ধর্মে। এক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
এই কারণেই বেদ ও স্মৃতি শাস্ত্র মূল সিদ্ধান্ত কে অক্ষত রাখতে নিয়ম বেঁধে দিয়ে সরাসরি বলেছে — যা বেদ বিরুদ্ধ তা পরিত্যাজ্য। শ্রুতিবচনই সর্বোপরি।
তাই পরমেশ্বর রুদ্র-শিব অপরাজেয়। দুর্মুখ গণপতির নাম দিয়ে প্রচারিত বেদবিরুদ্ধ কাহিনী খণ্ডিত হল।
__________________________________________
সনাতন ধর্মে শৈবরা কোনো নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ মতবাদী নন, বরং সনাতন ধর্মের নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত প্রদায়ী বেদ শৈবদের সর্বোচ্চ পরমসত্তা শিবকেই গ্রহণ করেছে —
তদেব নিষ্কলং ব্রহ্ম নির্বিকল্পং নিরঞ্জনম্ ।
তদ্ব্রহ্মাহমিতি জ্ঞাত্বা ব্রহ্ম সম্পদ্যতে ধ্রুবম্ ॥ ৮ ॥
নির্বিকল্পমনন্তং চ হেতুদৃষ্টান্তবর্জিতম্ ।
অপ্রমেয়মনাদিং চ জ্ঞাত্বা চ পরমং শিবম্ ॥ ৯ ॥
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/ব্রহ্মবিন্দু উপনিষদ/৮-৯ ক্রমাঙ্ক মন্ত্র]
সেই পরমশিবকেই নির্বিকল্প, অনন্ত, হেতু ও দৃষ্টান্ত-বর্জিত, অপ্রমেয় এবং অনাদি - ব্রহ্ম বলে জানলে — সেই আত্মজ্ঞানী ব্যক্তি মুক্ত হন ॥ ৯ ॥
[বিশেষ দ্রষ্টব্য : সনাতন ধর্মের বিষয়ে প্রচারের ক্ষেত্রে কারোর মনগড়া কাল্পনিক অনুমান বা নিজস্ব ধারণা দিয়ে করা ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়, প্রত্যেক দাবী পেছনে প্রামাণিক শাস্ত্রের প্রমাণ ও আপ্ত বচন উপস্থাপন করলে সেটিই গ্রহণযোগ্য। নচেৎ সনাতন ধর্মের প্রামাণিক শাস্ত্রের প্রমাণ ছাড়া অশাস্ত্রীয় কোনো কিছু প্রচার করে শিবনিন্দা করলে বারংবার শাস্ত্রীয় খণ্ডন উপস্থাপন করা হবে।]
_________________________________________________
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 
পরমেশ্বর শিবের ও সনাতন শৈবধর্মের বিষয়ে এমন গুহ্য সত্য রহস্য ও সত্য উন্মোচনমূলক লেখা আরো পেতে অবশ্যই আমাদের Shivalaya ফেসবুক পেজ Follow করে Favourite করে রাখুন। এই তথ্য দ্বারা যদি আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি হয়ে থাকে তবে অবশ্যই এই লেখাটি শেয়ার করুন, যাতে সত্য প্রকাশ্যে আসে।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন