রামানুজের শ্রীবৈষ্ণব সম্প্রদায়ের গুরুপরম্পরাহীনতার প্রমাণ (শৈবপক্ষ দ্বারা)
🚫 রামানুজের শ্রীবৈষ্ণব সম্প্রদায়ের গুরুপরম্পরাহীনতার প্রমাণ (শৈবপক্ষ দ্বারা)
॥ ॐ নমঃ শিবায় ॥
🔰 ভূমিকা —
বর্তমান সময়ে শাস্ত্রজ্ঞানহীন মানুষেরা শৈব গুরুপরম্পরাকে সনাতন ধর্মের একমাত্র প্রাচীন ও প্রধান পরম্পরা বলে স্বীকার করতে চায় না। কারণ, তাদের বক্তব্য হল - সনাতন ধর্মের বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, গাণপত্য ব্রাহ্ম(নিরপেক্ষ ব্রহ্মবাদী) ইত্যাদি পরম্পরার সকলেই সনাতন ধর্মের এক একটি সিদ্ধান্ত, সবাই নাকি সনাতন ধর্মের মান্য পরম্পরা । শৈবদের গুরুপরম্পরার যেমন নিজস্ব মান্যতা রয়েছে তেমনই নাকি অনান্য পরম্পরার নিজস্ব মান্যতা রয়েছে।
কিন্তু এখন সমস্যা হল সবার যদি নিজের নিজের পরম্পরার ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তবে কোনটি প্রকৃত ধর্মের সত্য সিদ্ধান্ত ?
সনাতন ধর্ম একটিই, সত্যও একটিই, পরমেশ্বর একজনই - তাহলে ভিন্ন গুরুপরম্পরার ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত কেন রয়েছে ?
একটি সিদ্ধান্তের জায়গায় একাধিক সিদ্ধান্ত কেন রয়েছে আমাদের সনাতনী সমাজে ?
এই জিজ্ঞাসা আজ পর্যন্ত সনাতন ধর্মের মানুষদের মনে উদয় হয়নি, যার কারণে সঠিক সিদ্ধান্ত কোনটি তা সনাতনীরা জানতেই পারেনি। প্রকৃত গুরু পরম্পরা কোনটি, যখন জীবের জন্য ঈশ্বরের দ্বারা সনাতন ধর্মের মার্গ প্রশস্ত করা হয়েছিল, সেই সূচনাকালে কোন গুরু পরম্পরার হাত ধরে এই সনাতন ধর্মের সিদ্ধান্ত সমগ্র জীবের কাছে ধরা দিয়েছিল ?
— এ বিষয়ে কারোরই জানবার আগ্রহ প্রকাশ হতে দেখা যায়নি, তাই এই প্রবন্ধে আমি সেই সঠিক গুরুপরম্পরার নির্ণয় করবো।
এই প্রসঙ্গে বৈষ্ণবদের মান্য যে সকল গুরুপরম্পরা এই পৃথিবীতে বর্তমান রয়েছে, সেই গুরুপরম্পরা গুলির উৎপত্তি কবে হয়েছিল ?
তাদের পরম্পরাগত মান্যতা কি ?
তাদের এই মান্যতার সাথে শাস্ত্রের বচনের মিল আছে কি না ?
নাকি তাদের নিজস্ব মস্তিষ্কপ্রসূত কাল্পনিক কাহিনীর মান্যতার উপর নির্ভর করে বৈষ্ণব গুরুপরম্পরা গড়ে উঠেছে ?
শৈব গুরুপরম্পরা আর বৈষ্ণবদের গুরুপরম্পরার মধ্যে কোন পরম্পরা তথা সিদ্ধান্ত শাস্ত্রসম্মত, অধিক গ্রহণযোগ্য আর কি কি পার্থক্য রয়েছে — এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
[এখানে শুধুমাত্র বিশ্লেষণ করে পরম্পরার প্রামাণিকতার বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা হয়েছে, কোনো সম্প্রদায়কে অপমানিত বা কটুক্তি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।]
________________________________________________
________________________________________________
🟫☘️ আলোচ্য বিষয় ☘️🟫
🔆 প্রথমে শ্রীবৈষ্ণবদের দাবী সম্পর্কে জানা যাক :
🚫 শ্রীবৈষ্ণব সম্পদায় ও তার মান্যতা —
বর্তমান বৈষ্ণব পরম্পরাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন বৈষ্ণব সম্প্রদায়।
‘শ্রী’ সম্প্রদায়ের বৈষ্ণবদের গুরুপরম্পরাগত বিশ্বাস হল — স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু থেকে এই পরম্পরার সূত্রপাত হয়েছে, তাই এই সম্পরদায়কে বৈষ্ণব পরম্পরা বলা হয় এবং বিষ্ণুদেবের পত্নী দেবী লক্ষ্মী মাধ্যমে এর বিস্তার হয়েছিল, যেহেতু লক্ষ্মীদেবীর একটি নাম ‘শ্রী’ তাই এই সম্প্রদায়ের নাম “শ্রী বৈষ্ণব” পরম্পরা ।
দেবী লক্ষ্মী এই সম্প্রদায়ের মান্য জ্ঞান ও মন্ত্র ইত্যাদি নাকি বৈকুন্ঠের সেনাপতি বিষ্বকসেনের কাছে। ভাগবত পুরাণে বৈকুন্ঠের সেনাপতি এই বিষ্বকসেনকে বৈষ্ণবতন্ত্রের প্রতিমূর্তি বলে উপমা দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ পঞ্চরাত্র মূলত বিষ্বকসেন স্বরূপ (ভাগবতপুরাণ/১২ স্কন্ধ/১১ অধ্যায়/২০নং শ্লোক)। তাই শ্রীবৈষ্ণব পরম্পরাতে পঞ্চরাত্র একটি অন্যতম প্রধান মান্য শাস্ত্র ।
বৈকুন্ঠের সেনাপতি বিষ্বকসেনের পর একদম সরাসরি কলিযুগে জন্ম নেওয়া ১২জন বিষ্ণুভক্ত হলেন ‘শ্রী সম্প্রদায়’ -এর আচার্য, দক্ষিণভারতে এই বিষ্ণু ভক্তদের ‘আলবার’ বলা হয়। তারা পাঞ্চরাত্রের মতবাদের প্রচার করেন। তাই এনাদের পাঞ্চরাত্রিক বৈষ্ণব বলা হয়ে থাকে। তারা বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে তামিল ভাষায় বিশেষ স্তুতি রচনা করেছিলেন। তারা সকলে ৪০০০ তামিল স্তুতি রচনা করেছিলেন, তাকে পাশুরাম বলে, যা "দিব্যপ্রবন্ধ" বা "তামিল বেদ" নামে পরিচিত এই শ্রী সম্প্রদায়ের বৈষ্ণবদের কাছে।
১২ জন আলবারের নাম —
(১) সরোযোগী আলবার,
(২) ভূতনাথ আলবার,
(৩) মহাযোগী আলবার,
(৪) ভক্তিসার আলবার,
(৫) কুলশেখর আলবার,
(৬) মুনিবাহন আলবার,
(৭) বিপ্রনারায়ণ আলবার,
(৮) শঠকোপ আলবার,
(৯) মধুরকবি আলবার,
(১০) বিষ্ণুচিত্ত আলবার,
(১১) পরকাল আলবার,
(১২) আণ্ডাল আলবার।
🔴এই "শ্রী বৈষ্ণব" পরম্পরা সম্পর্কে ভাগবতে পুরাণে ভবিষ্যৎ বাণীও পাওয়া যায়।
"কৃতাদিষু প্রজা রাজন কলাবিচ্ছন্তি সম্ভবম্।
কলৌ খলু ভবিষ্যন্তি নারায়ণপরায়ণাঃ৷৷"
ক্বচিৎ ক্বচিন্মহারাজ দ্রবিড়েষু চ ভূরিশঃ।
তাম্রপর্ণী নদী যত্র কৃতমালা পয়স্বিনী।।"
কাবেরী চ মহাপুণ্যা প্রতীচী চ মহানদী।
যে পিবন্তি জলং তাসাং মনুজা মনুজেশ্বর।
প্রায়াে ভক্তা ভগবতি বাসুদেবেহমলাশয়ঃ ।।"
(ভাগবতপুরাণ ১১/৫/৩৮-৪০)
অর্থ — রাজন্ ! সত্য-ত্রেতা-দ্বাপর যুগের প্রজাসকলের একান্ত কাম্য যে তাদের জন্ম যেন কলিযুগে হয় ; কারণ কলিযুগেই ভগবান নারায়ণের শরণাগত এবং আশ্রিত ভক্তসকলের আগমনের অপরিমিততা সম্ভব। ৩৮
হে মহারাজ বিদেহ! কলিযুগে দ্রাবিড়দেশে অধিক ভক্ত পাওয়া যায় ; সেখানে যে তাম্রপর্ণী, কৃতমালা,পয়স্বিনী।৩৯
পরমপবিত্র কাবেরী, মহানদী, এবং প্রতীচী নদীসকল আবহমান কাল থেকে প্রবাহমানা। রাজন! যারা এই সকল নদীর জল পান করে থাকেন প্রায়শ অন্তরের শুদ্ধিকরণ হয়ে তারা ভগবান বাসুদেবের ভক্ত হয়ে যান।৪০
১২ জন আলবারের পরবর্তীতে বহুকাল পরে নাথমুনি যখন খ্রিস্টীয় ১০ম শতাব্দীতে আবির্ভূত হন তখন প্রায় অনেক দিব্যপ্রবন্ধই বিলুপ্ত। তখন নাকি তিনি তা উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করেন। নাথমুনির প্রার্থনার ফলে, স্বয়ং শঠকোপ আলবার তাঁর সম্মুখে আবির্ভূত হয়ে, নাথমুনিকে ৪০০০ দিব্য প্রবন্ধ প্রদান করেন। নাথমুনি এই ৪০০০ দিব্যপ্রবন্ধ সংরক্ষণ করে রাখেন লিখিত আকারে।
এরপর শ্রী পুণ্ডরীকাক্ষ নামক এক বিষ্ণুভক্তের আবির্ভাব হয়। তারপর শ্রী রামমিশ্র , তারপর যামুনাচার্য, এরপর, মহাপূর্ণ নামক বিষ্ণুভক্ত ও অবশেষে রামানুজ আসেন। কেন্দ্রীয় দার্শনিক হলেন একাদশ শতাব্দীর এই রামানুজ, যিনি এই শ্রী বৈষ্ণব পরম্পরাকে বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের মাধ্যমে স্থাপন করেছিলেন। রামানুজ কে শেষ নাগের অবতার বলে ধারণা করেন শ্রী সম্প্রদায়ের বৈষ্ণবেরা। আর এর প্রমাণ হিসেবে তারা পঞ্চরাত্রের ‘ঈশ্বরসংহিতা ২০/২৭৩-২৭৬’ ও ‘বৃহৎব্রহ্ম সংহিতা ২/৭/৬৫-৭০’ ইত্যাদি প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন। রামানুজ এই শ্রী বৈষ্ণব সম্প্রদায়কে সংগঠিত করেন বলে এই পরম্পরাকে ‘রামানুজ সম্প্রদায়’ বলা হয়ে থাকে।
রামানন্দ (রামানন্দাচার্য) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০০-১৩৮০) একজন ভারতীয় হিন্দু বৈষ্ণব ভক্তিমূলক কবি সাধক । ইনি রামানুজের পরম্পরার একটি উপধারা, এনাদের রামানন্দী পরম্পরা বলা হয়।
__________________________________________________
__________________________________________________
🔆 এবার শ্রীবৈষ্ণব সম্প্রদায়ের পক্ষ দাবী করা মান্যতার বিষয়ে মহাপাশুপত শৈব পরম্পরার পক্ষ থেকে সমীক্ষা করা যাক :
🔥 শৈব পক্ষ দ্বারা ‘রামানুজ শ্রী বৈষ্ণব সম্প্রদায়’ -এর মান্যতাকে শাস্ত্রের নিরিখে প্রাচীনত্ব ও গ্রহণযোগ্যতার বিচার —
🔷 (১) পঞ্চরাত্র মোহনাত্মক গ্রন্থ, যা গৌতম ঋনির অভিশাপে বেদের মার্গ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে যাওয়া মুনিদের জন্য ভগবান বিষ্ণু রচনা করেছিলেন। এই পঞ্চরাত্রের বানীই অসত্য, এই কারণেই এটি বেদবিরুদ্ধ। প্রমাণ 👇
বৈষ্ণববীয় পঞ্চরাত্র আগম সৃষ্টির কারণ কি এবং সেগুলি কেন বেদবিরুদ্ধ অবৈদিক ?
তাই পঞ্চরাত্র কে আশ্রয় করে কোনো পরম্পরা প্রচলিত করবার অর্থই হল বিপথে যাওয়া। এই কারণে পঞ্চরাত্রকে মান্য করে চলাটাই গ্রহণযোগ্য নয়, এই পথ ধর্মের পথ নয়। কারণ, পঞ্চরাত্রে যা কিছু উল্লেখ করা আছে তা মূলত জীবকে মায়ায় মোহিত করে দেবার জন্য, যাতে মানুষ সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে অসত্যের পথে চলে গিয়ে অধোগতি প্রাপ্ত হয়ে যায়, এই কারণেই এই পঞ্চরাত্রের উৎপত্তি ঘটানো হয়েছিল।
🔷 (২) শ্রী লক্ষ্মী দেবী দ্বারা বিষ্বকসেন এই শ্রীসম্প্রদায়ের জ্ঞান পেয়েছেন, এমনটা কোথাও ‘শব্দপ্রমাণ’ সহ উল্লেখ করে বর্ণনা করা নেই। ভাগবত পুরাণের ১২ স্কন্ধের ১১ অধ্যায়ের ২০নং শ্লোক দেখে এখানে অনুমান করে নিয়েছেন মাত্র শ্রীবৈষ্ণবরা। শব্দপ্রমাণ না থাকলে শুধু অনুমান করে নিয়ে তার ভিত্তিতে একটি মান্যতা তৈরী করে নেওয়ার মতো দুঃষ্কর্ম হল চরম অশাস্ত্রীয় এবং প্রচণ্ড পরিমাণে অধর্মের বিষয়।
🔷 (৩) শ্রী বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের বিশ্বাস অনুযায়ী, ১২ জন বিষ্ণুভক্ত আলবার কলিযুগে জন্মেছিলেন। এখন একটা বড় প্রশ্ন ওঠে বৈষ্ণবদের মান্য করা এই বিশ্বাসের উপরেই, কারণ, কলিযুগে যদি ১২ জন আলবার দ্বারা প্রথমবার মর্তে বৈষ্ণব পরম্পরা আরম্ভ হয়ে থাকে তবে ১২ জন আলবার জন্মানোর আগে বাকি তিনযুগে বৈষ্ণবদের গুরুপরম্পরার অস্তিত্ব কোথায় ছিল ?
🔷 (৪) এই রামানুজের নব্য পরম্পরা সম্পূর্ণভাবে কপোলকল্পিত এবং প্রকৃত গুরুপরম্পরাহীন, শাস্ত্রে কোথাও এই শ্রী পরম্পরার উল্লেখ নেই, কোনো পুরাণ শাস্ত্রে এই পরম্পরার উল্লেখ নেই, প্রাচীন কালের কোনো ঋষি মুনি এই নব্য পরম্পরার আচার্য নন। শুধুমাত্র নিজস্ব সম্প্রদায় বানিয়ে একটা কাহিনী রচনা করে পঞ্চরাত্রকে ব্যবহার করে, নব্য ভাগবতপুরাণের কিছু শ্লোক তুলে ধরে দাবী করে বসেছে যে ঐ শ্লোকে নাকি আলবার দের জন্ম হবার ভবিষ্যৎ বাণী করা হয়েছে, যদিও সেই শ্লোকে সরাসরি ১২ জন বিষ্ণুভক্তদের উল্লেখ করবার কোনো শব্দ প্রমাণ নেই, অস্পষ্ট শ্লোক এটি।
🔷 (৫) কলিযুগে পঞ্চরাত্রের প্রচার প্রথমবার রামানুজ ই করেছিলেন। আর এই পঞ্চরাত্রে রামানুজকে শেষনাগের অবতার ঘোষণা করা হয়েছে, যেমন ঈশ্বর সংহিতা, বৃহৎব্রহ্ম সংহিতা, শেষ সংহিতা ইত্যাদি পঞ্চরাত্র। এখন যদি তর্কের জন্য আপাতত ধরেও নিই যে, রামানুজ সংকর্ষণ নামক আদিশেষনাগের অবতার ছিলেন এবং তিনি কলিযুগে এসে আবির্ভূত হয়ে বৈষ্ণব সম্প্রদায়কে উদ্ধার করবেন, তাহলে রামানুজের পূর্ববর্তী আচার্য নাথমুনি, পুণ্ডরীকাক্ষ, শ্রী রামমিশ্র, যামুনাচার্য কেন এটি উল্লেখ করেননি ?, তাঁরা কি তাহলে এটা জানতেন না ?। প্রকৃতপক্ষে এর কারণ হল, এটি পরবর্তীকালে উক্ত পঞ্চরাত্রে নিশ্চিতভাবে "রামানুজ শেষনাগের অবতার" অংশটি সংযোজন করা হয়েছে বলে বোঝা যায়। নিজেদের নব্য সম্প্রদায় কে শাস্ত্রসম্মত বলে প্রমাণ করবার জন্য রামানুজকে অবতার ঘোষণা করে পঞ্চরাত্রের নামে চালানো হয়েছে।
__________________________________________________
♦️ শৈবপরম্পরা এবং শ্রীবৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে - সনাতন ধর্মের একমাত্র শাস্ত্রীয় ও প্রামাণিক পরম্পরা কোন পরম্পরা ?
✅ উত্তর - সনাতন ধর্মের শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে এমন পরম্পরা হল - একমাত্র শৈবপরম্পরা। কারণ, প্রামাণিক শাস্ত্র শিবমহাপুরাণে শৈব গুরুপরম্পরাগুলির উল্লেখ রয়েছে।
[উপমন্যু শৈবাচার্য জী শ্রীকৃষ্ণকে শিবপূজার পর শিবস্তোত্র পাঠ করবার বিধি বলতে গিয়ে স্তোত্রে যেভাবে বর্ণনা করেছেন শৈব আচার্য ও শৈবপরম্পরার নাম, সেই শ্লোক সহ এখানে নিচে উপস্থাপন করা হল]
▪️ প্রমাণ দেখুন -
শ্বেতাদ্যা নকুলীশান্তাঃ সশিষ্যাশ্চাপি দেশিকাঃ।
তৎ সন্ততীয়া গুরবো বিশেষাদ্ গুরবো মম ॥ ১৬৮
শৈবা মাহেশ্বরাশ্চৈব জ্ঞানকর্মপরায়ণাঃ।
কর্মেদমনুমন্যন্তাং সফলং সাধ্বনুষ্ঠিতম্ ॥ ১৬৯
শৈবাঃ সিদ্ধান্তমার্গস্তাঃ শৈবাঃ পাশুপতাস্তথা।
শৈবা মহাব্রতধরাঃ শৈবাঃ কাপালিকাঃ পরে ॥ ১৭৩
শিবাজ্ঞাপালকাঃ পূজ্যা মমাপি শিবশাসনাৎ।
সর্বে মামনুগৃহন্তু শংসন্তু সফলক্রিয়াম্ ॥ ১৭৪
[শিবমহাপুরাণ/বায়বীয় সংহিতা/উত্তরখণ্ড/৩১ অধ্যায়]
অর্থ : উপমন্যু জী বললেন, শ্বেতাশ্বতর আচার্য থেকে নকুলীশ পর্যন্ত, শিষ্য-সহ আচার্যগণ, তাঁদের সন্তান পরম্পরায় উৎপন্ন গুরুজন, বিশেষতঃ আমার গুরু, শৈব, মাহেশ্বর, যাঁরা জ্ঞান ও কর্মে তৎপর থাকেন, তাঁরা যেন আমার এই কর্মকে সফল ও সুসম্পন্ন বলে মানেন ॥ ১৬৮-১৬৯
সিদ্ধান্তমার্গী শৈব, পাশুপত শৈব, মহাব্রতধারী শৈব ও অন্য কাপালিক শৈব পরম্পরায় দীক্ষিত ব্যক্তি - এঁনারা সকলেই শিবের আদেশ পালনকারী এবং আমারও পূজনীয়। অতএব শিবের আদেশে এঁদের সকলের আমার ওপর অনুগ্রহ হোক এবং তাঁরা এই কার্যকে সফল ঘোষণা করুন। ১৭৩-১৭৪
দেখুন ! আমাদের শৈব পরম্পরা তথা সমগ্র সনাতন ধর্মের প্রথম আচার্য গুরুদেব হিসেবে শ্বেতাশ্বতর মহর্ষিকে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মাধ্যমে পরবর্তীতে আরো আচার্য হয়েছেন, এভাবেই চলতে চলতে কলিযুগ এলে নকুলীশ (লকুলীশ) নামক অবতার নিয়ে পরমেশ্বর শিবই শৈবপরম্পরার আচার্য হয়ে প্রচার করেন।
এনার মধ্যবর্তী সকল প্রাচীন ঋষি মুনিই ছিলেন আমাদের শৈব আচার্য, যাদের উপর ভিত্তি করে বর্তমানের সনাতনীরা সনাতন ধর্ম নিয়ে গর্ব করে।
আমাদের মহাপাশুপত শৈব পরম্পরার সেই সকল আচার্যদের নাম বলা হয়েছে শিবমহাপুরাণের বায়বীয় সংহিতার উত্তরখণ্ডের ৯ম অধ্যায়ে।
এই অধ্যায়ের শ্লোকের অনুবাদ দিলাম —
🔜 ➡️ “শ্রীকৃষ্ণ বললেন — ভগবন্ ! সমস্ত যুগাবর্তে যোগাচার্যের রূপে ভগবান শংকরের যাঁরা অবতার হন এবং সেই অবতারদের শিষ্যদের সকলের বর্ণনা করুন।
উপমন্যু বললেন — শ্বেত, সুতার, মদন, সুহোত্র, কঙ্কলৌগাক্ষি, মহামায়াবী জৈগীষব্য, দধিবাহ, ঋষভ মুনি, উগ্র, অত্রি, সুপালক, গৌতম, বেদশিরা মুনি, গোকর্ণ, গুহাবাসী, শিখণ্ডী, জটামালী, অট্টহাস, দারুক, লাঙ্গুলী, মহাকাল, শূলী, দণ্ডী, মুণ্ডীশ, সহিষ্ণু, সোমশর্মা ও নকুলীশ্বর এই বারো কল্পের সপ্তম মন্বন্তরে যুগক্রমে আঠাশজন যোগাচার্য প্রকটিত হন। এঁনাদের প্রত্যেকের শান্তচিত্তযুক্ত চারজন করে শিষ্য ছিলেন, যা শ্বেত থেকে রুষ্য পর্যন্ত বলা হয়েছে। আমি তাঁদের ক্রমশঃ বর্ণনা করছি, শোনো।
শ্বেত, শ্বেতশিখ, শ্বেতাশ্ব, শ্বেতলোহিত, দুন্দুভি, শতরূপ, ঋচীক, কেতুমান, বিকোশ, বিকেশ, বিপাশ, পাশনাশন, সুমুখ, দুর্মুখ, দুর্গম, দুরতিক্রম, সনৎকুমার, সনক, সনন্দন, সনাতন, সুধামা, বিরজা, শঙ্খ, অণ্ডজ, সারস্বত, মেঘ, মেঘবাহ, সুবাহক, কপিল, আসুরী, পঞ্চশিখ, বাস্কল, পরাশর, গর্গ, ভার্গব, অঙ্গিরা, বলবন্ধু, নিরামিত্র, কেতুশৃঙ্গ, তপোধন, লম্বোদর, লম্ব, লম্বাত্মা, লম্বকেশক, সর্বজ্ঞ, সমবুদ্ধি, সাধ্য, সিদ্ধি, সুধামা, কশ্যপ, বশিষ্ঠ, বিরজা, অত্রি, উগ্র, গুরুশ্রেষ্ঠ, শ্রবণ, শ্রবিষ্ঠক, কুণি, কুণবাহু, কুশরীর, কুনেত্রক, কাশ্যপ, উশনা, চ্যবন, বৃহস্পতি, উতথ্য, বামদেব, মহাকাল, মহানিল, বাচঃশ্রবা, সুবীর, শ্যারক, যতীশ্বর, হিরণ্যনাভ, কৌশল্য, লোকাক্ষি, কুথুমি, সুমন্ত, জৈমিনী, কুবন্ধ, কুশকন্ধর প্লক্ষ, দার্ভায়ণি, কেতুমান, গৌতম, ভল্লবী, মধুপিঙ্গ, শ্বেতকেতু, উশিজ, বৃহদশ্ব, দেবল, কবি, শালিহোত্র, সুবেষ, যুবনাশ্ব, শরদ্বসু, ছগল, কুম্ভকর্ণ, কুম্ভ, প্রবাহুক, উল্ক, বিদ্যুৎ, শম্বুক, আশ্বলায়ন, অক্ষপাদ, কণাদ, উলুক, বৎস, কুশিক, গর্গ, মিত্রক এবং রুষ্য- এঁরা যোগাচার্যরূপী মহেশ্বরের শিষ্য। এঁদের সংখ্যা একশো বারো। এঁরা সকলেই সিদ্ধ পাশুপত। এঁদের শরীর ভস্মে বিভূষিত থাকে। এঁরা সম্পূর্ণ শাস্ত্রে তত্ত্বজ্ঞ, বেদ ও বেদাঙ্গের পারঙ্গম বিদ্বান। শিবাশ্রমে অনুরক্ত, শিবজ্ঞান-পরায়ণ, সর্বপ্রকার আসক্তিমুক্ত, একমাত্র ভগবান শিবেই মন ন্যস্ত রাখেন, সমস্ত দ্বন্দ্ব সহ্যকারী, ধীর, সর্বভূত-হিতকারী, সরল, কোমল, স্বস্থ, ক্রোধশূন্য ও জিতেন্দ্রিয়। তাঁদের অলংকার হল রুদ্রাক্ষের মালা। তাঁদের মস্তক ত্রিপুঞ্জে অঙ্কিত। তাঁদের মধ্যে কেউ শিখারূপে জটাধারণ করেন, কারো সব কেশই জটারূপ। কেউ কেউ জটা রাখেন না, অনেকে সর্বদা মাথা ন্যাড়া করেন। তাঁরা প্রায়শঃ ফল-মূল খান, প্রাণায়াম সাধনে তৎপর হন। 'আমি শিবের' এই অভিমানযুক্ত হন। সর্বদা শিবের চিন্তায় ব্যাপৃত থাকেন। তাঁরা সংসাররূপ বিষ-বৃক্ষের অঙ্কুরকে মন্থন করেছেন এবং সর্বদা পরমধামে যাবার জন্য উৎসুক থাকেন। যাঁরা যোগাচার্যগণের সঙ্গে এই শিষ্যদের জেনেও মান্য করে সর্বদা শিবের আরাধনা করেন, তাঁরা শিবের সাযুজ্য প্রাপ্ত হন, এর অন্যথা ভাবা উচিত নয়।” ⬅️🔚
🔶 আরো দেখুন — প্রাচীনকালে সকলেই শৈব ছিলেন,
🔆 প্রমাণ দেখুন —
হিতায় সর্বমর্ত্যানাং শিবধর্মং সনাতনম্।
যেন সিদ্ধাঃসুরা দৈত্যা গন্ধর্বোরগরাক্ষসাঃ ॥৮
ঋষয়ঃ কিন্নরা যক্ষস্তথা কিংপুরুষাদয়ঃ।
তথা তথা বিবিধাশ্চান্যে শিবধর্ম পরায়ণাঃ ॥৯
সম্পূজ্যাঃ সসুরাঃ সর্বে তদ্ভক্তাঃ শিবধার্মিকাঃ ।..॥১০
[তথ্যসূত্র : শিবধর্মপুরাণ/১ম অধ্যায়]
✅ অর্থ : মৃত্যুলোকবাসী সকল জীবের জন্য সনাতন শিবধর্ম পরমহিতকারক। এই কারণে, সমস্ত সিদ্ধগণ, দেবতাগণ, দৈত্যগণ, গন্ধর্বগণ, নাগগণ, রাক্ষসগণ, ঋষিগণ, কিন্নরগণ, যক্ষগণ তথা কিংপুরুষাদি ও অনান্য বিবিধ সকলেই শিবধর্ম পরায়ণ হয়েছেন এবং দেবতাদের সাথে শিবের পূজা করে তারা ভক্তিপূর্বক শিবধার্মিক অর্থাৎ শৈব হয়েছেন ॥৮-১০
[এখান থেকে প্রমাণিত হয়ে গেল যে, শৈবধর্ম ই সনাতনধর্ম, প্রাচীন কালে কেউ অশৈব ছিলেন না]
__________________________________________________অপর দিকে, রামানুজের শ্রীবৈষ্ণবপরম্পরার কোনো অস্তিত্ব নেই শাস্ত্রে, পরম্পরার নাম উল্লেখ করা নেই, আচার্য পরম্পরার ক্রম উল্লেখ নেই। প্রাচীনকালে বৈষ্ণবদের পরম্পরার অস্তিত্বহীনতা প্রমাণিত হল।
কিন্তু শৈবপরম্পরার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে আচার্যদের নাম সহ ক্রম উল্লেখ করা আছে শাস্ত্রে, এমনকি পরম্পরার নাম পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে শিবমহাপুরাণে।
তাই যা শাস্ত্রবিহিত, যা শাস্ত্র সম্মত, যা শাস্ত্রের বচন সিদ্ধ — সেই পরমসত্য ই গ্রহণ যোগ্য, এই কারণে সনাতন ধর্মের শাস্ত্রের আলোকে শৈবপরম্পরা ই একমাত্র সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ঐ অদ্বিতীয় সনাতন গুরু পরম্পরা।
রামানুজের শ্রীবৈষ্ণবপরম্পরার প্রাচীনত্ব নেই, সত্যযুগে এই সম্প্রদায়ের কোনো অস্তিত্ব ছিলনা, দ্বাপর যুগ ও ত্রেতাযুগেও এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না, কিন্তু কলিযুগ উপস্থিত হতেই কিছু বিষ্ণুভক্তদের ইচ্ছায় একটি গুরুশিষ্য পরম্পরা রাতারাতি জেগে উঠেছে। এটিই কলির লীলা, যেখানে সত্যকে চাপা দেবার জন্য অসত্য, অবার্চিন মতবাদগুলি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে আজ।
রামানুজ কিছু রাজার রাজকন্যাদের অসুস্থতাকে নিরাময় করে দিয়েছিলেন, ফলে সেইসব রাজাদের আনুগত্য লাভ করে রামানুজ সহজেই সেই সকল রাজ্যতে বৈষ্ণব মতবাদের নব্য সম্প্রদায়কে প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ্য হয়েছিলেন।
রাজকীয় ক্ষমতার বলে নিজের নব্য শ্রীবৈষ্ণব সম্প্রদায় কে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন রামানুজ। নচেৎ তার পক্ষে কখনোই শৈবদের মধ্যে বৈষ্ণবীয় সংস্কৃতি প্রবেশ করানো সম্ভব হতো না, সুযোগের ব্যবহার করে রামানুজ নিজের গুরুপরম্পরা প্রকট করেছিলেন, তারপর তিনি বিভিন্ন ভাষ্য পুস্তক রচনা করে শাস্ত্রের সর্বত্র বিষ্ণুকেই সর্বোচ্চ ব্রহ্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করেন। এমনকি শৈব আচার্য মহর্ষি শ্বেতাচার্যের শ্বেতাশ্বতর উপনিষদকেও ব্যবহার করে পরমেশ্বর শিবের জন্য বলা শ্রুতিমন্ত্রগুলিকে বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে বলে দাবী করেছেন নিজের রচিত ভাষ্য ইত্যাদি পুস্তকে।
এই কারণে রামানুজ তথা তার উক্ত নব্য বৈষ্ণবপরম্পরার পক্ষ থেকে লিখিত কোনো ভাষ্যই আমাদের শৈবদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বিকৃত মতবাদের বচন সর্বদা পরিত্যাজ্য, তাই ইচ্ছাকৃতভাবে পরমেশ্বর শিবের উদ্দেশ্যে বাচিত হওয়া বেদমন্ত্রের অর্থের বিকৃতকারী রামানুজ ইত্যাদি নব্য শ্রীবৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কোনো কিছুই আমাদের শৈবদের কাছে মান্য নয়।
__________________________________________________
♦️ তাহলে কি আপনারা বিষ্ণুর পূজা করা, বিষ্ণুর ভক্তি করা কে নিষিদ্ধ বলতে চাইছেন ? আর বিষ্ণুভক্ত দের আপনারা অবৈধ বলে দাবী করছেন ?
✅ উত্তর - দেখুন ! এখানে আলোচ্য বিষয় হল রামানুজের ‘শ্রীবৈষ্ণব’ সম্প্রদায়ের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে। শাস্ত্রে কোথাও বিষ্ণুপূজা করাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, বিষ্ণুভক্তিতেও কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই আমরা শৈবরা কখনোই বিষ্ণুপূজা বা বিষ্ণুভক্তিকে অশ্রদ্ধা করি না, নিষিদ্ধ বলেও প্রচার করিনা।
পরমেশ্বর শিবের পূজা করবার মুহূর্তে সকল দেবদেবীর পূজা করতে হয়, তাই স্বাভাবিক ভাবেই ভগবান বিষ্ণুর পূজাও করা হয়ে থাকে। আমাদের মহাপাশুপত শৈব পরম্পরা তথা শাস্ত্রের বচন অনুসারে সকল দেবদেবীর মধ্যে শিবতত্ত্বই মূল কারণ হিসেবে অবস্থিত, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেবদেবীর পূজা করি। সেক্ষেত্রে ভগবান বিষ্ণুর পূজার সময়েও তার অন্তরে শিব স্থিত অর্থাৎ শিবই বিষ্ণুরূপ ধারণ করে আমার পূজা গ্রহণ করছেন - এমন ভাব হৃদয়ে ধারণ করে আমরা পূজা করে থাকি। তাই ভগবান বিষ্ণুর পূজা বা ভক্তিতে কোন বাধা নেই, বাধা দেওয়ার কথা যারা ভাবনা করে তারা অধর্মী।
আমরা পরমেশ্বর শিবের গুরুপরম্পরার অনুশাসন অনুসারে শৈব, আমাদের অদ্বৈত শৈবপরম্পরার নীতিতে কোথাও কাউকে হিংসা করবার মতো শিক্ষা দেওয়া নেই। তাই ভগবান বিষ্ণুর পূজা বিষয়ে আমাদের শৈবদের কোনো বিদ্বেষ নেই।
সত্য যুগেও শ্রীবিষ্ণুর পূজা ও পরমেশ্বর শিবের পূজা হতো, চিরকাল হয়ে এসেছে, আজও হচ্ছে। এটি চিরাচরিত সত্য, এতে কোনো অসঙ্গতি নেই। কিন্তু আমরা আলোচনা করছি শৈবপরম্পরা ও বৈষ্ণব পরম্পরা মধ্যে কোন পরম্পরা টি সবথেকে প্রাচীন ও শাস্ত্রের দৃষ্টিতে প্রামানিক পরম্পরা ।
পূজা করা ভক্তি করা এটি অন্য একটি প্রসঙ্গের বিষয়, আর পরম্পরার পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ অন্য একটি প্রসঙ্গের বিষয়। দুটি আলাদা প্রসঙ্গকে এক ভাবা উচিত নয়। গুরুপরম্পরা না থাকা সত্ত্বেও মনসা দেবীর পূজা হয়, শীতলা দেবীর পূজা হয়। তাই দেবদেবীর পূজা করা আর সেই দেবদেবীর গুরু পরম্পরার প্রামাণিকতার আলোচনা করবার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
বৈষ্ণব পরম্পরা না থাকলেও আমরা শৈবরা পরমেশ্বর শিবের পূজা করবার সময়ে শ্রীবিষ্ণুকে পূজা করতাম, নন্দী মহারাজকে পূজা করতাম, কীর্তিমুখকে পূজা করতাম, নবগ্রহ দেবতাকে পূজা করতাম, যেমনটা সত্যযুগেও হতো আজও তেমনই ভাবে পূজা করছি।
কোনো দেবদেবীর গুরুপরম্পরা থাকে এই কারণেই যে, ঐ নির্দিষ্ট দেবী বা দেবতার পরমত্ব যে সর্বোপরি তা সমাজে প্রচার প্রসার করে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য, তাদের দৃষ্টিকোণে সৃষ্টিরহস্য একমাত্র সত্য লাভের পথ, সেটি সমাজে প্রচলিত করবার জন্য, সেই দেবী বা দেবতার পূজার্চনা, সাধনা ইত্যাদি করবার সঠিক পদ্ধতি প্রচার করবার জন্য।
কিন্তু এই কারণে বহু এমন সম্প্রদায়ের জন্ম হয়েছ, যা প্রকৃত সনাতন জ্ঞানের বিপরীত ও অসঙ্গতিপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়ে মানুষকে ধর্মের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে ভুল পথে পরিচালিত করে, ফলে মানুষ সনাতন ধর্মের সঠিক আচার নিয়ম বিধি-বিধান থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। এর ফলে ধীরে ধীরে অজ্ঞানতা গ্রাস করে সমাজকে, আর এরই সুযোগ নিয়ে ধর্মবিদ্বেষী অপপ্রচারকারীরা সনাতন ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে।
এই কারণে প্রত্যেক মতবাদ ও সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্তকে বিচার বিশ্লেষণ করে সত্যকে উপস্থাপন করবার বিধান স্বয়ং সনাতন ধর্ম আমাদের সকলকে অধিকার হিসেবে দিয়েছেন। কিন্তু তা অবশ্যই সঠিক শাস্ত্রীয় গুরুপরম্পরাগত ক্রমে দীক্ষিত ও শিক্ষাপ্রাপ্ত আচার্য গুরুদেবের সিদ্ধান্ত হতে হবে। যারা হঠাৎ ই একটা নব্য মতবাদ সিদ্ধান্তের উদয় ঘটিয়ে নিজেদের সম্প্রদায় বানিয়ে গুরু শিষ্য পরম্পরা আরম্ভ করে প্রাচীন শাস্ত্র সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিপরীত সিদ্ধান্ত দেন তাদের সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য কি না তা নিয়ে বিচার বিশ্লেষন করা অবশ্যই ন্যায় ও ধর্মসম্মত কার্য।
আর এই কারণেই বৈষ্ণবদের সবচেয়ে পুরাতন ও প্রথম পরম্পরা ‘রামানুজের শ্রীবৈষ্ণব সম্প্রদায়’ -এর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু তা নিয়ে আলোচনা করা হল।
যাতে সমাজের মানুষ এদের নব্য সিদ্ধান্তকে সনাতন ধর্মের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও একমাত্র সিদ্ধান্ত বলে ভেবে নিয়ে অন্ধকার মার্গে না চলে যায়।
বিষ্ণু পূজা ও বিষ্ণুভক্তি করা শাস্ত্রসম্মত, কিন্তু ভগবান বিষ্ণুর নামে নব্য গুরুপরম্পরা তৈরী করে অসঙ্গতিপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রচার করা কখনোই শাস্ত্রসম্মত নয়, গ্রহণযোগ্যও নয়।
__________________________________________________
🔶 অন্তিম সিদ্ধান্ত 🔶
শৈবপরম্পরা সম্পূর্ণভাবে শাস্ত্রসম্মত এবং শৈবপরম্পরাগুলির উল্লেখ শাস্ত্রে রয়েছে এমনকি আচার্য ক্রমও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু শ্রীবৈষ্ণবদের এমন কোনো প্রামাণিকতা নেই। শাস্ত্রপ্রমাণহীন, শাস্ত্রে উল্লেখহীন গুরুপরম্পরাহীন শ্রীবৈষ্ণব সম্প্রদায়ের যে কোনো নব্য সিদ্ধান্ত, নব্য ভাষ্য অগ্রহণযোগ্য তথা সর্বদা পরিত্যাজ্য। কারণ, যেখানে গুরুপরম্পরারই অস্তিত্ব নেই সেখানে পরবর্তীকালের ভাষ্যের কোনো গ্রহণযোগ্যতাই থাকে না।
শৈবপরম্পরাই সনাতন ধর্মের সবচেয়ে প্রাচীনতম এক ও অদ্বিতীয় গুরুপরম্পরা। এক্ষেত্রে শ্রীবৈষ্ণব সম্প্রদায় অবার্চীন, নবীন ও গৌণ সম্প্রদায় মাত্র।
__________________________________________________
✍️ সত্য উন্মোচনে — শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
#বৈষ্ণবমতখণ্ডন #ভণ্ডবৈষ্ণবদমন #বৈষ্ণবমতবাদখণ্ডন #বৈষ্ণবদেরভণ্ডামীফাঁস #বিশিষ্টাদ্বৈতবাদেরখণ্ডন #শিবালয় #শিবধর্ম #সনাতনধর্ম #Shivalaya #রামানুজমতখণ্ডন #শ্রীবৈষ্ণবপরম্পরাখণ্ডন


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন