সদ্যোজাত শিবের যোগাবতার মহর্ষি শ্বেত — মহাপাশুপত শৈব গুরুপরম্পরা তথা সনাতন ধর্মের প্রথম আচার্য গুরুদেব

 


🕉️ মহর্ষি শ্বেত — মহাপাশুপত শৈব গুরুপরম্পরা তথা সনাতন ধর্মের প্রথম আচার্য গুরুদেব

__________________________________________________

🔰 ভূমিকা — সকল শৈবগুরুপরম্পরা ও সমগ্র সনাতন ধর্মের  এক ও অদ্বিতীয় প্রাচীনতম গুরুপরম্পরা হল — পাশুপত। আগম (মহাতন্ত্র/মহাশ্রুতি) ও নিগম (বেদ/শ্রুতি) উভয়কে একত্রে ধারণ করে এই পাশুপত পরম্পরা তাই এই পরম্পরা ‘মহাপাশুপত’ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এই পরম্পরা ‘অদ্বৈত’ দর্শনে স্থিত, শিবমহাপুরাণে এই অদ্বৈতবাদকে ‘শৈব অদ্বৈতবাদ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, আর স্কন্দমহাপুরাণের সূতসংহিতায় পরম + অদ্বৈত = ‘পরমাদ্বৈত’ বলে উল্লেখিত হয়েছে। এই দার্শনিক পরিভাষায - পাশ পশু, পতি এই তিনটি বিষয়ের উপর ন্যস্ত।  পাশ = মায়া, পশু = পাশরূপী দড়িতে আবদ্ধ জীবাত্মা, পতি = পাশ ও পশুর নিয়ন্ত্রণকর্তা, পাশ থেকে পশুকে মুক্তিদাতা স্বামী। 

ব্রহ্মা থেকে শুরু করে বিষ্ণু, ইন্দ্র, বরুণ ইত্যাদি সকল দেবদেবী, মনুষ্য, স্থাবর জঙ্গমাত্মক সমগ্র জীব ইত্যাদি থেকে কীট পর্যন্ত সকলেই পরমেশ্বর শিবের পশুমাত্র - এটিই পাশুপত দর্শনের কথা।

পরমেশ্বর শিব জীবকে মায়ার দড়িরূপী পাশ থেকে মুক্ত করেন, তাই পরমেশ্বর শিবকে পশুদের পতি অর্থাৎ - ‘পশুপতি’ বলা হয়। অজ্ঞানরূপী মায়ার কারণে জীব পাশবদ্ধ পশু হয়ে থাকেন, কিন্তু জীব যখন আত্মজ্ঞান লাভ করে নিজের আত্মাকে শিব বলে জানতে পারেন, তখন তিনি পাশমুক্ত হয়ে শিবকৃপায় শিবে লীন হয়ে একীভূত হয়ে যান। এই আত্মজ্ঞানের দ্বারা পশুর পাশের পতন (নাশ) হয় বলে আত্মজ্ঞানকে ‘পাশুপতজ্ঞান’ বলা হয়। এই দার্শনিক অদ্বৈত পাশুপত জ্ঞান লাভের জন্য‌ই শিবভক্তির ও শিব উপাসনা আবশ্যক, এর দ্বারা শিবকৃপা সুলভ হয়। শিবকৃপা হলে ভক্ত পরমেশ্বের শিবের মার্গে অর্থাৎ সনাতন শৈবমার্গের বিষয়ে বিস্তারিত জেনে হৃদয়ে শিবভাব লাভ করে ক্রমশ মহাযোগী হয়ে সেই পরমশিবে লীন হয়ে যান। 

কিন্তু সেই সত্য ও ব্রহ্মবিদ্যা বা আত্মজ্ঞান যাতে জীব পর্যন্ত পৌঁছে যায় তার জন্য পরমেশ্বর নিজেই আচার্য রূপে প্রকটিত হয়ে নিজের শিবস্বরূপ জীবকে চিনিয়ে দেন। এই কারণেই সনাতন ধর্ম সর্বদা গুরুর উপর নির্ভরশীল হতে বলে, প্রথম গুরু স্বয়ং পরমেশ্বর শিব নিজেই, তিনিই নিজের শিবস্বরূপের জ্ঞান তার শিষ্যকে দেন, সেই শিষ্য পরবর্তীতে গুরুরূপে উক্ত পরমজ্ঞান তাঁর শিষ্যকে দেন, সেই শিষ্য তার নিজ শিষ্যকে দেন, এইভাবে পরমেশ্বরের স্বরূপগত সঠিক অভ্রান্ত সত্য জ্ঞান গুরুশিষ্য পরম্পরার মাধ্যমে বাহিত হয়ে সমাজে প্রচলিত হয়েছে। 

  পরমেশ্বর শিবের পঞ্চমুখের মধ্যে প্রথম মুখ ‘সদ্যোজাত’ নামে বিখ্যাত। এই সদ্যোজাত মুখসম্পন্ন প্রভুকে ‘সদ্যোজাত শিব’ বলা হয়। এই মুখ থেকেই শিবের ব্রহ্মারূপ লীলাবশত প্রকট হয়েছে। আবার সেই সদ্যোজাত শিব‌ই ব্রহ্মাকে ‘বেদ’ জ্ঞান প্রদান করেন, প্রকৃত আত্মজ্ঞান প্রদান করেন। ব্রহ্মা বেদ লাভের পর, নিজের মন থেকে মানস পুত্ররূপী ঋষিদের উৎপন্ন করে, তাদের মধ্যে এই বেদ জ্ঞানকে ছড়িয়ে দেন। ঋষিরা সেই বেদ জ্ঞানকে তাদের শিষ্যদের মধ্যে বিতরণ করেন, এভাবেই গুরু শিষ্য পরম্পরার মাধ্যমে আজ এই বর্তমানে পৌঁছেছে। 

পরমেশ্বরের লীলায় অসংখ্য কোটি কোটি লক্ষ লক্ষ অযুত ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি ও নাশ হয়েছে, এখনো হচ্ছে আর চিরকাল এভাবেই চলতে থাকবে। প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি পালন সংহার - এর সময়কাল চতুর্যুগ, মন্বন্তর, কল্প, ব্রাহ্মরাত্রি, মহাযুগ, মহাকল্প ইত্যাদির ওপর বিচার হয়ে থাকে। যার কিছু কিছু বর্ণনা আমাদের পুরাণ ইত্যাদি শাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে। সাধারণত পুরাণ শাস্ত্রে কল্পে কল্পে ঘটে যাওয়া সৃষ্টির বর্ণনা কি বিশদ ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। 

 কোটি কোটি কল্প আরম্ভ হয়েছে এবং কোটি কোটি কল্প অতীত হয়েছে। কিন্তু পুরাণ শাস্ত্র অনুসারে, যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে ব্রহ্মার দিষ রাত্র -এর সময়কালের অন্তর্গত যেসব কল্পের উল্লেখ আছে তার ভিত্তিতে কখনো, শ্বেত কল্প থেকে আরম্ভ হয়, কখনো ভব কল্প থেকে সৃষ্টি আরম্ভ হয়। কিন্তু সর্বত্র প্রায় এক‌ই ঘটনা ঘটে থাকে, কল্পান্তরে কিছুটা ভিন্ন কাহিনী হয় মাত্র, তবে পরিণতি এক‌ই থাকে। তাই শ্বেত কল্প, বারাহ কল্প বা ভব কল্প নামক যে কল্প‌ই হোক না কেন, এখানে সকল কল্পেই ব্রহ্মা পরমেশ্বর শিবের কাছ থেকে বেদ জ্ঞান লাভ করে থাকেন, এটিই স্থির শিবলীলা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, এক্ষেত্রে পরমেশ্বর শিব একজন আচার্যের মতো রূপ ধারণ করে গুরুশিষ্য পরম্পরার সূচনা করেন। এই বিশেষ আচার্য রূপের নাম হল — শ্বেত ; যিনি স্বয়ং ‘সদ্যোজাত শিব’। এই পরমেশ্বর‌ শিবের অবতার শ্রীমান শ্বেত আচার্য‌ই হলেন, সমগ্র সনাতন ধর্মের প্রথম গুরু। ইনিই মহাপাশুপত পরমাদ্বৈত শৈবজ্ঞানের প্রথম প্রকাশ করেছেন এই বিশ্বসংসারের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য। তাই এই গুরুপরম্পরার নাম — ‘মহা-পাশুপত শৈব গুরুপরম্পরা’।

কিন্তু আজ এই কলিযুগের প্রারম্ভ কালে আমাদের সনাতনীদের মধ্যে এই সনাতন ইতিহাসের প্রকৃত সত্য জ্ঞান আবছা হয়ে যাওয়ার কারণে বহু সাম্প্রদায়িক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে, তারা নিজেদের ব্যক্তিগত ধারণাকেই সমাজে ‘সনাতন ধর্মের সিদ্ধান্ত’ বলে দেখাবার ও প্রতিষ্ঠা করবার জন্য বিভিন্ন ভাষ্য বা পুস্তক রচনা করে, কাল্পনিক গুরুপরম্পরার দিব্য কাহিনী আমদানি করে নিজেদের একটি ‘অমুক সম্প্রদায়’ বলে ঘোষণা করেছে, আর তাদের কাছে দীক্ষিত হয়ে শিষ্য সংখ্যার পরিমাণ বৃদ্ধি হয়ে চলেছে, এতে তাদের প্রসার ঘটেছে সনাতন সমাজে। বর্তমানে এমন বহু পরম্পরা সম্প্রদায় দেখা যাচ্ছে যাদের পরম্পরার নাম প্রাচীন শাস্ত্রে উল্লেখিত হয়নি, তাদের মন থেকে উদ্ভূত দর্শন প্রাচীন শাস্ত্রের দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক, শুধু তাই নয় বরং তাদের উক্ত দর্শন পর্যন্ত শাস্ত্রে শব্দপ্রমাণ সহ উল্লেখ নেই। এইভাবে  প্রচুরসংখ্যক সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে, আজ তাদের অপ্রামাণিক অবৈধ সম্প্রদায়‌ই সনাতন ধর্মের প্রকৃত সম্প্রদায় হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে। এতে সত্য মার্গ নির্ণয় করা দূরহ বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে সনাতনীরাই কখনো কখনো বিভ্রান্ত হয়ে দাবি করেন যে সনাতন ধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায় রয়েছে এবং তাদের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে সনাতন ধর্ম সম্পর্কে। আবার কেউ কেউ দাবি করেন, সনাতন ধর্মের যে যে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ বা দার্শনিক মতভেদ আছে, তা সবই গ্রহণযোগ্য। কিন্তু বাস্তবতা হল, আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রে বর্তমান কালের মত কোন হাজার রকমের পরম্পরা ছিল না। বরং শৈব অদ্বৈত - এই একটিমাত্র দর্শন - কে লাভ করবার জন্য বিভিন্ন অন্যান্য দর্শনের উপর নির্ভর করে বা পূজা পদ্ধতি ইত্যাদির কর্মকান্ডকে অনুসরণ করে জ্ঞান লাভ করে অবশেষে অন্তিমে এই অদ্বৈতভাবে উপনীত হওয়ায় একমাত্র লক্ষ্য ছিল সনাতনের, আর সেটি একমাত্র মহাপাশুপত পরম্পরার অন্তর্গত‌ই ছিল। কিন্তু অজ্ঞানতার ফলে মানুষ নিজের ভাবনা চিন্তাকে সর্বোচ্চ হিসেবে ভাবার গোড়ামী তা করতে গিয়ে আজকে সনাতন ধর্মকে বিভিন্ন নব্য সম্প্রদায়ে বিভক্ত করেছে। এই সকল ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ সম্প্রদায়ের মতভেদের অজ্ঞানতাকে দূরীকরণের নিমিত্তে এবং প্রাচীন সনাতন ধর্মের প্রাচীন সেই এক অদ্বিতীয় মার্গে সকল সনাতনীকে নিয়ে একসূত্রে বেঁধে একতার মাধ্যমে সনাতন ধর্মকে শক্তিশালী করবার লক্ষ্যে — সনাতন ধর্মের প্রথম মানব অবয়বে লীলাকারী যিনি সর্বপ্রথম গুরু, সেই শিবাবতার মহর্ষি শ্বেত দেশিক শৈব আচার্যের বিষয়ে এই প্রবন্ধে শাস্ত্রীয় তথ্য উপস্থাপন করা হল। 

__________________________________________________

✳️ প্রাসঙ্গিক কথা : 

৭১টি চতুর্যুগ নিয়ে ১টি মন্বন্তর। প্রত্যেক মন্বন্তরে একটি করে মনুর শাসন কাল থাকে। ১৪ টি মন্বন্তর নিয়ে ১টি কল্প।  

মৎস পুরাণের ২৯০ অধ্যায়ের ৩য় শ্লোকে বলা হয়েছে —

প্রথমঃ শ্বেতকল্পস্তু দ্বিতীয়ো নীললোহিতঃ ।

বামদেবস্তৃতীয়স্তু ততো রাথন্তরোঽপরঃ ॥ ৩ ॥

✅ অর্থ : প্রথমে শ্বেতকল্প, দ্বিতীয় নীললোহিত কল্প, তৃতীয় কল্প বামদেব, চতুর্থ কল্প হল রথন্তর কল্প ॥ ৩ ॥


♦️ এবার দেখুন, লিঙ্গমহাপুরাণের পূর্বভাগের ২২তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে, ব্রহ্মার আয়ু পূর্ণ হয়ে শেষ হবার পর যখন ব্রহ্মার মৃত্যু হয়, তখন শিব‌ই সদ্যোজাতরূপে প্রকট হয়ে নিষ্প্রাণ ব্রহ্মার দেহে পুনরায় প্রাণ দান করেন, তখন সর্ব প্রথম শ্বেতকল্প উপস্থিত হয়। এই শ্বেতকল্পে পরমেশ্বর শিব নিজেই শ্বেতবর্ণের ‘সদ্যোজাত’ নামে প্রকট হয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন — 

সুত উবাচ ।
তস্য তদ্বচনং শ্রুত্বা ব্রহ্মণো ভগবান্ ভবঃ । 
ব্রহ্মরূপী প্রবোধার্থং ব্রহ্মাণং প্রাহ সস্মিতম্ ॥ ১ ॥
শ্বেতকল্পো যদা হ্যাসীদহমেব তদাভবম্ । 
শ্বেতোষ্ণীষঃ শ্বেতমার্ল্যঃ শ্বেতাম্বরধরঃ সিতঃ ॥ ২ ॥

শ্বেতাস্থিঃ শ্বেতরোমা চ শ্বেতাসৃক শ্বেতলোহিতঃ । 
তেন নাম্না চ বিখ্যাতা শ্বেতকল্পস্তদা হ্যসৌ ॥ ৩ ॥
মৎপ্রসূতা চ দেবেশী শ্বেতাঙ্গা শ্বেতলোহিতা । 
শ্বেতবর্ণা তদা হ্যাসীদ্ গায়ত্রী ব্রহ্মসংজ্ঞিতা ॥ ৪ ॥ 
তস্মাদহং চ দেবেশ ত্বয়া গুহ্যেন বৈ পুনঃ । 
বিজ্ঞাতঃ স্বেন তপসা সদ্যোজাতত্বমাগতঃ ॥ ৫ ॥ 
সদ্যোজাতেতি ব্রহ্মৈতদ্ গুহ্যং চৈতৎপ্রকীর্তিতম্ । 
তস্মাদ্ গুহ্যত্বমাপন্নং যে ভেৎস্যন্তি দ্বিজাতয়ঃ ॥ ৬ ॥
[লিঙ্গমহাপুরাণ/পূর্বভাগ/২৩ অধ্যায়/২-৬ শ্লোক]

✅ অর্থ : যখন শ্বেতকল্প ছিল, সেই সময় আমি শ্বেতবর্ণের ছিলাম। আমার শ্বেত পাগড়ি, শ্বেত মালা, শ্বেত বস্ত্র, শ্বেত অস্থি, শ্বেত রোম, শ্বেত ত্বক এবং আমার রুধিরও শ্বেত ছিল। এই কারণেই সেই কল্প ‘শ্বেতকল্প’ নামে বিখ্যাত হয়েছিল ॥ ২–৩ ॥

সেই কল্পে আমার থেকেই উৎপন্ন, ‘ব্রহ্ম’ নামে পরিচিত দেবেশ্বরী গায়ত্রীও শ্বেত অঙ্গবিশিষ্টা, শ্বেত রক্তযুক্তা এবং শ্বেতবর্ণা ছিলেন ॥ ৪ ॥

এরপর, হে দেবেশ ! আপনার উগ্র তপস্যার দ্বারা তুমি সদ্যোজাতত্ব প্রাপ্ত আমাকে, শিবকে জ্ঞাত করেছিলেন ॥ ৫ ॥

আমার এই সদ্যোজাত রূপ গুপ্ত ব্রহ্মরূপে পরিচিত। অতএব, যে দ্বিজগণ সেই গুপ্ততত্ত্ব লাভকারী আমাকে, সদ্যোজাত শিবকে জানতে পারবেন, তাঁরা আমার সান্নিধ্য লাভ করবেন ; সেই স্থান থেকে আর তাঁদের প্রত্যাবর্তন হয় না। অর্থাৎ, তাঁরা জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যান ॥ ৬ ॥

🔶 ব্যাখ্যা —  এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, 

• সর্বপ্রথম কল্পের সৃষ্টিকালেই সদ্যোজাতরূপী শ্বেতবর্ণের শিবকে তপস্যার দ্বারা ব্রহ্মা লাভ করেছিলেন। 

• পরমেশ্বর শিবের এই সদ্যোজাত রূপ শ্বেত বর্ণ সমন্বিত হ‌ওয়ার কারণে এই প্রথম কল্পের নাম শ্বেতকল্প।

• ঐ পরমব্রহ্ম শিবকে জানলেই জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে জীব চিরতরে মুক্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ এই লক্ষণ বেদের‌ই জ্ঞান থেকে উপলব্ধ মোক্ষের লক্ষণ। 

• তাই ব্রহ্মা যে সদ্যোজাত শিবের‌ই দর্শন ও বেদজ্ঞান লাভ করেছিলেন এতে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। এ বিষয়ে প্রমাণ পরবর্তী অংশে দেওয়া হল।

__________________________________________________

✳️ মহর্ষি শ্বেত শৈবাচার্যের কাছ থেকে ব্রহ্মা শিবজ্ঞান লাভ করেন —

বায়ুরুবাচ ।
একোনবিংশতিঃ কল্পো বিজ্ঞেয়ঃ শ্বেতলোহিতঃ । 
তস্মিন্কল্পে চতুর্বক্ত্রঃ স্রষ্টুকামোঽতপত্তপঃ ॥ ৩ ॥
তপসা তেন তীব্রেণ তুষ্টস্তস্য পিতা স্বয়ম্ । 
দিব্যং কৌমারমাস্থায় রূপং রূপবতাং বরঃ ॥ ৪ ॥
শ্বেতো নাম মুনির্ভূত্বা দিব্যাং বাচমুদীরয়ন্ । 
দর্শনং প্রদদৌ তস্মৈ দেবদেবো মহেশ্বরঃ ॥ ৫ ॥
তং দৃষ্ট্বা পিতরং ব্রহ্মা ব্রহ্মণোঽধিপতিং পতিম্ । 
প্রণম্য পরমজ্ঞানং গায়ত্র্যা সহ লব্ধবান্ ॥ ৬ ॥
ততঃ স লব্ধবিজ্ঞানো বিশ্বকর্মা চতুর্মুখঃ । 
অসৃজৎসর্বভূতানি স্থাবরাণি চরাণি চ ॥ ৭ ॥
যতঃ শ্রুত্বাঽমৃতং লব্ধং ব্রহ্মণা পরমেশ্বরাৎ । 
ততস্তদ্বদনাদেব ময়া লব্ধং তপোবলাৎ ॥ ৮ ॥

[শিবমহাপুরাণ/বায়বীয় সংহিতা/পূর্বভাগ/৫ অধ্যায়/৩-৮ শ্লোক]

✅ অর্থ — বায়ুদেবতা বললেন, মহর্ষিগণ! উনিশতম কল্পকে শ্বেতলোহিত কল্প বলে জানবে। সেই কল্পে চতুর্মুখ ব্রহ্মা সৃষ্টির কামনায় তপস্যা করেন। তাঁর সেই তীব্র তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর পিতা স্বয়ং দেবদেব মহেশ্বর তাঁকে দর্শন দেন। তিনি দিব্য কুমারের রূপ ধারণ করে রূপবানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ‘শ্বেত’ নামক মুনি হয়ে দিব্য বাণী উচ্চারণ করতে করতে তাঁর সামনে উপস্থিত হন। বেদাধিপতি এবং সকলের পালকপিতা মহেশ্বরকে দর্শন করে গায়ত্রীসহ ব্রহ্মা তাঁকে প্রণাম করেন এবং তাঁর থেকেই উত্তম জ্ঞান লাভ করেন। জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে বিশ্বকর্মা চতুর্মুখ ব্রহ্মা সম্পূর্ণ চরাচর ভূতাদির সৃষ্টি করতে থাকেন। সাক্ষাৎ পরমেশ্বর শিবের থেকে ব্রহ্মা অমৃত স্বরূপ জ্ঞান লাভ করেছিলেন এবং আমি তপস্যার বলে তাঁরই মুখ থেকে সেই জ্ঞান উপলব্ধ করেছি ॥ ৩–৮ ॥

🔶 ব্যাখ্যা — এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, 

• শ্বেতলোহিত কল্পের ক্ষেত্রেও সর্বপ্রথম সৃষ্টিকালের প্রারম্ভে সদ্যোজাতরূপী শ্বেতবর্ণের শিবকে তপস্যার দ্বারা ব্রহ্মা লাভ করেছিলেন।

• পরমেশ্বর সদ্যোজাত শিব কুমার বয়সী মুনি রূপ ধারণ করে ব্রহ্মার সম্মুখে প্রকট হন, তাঁর নাম ‘শ্বেত’। তিনি দিব্যবানী অর্থাৎ আত্মজ্ঞানের বানী উচ্চারণ করতে করতে প্রকট হয়েছিলেন।

• বায়ুদেবতা বলেছেন, ব্রহ্মার কাছ থেকে তপস্যার মাধ্যমে বায়ুদেব সনাতন জ্ঞান লাভ করেছেন, ব্রহ্মা স্বয়ং পরমেশ্বর শিবের থেকে সেই জ্ঞান লাভ করেছেন। 

• স্বয়ং পরমেশ্বর শিব বেদের অধিপতি, তাই তিনিই শ্বেত !  আচার্যরূপে প্রকট হয়ে পরমজ্ঞান প্রদান করেছেন।

__________________________________________________

 এর‌ই সাথে লিঙ্গমহাপুরাণেও আরো বলা হয়েছে — 

সূত উবাচ ।
একোনত্রিংশকঃ কল্পো বিজ্ঞেয়ঃ শ্বেতলোহিতঃ ॥ ২
তস্মিংস্তৎপরমং ধ্যানং ধ্যাযতো ব্রহ্মণস্তদা। 
উৎপন্নস্তু শিখাযুক্তঃ কুমারঃ শ্বেতলোহিতঃ ॥ ৩
তং দৃষ্ট্বা পুরুষং শ্রীমান্ ব্রহ্মা বৈ বিশ্বতোমুখঃ । 
হৃদি কৃত্বা মহাত্মানং ব্রহ্মরূপিণমীশ্বরম্ ॥ ৪
সদ্যোজাতং ততো ব্রহ্মা ধ্যানযোগপরোহভবৎ । 
ধ্যানযোগাৎপরং জ্ঞাত্বা ববন্দে দেবমীশ্বরম্ ॥ ৫
সদ্যোজাতং ততো ব্রহ্মা ব্রহ্ম বৈ সমচিন্তয়ৎ ।
ততোহস্য পার্শ্বতঃ শ্বেতাঃ প্রাদুর্ভূতা মহায়শাঃ ॥ ৬
সুনন্দো নন্দনশ্চৈব বিশ্বনন্দোপনন্দনৌ ।
শিষ্যাস্তে বৈ মহাত্মানো যৈস্তদ্ ব্রহ্ম সদাবৃতম্ ॥ ৭
তস্যাগ্রে শ্বেতবর্ণাভঃ শ্বেতো নাম মহামুনিঃ । 
বিজ্ঞজ্ঞেহথ মহাতেজাস্তস্মাজ্জজ্ঞে হরস্ত্বসৌ ॥ ৮
তত্র তে মুনযঃ সর্বে সদ্যোজাতং মহেশ্বরম্ । 
প্রপন্নাঃ পরযা ভক্ত্যা ঘৃণন্তো ব্রহ্ম শাশ্বতম্ ॥ ৯
তস্মাদ্বিশ্বেশ্বরং দেবং যে প্রপদ্যন্তি বৈ দ্বিজাঃ । 
প্রাণাযামপরা ভূত্বা ব্রহ্মতৎপরমানসাঃ ॥ ১০
তে সর্বে পাপনির্মুক্তা বিমলা ব্রহ্মবর্চসঃ । 
বিষ্ণুলোকমতিক্রম্য রুদ্রলোকং ব্রজন্তি তে ॥ ১১

[লিঙ্গমহাপুরাণ/পূর্বভাগ/১১ অধ্যায়/২-১১ শ্লোক]

✅ অর্থ : ঊনত্রিশতম কল্প ‘শ্বেতলোহিত’ নামে পরিচিত। সেই কল্পে যখন ব্রহ্মাজী সমাধিস্থ হয়ে পরমেশ্বরের ধ্যান করছিলেন, ঠিক সেই সময় শিখাধারী, শ্বেতলোহিত-বর্ণের এক কুমার আবির্ভূত হলেন ॥ ২–৩ ॥

সেই সদ্যোজাত কুমারকে দর্শন করে সর্বতোমুখ, শ্রীমান্‌ ব্রহ্মা সেই ব্রহ্মস্বরূপ মহাত্মা পরমেশ্বরকে হৃদয়ে ধারণ করে ধ্যানযোগে তৎপর হলেন। পুনরায় ধ্যানযোগের মাধ্যমে তাঁকে সাক্ষাৎ পরমেশ্বররূপে জ্ঞাত হয়ে প্রণাম করলেন। ব্রহ্মা সেই সদ্যোজাত কুমারকেই পরাৎপর ব্রহ্ম বলে কল্পনা করলেন ॥ ৪ ॥

এরপর সেই সদ্যোজাত ব্রহ্মের নিকটেই সুনন্দ, নন্দন, বিশ্বনন্দ এবং উপনন্দন নামে শ্বেতবর্ণের চারজন মহাযশস্বী শিষ্য আবির্ভূত হলেন। সেই মহাত্মা শিষ্যগণ সর্বদা সেই সদ্যোজাত ব্রহ্মের সেবায় নিয়োজিত থাকতেন ॥ ৬–৭ ॥

তাঁদের সম্মুখে শ্বেতবর্ণের আভাযুক্ত ‘শ্বেত’ নামে এক মহাতেজস্বী মুনি আবির্ভূত হলেন। সেই সদ্যোজাতের থেকেই উৎপন্ন হওয়ার কারণে সেই মুনির নাম ‘হর’-ও হয় ॥ ৮ ॥

সেখানে সেই সকল মুনি পরম ভক্তির সঙ্গে শাশ্বত ব্রহ্মস্বরূপ সেই সদ্যোজাত মহেশ্বরের স্তব করতে করতে তাঁর শরণাগত হলেন ॥ ৯ ॥

অতএব, হে দ্বিজগণ ! যে সকল প্রাণী প্রাণায়ামে পরায়ণ হয়ে ব্রহ্মে নিবিষ্ট চিত্তে সেই বিশ্বেশ্বর দেবের শরণাগত হন, তাঁরা সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত, নির্মল আত্মার অধিকারী এবং ব্রহ্মজ্ঞানে জ্ঞানী হয়ে ওঠেন। পরিশেষে তাঁরা বিষ্ণুলোককেও অতিক্রম করে রুদ্রলোকে (শিবলোকে) গমন করেন ॥ ১০–১১ ॥

🔶 ব্যাখ্যা — 

• ব্রহ্মা হৃদয়ে পরমেশ্বর শিবের ধ্যান করলে সদ্যোজাত শিব কুমার বয়সীরূপে প্রকট হন। পূর্বে তিনি শ্বেত নামে অভিহিত হয়েছেন বলে শাস্ত্রবচনে স্বীকৃত হয়েছেন।

• সদ্যোজাত শিবের মুনি অবতার শ্বেত আচার্য নিজের থেকে ‘সুনন্দ, নন্দন, বিশ্বনন্দ, উপনন্দন’ - এই চারজন শিষ্যকে প্রকট করেন। 

• এরপর ‘শ্বেত’ রূপে লীলাকারী সদ্যোজাত শিব‌ই — নিজের দিব্য দেহ থেকে শ্বেত নামে আরেক মহামুনিকে প্রকট করে শিষ্য বানিয়েছেন, ইনিই শ্বেতাশ্বতর নামে বিখ্যাত। সদ্যোজাত থেকেই তার প্রকট হবার কারণে তার নাম‌ও - হর। মূলত গুরুশিষ্যপরম্পরার সূচনা করার জন্য প্রভু শিব‌ই স্বয়ং নিজেই গুরুরূপী শ্বেত হয়েছেন আবার শিষ্যরূপেও শ্বেত নামে বিভক্ত হয়েছেন। এখানে প্রথমজন শ্বেত আচার্য এবং পরবর্তী শ্বেত-হর নামে পরিচিত মুনি ‘শ্বেতাশ্বতর’ নামে বিশেষ ভাবে অভিহিত করা হয়েছে, যাতে চিহ্নিত করতে সুবিধা হয়।

• প্রাণায়াম অভ্যাসরত যে ব্যক্তি ব্রহ্মলাভের ইচ্ছা করে পরমব্রহ্ম পরমেশ্বর শিবের শরণাপন্ন হন তিনি ব্রহ্মজ্ঞানসম্পন্ন হয়ে ওঠেন এবং বিষ্ণুলোককেও অতিক্রম করে শিবলোকে পৌঁছে যান।

__________________________________________________

✳️ লিঙ্গমহাপুরাণের বচনের ন্যায় এই এক‌ই বিষয় উল্লেখ করে বায়ুপুরাণ আরো বলছে —

একোনবিংশকঃ কল্পো বিজ্ঞেয়ঃ শ্বেতলোহিতঃ ।

যস্মিন্ তৎ পরমধ্যানং ধ্যায়তো ব্রহ্মণস্তথা ॥ ৯ ॥

শ্বেতোষ্ণীষঃ শ্বেতমাল্যঃ শ্বেতাম্বরধরঃ শিখী।

উৎপন্নস্তু মহাতেজাঃ কুমারঃ পাবকোপমঃ ॥ ১০ ॥

ভীমং মুখং মহারৌদ্রং সুঘোরং শ্বেতলোহিতম্ ।

দীপ্তং দীপ্তেন বপুষা মহাস্যঃ শ্বেতবর্চ্চসমা ॥ ১১ ॥

তং দৃষ্টা পুরুষঃ শ্রীমানস ব্রহ্মা বৈ বিশ্বতোমুখঃ ।

কুমারং লোকধাতারং বিশ্বরূপং মহেশ্বরম্ ॥ ১২ ॥ 

পুরাণপুরুষং দেবং বিশ্বাত্মা যোগিনাং বরম্ । 

ববন্দে দেবদেবেশং ব্রহ্মা লোকপিতামহঃ ॥ ১৩ ॥

হৃদি কৃত্ব মহাদেবং পরমাত্মানমীশ্বরম । 

সদ্যোজাতং ততো ব্রহ্ম ব্রহ্মা বৈ সমচিন্তয়ৎ ॥ ১৪ ॥

জ্ঞাত্বা মুমোচ দেবেশো হৃষ্টো হাসং জগৎপতিঃ ।

ততোহস্য পার্শ্বতঃ শ্বেতা ঋষয়ো ব্রহ্মবর্চ্চসঃ ॥ ১৫ ॥

প্রাদুর্ভুতা মহাত্মানঃ শ্বেতমাল্যানুলেপনাঃ । 

সুনন্দো নন্দকশ্চৈব বিশ্বনন্দোঽথ নন্দনঃ ॥ ১৬ ॥ 

শিষ্যাস্তে বৈ মহাত্মানো যৈস্তু ব্রহ্ম ততো বৃতম ।

তস্যাগ্রে শ্বেতবর্ণাভঃ শ্বেতনামা মহামুনিঃ ॥ ১৭ ॥

বিজজ্ঞেঽথ মহাতেজা যস্মাজ্জজ্ঞে নরস্ত্বসৌ । 

তত্র তে ঋষয়ঃ সর্বে সদ্যোজাতং মহেশ্বরম ॥ ১৮ ॥

তস্মদ্বিশ্বেশ্বরং দেবং যে প্রপদ্যন্তি বৈ দ্বিজাঃ । 

প্রাণায়ামপরা যুক্তা ব্রহ্মণি ব্যবসায়িনঃ ॥ ১৯ ॥

তে সর্বে পাপনিৰ্ম্মুক্তা বিমলা ব্রহ্মবর্চ্চসঃ । 

ব্রহ্মলোকমতিক্রম্য ব্রহ্মলোকং ব্রজন্তি চ ॥ ২০ ॥

[বায়ুপুরাণ/২২ অধ্যায়/৯-২০ শ্লোক]

✅ অর্থ — উনিশতম কল্প শ্বেতলোহিত কল্প নামে অভিহিত। সেই কল্পে ব্রহ্মা পরম ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ছিলেন। ॥ ৯ ॥

তখন অগ্নির মতো তেজস্বী এক মহাপরাক্রমশালী কুমারের আবির্ভাব হয়। তাঁর শ্বেত পাগড়ি, শ্বেত মালা, শ্বেত বস্ত্র এবং শিখা ছিল। ॥ ১০ ॥

তাঁর মুখ ছিল ভীষণ রুদ্ররূপী। তিনি শ্বেতলোহিতবর্ণ, দীপ্তিমান দেহবিশিষ্ট, বৃহৎ মুখমণ্ডলসম্পন্ন এবং শ্বেত তেজে সমুজ্জ্বল ছিলেন ॥ ১১ ॥

সেই বিশ্বতোমুখ, শ্রীসম্পন্ন ব্রহ্মা তাঁকে দর্শন করলেন। তিনি ছিলেন লোকের স্রষ্টা, বিশ্বরূপধারী মহেশ্বর এবং কুমাররূপে আবির্ভূত ॥ ১২ ॥

তিনি পুরাণপুরুষ, দেবতা, বিশ্বাত্মা এবং যোগীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।* লোকপিতামহ ব্রহ্মা সেই দেবদেবেশ্বরকে প্রণাম করলেন ॥ ১৩ ॥

পরমাত্মা ঈশ্বর ব্রহ্ম মহাদেবের সদ্যোজাতস্বরূপ কে নিজের হৃদয়ে ধারণ করে ব্রহ্মা ধ্যান করলেন ॥ ১৪ ॥

তখন জগৎপতি দেবেশ আনন্দিত হয়ে হাসলেন। এরপর তাঁর পার্শ্ব থেকে শ্বেতবর্ণ, ব্রহ্মতেজে দীপ্ত ঋষিগণ আবির্ভূত হলেন ॥ ১৫ ॥

সেই মহাত্মা ঋষিরা শ্বেতমালা ও শ্বেত চন্দনাদি লেপনে সুশোভিত ছিলেন। তাঁদের নাম সুনন্দ, নন্দক, বিশ্বনন্দ এবং নন্দন ॥ ১৬ ॥

তাঁরা ছিলেন সেই মহাত্মা দেবের শিষ্য, যাঁর দ্বারা ব্রহ্মতত্ত্ব পরিবেষ্টিত হয়েছিল। সেই সদ্যজাত শিবের থেকে অগ্রভাগে শ্বেতবর্ণবিশিষ্ট শ্বেত নামক মহামুনি আবির্ভূত হলেন ॥ ১৭ ॥

যার থেকে সেই মহাতেজস্বী নরাকার ঋষির প্রকট হয়েছিলেন। সেখানে সেই সমস্ত ঋষি সদ্যোজাত মহেশ্বরের শরণ গ্রহণ করলেন ॥ ১৮ ॥

যে ব্রহ্মনিষ্ঠ দ্বিজ ব্যক্তি প্রাণায়ামে রত হয়ে সেই বিশ্বেশ্বর দেবের শরণ গ্রহণ করেন — ॥ ১৯ ॥

তাঁরা সকলেই পাপমুক্ত, নির্মল ও ব্রহ্মতেজে দীপ্ত হন। তাঁরা ব্রহ্মলোক (ব্রহ্মার লোক) অতিক্রম করে ব্রহ্মলোকে (শিবলোকে) গমন করেন ॥ ২০ ॥

🔶 ব্যাখ্যা — এখানে লিঙ্গমহাপুরাণের অনুরূপ কিছু বচনের সাথে আরো কিছু বলা হয়েছে। যেমন, 

• শ্বেত রূপী সদ্যোজাত শিবের — অগ্রভাগ থেকে নরাকার শ্বেত বা শ্বেতাশ্বতর মুনি প্রকট হলেন। 

• প্রাণায়াম অভ্যাসরত যে ব্যক্তি ব্রহ্মলাভের ইচ্ছা করে পরমব্রহ্ম পরমেশ্বর শিবের শরণাপন্ন হন তিনি ব্রহ্মজ্ঞানসম্পন্ন হয়ে ওঠেন এবং ব্রহ্মলোক অর্থাৎ ব্রহ্মার লোককেও অতিক্রম করে পরমব্রহ্ম শিবের প্রকৃত ব্রহ্মলোক অর্থাৎ শিবলোকে পৌঁছে যান।

__________________________________________________

♦️ উপরোক্ত শাস্ত্রবচন থেকে প্রমাণিত হল যে, সৃষ্টির পূর্বেই পরমেশ্বর শিব ‘শ্বেত’ মুনি নামে প্রকট হয়ে জ্ঞান প্রদান করেন, তাই সেই সেই কল্প শ্বেতকল্প নামে পরিচিত। ঐ কল্প অতীত হয়ে বর্তমান কালে যে কল্প চলছে, তা ‘বারাহ বা শ্বেতবারাহ’ কল্প নামে পরিচিত। এই কল্পের ৭ম মন্বন্তরের মধ্যে ১ম যে চতুর্যুগ আরম্ভ হয়েছিল, সেই ১ম চতুর্যুগের মধ্যে দ্বাপর যুগের শেষ কালে ও কলির শুরুর কিছু সময় পূর্বে পরমেশ্বর শিব মর্ত্যে লীলা নিমিত্তে প্রকটিত হবেন ‘শ্বেত’ নামে। তখন তার থেকে শ্বেত (শ্বেতাশ্বতর) নামক এক মুনি সহ আরো তিনজন মহর্ষি প্রকট হবেন। দেখুন এবিষয়ে বিস্তারিতভাবে শিব মহাপুরাণে বলা হয়েছে —

শিব উবাচ ।
সপ্তমে চৈব বারাহে কল্পে মন্বন্তরাভিধে ।
কল্পেশ্বরোঽথ ভগবান্সর্বলোকপ্রকাশনঃ ॥ ২ ॥
মনোবৈবস্বতস্যৈব তে প্রপুত্রো ভবিষ্যতি ।
তদা চতুর্যুগাশ্চৈব তস্মিন্মন্বন্তরে বিধে ॥ ৩ ॥
অনুগ্রহার্থং লোকানাং ব্রাহ্মণানাং হিতায় চ ।
উৎপৎস্যামি বিধে ব্রহ্মন্দ্বাপরাখ্যযুগান্তিকে ॥ ৪ ॥
যুগপ্রবৃত্ত্যা চ তদা তস্মিংশ্চ প্রথমে যুগে ।
দ্বাপরে প্রথমে ব্রহ্মন্যদা ব্যাসঃ স্বয়ংপ্রভুঃ ॥ ৫ ॥
তদাহং ব্রাহ্মণার্থায় কলৌ তস্মিন্যুগান্তিকে ।
ভবিষ্যামি শিবাযুক্তঃ শ্বেতো নাম মহামুনিঃ ॥ ৬ ॥
হিমবচ্ছিখরে রম্যে ছাগলে পর্বতোত্তমে ।
তদা শিষ্যাঃ শিখাযুক্তা ভবিষ্যন্তি বিধে মম ॥ ৭ ॥
শ্বেতঃ শ্বেতশিখশ্চৈব শ্বেতাশ্বঃ শ্বেতলোহিতঃ ।
চত্বারো ধ্যানযোগাত্তে গমিষ্যন্তি পুরং মম ॥ ৮ ॥
ততো ভক্তা ভবিষ্যন্তি জ্ঞাত্বা মাং তত্ত্বতোঽব্যয়ম্ ।
জন্মমৃত্যুজরাহীনাঃ পরব্রহ্মসমাধয়ঃ ॥ ৯ ॥
দ্রষ্টুং শক্যো নরৈর্নাহমৃতে ধ্যানাৎপিতামহ ।
দানধর্মাদিভির্বৎস সাধনৈঃ কর্মহেতুভিঃ ॥ ১০ ॥

[শিবমহাপুরাণ/শতরুদ্র সংহিতা/৪ অধ্যায়/২-১০ শ্লোক]

✅ অর্থ : ব্রহ্মাকে উদ্দেশ্য করে পরমেশ্বর শিব বললেন — 

[শ্বেত] বারাহ কল্পের সপ্তম মন্বন্তরে, সমস্ত লোকের প্রকাশক ভগবান সূর্যদেবের পুত্র বৈবস্বত মনু যখন আপনার প্রপৌত্র হবেন। হে বিধাতা! সেই মন্বন্তরের প্রথম চতুর্যুগ সমূহের আবর্তনের প্রথম দ্বাপর যুগের শেষ ভাগে জগতের মানুষদের অনুগ্রহ করার জন্য এবং ব্রাহ্মণদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে, হে ব্রহ্মন! আমি অবতার রূপে আবির্ভূত হব।

 যুগপ্রবৃত্তির নিয়ম অনুসারে সেই আদি যুগে, হে ব্রহ্মন! [বৈবস্বত মন্বন্তরের] প্রথম দ্বাপর যুগে যখন স্বয়ং ঐশ্বর্যশালী বেদব্যাস আবির্ভূত হবেন ॥ ৫ ॥

তখন আমি (শিব) ব্রহ্মজ্ঞানলাভে ইচ্ছুক ব্রাহ্মণদের (এবং ধর্মের) কল্যাণের জন্য, সেই [দ্বাপর] যুগের শেষে কলিযুগের আগমনকালে, নিজের শক্তি শিবার (পার্বতীর) সাথে যুক্ত হয়ে ‘শ্বেত’ নামক মহামুনি রূপে অবতার গ্রহণ করব ॥ ৬ ॥

হে বিধাতা! হিমালয়ের সুন্দর শিখরে অবস্থিত শ্রেষ্ঠ ‘ছা-গল’ নামক পর্বতে তখন আমার দীক্ষিত (শাখাযুক্ত) শিষ্যেরা আবির্ভূত হবেন ॥ ৭ ॥

শ্বেত, শ্বেতশিখ, শ্বেতাশ্ব এবং শ্বেতলোহিত — এই চারজন ধ্যানযোগপরায়ণ শিষ্য আমার পরম ধামে (শিবলোকে) গমন করবেন ॥ ৮ ॥

তারপর অন্যান্য ভক্তরাও আমাকে তত্ত্বগতভাবে অবিনাশী রূপে জেনে, জন্ম, মৃত্যু ও বার্ধক্য থেকে মুক্ত হয়ে পরব্রহ্মে সমাহিত হবেন ॥ ৯ ॥

হে পিতামহ! হে বৎস! তীব্র ধ্যান ছাড়া মানুষের পক্ষে আমার সাক্ষাৎকার পাওয়া সম্ভব নয়; কেবল দান, ধর্ম আদি বাহ্যিক কর্ম বা সাধনের মাধ্যমে আমাকে দর্শন করা যায় না ॥ ১০ ॥

[শিবমহাপুরাণের উক্ত শ্লোকের অনুরূপ প্রায় এক‌ইরকম বচন লিঙ্গ মহাপুরাণের পূর্বভাগের ২৪ অধ্যায়ের ৮-১৬ শ্লোকে বর্ণিত হয়েছে]

🔶 ব্যাখ্যা —

• সৃষ্টির পূর্বে পিতামহ ব্রহ্মা সৃষ্টির জ্ঞান লাভের জন্য পরমেশ্বর শিবের তপস্যা করলছ, পরমেশ্বর শিব, সদ্যোজাত মুখ হতে শ্বেত নামক কুমার অবতার ধারণ করে, শ্বেত আচার্য হয়ে প্রকট হন। তখন‌ই তাঁর চার শিষ্যের সাথে আরো একজন শিষ্য প্রকট হন, সেই একজনের নাম শ্বেত বা শ্বেতাশ্বতর আচার্য নামে চিহ্নিত। পরবর্তীতে সদ্যোজাত অবতার যোগাচার্য শিব‌ই দ্বাপর যুগের শেষকালে ছা-গল নামক হিমালয় পর্বতের চূড়ায় বা শিখরে অবস্থান করেন, তখন তাঁর পূর্ববর্তী সময়ে প্রকটিত করা শ্বেত (শ্বেতাশ্বতর) নামক শিষ্য, তার‌ই সাথে আরো তিনজন শ্বেতশিখ, শ্বেতশ্ব ও শ্বেতলোহিত নামক শিষ্য প্রকট হয়ে অবস্থান করেন এবং কার্য শেষে শিবলোকে গমন করেন।

__________________________________________________

সদ্যোজাত শিবের অবতার মহর্ষি শ্বেত -এর দ্বারা প্রকটিত যে শিষ্য শ্বেত নামে পরিচিত তিনিই বিখ্যাত শ্বেতাশ্বতর মহর্ষি। তিনি তপস্যার মাধ্যমে ব্রহ্মবিদ্যা অর্থাৎ শিবজ্ঞান লাভ করে ছিলেন। স্বাক্ষাৎ বেদের শ্রুতি প্রমাণ —

তপঃপ্রভাবাদ দেবপ্রসাদাচ্চ ব্রহ্ম হ শ্বেতাশ্বতরোহথ বিদ্বান্ ।

অত্যাশ্রমিড্যঃ পরমং পবিত্রং প্রোবাচ সম্যগৃষিসংঘজুষ্টম্ ॥ ২১  ॥

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৬ অধ্যায়/২১ শ্রুতি]

✅ অর্থ — তপস্যার প্রভাব এবং পরমদেব শিবের প্রসাদে বিদ্বান্ শ্বেতাশ্বতর ব্রহ্মতত্ত্ব (শিবতত্ত্ব) উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি অত্যন্ত প্রশংসনীয়, অত্যাশ্রম নামক বর্ণাশ্রমের ঊর্ধ্বে অবস্থিত পরম পবিত্র সেই ব্রহ্মতত্ত্ব যথাযথভাবে বর্ণনা করেছিলেন, যা ঋষিসমাজের দ্বারা সমাদৃত।

🔶 ব্যাখ্যা —

• এই শ্লোকটি নিশ্চিত করে যে শ্বেতাশ্বতর একজন বিদ্বান্ ঋষি, যিনি তপস্যা ও শিবপ্রসাদে পরম শিবতত্ত্ব উপলব্ধি করে তা প্রচার করেছিলেন।


শ্বেতাশ্বতর যে জ্ঞান লাভ করেছেন শ্বেত নামক সদ্যোজাত শিবের কাছ থেকে, সেই বেদান্ত জ্ঞানই প্রাচীন কাল থেকে প্রচারিত হয়ে আসছে। প্রমাণ - 

বেদান্তে পরমং গুহ্যং পুরাকল্পে প্রচোদিতম্।

নাপ্রশান্তায় দাতব্যং নাপুত্রায়াশিষ্যায় বা পুনঃ ॥ ২২  ॥

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৬ অধ্যায়/২২ শ্রুতি]

✅ অর্থ - বেদান্তে বর্ণিত [শ্বেতাশ্বতরের উপলব্ধি করা] এই পরম গুহ্যতত্ত্ব (শিবজ্ঞান) প্রাচীনকালে প্রচারিত হয়েছিল। যিনি অন্তরে শান্ত নন, তাঁকে এই তত্ত্ব প্রদান করা উচিত নয় ; তদ্রূপ, পুত্র না হলে অথবা শিষ্য না হলে তাঁকেও এই তত্ত্ব পুনরায় প্রদান করা উচিত নয়।

⏺️ সারকথা — শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের বক্তা হলেন মহর্ষি শ্বেতাশ্বতর। তিনি শ্বেত নামধারী পরমেশ্বর সদ্যোজাত শিবের থেকে প্রকটিত পুত্র তথা শিষ্য। তিনি বৈদিক আচার্য। তিনি যে শিবকৃপায় শিবজ্ঞান লাভ করেছেন এবং তা সকল প্রাচীনকালের সকল ঋষিদের তিনিই প্রদান করেছিলেন তা শ্রুতি দ্বারাই প্রমাণিত। 

__________________________________________________

✳️ বেদের বিভিন্ন শাখা রয়েছে, যেমন - শাকল, বাস্কল, তৈত্তিরীয়, শৌনকীয়, মৈত্রায়ণী, ঐতরেয় ইত্যাদি শাখা। এই অনুরূপ শ্বেতাশ্বতর শাখাও বেদের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার প্রমাণ শিবমহাপুরাণের বচনে স্পষ্ট — 

ইত্যাদিশিবসূত্রাণাং বার্তিকৈ কথিতং ময়া ।

জ্ঞানং বন্ধ ইতীদং তু দ্বিতীয়ং সূত্রমীশিতুঃ ॥ ৪৬

জ্ঞানমিত্যাত্মনস্তস্য কিঞ্চিজ্জ্ঞানক্রিয়াত্মকম্ ।

ইত্যাহাদ্যপদেনেশঃ পশুবর্গস্য লক্ষণম্ ॥ ৪৭

এতদ্দ্বয়ং পরাশক্তেঃ প্রথমং স্পন্দতাং গতম্ ।

এতামেব পরাং শক্তিং শ্বেতাশ্বতরশাখিনঃ ॥ ৪৮

স্বাভাবিকী জ্ঞানবলক্রিয়া চেত্যস্তুবন্মুদা ।

জ্ঞানক্রিয়েচ্ছারূপং হি শম্ভোর্দৃষ্টিত্রয়ং বিদুঃ ॥ ৪৯

[শিবমহাপুরাণ/কৈলাস সংহিতা/১৬ অধ্যায়/৪৬-৪৯ শ্লোক]

✅ অর্থ — এই প্রকারে শিবসূত্রের ব্যাখ্যা করলাম । এবার ‘জ্ঞান বন্ধঃ’ এই হল শিবসূত্রের দ্বিতীয় সূত্র ॥ ৪৬

এই সূত্রে পশু(জীব) বর্গদের লক্ষণ বলা হয়েছে । এই সূত্রের আদি পদ ‘জ্ঞান’ শব্দের দ্বারা কিঞ্চিৎ মাত্র জ্ঞান আর ক্রিয়া হ‌ওয়াই জীবের লক্ষণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে । এই জ্ঞান আর ক্রিয়া পরাশক্তির প্রথম স্পন্দন, কৃষ্ণ-যজুর্বেদের শ্বেতাশ্বতর শাখার অধ্যয়নকারী বিদ্বানেরা ‘স্বাভাবিকী জ্ঞানবলক্রিয়া চ’ - এই শ্রুতি দ্বারা এই পরাশক্তির‌ই স্তব করেছেন । পরমেশ্বর শম্ভুর শক্তিকে তিন ধরনের দৃষ্টিতে ‘জ্ঞান, ক্রিয়া ও ইচ্ছারূপ’ হিসেবে এখানে দেখা হয়েছে ॥ ৪৭-৪৯

— এইখানে শিবের স্বাভাবিক শক্তিকে পরাশক্তি বলে বেদের শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের ১ম অধ্যায়ের ৩য় শ্রুতিতে উল্লেখ করা হয়েছে এই কথা তাঁরা বলেন, যারা শ্বেতাশ্বতর শাখার বেদপাঠ কারী।

আবার একই কথা  -  ‘দেবীভাগবত মহাপুরাণ’ বলেছে —

তদা শিবামবিজ্ঞায় দুঃখস্যান্তো ভবিষ্যতি ।

অত এব শ্রুতৌ প্রাহুঃ শ্বেতাশ্বতরশাখিনঃ ॥ ১০

তে ধ্যানযোগানুগতা অপশ্যন্ ।

দেবাত্মশক্তিং স্বগুণৈর্নিগূঢ়াম ॥ ১১

[দেবী ভাগবত মহাপুরাণ/৭ম স্কন্ধ/২৯ অধ্যায়/১০-১১ শ্লোক]

✅ অর্থ — পরমেশ্বর শিবের যে শক্তি (দেবী শিবা) রয়েছে সেই শিবাতত্ত্বের জ্ঞান ছাড়া সংসারের দুঃখভোগের নাশ হয় না । অতএব, এই কারণেই শ্বেতাশ্বতর শাখার অধ্যয়নকারী বিদ্বানব্যক্তিগণ শ্রুতিতে(বেদের শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের অন্তর্গত ১ম অধ্যায়ে) বলেছেন, ধ্যানযোগের অনুগত হয়ে দেখেছিলেন যে, পরমাত্মা পরমশিবের পরাশক্তিই এই জগত উন্মেষের একমাত্র কারণ। দেবীশক্তিই তার তিন গুণের সাহায্যে সেই পরমাত্মা শিবকে যেন এই বিশ্বের কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছে ( তাই মায়ায় আবদ্ধ জীব নিজের আত্মরূপ পরমাত্মা শিব সম্পর্কে জানতে পারে না) ॥ ১১

⏺️ সারকথা — শ্বেতাশ্বতর শাখার অস্তিত্ব বেদে রয়েছে, আর বেদের সেই শাখারই অন্তর্ভুক্ত হল -  শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ, এই উপনিষদ ও সমগ্র শাখার বক্তা হলেন মহর্ষি শ্বেতাশ্বতর, তাই তাঁর নামেই বেদের উক্ত শাখার নাম উল্লেখিত হয়েছে, যার প্রমাণ শিবমহাপুরাণ ও দেবীভাগবত পুরাণ দিয়েছে। অর্থাৎ এই শাখা দ্বারা বেদে একমাত্র শিবই যে পরমেশ্বর - তা প্রমাণিত। আর এর দ্বারা মহর্ষি শ্বেতাশ্বতর যে শৈব আচার্য, সেটিও স্পষ্ট।

__________________________________________________

মহর্ষি শ্বেতাশ্বতর নিঃসন্দেহে শৈব আচার্য ছিলেন, তিনি বেদ ও শৈবাগম সমন্বিত মহাপাশুপত শৈব গুরুপরম্পরার পার্থিব শৈব আচার্য ছিলেন। প্রমাণ দেখুন,

♦️ সৌরপুরাণ থেকে — 

সূত উবাচ ।

যোঽসৌ শিখণ্ডিনঃ পুত্রো ব্রহ্মচর্যাশ্রমে রতঃ ।

অধীত্য বিধিবদ্বেদান্ পরং বৈরাগ্যমাস্থিতঃ ॥ ১৪ ॥

বিচারঃ শ্রেয়সে তস্য কদাচিৎ সমভূদ্দ্বিজাঃ ।

প্রবৃত্তঞ্চ নিবৃত্তঞ্চ কৰ্ম যদ্দ্বিবিধং মতম্ ।

তয়োরাত্যন্তিকী মুক্তিৰ্ম্মম কেন ভবিষ্যতি ॥ ১৫ ॥

ইতি সঞ্চিন্ত্য মনসা জগাম হিমবদ্গিরিম্ ॥ ১৬ ॥

তত্র ধর্মবনং নাম মুনিসিদ্ধৈর্নিষেবিতম । 

অপশ্যদ্‌যোগিভিজুর্ষ্টং মহাদেবকৃতালয়ম্ ॥ ১৭ ॥

যত্র সিদ্ধা মহাত্মানো মরীচ্যাদ্যা মহর্ষয়ঃ।

নারায়ণশ্চ ভগবাংস্তথা চান্যে সুরাসুরাঃ ॥ ১৮

সমারাধ্য মহাদেবং সিদ্ধিং প্রাপ্তা হ্যনেকশঃ ॥ ১৯ ॥

যত্র মন্দাকিনী গঙ্গা রাজতে হ্যঘহারিণী ।

অপশ্যদাশ্রমং তস্যাস্তীরে যোগীন্দ্রসেবিতম্ ॥ ২০ ॥

মন্দাকিনীজলে তত্র স্নাত্বাভ্যর্চ্চ্য মহেশ্বরম্ । 

মহাদেবকথাযুক্তৈঃ স্তুত্বা স বিবিধৈঃ স্তবৈঃ।

ধ্যায়মানঃ ক্ষণং তত্র স্থিতো বিশ্বেশ্বরং শিবম্ ॥ ২১ ॥

শ্বেতাশ্বতরনামানমথাপশ্যন্মহামুনিম্ ।

মহাপাশুপতং শান্তং জীর্ণকৌপীনবাসসমৃ ।

ভস্মোদ্ধূলিতসৰ্বাঙ্গং ত্রিপুণ্ড্ৰতিলকান্বিতম্ ॥ ২২ ॥

অভিবন্দ্য মুনেঃ পাদৌ শিরসা প্রাঞ্জলির্নৃপঃ ।

অব্রবীৎ তং মুনিশ্রেষ্ঠং সৰ্বভূতানুকম্পিনম্ ॥ ২৩ ॥

অদ্য ধন্যঃ কৃতার্থোঽস্মি সফলং জীবিতং মম ৷

তপাংসি সফলান্যেব জাতানি তব দর্শনাৎ ॥ ২৪ ॥

ভবামি তব শিষ্যোঽহং রক্ষ সংসারজাদ্ভয়াৎ ।

যোগ্যতা মম চেদন্তি শিষ্যোঽহং ভবিতুং তব ॥ ২৫ ॥

সোঽনুগৃহ্যাথ পুত্রত্বে রাজানং মুনিপুঙ্গবাঃ ।

কায়য়িত্বা স সন্ন্যাসং দদৌ যোগমনুত্তমম্ ॥ ২৬ ॥

যত্তৎ পাশুপতং যোগমন্ত্যাশ্রমমিতি শ্রুতম্।

গুহ্যং তৎ সর্ববেদেষু বেদবিদ্ভিরনুষ্ঠিতম্ ॥ ২৭ ॥

অনুগ্রহান্মুনেস্তস্য সোঽপি পাশুপতোঽভবৎ । 

বেদাভ্যাসরতঃ শান্তো ভস্মনিষ্ঠো জিতেন্দ্রিয়ঃ ।

সন্ন্যাসবিধিমাশ্রিত্য সুশীলো মুক্তিমান্ ভবেৎ ॥ ২৮ ॥

(সৌরপুরাণ/২৭ অধ্যায়/১৪-২৮ শ্লোক)

✅ অর্থ — সূত বললেন, ঐ যে শিখণ্ডীর পুত্র, উনি ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বনপূর্বক যথাবিধি বেদ অধ্যয়ন করে এরপরে বৈরাগ্যে আস্থাবান হলেন। হে দ্বিজগণ ! কোন সময়ে তার শ্রেয়বিচার মনে উপস্থিত হয়। “প্রবৃত্ত-নিবৃত্ত” নামক যে দুইপ্রকারের কৰ্ম আছে, সেসবের থেকে ঊর্ধ্বে যে মুক্তি আছে, সেই মুক্তি আমার হবে কিভাবে  ? — মনে মনে এই চিন্তা করে রাজা হিমালয়পর্বতে মুনিসিদ্ধ-সেবিত ধৰ্মবনে গেলেন। ধর্মবনে ঋষি- সেবিত শিবালয় দেখতে পেলেন ; সেখানে মরীচি প্রভৃতি মহর্ষিগণ, সিদ্ধগণ, ভগবান নারায়ণ হরি এবং অন্য দেবদানবেরা অনেকেই শিবারাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছেন ॥ ৭-১৯ ॥

সেখানে পাপহারিণী মন্দাকিনী গঙ্গা বিরাজমানা ; গঙ্গাতীরে যোগীন্দ্র-সেবিত এক আশ্রম দর্শন করলেন। রাজা সেখানে মন্দাকিনী-জলে স্নান, শিবপূজা এবং শিবকথাযুক্ত বিবিধ স্তোত্র দ্বারা শিবস্তব করে বিশ্বেশ্বর শিবকে ধ্যান করতে থেকে ক্ষণকাল সেখানে থাকলেন। অনন্তর তিনি মহাপাশুপত, শান্ত, জীর্ণ- কৌপীন-পরিধান, তার অঙ্গের সর্বত্র ভস্মে আবৃত , ত্রিপুণ্ড্রধারী, শ্বেতাশ্বতর নামক মহামুনিকে দেখতে পেলেন ।

রাজা, মুনির চরণযুগল বন্দন করে, সর্ব্বভূতে দয়ালু সেই মুনিকে কৃতাঞ্জলিপুটে বললেন, আজ আমি ধন্য ও কৃতার্থ হলাম, আমার জীবন সার্থক হল; আপনার দর্শনহেতু তপস্যাও সফল হল। আপনার শিষ্য হবার যদি আমার যোগ্যতা থাকে তাহলে আমাকে আপনার শিষ্য করুন, আমাকে সংসারভীতি হতে বিমুক্ত করুন। হে মুনি- বরগণ!  শ্বেতাশ্বতর, রাজাকে পুত্রের মতো দৃষ্টিতে দেখে অনুগ্রহ প্রদর্শন করে সন্ন্যাস আশ্রম অবলম্বন করিয়ে সেই অত্যুত্তম যোগ প্রদান করিলেন,  যা অন্ত্যাশ্রম(অতিবর্ণাশ্রম/শিবাশ্রম) লভ্য এবং পাশুপত নামে অভিহিত। সেই যোগ সর্ব্ববেদের গুহ্য বিষয়, কিন্তু বেদজ্ঞগণের দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়। মুনি শ্বেতাশ্বতরের অনুগ্রহে রাজা সুশীলও পাশুপত হইলেন। তিনি বেদাভ্যাসনিরত, ভস্মনিষ্ঠ ও জিতেন্দ্রিয় হয়ে সন্ন্যাস-বিধি আশ্রয় করবার কারণে মুক্তিলাভ করলেন ॥ ২০-২৯ ॥


♦️ আরো দেখুন, এই এক‌ই ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, 

কূর্ম পুরাণ থেকে — 

মন্দাকিনীজলে স্নাত্বা সন্তর্প্য পিতৃ-দেবতাঃ ।

অর্চ্চয়িত্বা মহাদেবং পুষ্পৈঃ পদ্মোৎপলাদিভিঃ ॥ ২৮ ॥

ধ্যাত্বার্কসংস্থং ঈশানং শিরস্যাধায় চ অঞ্জলিম্ । 

সম্প্রেক্ষমাণো ভাস্বন্তং তুষ্টাব পরমেশ্বরম্ ॥ ২৯ ॥

রুদ্রাধ্যায়েন গিরিশং রুদ্রস্য চরিতেন চ ।

অন্যৈশ্চ বিবিধৈঃ স্তোত্রৈঃ শাম্ভবৈর্বেদসম্ভবৈঃ ॥ ৩০ ॥

অথাস্মিন্নন্তরেহপশ্যৎ সমায়ান্তং মহামুনিম্ ।

শ্বেতাশ্বতরনামানং মহাপাশুপত উত্তমম্ ॥ ৩১ ॥

ভস্মসন্দিগ্ধসর্বাঙ্গং কৌপীনাচ্ছাদনান্বিতম্ ।

তপসা কর্শিতাত্মানং শুক্লযজ্ঞোপবীতিনম্ ॥ ৩২ ॥

সমাপ্য সংস্তবং শন্ডোরানন্দাস্রাবিলেক্ষণঃ ।

ববন্দে শিরসা পাদৌ প্রাঞ্জলির্বাক্যমব্রবীৎ ॥ ৩৩ ॥

ধন্যোহস্ম্যনুগৃহীতোহস্মি যন্মে সাক্ষান্মুনীশ্বরঃ । 

যোগীশ্বরোহদ্য ভগবান্ দৃষ্টো যোগবিদাংবরঃ ॥ ৩৪ ॥

অহো মে সুমহদ্ভাগ্যং তপাংসি সফলানি মে ।

কিং করিষ্যামি শিষ্যোহহং তব মাং পালয়ানঘ ॥ ৩৫ ॥ 

সোহনুগৃহ্যাথ রাজানং সুশীলং শীলসংযুতম্ ।

শিষ্যত্বে প্রতিজগ্রাহ তপসা ক্ষীণকল্মষম্ ॥ ৩৬ ॥

সান্ন্যাসিকং বিধিং কৃৎস্নং কারয়িত্বা বিচক্ষণঃ।

দদৌ তদৈশ্বরং জ্ঞানং স্বশাখাবিহিতব্রতম্ ॥ ৩৭

অশেষং বেদসারং তৎ পশুপাশবিমোচনম্ ।

অন্ত্যাশ্রমমিতি খ্যাতং ব্রহ্মাদিভিরনুষ্ঠিতম্ ॥ ৩৮ ॥

উবাচ শিষ্যান্ সম্প্রেক্ষ্য যে তদাশ্রমবাসিনঃ ।

ব্রাহ্মণাঃ ক্ষত্রিয়া বৈশ্যা ব্রহ্মচর্য্যপরায়ণাঃ ॥ ৩৯ ॥

ময়া প্রবর্ত্তিতাং শাখামধীত্যৈবেহ যোগিনঃ ।

সমাসতে মহাদেবং ধ্যায়ন্তো নিষ্কলং শিবম্ ॥ ৪০

ইহ দেবো মহাদেবো রমমাণঃ সহোময়া ।

অধ্যাস্তে ভগবানী শো ভক্তানামনুকম্পয়া ॥ ৪১ ॥ 

ইহাশেষজগদ্ধাতা পুরা নারায়ণঃ স্বয়ম্ ।

আরাধয়ন্ মহাদেবং লোকানং হিতকাম্যয়া ॥ ৪২ ॥

ইহ তং দেবং ঈশানং দেবানামপি দৈবতম্ ।

আরাধ্য মহতীং সিদ্ধিং লেভিরে দেব দানবাঃ ॥ ৪৩ ॥

ইহৈব মুনয়ঃ সর্বে মরীচ্যাদ্যা মহেশ্বরম্ ।

দৃষ্টা তপোবলাজ জ্ঞানং লেভিরে সার্বকালিকম্ ॥ ৪৪ ॥

তস্মাৎ ত্বমপি রাজেন্দ্র তপোযোগসমন্বিতঃ ।

তিষ্ঠ নিত্যং ময়া সার্দ্ধং ততঃ সিদ্ধিমবাপ্স্যসি ॥ ৪৫ ॥

এবমাভাষ্য বিপ্রেন্দ্রো দেবং ধ্যাত্বা পিনাকিনম্ ।

আচচক্ষে মহামন্ত্রং যথাবৎ সর্বসিদ্ধয়ে ॥ ৪৬ ॥

সর্বপাপোপশমনং বেদসারং বিশুদ্ধিদম্ !

অগ্নিরিত্যাদিকং পুণ্যমৃষিভিঃ সম্প্রবর্তিতম্ ॥‌ ৪৭ ॥

সোহপি তদ্বচনাদ্রাজা সুশীলঃ শ্রদ্ধয়াবিতঃ ।

সাক্ষাৎ পাশুপতো ভূত্বা বেদাভ্যাসরতোহভবৎ ॥ ৪৮ ॥

ভস্মোদ্ধুলিতসর্বাঙ্গঃ কন্দ-মূলফলাশনঃ। 

শান্তো দন্তো জিতক্রোধঃ সন্ন্যাসবিধিমাশ্রিতঃ ॥ ৪৯ ॥

[নবভারত প্রকাশিত ‘কূর্মমহাপুরাণ/পূর্বভাগ/১৪ অধ্যায়/২৮-৪৯ শ্লোক’ (অথবা গীতাপ্রেসের হিন্দি ভাষায় প্রকাশিত ‘কূর্মপুরাণ/পূর্বভাগ/১৩ তম অধ্যায়/২৮-৪৯ নং শ্লোক’)]

✅ অর্থ — মন্দাকিনীজলে স্নান, পিতৃ ও দেবতাদের উদ্দেশ্যে তর্পণ এবং পদ্মোৎপলাদি পুষ্পদ্বারা মহাদেবের অর্চ্চনা করলেন এবং মস্তকে অঞ্জলি বন্ধনপূর্ব্বক অর্কসংস্থ ঈশানকে ধ্যান করে অতি তেজোময় পরমেশ্বরকে দর্শন করে স্তব করতে লাগলেন। তিনি রুদ্রাধ্যায়(বেদের শতরুদ্রিয়), রুদ্রচরিত ও অন্যান্য বিভিন্ন বেদ- সম্ভব শাম্ভব স্তোত্রদ্বারা গিরিশের স্তব করলেন । এই সময়ে তিনি দেখলেন যে, মহাপাশুপত, ভস্ম দ্বারা আচ্ছাদিত দেহধারী, কৌপীনধারী, তপস্যা দ্বারা কৃশতনু, শুক্ল যজ্ঞোপবীতধারী শ্বেতাশ্বতর নামের মহামুনি আসছেন। সুশীল শম্ভুর স্তব সমাপন করে আনন্দের অশ্রুপরিপূরিত চোখে নিজের মস্তক দ্বারা মহামুনির চরণযুগল বন্দনা করলেন এবং হাতজোড় করে বললেন, – এখন আমি ধন্য ও অনুগৃহীত হলাম। যেহেতু যোগবিদ গণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভগবান্ যোগীশ্বরকে সাক্ষাৎ দর্শন করলাম। অহো আমার কি পরম সৌভাগ্য। আমার তপস্যা সফল হয়ে গেল। আমি আপনার শিষ্য, কি করবো আমি ? অনুমতি করুন। হে অনঘ! আমাকে রক্ষা করুন। 

অনন্তর শ্বেতাশ্বতর মুনি তপস্যা দ্বারা নিষ্পাপ ও সচ্চরিত্র রাজার প্রতি অনুগ্রহ করে তাকে নিজের শিষ্য বলে স্বীকার করলেন। বিচক্ষণ মুনি সমস্ত সান্ন্যাসিক বিধির অনুষ্ঠান করিয়ে ঐশ্বর জ্ঞান ও স্বশাখাবিহিত (নিজের শ্বেতাশ্বতর শাখার) ব্রত প্রদান করলেন। ঐ জ্ঞান অসীম, বেদের সারভূত ও পশুপাশবিমোচক এবং ঐ ব্রত ব্রহ্মবাদিগণের দ্বারা অনুষ্ঠিত অন্ত্যাশ্রম(অত্যাশ্রম/অতিবর্ণাশ্রম) নামে বিখ্যাত। পরে তিনি তদাশ্রমবাসী ব্রহ্মচর্য্য পরায়ণ ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য আদি শিষ্যদের প্রতি তাকিয়ে মহর্ষি শ্বেতাশ্বতর বললেন,— এই যোগীগণ আমার প্রবর্তিত শ্বেতাশ্বতর শাখা অধ্যায়ন করে নিষ্কল মহাদেব শিবের ধ্যান করবার জন্য এই স্থানে স্থিত আছেন। 

 ভগবান দেবাদিদেব মহাদেব ভক্তগণের কামনা অনুকম্পা হেতু উমার সহিত ক্রীড়া করবার জন্য এই স্থানে অবস্থান করে থাকেন। সমস্ত লোকের বিধাতা স্বয়ং নারায়ণ লোকসমূহের হিতকামনায় পূর্বকালে এই স্থানে পরমেশ্বর মহাদেবের আরাধনা করেছিলেন। দেবতাদের‌ও দেবতা দেব ঈশানকে এই স্থানেই আরাধনা করে দেব-দানবগণ মহতী সিদ্ধিলাভ করেছেন। এই স্থানে মরীচ্যাদি মুনিগণ তপোবলপ্রভাবে মহেশ্বরকে দর্শন করে সার্বকালিক জ্ঞান লাভ করেছেন। হে রাজেন্দ্র! সেইজন্য তুমি তপোযোগে-সমন্বিত হয়ে আমার সহিত এই স্থানে এখন সর্বদা অবস্থান করো ; তবেই সিদ্ধিলাভ করতে পারবে। বিপ্রশ্রেষ্ঠ মুনি এভাবে বলে পিনাকী মহাদেবের ধ্যান করে সর্বসিদ্ধির জন্য যথাবিধি সর্বপাপনাশক, বেদসার, বিমুক্তিপ্রদ, ঋষিগণের দ্বারা সংপ্রবর্তিত, পুণ্যজনক, “অগ্নিরিতি” ইত্যাদি মহামন্ত্র উপদেশ করলেন। রাজা সুশীলও এগুলি মুনিবচন হবার কারণে সেই বচনের প্রতি শ্রদ্ধাযুক্ত ও সাক্ষাৎ পাশুপত হয়ে বেদ অভ্যাসে রত হলেন। তিনি সন্ন্যাসবিধি অবলম্বনপূর্বক সর্ব অঙ্গে ভস্মে ভূষিত করে কন্দ-মূল ফলাশী, শান্ত, দান্ত ও জিতক্রোধ হয়েছিলেন ॥ ২৮-৪৯ ॥


🔶 ব্যাখ্যা —

• শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ তথা শ্বেতাশ্বতর শাখার যিনি স্থাপক সেই মহর্ষি শ্বেতাশ্বতর নিজের দেহের সর্বত্র ভস্ম ও ত্রিপুণ্ড্র ধারণ করেন, তিনি শৈব মহাপাশুপত পরম্পরাভুক্ত ছিলেন, তার নিজের বৈদিক শাখার নাম শ্বেতাশ্বতর শাখা, তার অন্তর্গত ই হল এই শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ , এই পরম্পরার ব্রত হল - পাশুপতব্রত । তার পরম্পরায় ‘অগ্নিরিতি ভস্ম বায়ুরিতি ভস্ম’ নামক অথর্ব-শির উপনিষদের বেদোক্ত মন্ত্রটি পাঠ করে ভস্ম ধারণ করা হয় । যারা এই পাশুপত পরম্পরাভুক্ত হন তিনি অন্ত্যাশ্রমী/অত্যাশ্রমী/ শিবাশ্রমী/অতিবর্ণাশ্রমী বলে কথিত । তারা সকলেই পরমেশ্বর শিবের ধ্যান করেন। তারা যে স্থানে থেকে শিব আরাধনা করেন সেখানেই মানুষ, দৈত্য-দানব, দেবতারা এমনকি শ্রীহরি নারায়ণ‌ও শিব আরাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছেন।

একথা সৌরপুরাণ ও কূর্মপুরাণ উভয় শাস্ত্র ই তা  স্পষ্টভাবে জানিয়েছে ।

• মহর্ষি শ্বেতাশ্বতর সম্পূর্ণ ভাবে শৈবাচারী, মহাপাশুপত পরম্পরাভুক্ত। অর্থাৎ মহর্ষি শ্বেত শৈবাচার্যের শিষ্য শ্বেতাশ্বতর‌ও শৈব আচার্য। 

__________________________________________________

এবার দেখুন, শিবমহাপুরাণে, শ্বেত আচার্য থেকে নকুলীশ/লকুলীশ আচার্য পর্যন্ত উল্লেখ করে মহাপাশুপত শৈব গুরুপরম্পরা তথা সনাতন ধর্মের একমাত্র প্রামাণিক আচার্য/গুরুপরম্পরার উল্লেখ রয়েছে।

♦️ শ্রী শিবমহাপুরাণ থেকে প্রমাণ — 

শ্বেতাদ্যা নকুলীশান্তাঃ সশিষ্যাশ্চাপি দেশিকাঃ ।

তৎ সন্ততীয়া গুরবো বিশেষাদ্ গুরবো মম ॥ ১৬৮ ॥

শৈবা মাহেশ্বরাশ্চৈব জ্ঞানকর্মপরায়ণাঃ ।

কর্মেদমনুমন্যন্তাং সফলং সাধ্বনুষ্ঠিতম্ ॥ ১৬৯ ॥

(শিবমহাপুরাণ/বায়বীয় সংহিতা/উত্তর খণ্ড/৩১ অধ্যায়/১৬৮-১৬৯ শ্লোক)

✅ অর্থ — শ্বেত থেকে নকুলীশ পর্যন্ত, শিষ্য-সহ দেশিক আচার্যগণ, তাঁদের সন্তান পরম্পরায় উৎপন্ন গুরুজন, বিশেষতঃ আমার গুরু, যারা শৈব মাহেশ্বর মার্গী, যাঁরা জ্ঞান ও কর্মে তৎপর থাকেন, তাঁরা যেন আমার এই কর্মকে সফল ও সুসম্পন্ন বলে মানেন ॥ ১৬৮-১৬৯ ॥


🔲 সারকথা : শিবমহাপুরাণ সরাসরি শৈবপরম্পরার আচার্য হিসেবে শ্বেতাশ্বতরাচার্য থেকে শুরু করে নকুলীশাচার্য পর্যন্ত উল্লেখ করে দিয়েছে । 

__________________________________________________

🔥 সিদ্ধান্ত — সদ্যোজাত শিবের যোগাবতার ‘মহর্ষি শ্বেত’ হলেন — সনাতন ধর্মের সর্বপ্রথম আচার্য গুরুদেব। তিনি মহাপাশুপত শৈব গুরুপরম্পরার শৈব আচার্য। এই পরম্পরার আচার্যপরম্পরা সম্পূর্ণভাবে শাস্ত্রে উল্লেখিত হ‌ওয়ার কারণে, এটিই একমাত্র ও অদ্বিতীয় শাস্ত্রীয় প্রামাণিক সনাতন গুরুপরম্পরা। সকল শৈব পরম্পরা এই মহা-পাশুপত গুরুপরম্পরার থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে।

সনাতন ধর্মের একমাত্র অদ্বিতীয় প্রাচীন গুরুপরম্পরা মহাপাশুপত শৈব পরম্পরায় স্বয়ং পরমেশ্বর শিব মহর্ষি শ্বেত শৈব যোগাচার্য রূপে অবতীর্ণ হয়ে মোক্ষের মার্গ প্রশস্ত করেছিলেন। সকল সনাতনী ‘মহর্ষি শ্বেত’ শৈবাচার্যের কাছে কৃতজ্ঞ। ভগবান শ্বেত শৈবগুরুদেবের শ্রীচরণে শতসহস্রলক্ষকোটীসংখ্যক প্রণাম জানাই। শ্বেতাশ্বতর শৈব আচার্যের চরণের শতকোটি প্রণাম জানাই।

__________________________________________________

[বিশেষ দ্রষ্টব্য : শিবালয় প্রতিষ্ঠানের গুরুপরম্পরা অবধূত শৈবপরম্পরার মহাযোগী শ্রীমৎ স্বামী দয়ানন্দ অবধূত শৈবাচার্য গুরুদেব হিমালয়ে বিচরণ কালে অদৃশ্য পাশুপতযোগী শিবগুরুস্বামীজীর কাছে মহাপাশুপত বিরজাদীক্ষা প্রাপ্ত করে কৈলাসে গিয়ে দীর্ঘকাল যাবৎ শিবযোগ অবলম্বন করে তপস্যা করার পর  - মহাপাশুপতাচার্য শ্রীলকুলীশ শৈবগুরুদেবের শিষ্য শ্রীকৌরুষ্য বা রুরু শৈবাচার্যের দর্শন লাভ করেন, বাংলাদেশের সুগন্ধা সতীপীঠে এই বিষয়ে উল্লেখ আছে, যা অবধূত পরম্পরাকে শৈব মহাপাশুপত গুরুপরম্পরার‌ই ধারা হিসেবে প্রামাণিকতা জনসমক্ষে জ্বলজ্যান্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ দিচ্ছে আজ‌ও। শ্রীলকুলীশ শৈবগুরুদেব হলেন মহাপাশুপত শৈব গুরু পরম্পরার শেষতম শিবযোগাবতার। আর এই গুরু পরম্পরার সূত্রপাত হয়েছে সাক্ষাৎ সদ্যোজাত শিবের অবতার ‘মহর্ষি শ্বেত’ যোগাচার্যের মাধ্যমে।]

__________________________________________
🚩 তথ্য সংগ্রহ ও লেখনীতে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীপাদযুক্ত শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব 🚩
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥

পরমেশ্বর শিবের জয়🙏
শিবাবতার যোগাচার্য মহর্ষি শ্বেত শৈবাচার্যের জয় 🙏
মহাপাশুপত শৈব সনাতন গুরুপরম্পরার জয় 🙏

সকল শৈবগুরুর জয় 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩

পরমেশ্বর শিবের ও সনাতন শৈবধর্মের বিষয়ে এমন গুহ্য সত্য রহস্য ও সত্য উন্মোচনমূলক লেখা আরো পেতে অবশ্য‌ই আমাদের Shivalaya ফেসবুক পেজ Follow করে Favourite করে রাখুন। এই তথ্য দ্বারা যদি আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি হয়ে থাকে তবে অবশ্য‌ই এই লেখাটি শেয়ার করুন, যাতে সত্য প্রকাশ্যে আসে।

#সনাতনধর্ম #শিবালয় #shiva #শিব #পরমেশ্বরশিব #ভগবান #অগস্ত্য #শৈবাচার্য #মহাপাশুপত #শৈবপরম্পরা #লোপামুদ্রা #শিবমহাপুরাণ  #Shivalaya #শৈবধর্ম #শিবশাসন #স্কন্দমহাপুরাণ #কাশীখণ্ড


[এই পোস্টটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত।এখানে ব্যবহৃত চিত্রটি কেবল বিষয়টি সহজে উপস্থাপনের জন্য Ai-সহায়তায় নির্মিত একটি প্রতীকী চিত্র, এই ছবিটির মধ্যে কিছু লেখা আলাদা ভাবে লেখা হয়েছে। সকল শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতি ও তথ্য যথাসম্ভব মূল গ্রন্থ অনুসারে ছবি উপস্থাপিত হয়েছে।]






মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ