সত্যার্থ প্রকাশ পুস্তকের অন্তর্গত “পঞ্চম সমুল্লাস” -এর খণ্ডন — মিথ্যার্থ প্রকাশ
সত্যার্থ প্রকাশ ষষ্ট সমুল্লাস খণ্ডন — মিথ্যার্থ প্রকাশ
আর্যসমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর লেখা সত্যার্থ প্রকাশ পুস্তকের খণ্ডন —
সনাতন ধর্মের সর্বপ্রাচীন এক ও অদ্বিতীয় গুরুপরম্পরা হল - মহাপাশুপত শৈব পরম্পরা, সেই মহাপাশুপতের ধারা শৈব অবধূত পরম্পরার বর্তমান মহামান্য আচার্য শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্যদেব জী স্বয়ং লিখিত আকারে পঞ্চম সমুল্লাসের খণ্ডন উপস্থাপন করলেন। SHIVALAYA শৈব সংগঠনের পক্ষ থেকে সমগ্র বাংলাতে এই সর্ব প্রথমবার প্রকাশ করা হল “সত্যার্থ প্রকাশ পুস্তকের খণ্ডন” সমন্বিত — মিথ্যার্থ প্রকাশ
অথ মিথ্যার্থ প্রকাশ — সত্যার্থ প্রকাশের অন্তর্গত পঞ্চম সমুল্লাস ও তার খণ্ডন
॥ ॐ গণেশায় নমঃ । ॐ শ্রীগুরুভ্যো নমঃ । ॐ নমঃ শিবায় ॥
সত্যার্থ প্রকাশের অন্তর্গত পঞ্চম সমুল্লাসের খণ্ডন
॥ সন্ন্যাস বিধি প্রকরণ ॥
🟪(১) দয়ানন্দ সরস্বতীর প্রথম দাবী (১)🟪
বনেষু চ বিহৃত্যৈবং তৃতীযং ভাগমাযুষঃ ।
চতুর্থমাযুষো ভাগং ত্যাক্ত্বা সঙ্গান্ পরিব্রজেৎ ।। মনু (৬। ৩৩)
এইরূপে বনে আয়ুর তৃতীয় ভাগ অর্থাৎ পঞ্চাশৎ বর্ষ হইতে পঞ্চ সপ্ততি বর্ষ বয়স পর্য্যন্ত বানপ্রস্থ থাকিয়া আয়ুর চতুর্থ ভাগে সঙ্গত্যাগ করিয়া পরিব্রাট্ অর্থাৎ সন্ন্যাসী হইবে।
প্রশ্নঃ- গৃহাশ্রম ও বানপ্রস্থাশ্রমে প্রবেশ না করিয়া সন্ন্যাসাশ্রম করিলে পাপ হয় কি না?
উত্তরঃ- হয়, নাও হয় ।
প্রশ্নঃ- এই দুই প্রকারের কথা বলিতেছেন কেন?
উত্তরঃ- দুই প্রকার নহে। যে বাল্যাবস্থায় বিরক্ত হইয়া বিষয়াসক্ত হয়, সে মহাপাপী, আর যে আসক্ত হয় না, সে মহা পুণ্যাত্মা সৎপুরুষ ।
❌ দয়ানন্দ সরস্বতীর ১ম দাবীর খণ্ডন (শৈব পক্ষ থেকে) — এখন দয়ানন্দের লেখা থেকে দয়ানন্দের সন্ন্যাসী হওয়ার পরীক্ষা করা যাক, এখন দয়ানন্দের নিজের লেখার মাধ্যমেই তাঁর সন্ন্যাসী হওয়ার পরীক্ষা করা যাক। আপনি ৭৫ বছরের পূর্বেই সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন, অথচ বিষয়-আসক্তি ত্যাগ করেননি — তাহলে বিষয়ভোগে আসক্ত থাকার ফলে আপনার পাপই হয়েছে। আপনি ভোগ-বিলাসের সমস্ত ব্যবস্থা করেছিলেন — পালঙ্কে শয়ন করতেন, বড় বড় বালিশ ব্যবহার করতেন, নানান রকম সুস্বাদু খাবার খেতেন, নিজের পা নিজে না ধুয়ে, সেই কাজের জন্য আলাদা চাকর বা দাস রাখতেন। চাটনি, মোরব্বা, পুরি, হালুয়া ছাড়া আপনার খাবার খেতে ভালো লাগতো না। দুশালা জড়াতেন, হুক্কা পান করতেন, পায়ে বিলায়তি জুতো, ঘড়ি ইত্যাদি ব্যবহার করতেন। স্বার্থসিদ্ধির জন্য খ্রিস্টানদের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন, এবং যেখানে থাকতেন, সেখানেও কোঠি-বাংলোতেই থাকতেন — ইত্যাদি।
এই সব ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থাকার কারণে আপনার পাপই হয়েছে।
__________________________________________________
🟪(২) দয়ানন্দ সরস্বতীর দ্বিতীয় দাবী (২)🟪
🔸সত্যার্থ প্রকাশ পঞ্চম সমুল্লাসের ৮৯ পৃষ্ঠায় দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন,
নাবিরতো দুশ্চরিতান্নাশান্তো নাসমাহিতঃ।
নাশান্তমানসো বাপি প্রজ্ঞানেনৈনমা প্নুয়াৎ ॥ ~ কঠ বল্লী ২ । মন্ত্র ২৪)
যে ব্যক্তি দুরাচার হইতে বিরত হয় নাই, যাহার মধ্যে শান্তি নাই, যাহার আত্মা যোগী নহে এবং যাহার মন শান্ত নহে, সে ব্যক্তি সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়াও প্রজ্ঞান দ্বারা পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হয় না।
❌ দয়ানন্দ সরস্বতীর ২য় দাবীর খণ্ডন (শৈব পক্ষ থেকে) — স্বামীজি, আপনার মধ্যে তো শান্তির নামমাত্রও ছিল না। কেউ আপনার বিরুদ্ধে কিছু বললেই সঙ্গে সঙ্গে তাকে উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গালিগালাজ শুরু করতেন। আপনার এই সত্যার্থ প্রকাশ গ্রন্থটিকেই উদাহরণ হিসেবে ধরুন — দ্বিতীয়, তৃতীয় ও একাদশ সমুল্লাসে গালিগালাজে ভরিয়ে রেখেছেন। আপনার আত্মাও যোগী ছিল না, কারণ যখন চিত্তের বৃত্তিই শান্ত হয়নি, তখন আত্মায় যোগ কোথা থেকে হবে ? আপনার মনও শান্ত ছিল না — কোথাও একরকম লিখেছেন, কোথাও আরেকরকম ; সবসময় উল্টো কথা বলার মতো আচরণ করেছেন, অনেকটা সেই থুতু ফেলে সেই থুতু কে চেটে নেবার মতো বিষয়টা আপনার। এই কারণে আপনার সন্ন্যাস গ্রহণ সম্পূর্ণই ব্যর্থ হয়েছে।
__________________________________________________
🟪(৩) দয়ানন্দ সরস্বতীর তৃতীয় দাবী (৩)🟪
🔸সত্যার্থ প্রকাশ পঞ্চম সমুল্লাসের ৯০ পৃষ্ঠায় দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন,
অবিদ্যায়ামন্তরে বর্তমানঃ স্বয়ং ধীরাঃ পণ্ডিতন্মন্যমানাঃ। জঘন্যামানাঃ পরিয়ন্তি মূঢা অন্ধৈনৈব নীয়মানা য়থান্ধাঃ ॥ ১॥
মু ০১। খণ্ড ২। ম০৮।
যাহারা অবিদ্যার মধ্যে ক্রীড়া করে এবং নিজেদের ধীর ও পণ্ডিত মনে করে তাহারা নীচ গতি প্রাপ্ত হয়। সেই মুঢ়গণ, অন্ধ যেমন অন্ধের পশ্চাতে যাইয়া দুর্দশাগ্রস্ত হয়, সেইরূপ দুঃখ ভোগ করিয়া থাকে ॥১॥
❌ দয়ানন্দ সরস্বতীর ৩য় দাবীর খণ্ডন (শৈব পক্ষ থেকে) — স্বামীজির মধ্যে পণ্ডিত-অভিমানও কম ছিল না। দেখুন, তৃতীয় সমুল্লাসেই বিদ্যার অহংকারে তিনি ব্রহ্মা থেকে জৈমিনি পর্যন্ত আচার্যদের গ্রন্থে ত্রুটি দেখিয়েছেন। যাঁদের সম্পর্কে নিজেই লিখেছেন যে তাঁরা মহাপণ্ডিত, সর্বশাস্ত্রবিদ এবং ধর্মাত্মা — তাঁদেরই গ্রন্থে আবার বেদবিরুদ্ধতা আরোপ করেছেন। এমনকি ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোকেও বেদবিরুদ্ধ বলেছেন।
যাঁরা সর্বশাস্ত্রবিদ মহাত্মা এবং বেদের অর্থ যথাযথভাবে জানতেন, তাঁদের ব্যাখ্যাকেও আপনি ভুল বলেছেন। তাই এই শ্রুতি আপনার ওপরই প্রযোজ্য। আপনার মতো লোকের এমন অবস্থাই হওয়া উচিত। আর আপনি তো সত্যিই অন্ধেরই চেলা — তাই তার লক্ষণ আপনার মধ্যে থাকা স্বাভাবিক। এই শ্রুতি আপনার ওপর সম্পূর্ণরূপে খাটে।
_________________________________________________
🟪(৪) দয়ানন্দ সরস্বতীর চতুর্থ দাবী (৪)🟪
🔸সত্যার্থ প্রকাশ পঞ্চম সমুল্লাসের ৯০ পৃষ্ঠায় দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন,
বেদান্তবিজ্ঞানসু নিশ্চিতার্থাঃ সংন্যাসয়োগাদ্যতয়ঃ শুদ্ধসত্বাঃ। তে ব্রহ্মলোকেষু পরান্তকালে পরামৃতাঃ পরিমূচ্যন্তি সর্বে॥ ॥ মুণ্ড ৩। খ০২।৬
যাঁহারা 'বেদান্ত' অর্থাৎ পরমেশ্বর প্রতিপাদক বেদমন্ত্রের অর্থজ্ঞান এবং তদনুকূল আচারে দৃঢ় নিশ্চয় এবং যাঁহারা সন্ন্যাস যোগ দ্বারা শুদ্ধান্তঃকরণ সন্ন্যাসী হন, তাঁহারা পরমেশ্বরে মুক্তিসুখ প্রাপ্ত হইয়া ভোগের পর মুক্তিসুখের সীমা শেষ হইলে সে স্থান হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া পুনরায় সংসারে আগমন করেন। মুক্তি ব্যতীত দুঃখের নাশ হয় না।
__________________________________________________
🟪(৫) দয়ানন্দ সরস্বতীর পঞ্চম দাবী (৫)🟪
🔸সত্যার্থ প্রকাশ পঞ্চম সমুল্লাসের ৯১ পৃষ্ঠায় দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন,
লোকৈষণায়াশ্চ বিত্তৈষণায়াশ্চ পুত্রৈষণায়াশ্চোত্থায়াথ ভৈক্ষচয়ং চরন্তি ॥ শত০ কা০ ১৪৷৷
লোক-প্রতিষ্ঠা বা লাভ, ঐশ্বর্য্যজনিত ভোগ-সম্মান এবং পুত্রাদির মোহ হইতে দূরে থাকিয়া সন্ন্যাসীগণ ভিক্ষুক হইয়া দিবারাত্র মোক্ষসাধনে তৎপর থাকেন।
❌ দয়ানন্দ সরস্বতীর ৫ম দাবীর খণ্ডন (শৈব পক্ষ থেকে) — দয়ানন্দ কেবল নামমাত্র সন্ন্যাসী — এ কথা তাঁর এই লেখাতেই প্রমাণিত হয়। কারণ, স্বামীজীর মধ্যে এই সকল ইচ্ছা অত্যন্ত প্রবলভাবে ভরপুর ছিল।
দেখুন, লোকৈষণা বলতে বোঝায়, লোক নিন্দা করুক বা প্রশংসা করুক, কিংবা অপমান করুক — যার চিত্তে কোনো হর্ষ (আনন্দ) বা শোক জন্মায় না, সেই-ই প্রকৃত সন্ন্যাসী হওয়ার যোগ্য। কিন্তু স্বামীজী কে যদি কেউ নিন্দা করে, তবে তিনি কতটা দুঃখ পান—তা স্পষ্ট; সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে প্রস্তুত হয়ে গালিগালাজ শুরু করেন।
বিত্তৈষণার ত্যাগও আপনার মধ্যে দেখা যায় না। অর্থের প্রতি আপনার আকাঙ্ক্ষা এতটাই ছিল যে তা কখনো পূর্ণ হতো না। অর্থলাভের জন্য নানা রকম প্রচেষ্টা করেছেন — ভিক্ষা করে নিজের ব্যক্তিগত মুদ্রণালয় (প্রেস) প্রতিষ্ঠা করেছেন। তারপরও বইয়ের মূল্য দ্বিগুণ-তিনগুণ নির্ধারণ করেছেন। আপনার বই অন্য কেউ ছাপতে না পারে, সেই জন্য তার রেজিস্ট্রি করিয়েছেন। বই বিক্রির মাধ্যমে অর্থ আসার পরও ব্যাকরণের বই ছাপানোর জন্য আবার অর্থসাহায্য নিয়েছেন।
‘উপদেশ মণ্ডলী’-র নামে এক লক্ষ টাকা সংগ্রহের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে। আপনার মনে লোভ এতটাই ছিল যে ধনবান ও পুঁজিপতিদের সঙ্গে স্নেহসহকারে দীর্ঘ সময় কথা বলতেন, খ্রিস্টান মিশনারি সভা ও ইংরেজি দপ্তরে ঘোরাফেরা করতেন, কিন্তু দরিদ্রদের প্রতি তেমন কোনো গুরুত্ব দিতেন না। আপনি এতটাই প্রতিষ্ঠা (খ্যাতি) কামনা করতেন যে কোঠি, বাংলো ও প্রাসাদেই অবস্থান করতেন।
আপনার নিজের পুত্র না থাকলেও প্রধান সেবক-সহকারীদের প্রতি আপনি স্নেহ প্রদর্শন করতেন এবং তাদের সুখ-দুঃখে হর্ষ-শোক প্রকাশ করতেন। কারণ আপনি নিজেই পৃষ্ঠা ৯৪-এ লিখেছেন যে দেহধারী কেউই সুখ-দুঃখ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকতে পারে না।
অতএব, আপনি তিন প্রকার এষণা (লোকৈষণা, বিত্তৈষণা, পুত্রৈষণা) থেকে মুক্ত নন—এই কারণে আপনি প্রকৃত সন্ন্যাসীও নন। কারণ এই তিনটি এষণাকে জয় করতে পারে কেবল সেই ব্যক্তি, যার সঙ্গে সংসারের কোনো প্রকার লেনদেন বা সম্পর্ক থাকে না।”
__________________________________________________
🟪(৬) দয়ানন্দ সরস্বতীর ষষ্ঠ দাবী (৬)🟪
🔸সত্যার্থ প্রকাশ পঞ্চম সমুল্লাসের ৯১ পৃষ্ঠায় দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন,
প্রাজাপত্যাং নিরূপ্যেষ্টিং সর্ববেদসদক্ষিণাম্।
আত্মন্যগ্নীন্ সমারোপ্য ব্রাহ্মণঃ প্রব্রজেদ গৃহাৎ॥ ১॥
প্রজাপতি অর্থাৎ পরমেশ্বর প্রাপ্তির জন্য ইষ্টি অর্থাৎ যজ্ঞ করিয়া তাহাতে যজ্ঞোপবীত শিখাদি চিহ্ন বিসর্জন করিবে। আহবনীয়াদি পাঁচ অগ্নিতে প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান এবং সমান- এই পঞ্চ প্রাণে আরোপণ করিয়া ব্রহ্মহ্মবিদ্ ব্রাহ্মণ গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া সন্ন্যাসী হইবে।[১]
❌ দয়ানন্দ সরস্বতীর ৬ষ্ঠ দাবীর খণ্ডন (শৈব পক্ষ থেকে) — দয়ানন্দের এই ব্যাখ্যাও ভুল। এখানে তিনি ‘সর্ব বেদস্’-এর অর্থ যজ্ঞোপবীত ইত্যাদি করেছেন, অথচ এর প্রকৃত অর্থ ‘সর্বস্ব’। এখানে প্রজাপত্য ইষ্টির দক্ষিণা হিসেবে ‘সর্ব বেদস্’ বলা হয়েছে। এখন নিজেই বিচার করে দেখুন — উক্ত ইষ্টির দক্ষিণা কি ‘সর্বস্ব’ হতে পারে, না কি যজ্ঞোপবীতাদি ? যার সামান্যও বুদ্ধি আছে, সে অবশ্যই ‘সর্বস্ব’-ই বলবে।
কারণ বৈরাগ্য ভাব ছাড়া বাহ্যিক সন্ন্যাস গ্রহণ অর্থহীন। আর যে ব্যক্তি ধন-সম্পদসহ সমস্ত বস্তু ত্যাগ করেনি, তার মধ্যে বৈরাগ্য কোথায় ?
__________________________________________________
🟪(৭) দয়ানন্দ সরস্বতীর সপ্তম দাবী (৭)🟪
🔸সত্যার্থ প্রকাশ পঞ্চম সমুল্লাসের ৯২ পৃষ্ঠায় দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন,
ইন্দ্রিয়সমূহকে অধর্মাচরণ হইতে নিবৃত্ত করিয়া রাগদ্বেষ পরিত্যাগ পূর্বক সকল প্রাণীর প্রতি নির্বৈর থাকিয়া মোক্ষের জন্য সামর্থ্য বৃদ্ধি করিতে থাকিবে ॥ ৫ ॥
❌ দয়ানন্দ সরস্বতীর ৭ম দাবীর খণ্ডন (শৈব পক্ষ থেকে) — স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী জীর মধ্যে বিদ্যা-জ্ঞান, বৈরাগ্য এবং ইন্দ্রিয়জয় — এই গুণগুলিও ছিল না। তাঁর মধ্যে বিষয়ভোগের আকাঙ্ক্ষা প্রবল ছিল। যদি তাঁর বিদ্যা ও জ্ঞান যথার্থ হতো, তবে তিনি কেন পরস্পরবিরোধী, শাস্ত্রবিরুদ্ধ এবং যুক্তিহীন লেখা লিখতেন ?
যদি তাঁর মধ্যে বৈরাগ্য থাকত, তবে ধন-সম্পদ প্রভৃতি বস্তুতে আসক্তি কেন থাকতো ? আর যদি বিষয়ভোগের ইচ্ছা না থাকত, তবে উৎকৃষ্ট খাদ্য ও বস্ত্রের প্রতি তাঁর আকর্ষণই বা কেন থাকতো ?
__________________________________________________
🟪(৮) দয়ানন্দ সরস্বতীর অষ্টম দাবী (৮)🟪
🔸সত্যার্থ প্রকাশ পঞ্চম সমুল্লাসের ৯৩ পৃষ্ঠায় দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন,
“ সকল পদার্থে নিস্পৃহ ”
❌ দয়ানন্দ সরস্বতীর ৮ম দাবীর খণ্ডন (শৈব পক্ষ থেকে) — আর্য সমাজ ছাড়া তো আপনার সর্বত্রই বিরোধ ছিল, এবং প্রাচীন আচার্যদের জন্য আপনি কত রকমের দুর্বাক্য ব্যবহার করেছেন। এমনকি আপনি আপ্তপুরুষদের গ্রন্থগুলোরও অপমান করেছেন। অতএব, আপনি প্রকৃত সন্ন্যাসী ছিলেন না।
_________________________________________________
🟪(৯) দয়ানন্দ সরস্বতীর নবম দাবী (৯)🟪
🔸সত্যার্থ প্রকাশ পঞ্চম সমুল্লাসের ৯২ পৃষ্ঠায় দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন,
কোন স্থানে উপদেশ অথবা কথোপকথন কালে কেহ সন্ন্যাসীর প্রতি ক্রুদ্ধ হইলে অথবা তাহার নিন্দা করিলে, তৎপ্রতি ক্রোধ প্রকাশ না করিয়া তাহার কল্যাণার্থ উপদেশ প্রদান করা সন্ন্যাসীর কর্তব্য।
❌ দয়ানন্দ সরস্বতীর ৯ম দাবীর খণ্ডন (শৈব পক্ষ থেকে) — স্বামীজি এই কথা লিখে রেখেছেন ঠিকই, কিন্তু কখনো কি তা পালনও করেছেন? কেউ আপনার উপর ক্রোধ করলেও আপনি তার উপর ক্রোধ করবেন না—এটা অসম্ভব। এমনকি যারা আপনার সেবায় নিয়োজিত থাকত, তাদের হৃদয়ও আপনার ক্রোধাগ্নিতে যেন দগ্ধ হয়ে যেত। কেউ আপনার দোষকে দোষ বললে তাকেও আপনি তিরস্কার করতেন।
আপনার রচিত শাস্ত্রার্থের গ্রন্থগুলিতে এর শত শত উদাহরণ বিদ্যমান। আপনি নির্দ্বিধায় গালিগালাজ করতেন—আপনার সত্যার্থ প্রকাশ গ্রন্থেই তা দেখা যায়। আর ক্রোধ ছাড়া কেউ গালিগালাজ করে না—এ থেকে স্পষ্ট হয় যে আপনি কেবল নামমাত্র সন্ন্যাসী ছিলেন।”
__________________________________________________
🟪(১০) দয়ানন্দ সরস্বতীর দশম দাবী (১০)🟪
🔸সত্যার্থ প্রকাশ পঞ্চম সমুল্লাসের ৯৫ পৃষ্ঠায় দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন,
সম্য নিত্যমাস্তে য়স্মিন, য়দ বা সম্যঙ ন্যস্যন্তি দুঃখানি কমাণি য়েন স সন্ন্যাসঃ, স প্রশস্তো বিদ্যতে য়স্য স সন্ন্যাসী' যাহা ব্রহ্মে আছে এবং যদ্দারা দুষ্ট কর্মসমূহ পরিত্যক্ত হয়, যিনি সেই উত্তম স্বভাব বিশিষ্ট তাঁহাকে সন্ন্যাসী বলে। অতএব যিনি উত্তম কর্ম করেন এবং কুকর্ম সমূহের নাশ করেন, তাঁহাকে সন্ন্যাসী বলে।
❌ দয়ানন্দ সরস্বতীর ১০ম দাবীর খণ্ডন (শৈব পক্ষ থেকে) — বাহ, কী ব্যাখ্যা করেছেন ! যদি দুষ্ট কর্ম ত্যাগ করার নামই সন্ন্যাস হয়, তাহলে তো সব সৎ আচরণসম্পন্ন গৃহস্থ মানুষই সন্ন্যাসী হয়ে যায়। তাহলে তো সকল সৎ চরিত্রের মানুষ ঘরে বসেই সন্ন্যাসী হয়ে যেতে পারে। অতএব, আপনার এই মত ভুল।
শুনুন — যে ব্যক্তি সর্বস্ব ত্যাগ করেছে, অর্থাৎ যার সঙ্গে সংসারের কোনো প্রকার লেনদেন বা সম্পর্ক নেই, সেই-ই প্রকৃত সন্ন্যাসী।
__________________________________________________
🟪(১১) দয়ানন্দ সরস্বতীর একাদশ তম দাবী (১১)🟪
🔸সত্যার্থ প্রকাশ পঞ্চম সমুল্লাসের ৯৬ পৃষ্ঠায় দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন,
“ দেখ মনু বলিয়াছেন:-
বিবিধানি চ রত্নানি বিবিক্তেষূপপাদয়েৎ। মনু০১১
নানাবিধ রত্ন ও সুবর্ণ প্রভৃতি ধন (বিবিক্ত) অর্থাৎ সন্ন্যাসীকে দান করিবে ”
❌ দয়ানন্দ সরস্বতীর ১১শ তম দাবীর খণ্ডন (শৈব পক্ষ থেকে) — বাহ রে ধূর্তানন্দ, বাহ ! আপনার মনে অর্থের লোভ এমনভাবে বাসা বেঁধেছে যে তার কোনো তৃপ্তিই নেই। মানুষের কাছ থেকে বেশি বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য আপনি এই ছল-কপট রচনা করেছেন — মনুস্মৃতির নামে একটি মিথ্যা শ্লোক কল্পনা করে নিয়েছেন। পুরো মনুস্মৃতি খুঁজেও এই শ্লোক কোথাও পাওয়া যাবে না।
মনুসংহিতার নামে দয়ানন্দের লেখা এই কাল্পনিক শ্লোকের বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য কিছু দয়ানন্দী আর্যসমাজী এই বিষয়ে উত্তরে দিতে এসে বলেন যে দয়ানন্দ সরস্বতী জী নাকি এই শ্লোকের ভাব থেকে এমন একটি শ্লোক কল্পনা করেছেন মাত্র, এসব বৃথা চেষ্টা মাত্র। দয়ানন্দ সরস্বতী জী আপনি যে ধনসম্পত্তির লোভী ছিলেন তা আপনার এই বানোয়াট শ্লোক দেখেই স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়ে গেল।
অন্য় একটি শ্লোক মনু স্মৃতির উক্ত অধ্যায়ে আছে।
দেখুন -
ধনানি তু যথাশক্তি বিপ্রেষু প্রতিপাদয়েৎ ।
বেদবিৎসু বিবিক্তেষু প্রেত্য স্বর্গং সমশ্রুতে ॥
[মনুস্মৃতি/১১ অধ্যায়/৬ নং শ্লোক]
অর্থ : যে ব্রাহ্মণ বেদজ্ঞ এবং গার্হস্থ্য জীবনযাপন করেন, এমন ব্রাহ্মণদেরকে যথাশক্তি দান-দক্ষিণা প্রদান করা উচিত। এ ধরনের ব্রাহ্মণদের দান করলে দেহত্যাগের পর স্বর্গলাভ হয়।
প্রথমে তো কেউ এই স্বামীজীকে জিজ্ঞাসা করুক, তাঁর কি বাবার রাজত্ব চলছে নাকি যে যখন ইচ্ছে তখনই উল্টোপাল্টা সংস্কৃত বানিয়ে সেটাকে তিনি মনুস্মৃতির শ্লোক বলে প্রচার করে দিচ্ছেন ? তাও এমন কথা কল্পনা করেছেন যা শাস্ত্রবিরুদ্ধ তো বটেই, এই শ্লোকের সঙ্গেও কোনো সম্পর্ক নেই।
বিদ্বান ব্যক্তিরা নিজেরাই বিচার করুন — এখানে কোথাও সন্ন্যাসীকে অর্থ (টাকা পয়সা) ডান করে দেওয়ার কথা বলা নেই। বরং বেদজ্ঞ বিপ্র অর্থাৎ ব্রাহ্মণদের, যারা বেদের জ্ঞান রাখেন, তাঁদেরই ধন-সম্পদ দান করার কথা বলা হয়েছে।
এখানে সন্ন্যাসীর কোনো প্রসঙ্গই নেই। দয়ানন্দ তো এমন এক আশ্চর্য কথা বলে ফেলেছেন, যা কোনো ধর্মশাস্ত্রেই লেখা নেই। সন্ন্যাসীর তো উচিত যে —
ঋণানি ত্রীণ্যপাকৃত্য মনো মোক্ষে নিবেশয়েৎ।
অনপাকৃত্য মোক্ষং তু সেবমানো ব্রজত্যধঃ ॥
[মনুস্মৃতি/৬ অধ্যায়/৩৫ নং শ্লোক]
অর্থ : এই তিন ঋণ (দেবঋণ, পিতৃঋণ ও ঋষিঋণ) থেকে মুক্ত হয়ে মনকে মোক্ষে নিবিষ্ট করা উচিত। এই তিন ঋণ থেকে মুক্ত না হয়ে যে মোক্ষ কামনা করে, অর্থাৎ সন্ন্যাস গ্রহণ করে, সে নরকে পতিত হয়।
স্বামীজী এই শ্লোকটি বিবেচনা করেননি।
আরো দেখুন —
এককালং চরেন্দ্রৈক্ষং ন প্রসজ্জেত বিস্তরে।
ভৈক্ষে প্রসক্তো হি যতির্বিষয়েষ্বপি সজ্জতি ॥
[মনুস্মৃতি/৬ অধ্যায়/৫৫ নং শ্লোক]
অর্থ : সন্ন্যাসীর উচিত দিনে একবার ভিক্ষা সংগ্রহ করে সেই দিয়েই নিজের জীবিকা নির্বাহ করা। তাকে একাধিকবার ভিক্ষা চাওয়ার প্রবৃত্তি থেকে দূরে থাকা উচিত।
একাধিকবার ভিক্ষা চাওয়ার লোভে পড়লে সন্ন্যাসী বিষয়-আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে — ঠিক স্বামীজীর মতো। আরো শুনুন —
অভিপূজিতলাভাংস্তু জুগুপ্সেতৈব সর্বশঃ।
অভিপূজিতলাভৈশ্চ যতির্মুক্তোঽপি বধ্যতে ॥
[মনুস্মৃতি/৬ অধ্যায়/৫৮ নং শ্লোক]
অর্থ : সন্ন্যাসীর উচিত সম্মানের সঙ্গে প্রাপ্ত সুস্বাদু ভিক্ষার প্রতিও উপেক্ষা করা, কারণ তার স্বাদে আসক্ত না হলেও তা যজমানের স্নেহবন্ধনে সন্ন্যাসীকে আবদ্ধ করে ফেলে।
কিন্তু স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী জীর ক্ষেত্রে প্রতিদিন নানাবিধ উৎকৃষ্ট আহার প্রস্তুত হতো। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, সন্ন্যাসীর উচিত গাছের নীচে মাটিতে শয়ন ও আসন করা, দিনে একবার আহার করা ইত্যাদি। যে ব্যক্তি সর্বস্ব ত্যাগ করেছে এবং যার সঙ্গে সংসারের কোনো সম্পর্ক নেই, তাকেই সন্ন্যাসী বলা হয়। কারণ বৈরাগ্য ছাড়া সন্ন্যাস হয় না, আর যে ধন-সম্পদ প্রভৃতি সব কিছু ত্যাগ করেনি, তার মধ্যে বৈরাগ্য কোথায়?
অতএব, যার ধন-সম্পদের প্রতি আসক্তি দূর হয়নি, সে সন্ন্যাসী হতে পারে না। যে সর্বস্ব ত্যাগ করেছে এবং যার সঙ্গে সংসারের কোনো সম্পর্ক নেই, সে নানা রকম রত্ন, সোনা ইত্যাদি ধন দিয়ে কী করবে? সন্ন্যাসীর কাছে তো এগুলো ধূলির মতোই। কিন্তু স্বামীজির মধ্যে এই লক্ষণগুলির একটি পর্যন্তও দেখা যায় না। এই কারণে তাঁর সন্ন্যাস গ্রহণ সম্পূর্ণই ব্যর্থ হয়েছে।
__________________________________________________
সকল পাঠকবৃন্দের উদ্দেশ্যে আমি বলছি - নিরপেক্ষ বিচারের দ্বারা যা সত্য, তার পক্ষ অবলম্বন করবেন ।
পরমেশ্বর শিবের কৃপায়, শৈব আচার্য তথা গুরুদেবের কৃপায় সত্যার্থ প্রকাশের পঞ্চম সমুল্লাস খণ্ডন সম্পূর্ণ করা হল।
তারিখ - 19/04/2026
সময় - 08 : 56 pm
পরবর্তী ৬ষ্ঠ সমুল্লাসের খণ্ডন বিষয়ক প্রবন্ধ টি দেখবার জন্য
এইখানে ক্লিক করুন 👇
সত্যার্থ প্রকাশ পুস্তকের অন্তর্গত “ ষষ্ঠ সমুল্লাস” -এর খণ্ডন — মিথ্যার্থ প্রকাশ
🚩ॐ নমঃ শিবায় 🚩 শ্রীনন্দীকেশ্বরায় নমঃ 🚩
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩 ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
------------------------ইতি সত্যার্থপ্রকাশান্তর্গত পঞ্চম সমুল্লাস খণ্ডন সমাপ্ত----------------------


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন