কাশী তে মৃত্যুকালে জীবের কানে শিব কি রাম নামের দীক্ষা দেন ?

 

ভূমিকা — 

মোক্ষপুরী কাশী বারাণসীর মাহাত্ম্য সবচেয়ে বড়। কারণ একমাত্র এই স্থানেই জিভের কোন রকমের চেষ্টা ছাড়াই শুধুমাত্র এখানে বসবাস করবার মাধ্যমে মৃত্যু হলে সরাসরি মোক্ষ লাভ করা যায়, একথা স্বয়ং পরমেশ্বর শিব বলেছেন। যখন কোন মানুষ কাশী মহাতীর্থে থেকে প্রাণ ত্যাগ করে, সেই মুহূর্তে পরমেশ্বর শিব এসে তার কানে মহামন্ত্র উপদেশ করে দীক্ষা দিয়ে দেন, ফলে সেই জীব ঈশ্বর তত্ত্ব সম্পর্কে জেনে জ্ঞানী হয়ে ওঠেন। ফলে তৎক্ষণাৎ তিনি মোক্ষ লাভ করেন। 

বর্তমানে বৈষ্ণবেরা নিজেদের আরাধ্য দেবতা শ্রীহরির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য ‘মৃত্যুকালে জীবের কানে শিবের দেওয়া মহামন্ত্র’-কে কেন্দ্র করে দাবী করতে থাকে যে, কাশীতে যেসব মানুষের মৃত্যু হয়, শিব এসে তাদের কানে নাকি ‘রাম’নাম বলে রাম নামের দীক্ষা দিয়ে রাম নামের দ্বারাই মুক্তি দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ বৈষ্ণবদের দাবীতে সহজেই বোঝা যাচ্ছে যে, বৈষ্ণবেরা বলতে চায় প্রভু শিব মুক্তি প্রদান করে শ্রী হরির মাধ্যমেই, সবকিছুই শ্রী হরি লীলা, শিবের কোনো ক্ষমতা নেই, ঐ হরিনাম‌ই মহামন্ত্র - কাশীতে যে মুক্তি শিব দিয়ে থাকেন সেটি ঐ হরিনামের  দ্বারাই সম্ভব, এছাড়া আর কোনো উপায় নেই- এমনটাই হল বৈষ্ণবদের ধারণা। তাই বৈষ্ণবেরা এমন ধরণের দাবী করে থাকেন সমাজের মানুষের সামনে। কিন্তু এটি কতটুকু সত্য ? - এ বিষয়ে সঠিক শাস্ত্র প্রমাণ উল্লেখ করে আমি তথ্য উপস্থাপন করেছি।‌ 




শিবমহাপুরাণে বলা হয়েছে — 

প্রণবঃ সর্ববেদাদিঃ প্রণবঃ শিববাচকঃ।
মন্ত্রাধিরাজরাজশ্চ মহাবীজং মনুঃ পরঃ ॥ ৬০

শিবো বা প্রণবো হ্যেষ প্রণবো বা শিবঃ স্মৃতঃ।
বাচ্যবাচকয়োর্ভে‌দো নাত্যন্তং বিদ্যতে যতঃ ॥ ৬১

এনমেব মহামন্ত্রং জীবানাং চ তনুত্যজাম্।
কাশ্যাং সংশ্রাব্য মরণে দত্তে মুক্তিং পরাং শিবঃ ॥ ৬২

তস্মাদেকাক্ষরং দেবং শিবং পরমকারণম্‌।
উপাসতে যতিশ্রেষ্ঠা হৃদয়াম্ভোজমধ্যগম্ ॥ ৬৩

[শিবমহাপুরাণ/কৈলাসসংহিতা/১৩নং অধ্যায়/৬০-৬৩ নং শ্লোক]

🔴 অর্থ  —  সম্পূর্ণ বেদের আদি হল - প্রণব (ॐ) তথা শিবের (পরমেশ্বরের) বাচক‌ও হল - প্রণবই। এটি শ্রেষ্ঠ মন্ত্র অনান্য মন্ত্রের রাজাধিরাজ তথা মহাবীজ স্বরূপ।

 প্রণব-ই শিব আর শিব‌-ই প্রণব বলে জানা উচিত । কারণ বাচক আর বাচ্যের মধ্যে কোনো ভেদ নেই। 

শিব এই (প্রণব) মহামন্ত্রটিরই উপদেশ (দীক্ষা) দিয়ে কাশীতে মৃত্যুর সময় জীবদের পরামুক্তি প্রদান করেন।
এই কারণেই একাক্ষররূপ, দিব্য, মঙ্গলময় ও পরম কারণস্বরূপ এই মন্ত্রের উপাসনাই শ্রেষ্ঠ যতিগণ (বৈরাগীরা) হৃদয়-কমলের মধ্যে উপসনা করেন।


দেখুন, প্রণব প্রকৃতপক্ষে কে ?

উত্তর এইখানে ক্লিক করে দেখুন 👇

ॐ-কার একমাত্র পরমেশ্বর শিব, অন্য আর কেউ নয় 


এবার বৈষ্ণবদের পদ্মপুরাণ থেকেই দেখুন কাশীতে জীবের মৃত্যুর পর কেমন গতি লাভ হয় 👇 

যে চাপি পাপান্বিতমায়িনো নরাঃ 

পরান্নবস্ত্রাদিবধূভূজশ্চ ।

বারাণসীমৃত্যুপরাশ্চ যে বৈ 

শ্রীশৈলমর্ত্যাশ্চ ন তে বিচার্য্যাঃ ॥ ১৪৪

যুকাশ্চ দংশা অপি মৎকুণাশ্চ 

মৃগাদয়ঃ কীটপিপীলিকাশ্চ । 

সরীসৃপা বৃশ্চিকশূকরাশ্চ 

কাশীমৃতাঃ শঙ্করমাপ্নুবন্তি ॥ ১৪৫

[নবভারত প্রকাশিত পদ্মপুরাণ/পাতালখণ্ড/৬৭ অধ্যায়/১৪৪-১৪৫ নং শ্লোক]

অর্থ — যারা কাশীধামে প্রাণত্যাগ করে, তারা কপটাচারী পাপী ? পরদ্রব্য ও পরবধূর হরণকারী হলেও শ্রীশৈলের (উদাহরণ স্বরূপ শ্রীশৈল পর্বতবাসীদের মতো) মানুষ বলে মনে করা উচিত, তাদের সম্বন্ধে বিচার্য কিছুই নেই ॥ ১৪৪

কাশীধামে মৃত্যু হলে যূক (উকুন), মৎকুণ (ছারপোকা), মশক (মশা), পিপীলিকা (পিঁপড়া), মৃগ (হরিণ) ইত্যাদি অনান্য পশু, সরীসৃপ, বৃশ্চিক (বিছে) ও শূকর ইত্যাদি সকল যত রকমের জীব আছে তারা সকলে শঙ্করত্ব (শিবত্ব) প্রাপ্ত হয় ॥১৪৫


দেখুন কাশীধামে দেহতরাগ করে যে কোনো ধরনের জীব শিবত্ব‌ই লাভ করে, একথা স্বয়ং বৈষ্ণবদের পদ্মপুরাণ বলছে। সুতরাং কাশীধামে মৃত্যু কালে জীবের কানে প্রভু শিব এসে অযোধ্যাপতি রামের নাম বলেন না, বরং শিবনাম‌ই উপদেশ করে জ্ঞান প্রদান করে পাপ নাশ করে শিবত্ব দেন, ফলে সেই জীব শিবে লীন হয়ে চিরকালের মতো জন্য মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হয়ে মোক্ষলাভ করেন।


শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩 

ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩 


লেখনীতে — ©শ্রী নন্দীনাথ শৈব আচার্য জী 

কপিরাইট ও প্রচারে — Shivalaya 



মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ