‘রথন্তর’ বৈদিক শিবমন্ত্র

 



🕉️ ‘রথন্তর’ বৈদিক শিবমন্ত্র

__________________________________________________

🔰 ভূমিকা — সামবেদে ‘রথন্তর’ (Rathantara) নামক অত্যন্ত বিখ্যাত এবং অত্যন্ত পবিত্র একটি সাম-গান বা সুক্ত রয়েছে। বৈদিক যজ্ঞে (বিশেষ করে সোমযজ্ঞে) যে দুটি সাম-গানকে সবচেয়ে প্রধান ও শক্তিশালী মনে করা হয়, তার একটি হলো বৃহৎ সাম এবং অন্যটি হলো রথন্তর সাম। ‘রথন্তর’ নামক বেদ মন্ত্রটি পরমেশ্বর শিবের উদ্দেশ্যে পাঠ করা হয়ে থাকে, এমনটা মহাভারত আদি ইতিহাস-পুরাণশাস্ত্র সমূহে বর্ণিত হয়েছে।

__________________________________________________

✳️ রথন্তর বৈদিক শিবমন্ত্রের তথ্যসূত্র —

রথন্তর সাম-গানটি মূলত ঋগ্বেদের একটি মন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে গাওয়া হয়। সামবেদের পূর্বার্চিক অংশের ঐন্দ্র কাণ্ডে এটি অন্তর্ভুক্ত।

⏺️ তথ্যসূত্র : সামবেদ সংহিতা/কৌথুম শাখা/পূর্বার্চিক/ঐন্দ্র পর্ব/অধ্যায় ৩ (তৃতীয় প্রপাঠক)/দশতি ৪/মন্ত্র ১ (অথবা সূক্ত ২৩৩)। (উল্লেখ্য, এটি ঋগ্বেদের শাকল শাখার ৭ম মণ্ডলের ৩২তম সূক্তের ২২তম মন্ত্র এবং শুক্ল যজুর্বেদের বাজসনেয়ী সংহিতার ২৭তম অধ্যায়ের ৩৫তম মন্ত্র -এ উল্লেখিত।)

এই মন্ত্রের —

ঋষি : মৈত্রাবরুণণির্বসিষ্টঃ, 

দেবতা : ইন্দ্র (পরমেশ্বর শিব), 

ছন্দস্ : প্রগাথঃ

__________________________________________________

🕉️ রথন্তর বৈদিক শিবমন্ত্র


♦️ মূল দেবনাগরী অক্ষরে মন্ত্র (সস্বর সহিত) :
अ॒भि त्वा॑ शूर नो नु॒मोऽदु॑ग्धा इव धे॒नव॑: ।
ईशा॑नम॒स्य जग॑तः स्व॒र्दृश॒मीशा॑नमिन्द्र त॒स्थुष॑: ॥
🔶 বাংলা অক্ষর হরফে মন্ত্র (সস্বর পাঠ) :
অ॒ভি ত্বা॑ শূর নো নু॒মোঽদু॑গ্ধা ইব ধে॒নবঃ॑ । 

ঈশা॑নম॒স্য জগ॑তঃ স্ব॒র্দৃশ॒মীশা॑নমিন্দ্র ত॒স্থুষঃ॑ ॥
🔷 বাংলা অক্ষর হরফে মন্ত্র (নিস্বর পাঠ) :
অভি ত্বা শূর নোনুমোঽদুগ্ধা ইব ধেনবঃ ।
ঈশানমস্য জগতঃ স্বর্দৃশমীশানমিন্দ্র তস্থুষঃ ॥
✅ মন্ত্রের অর্থ : হে বীর ও তেজস্বী ইন্দ্ররূপধারী ঈশান ! (সকলের শাসক পরমেশ্বর শিব!) দুগ্ধপূর্ণ গাভী যেমন নিজের বাছুরের জন্য আকুল হয়ে ডাকে, আমরাও তেমনই ব্যাকুল চিত্তে আপনার স্ততি করছি। আপনি এই চলমান ও স্থাবর সমগ্র জগতের একমাত্র ঈশ্বর ও সর্বদ্রষ্টা রক্ষাকর্তা।

__________________________________________________

♦️ কেন একে 'রথন্তর' বলা হয় এবং এর গুরুত্ব কি ?

🔸 উত্তর —

সামবেদের গানের সুর বা পদ্ধতিকে বলা হয় 'সাম'। যখন উপরোক্ত মন্ত্রটিকে একটি বিশেষ সুরে যজ্ঞের সময় উদগাতা (সামবেদের পুরোহিত) গান করেন, তখন সেই সুর ও পদ্ধতির নাম হয় "রথন্তর সাম"। 'রথন্তর' শব্দের আক্ষরিক অর্থ — যা রথকে বা গতিকে অতিক্রম করতে পারে বা চালিত করতে পারে। 

ঐতরেয় ব্রাহ্মণ/৫/৩০ - অনুসারে : শাস্ত্রে বলা হয়েছে, সৃষ্টির শুরুতে 'বৃহৎ' এবং 'রথন্তর' এই দুটি সাম ছিল মন এবং বাক (কথা)-এর স্বরূপ। রথন্তর হলো 'বাক' বা বাণী এবং বৃহৎ হলো 'মন'। রথন্তর সামের মাধ্যমে এই পৃথিবী স্বর্গের সাথে যুক্ত হয়। 

তৈত্তিরীয় সংহিতা (কৃষ্ণ যজুর্বেদ): যজুর্বেদের যজ্ঞের মন্ত্রেও এই রথন্তরের স্তুতি করে বলা হয়েছে — "বৃহদ্রথন্তরে চ মে" অর্থাৎ যজ্ঞে যেন বৃহৎ এবং রথন্তর সাম আমার সহায় হয়। 

সুরক্ষা কবচ: সনাতন ঐতিহ্যে রথন্তর সামকে এক প্রকার আধ্যাত্মিক কবচ বা আত্মরক্ষার বৈদিক শিবমন্ত্র হিসেবেও গণ্য করা হয়।

__________________________________________________

🔶 মহাভারতে পরমেশ্বর শিব নিজেই বলেছেন যে সামবেদীয় বেদপাঠী বেদজ্ঞ ব্যক্তিগণ ‘রথন্তর’ নামক সামগান করে থাকেন — 

মামধ্বরে শংসিতারঃ স্তুবন্তি রথন্তরং সামগাশ্চোপগান্তি। 

মাং ব্রাহ্মণা ব্রহ্মবিদো যজন্তে মমাধ্বর্য্যবঃ কল্পয়ন্তে চ ভাগম্ ॥ ২৬ ॥

[মহাভারত/শান্তিপর্ব/২৭৬ অধ্যায়/২৬ শ্লোক]

✅ অর্থ : হোতারা যজ্ঞে আমার (শিবের) স্তব করেন, সামবেদীয়েরা আমার উদ্দেশে ‘রথন্তর’ নামক সামগান করে থাকেন, বেদবিদ্ ব্রাহ্মণেরা আমার পূজা করেন এবং যজুর্বেদীয় পুরোহিতেরা আমার যজ্ঞভাগ কল্পনা করে থাকেন ॥ ২৬ ॥


🔶 মহাভারতে আরো বলা হয়েছে, উপমন্যু শৈবাচার্য যখন নিজের সামনে পরমেশ্বর শিবকে আবির্ভূত হতে দেখলেন, তখন পরমেশ্বর শিবের পাশে পিতামহ ব্রহ্মা সামবেদের রথন্তর নামক শ্রুতি মন্ত্র পাঠ করে পরমেশ্বর শিবের স্তুতি করছিলেন বলে দর্শন করেছিলেন, একথা স্বয়ং মহর্ষি উপমন্যু শৈবাচার্য নিজেই বলেছেন — 

ব্রহ্মা ভবং তদাস্তৌষীদ্রথন্তরমুদীরয়ন্ । 

জ্যেষ্ঠসাম্না চ দেবেশং জগৌ নারায়ণস্তদা । 

গৃণম্ ব্রহ্মপরং শত্রুঃ শতরুদ্রিয়মুত্তমম্ ॥ ২৮১ ॥

[মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/১৩ অধ্যায়/২৮১ শ্লোক]

✅ অর্থ : তখন ব্রহ্মা রথন্তর (সামবেদের অংশবিশেষ) উচ্চাবণ করতে করতে মহাদেবের স্তব করতে লাগলেন। নারায়ণ জ্যেষ্ঠ নামক সামবেদেব অংশ দ্বারা দেবদেবের স্তব করতে লাগলেন এবং ইন্দ্র উত্তম শতরুদ্রিয় বেদপাঠ করতে করতে পরব্রহ্ম শিবের গুণগান গাইতে লাগলেন ॥ ২৮১ ॥

__________________________________________________

🚩 তথ্য সংগ্রহ, ব্যাখ্যা প্রদান তথা সত্য উন্মোচনে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীপাদযুক্ত শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব জী 🚩

©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥

শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩


পরমেশ্বর শিবের ও সনাতন শৈবধর্মের বিষয়ে এমন গুহ্য সত্য রহস্য ও সত্য উন্মোচনমূলক লেখা আরো পেতে অবশ্য‌ই আমাদের Shivalaya ফেসবুক পেজ Follow করে Favourite করে রাখুন। এই তথ্য দ্বারা যদি আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি হয়ে থাকে তবে অবশ্য‌ই এই লেখাটি শেয়ার করুন, যাতে সত্য প্রকাশ্যে আসে।

 #সনাতনধর্ম #শিবালয় #Shivalaya #sanatandharma  #শৈবধর্ম #ঈশান #পরমেশ্বরশিব #সামবেদ #ঋগ্বেদ  #শুক্লযজুর্বেদ #সদাশিব #শিবমন্ত্র #বৈদিকশিবমন্ত্র #বেদ #বেদজ্ঞান #রথন্তর #সামগান

[এই পোস্টটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এখানে ব্যবহৃত চিত্রটি কেবল বিষয়টি সহজে উপস্থাপনের জন্য Ai-সহায়তায় নির্মিত একটি প্রতীকী চিত্র, এই ছবিটির মধ্যে কিছু লেখা আলাদা ভাবে লেখা হয়েছে। সকল শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতি ও তথ্য যথাসম্ভব মূল গ্রন্থ অনুসারে ছবি উপস্থাপিত হয়েছে।]




মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ