বিশিষ্টাদ্বৈতবাদবৈষ্ণবসিদ্ধান্তশৃঙ্গভঙ্গ 🔨

 

॥ ॐ নমঃ শিবায় ॥

#বিশিষ্টাদ্বৈতবাদবৈষ্ণবসিদ্ধান্তশৃঙ্গভঙ্গ 🔨

প্রথমত নব্য রামানুজী বৈষ্ণবেরা যে নৃসিংহপূর্বতাপনী উপনিষদে পরমেশ্বর শিবের মন্ত্রকে বিষ্ণুর বলে চালাতে গিয়ে অর্থে অনর্থ করেছেন, তার বিপক্ষে যে বিষ্ণুর অসর্বজ্ঞতা ও অল্পজ্ঞতার প্রমাণ বেদ থেকে দেওয়া হয়ে তা আপনারা খণ্ডাতে পারেননি,

আপনারা আমাদের দেওয়া একটি যুক্তি খণ্ডাতে পারেননি। শুধু এড়িয়ে গেছেন মাত্র। আর শেষে ”অ আ ক খ” লিখে শেষে খণ্ডন করে দিয়েছি বলে লিখে দিয়েছেন, এতে কি শৈবদের দেওয়া উত্তরের খণ্ডন হয়ে গেল ??
কত বড় ধূর্ত  আপনারা !
যাই হোক, আপনাদের অ আ কখ লেখার জবাব‌ও আমরা বেদ থেকেই দেবো।

পাঠকবৃন্দগণ দেখুন,


🚫 রামানুজী বৈষ্ণব দের দাবী - ১👇

🥀#ISSGTশৈবসিদ্ধান্তশৃঙ্গভঙ্গ🥀

নৃসিংহতাপনীশ্রুতি মন্ত্রের বৈষ্ণবীয় ভাষ্যে ইদানীং ISSGT এক শৈব ভ্রাতা আপত্তি করে তার বিরুদ্ধে খণ্ডন লেখেন। কিন্তু সেই পূর্বপক্ষবাদী শৈব ভ্রাতার খণ্ডন অধ্যয়ন করে উত্তরপক্ষবাদীগণের বোধ হয় যে তা মোটেও খণ্ডন ছিলো না। কারণ খণ্ডন বলতে বোঝায় পূর্বপক্ষবাদীর সিদ্ধান্তকে প্রথমে ভুল প্রমাণিত করে তৎপশ্চাৎ স্বীয় সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। পূর্বপক্ষবাদীগণ তাদের লেখনীতে মূলত এতোটুকু বিষয় তুলে ধরছে যে নৃসিংহতাপনী উপনিষদের মন্ত্রে যে সকল নাম দ্বারা ভগবান নৃসিংহদেবকে সম্বোধন করা হয়েছে তা মূলতঃ নৃসিংহ ভগবানকে নয় বরং শিবকে স্তুতি করা হয়েছে এবং নৃসিংহরূপ মূলতই শিবের প্রকাশ। নৃসিংহতাপনী উপনিষদের মন্ত্রে নৃসিংহদেবকে যে-

"ঋতং সত্যং পরং ব্রহ্ম পুরুষং নরকেশরিবিগ্রহং কৃষ্ণপিঙ্গলম্।
ঊর্ধ্বরেতং বিরূপাক্ষং শঙ্করং নীললোহিতম্। উমাপতিঃ পশুপতিঃ পিনাকী হ্যামিতদ্যুতিঃ।
ঈশানঃ সর্ববিদ্যানামীশ্বরঃ সর্বভূতানাং ব্রহ্মাধিপতির্ব্রহ্মণোঽধিপতির্য়ো বৈ যজুর্বেদবাচ্যস্তং হি সাম জানীয়াদ্যো জানীতে সোহমৃতত্বং চ গচ্ছিতি।।"
(নৃসিংহপূর্বতাপিন্যুপনিষদ ১/১২)

যে প্রসিদ্ধ দেববাচক শব্দ দ্বারা সম্বোধন করা তা শ্রীপতি বিষ্ণুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না তাই নৃসিংহতাপনী উপনিষদের মন্ত্র মূলতঃ শৈবদের আরাধ্য শিবকেই পরতত্ত্বরূপে বর্ণিত করেছে ইহা পূর্বপক্ষের দাবি।

কিন্তু পূর্বপক্ষবাদীর প্রত্যুত্তরে উত্তরপক্ষবাদীগণ বলেন যে বৈদিক শাস্ত্র সমূহে যেসকল নাম জগতকারণ প্রকরণ পাঠে দর্শিত হয় তা এক পরব্রহ্মের ক্ষেত্রেই প্রযুক্ত হয়। কারণ বেদে বর্ণিত হয়েছে যে "উচ্ছিষ্টে নাম রূপং চোচ্ছিষ্টে লোক আহিতঃ" (অথর্ববেদ/ শৌনক-সংহিতা ১১/৯/১)- জগতের প্রলয় পরবর্তীতে যিনি অবশিষ্ট সেই ব্রহ্মের মধ্যে সমস্ত নাম, রূপ, লোক-লোকান্তর সমাহিত। অতএব, সকল নামই পরব্রহ্মের মধ্যে সমাহিত এবং ঋগ্বেদোক্ত বিশ্বকর্মা সূক্তে বলা হয়েছে সেই পরব্রহ্মই একা সকল দেবতার নাম ধারণ করে রয়েছেন। অতঃ বেদে জগতকারণ প্রকরণ পাঠে দর্শিত প্রসিদ্ধ দেববাচক শব্দ মূলত সেই দেবতাকে নয় বরং সেই দেবতাকে নাম প্রধানকারী বা সেই দেবতার হৃদয়ে অবস্থিত অন্তর্যামী পরমাত্মা পরব্রহ্মই ঐ শব্দে নির্দেশিত। এই তত্ত্বটি বিস্তারিত বোঝার জন্য অবশ্যই বিশিষ্টাদ্বৈত সিদ্ধান্তের নাম প্রকরণ অধ্যয়ন করা উচিত। 


🔥 শৈবদের পক্ষ থেকে জবাব —

(১) আপনাদের বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো প্রকরণ আমাদের জন্য‌ মান্য‌ই নয়, কারণ আপনাদের‌ই বৈষ্ণবীয় শাস্ত্র আপনাদের বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের নিন্দা করেছে। সুতরাং আপনাদের দর্শন খণ্ডিত । 👇
https://issgt100.blogspot.com/2024/11/blog-post_23.html

(২)  ব্রহ্মা বিষ্ণু সহ সকল দেবতার রূপ ও নাম পরমেশ্বর শিবের (অথর্বশির উপনিষদ/২/১-৩১)

(৩) আপনাদের বিষ্ণুই যদি পরব্রহ্ম হন তবে ব্রহ্মা ও নারায়ণের চেয়েও শ্রেষ্ঠ পরমেশ্বর শিব একথা বেদ কেন বলবে ?
পরাৎপরতরো ব্রহ্মা তৎপরাৎপরতো হরিঃ ।
তৎপরাৎপরতো হ্যেষ তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্তু ॥ ১৮  [তথ্যসূত্র - ঋগ্বেদ/আশ্বলায়ণশাখা/১০/১৭১/১৮ , ঋগ্বেদ সংহিতা /খিলানি/ ৪ নং অধ্যায় / ১১ নং এবং শিবসংকল্প উপনিষদ]
এবার যদি বলেন শিবসংকল্পসূক্ত বিষ্ণুকে বুঝিয়েছে তবে তার‌ও খণ্ডন এখানে 👇
https://issgt100.blogspot.com/2025/03/blog-post_3.html

(৪) শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে বলা হয়েছে যখন কোনো কিছুই ছিলনা, তখন একমাত্র শিব‌ই ছিলেন, আর এই শিব কোনো বিষ্ণুবাচক নয়, কারণ শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ‌ও শিবের জন্য সমর্পিত। তার প্রমাণ এখানে 👇
https://issgt100.blogspot.com/2025/01/blog-post_5.html

____________________________________________
🚫 রামানুজী বৈষ্ণব দের দাবী -২ 👇

যেহেতু পাণিনীয় ব্যাকরণ অনুসারে সেই পরব্রহ্মের নিদিষ্ট নাম নারায়ণ এবং সেই নারায়ণ নাম ধারণকারী পরব্রহ্মের স্বরূপ নারায়ণসূক্ত, পুরুষসূক্ত, স্কম্ভসূক্ত, বিশ্বকর্মাসূক্ততে সহ ছান্দোগ্যোপনিষদ, ছান্দোগ্যব্রাহ্মণ, গোপথব্রাহ্মণ, শতপথ ব্রাহ্মণ, ষড়বিংশব্রাহ্মণাদিতে বর্ণিত হয়েছে যে, যিনি হস্তে চক্র ধারণ করেন, শ্রীদেবী ও ভূদেবী যাহার পত্নী, যিনি সমুদ্রের জলে শয়ন করেন, যাহার নাভি পদ্ম হতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ও ব্রহ্মার উৎপত্তি, যাহার গাত্রবর্ণ কৃষ্ণবর্ণ এবং দ্যুতি হিরণ্যবর্ণ, যাহার ধামে গাভীগণ বিচরণ করেন, যার চক্ষু পদ্মের ন্যায় এজন্য যাহার নাম পুণ্ডরীকাক্ষ, দেবী মহালক্ষ্মীর যিনি পতি, যাহার বক্ষে শ্রীবৎসচিহ্ন, যিনি মৎস- কূর্ম- বরাহ- নৃসিংহ- বামন- রাম- কৃষ্ণ আদি অবতার ধারণ করেন। সেই পরব্রহ্ম যাকে পুরাণশাস্ত্রে বিস্তররূপে বর্ণন করা হয়েছে। যেহেতু সকল দেবতার নাম একাই ধারণকারী পরব্রহ্ম লক্ষ্মীপতি ভগবান শ্রীমন্নারায়ণ সেহেতু নৃসিংহতাপনী উপনিষদে বর্ণিত প্রসিদ্ধ দেববাচক শব্দসমূহ সেই দেব অর্থাৎ শিবকে নয় বরং সেইসকল নামসমূহ শিবকে যিনি দান করেছেন সেই পরব্রহ্ম ভগবান নারায়ণই  সেই সকলে নামে উক্ত উপনিষদ মন্ত্রের উপাস্য তত্ত্ব। তাই যুক্তিহীন বিচারে ভুয়সী প্রমাণ নিরর্থক। এজন্যই মনুস্মৃতির (১২/১১৩) শ্লোকের ভাষ্যে কুল্লকভট্ট বৃহস্পতি স্মৃতির বচন উদ্ধৃত করেন যে-

"কেবলং শাস্ত্রমাশ্রিত্য ন কর্ত্তব্যো বিনির্ণয়ঃ।
যুক্তিহীনবিচারে তু ধর্ম্মহানিঃ প্রজায়তে।।"
অনুবাদ: কেবল মাত্র শাস্ত্রকে আশ্রয় করিয়া কর্তব্য নির্ণয় করিবে না, যুক্তিকেও অবলম্বন করা চাই কারণ যুক্তিহীন বিচারে ধর্ম নষ্ট হয়।

তাই প্রসিদ্ধ দেববাচক শব্দ যে পরব্রহ্ম ভগবান নারায়ণই একা ধারণ করেন সেই বিশিষ্টাদ্বৈত সিদ্ধান্তের যুক্তি পূর্বপক্ষবাদীগণ জ্ঞাত না হয়েই ভুয়সী প্রমাণ উপস্থাপন করেন যা যুক্তিহীন বিচারে কেবল শাস্ত্রের প্রমাণ আশ্রয়। নাম প্রকরণ সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই নৃসিংহতাপনী উপনিষদের মন্ত্র ভাষ্য প্রতিষ্ঠিত। যেহেতু প্রসিদ্ধ দেববাচক শব্দ পরব্রহ্মেরই সেহেতু শাস্ত্রে সেই সেই নামসমূহে প্রসিদ্ধ দেবের ক্ষেত্রেই অত্যধিক প্রমাণ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার অর্থ এই না যে সেই প্রসিদ্ধ নাম কেবল ঐ দেবেরই বরং শাস্ত্র কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরব্রহ্ম নারায়ণের ক্ষেত্রে উক্ত নামসমূহ ব্যবহৃত হয়েছে যেহেতু তিনিই সকল নামের ধারণকর্তা এবং সেই  প্রসিদ্ধ দেবকে সেই নাম প্রদান প্রসিদ্ধ করেন। তাই পূর্বপক্ষবাদীগণ নৃসিংহতাপনী উপনিষদের মন্ত্রের ভাষ্যে নৃসিংহদেবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য প্রসিদ্ধ দেববাচক নাম দ্বারা নৃসিংহদেবকে বাদ দিয়ে ঐ প্রসিদ্ধ দেবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য প্রমাণ দ্বারা প্রসিদ্ধ দেবকে উপাস্য তত্ত্ব রূপে বর্ণন করা নিছক যুক্তিহীন বিচার।


🔥 শৈবদের পক্ষ থেকে জবাব —

(১) কোনো বেদ মন্ত্রের ব্যাখ্যা যখন বেদের অনান্য মন্ত্রেই স্পষ্টত উপস্থিত, তখন ব্যাকারণ দিয়ে তার অর্থের অনর্থ করা নীতি বিরুদ্ধ কার্য। আপনারা যদি সত্যিই যুক্তিকে বিশ্বাস করেন, তাহলে আপনারাও শুক্র নীতির কথা মেনে নিন, শুক্রনীততে বলা আছে যে—

সমাসব্যূহহেত্বাদিকৃতেচ্ছার্থং বিহায় চ।
স্তুত্যর্থবাদান্ সন্ত্যজ্য সারং সংগৃহ্য যত্নতঃ।।৩৮
ধর্ম্মতত্ত্বং হি গহন মতঃ সৎসেবিতং নরঃ।
শ্রুতিস্মৃতিপুরাণানাং কর্ম্ম৷ কূর্য্যাৎ বিচক্ষণঃ।।৩৯
[শুক্রনীতি/৩য় অধ্যায়/৩৮/৩৯]
অর্থ - ধর্মতত্ত্ব নির্জন কানন স্বরূপ অতি দুরভিগম্য, অতএব বিচক্ষণ লোকেরা বেদ, স্মৃতি, পুরাণ ইত্যাদি শাস্ত্রের নানা প্রকার সমাসের দ্বারা ও নানা প্রকার কারণ ঘটিয়ে তার দ্বারা নিজের অভিমতসিদ্ধ অর্থ করা পরিত্যাগ করবে। এরূপ অর্থ ঘটালে লোকে প্রসংশা করবে সেই প্রশংশাবাদ ত্যাগ করবে এবং সৎলোকেরা যেরূপ আচরণ করে সেরূপ কার্য'ই করবে।।

অর্থাৎ আপনারা বেদের মন্ত্রকে নিজের মতবাদের অনুরূপ দেখাবার জন্য বেদে ব্যাখ্যা থাকা সত্ত্বেও আপনারা ব্যাকারণ ব্যবহার করে অর্থের অনর্থ ঘটিয়ে বসে থাকেন।
আপনারা তো বড় যুক্তিবাদী , তাই না ?

তাহলে এখানে ভস্মজাবালের শ্রুতিতে যে কৈলাসপতি স্মিতহাস্য পঞ্চমুখ যুক্ত ত্রিপুণ্ড্রধারী ব্রহ্মা-নারায়ণ-রুদ্রের চেয়ে অতীত ভগবান শিবের কথা বলছে, তার পরমত্ত্ব খণ্ডন আপনারা কোন যুক্তিতে করবেন ? বলুন।

কৈলাসশিখরাবাসমোঙ্কারস্বরূপিণং মহাদেবং উমার্ধকৃতশেখরং সোমসূর্যাগ্নিনয়ন মনন্তেন্দুরবিপ্রভং ব্যাঘ্রচর্মাম্বরং মৃগহস্তং ভস্মোদ্ধূলিতবিগ্রহং তির্যক্ ত্রিপুণ্ড্ররেখা বিরাজমানভালপ্রদেশং স্মিতসম্পূর্ণ পঞ্চবিধ পঞ্চাননং বীরাসনারূঢ়মপ্রমেয়মনাদ্যনন্তং নিষ্কলং নির্গুণং শান্তং নিরঞ্জনমনাময়ং হুং ফট্ কুর্বাণং শিব নাম অন্যনিশমুচ্চরন্তং হিরণ্যবাহুং হিরণ্যরূপং হিরণ্যবর্ণং হিরণ্য নিধিং অদ্বৈতং চতুর্থং ব্রহ্মবিষ্ণুরুদ্রাতীতমেকমাশাস্যং ভগবন্তং শিবং প্রণম্য মুহুর্মুহুরভ্যর্চ্য শ্রীফলদলৈস্তেন ভস্মনা চ নতোত্তমাঙ্গঃ কৃতাঞ্জলিপুটঃ।
[অথর্ববেদ/ভস্ম জাবাল উপনিষদ /১/১]

অর্থ —  যিনি ব্যাঘ্রচর্ম পরিধান করেন, মৃগমুদ্রা হস্তে ধারণ করেন, সমগ্র দেহে ভস্ম মেখে থাকেন, যিনি কপালে ত্রিপুণ্ড্র তিলন ধারণ করেন, স্মিতহাস্যে পাঁচটিমুখ সম্পন্ন তিনি বীরাসনে বসেন, তিনিই নিষ্কল(নিরাকার পরমশিব) নির্গুণ(সকল মায়ার অতীত), শান্ত, তিনিই নিরঞ্জন। হুং ফট্ ইত্যাদি বলে শিব নাম অহর্নিশি উচ্চারণ করে সেই হিরণ্যবর্ণরূপী, হিরণ্যবাহু, হিরণ্যরূপ যার সেই প্রভুই অদ্বিতীয়, তিনিই জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্তির ঊর্ধ্বে থাকা চতুর্থপদ সমাধীতে প্রাপ্ত হন যে প্রভু, যিনি নারায়ণ, ব্রহ্মা ও কালরুদ্র — এই ত্রিদেবের‌ও অতীত হলেন ভগবান শিব, সেই প্রভুকে প্রণাম করে বারংবার অর্চনাপূর্বক বেলফল ও বেলপত্র তথা ভস্ম দিয়ে তার কাছে বারবার নত মস্তকে কৃতাঞ্জলিপুটে নিজেকে সমর্পণ করছি।
- এই একটি শ্রুতি মন্ত্র দিয়ে আপনাদের নারায়ণের চেয়েও শিব‌ই যে শ্রেষ্ঠ তথা শিব‌ই যে অদ্বৈত(অদ্বিতীয়) ব্রহ্ম তা প্রমাণিত হচ্ছে। এখন আপনি বেদ থেকে দেখান যে বেদে কোথায় বলা আছে - এই ত্রিদেবের চেয়ে ঊর্ধ্বে থাকা ত্রিদেবের স্রষ্ঠা সাম্ব-সদাশিবের চেয়েও নারায়ণ পরমতম?
যদি না দেখাতে পারেন তবে মেনে নিন আপনাদের বৈষ্ণবীয় মতবাদ খণ্ডিত। কেননা আপনারা তো বড় যুক্তিবাদী, তাই না ?
আর আপনাদের ঐ মৎস কূর্ম বরাহ নৃসিংহ বামন ইত্যাদি সব অবতারকেই পরমেশ্বর শিব সংহার করে রেখেছেন, একথাও বেদের শরভ উপনিষদের ৬-১৩নং মন্ত্রেই আছে। সেখানে ১ম মন্ত্রে শিব সম্পর্কে বিষ্ণুর অসর্বজ্ঞতা প্রমাণিত, ৩নং মন্ত্রে বিষ্ণুর পিতা হলেন শিব - একথা বলা হয়েছে। শরভ উপনিষদ ১০৮ উপনিষদের মধ্যে মান্য উপনিষদ হিসেবে গণ্য , যা অথর্ববেদের অন্তর্গত। তাই যুক্তিতে আসুন.. । বেদের মন্ত্র এড়িয়ে গিয়ে ব্যাকারণের দোহাই দিয়ে নারায়ণের নাম আর অন্য কারোর হতে পারে না বলে লাফালাফি করবার কোনো পথ নেই আপনাদের, কারণ শুক্রনীতি এটি করতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। তাই শাস্ত্রে অনুশাসনে না চলে নিজেরাই কুপথ অবলম্বন করে শৈবদের জ্ঞান দিতে আসাটা আপনাদের ধূর্ততা অথবা অল্পবুদ্ধির পরিচয়।

_______________________________________

🚫 রামানুজী বৈষ্ণব দের দাবী - ৩ 👇

পূর্বে এই মন্ত্রের ব্যূৎপত্তিগত অর্থ দেখানো হয়েছিলো তার লিংক কমেন্টবক্সে দেওয়া হলো, এখন ভগবান শ্রীনারায়ণ নৃসিংহের ক্ষেত্রে নৃসিংহতাপনী উপনিষদের নাম গুলো শাস্ত্রে ব্যবহৃত হয়েছে তা নিম্নে তুলে ধরা হলো-

#ঋতং: বিষ্ণুসূক্তে ভগবান বিষ্ণুকে "ঋতের গর্ভ" বলা হয়েছে "ঋতস্য গর্ভং" (ঋগ্বেদ ১/১৫৬/৩), মহাভারতে ভগবান নারায়ণকে বলা হয়েছে "ঋতং সত্যং চ পরমমহমেকঃ " (মহা০ হরি০ ভবি০ ১০/৫৭)। "ঋতমেকাক্ষরং ব্রহ্ম" (মহা০ আদি০ ১/২০, হরি০ ১/৯), "ঋতে তমেকং পুরুষং বাসুদেবং সনাতনম্" (মহা০ শান্তি০ ৩৩৯/৩২)

#সত্যং: ভাগবতপুরাণে(১/১/১) প্রথমেই ভগবান নারায়ণকে পরম সত্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে "সত্যং পরমং ধীমহিঃ",  বাল্মিকী রামায়ণে (৫/২৭/২৮) ভগবান রামকে পরম সত্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে "পরং সত্যং",  মহাভারতেও (শান্তিপর্ব ৪৬/১২৮) ভগবান নারায়ণকে পরম সত্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে "নারায়ণপরং সত্যং"। "নারায়ণপরং সত্যং" (মহা০ হরি০ ৪০/৪২)

#পরং_ব্রহ্ম: তৈত্তিরীয় আরণ্যকের(১০/১৩/৪) নারায়ণসূক্তেই ভগবান নারায়ণকে পরব্রহ্ম বলা হয়েছে "নারায়ণ পরং ব্রহ্ম", বাল্মিকী রামায়ণে (৫/২৭/২৮) ভগবান রামকে পরমব্রহ্ম বলে উল্লেখ করা হয়েছে " পরং ব্রহ্ম", মহাভারতেও (শান্তিপর্ব ৪৬/১২৮) এ ভগবান নারায়ণকে পরব্রহ্ম বলা হয়েছে "নারায়ণপরং ব্রহ্ম"।

#পুরুষং: ভগবান নারায়ণই পরমপুরুষ। সে শতপথ ব্রাহ্মণে উল্লেখ রয়েছে-
"পুরুষো হ নারায়ণোঽকাময়ত অতিতিষ্ঠেয়েঁ সর্বাণি
ভূতান্যহমেবেঁদ সর্বং স্যামিতি।" (শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩/৬/১/১) অনুবাদ: পরমপুরুষ নারায়ণ সৃষ্টির পর সঙ্কল্প করলেন ও সৃষ্ট জগতের মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে সমস্ত জগৎ হলেন।

নারায়ণ অনুবাকেও (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০/১৩/২) ভগবান নারায়ণকে পুরুষ শব্দে অভিহিত করা হয়েছে "নারায়ণ হরিম্........এব ইদং পুরুষঃ"।

#কৃষ্ণপিঙ্গলম্: ভগবান নারায়ণকেও যে শাস্ত্রে কৃষ্ণপিঙ্গলম্ বলে উল্লেখ করা হয়েছে সে সম্পর্কে পাঞ্চরাত্র পরাশর সংহিতায় (৭/১৬-১৪) উল্লেখ রয়েছে-
"বিষ্ণুং তদ্বাসুদেবং তং নারায়ণমনাময়ম্।।
ঋতং সত্যং পরব্রহ্ম পুরুষং কৃষ্ণপিঙ্গলম্।
উর্ধ্বরেতং বিরূপাক্ষং বিশ্বরূপায় বৈ নমো নমঃ।।"

শেষসংহিতায়ও ৪৫ অধ্যায়ের সিংহমন্ত্রঃ প্রকরণে ভগবান নৃসিংহকে কৃষ্ণপিঙ্গল বলে উল্লেখ করা হয়েছে- "ঋতং সত্যং পরং ব্রহ্ম পুরুষং কৃষ্ণপিঙ্গলম্।
উর্ধ্বরেতং বিরূপাক্ষং বিশ্বরূপায় বৈ নমো নমঃ।।

তাছাড়া লক্ষ্মীনারায়ণ সংহিতার (১/১৩৭/৭৮) ভগবান নারায়ণকে কৃষ্ণপিঙ্গল বলে উল্লেখ করা হয়েছে-
"ঋতং সত্যং পরব্রহ্ম পুরুষং কৃষ্ণপিঙ্গলম্।
নারায়ণং চ চোর্দ্ধশীলং বন্দে বিশ্বস্বরূপিণম্।।"

তাছাড়া ব্রহ্মকৈবর্তপুরাণের উত্তরখণ্ডের ঘটিকাচলমাহাত্ম্যের (৪/১৮) শ্লোকে এই মন্ত্রটি ভগবান নারায়ণের ক্ষেত্রে উৎসর্গিত করে স্তুতি করা হয়েছে। আর ব্রহ্মকৈবর্তপুরাণের প্রামাণিকতা শৈবদের পরমপ্রিয় সংহিতাত্মক স্কন্দপুরাণের শঙ্করসংহিতার শিবরহস্যখণ্ডের সম্ভবকাণ্ডের (২/২৮,৩৫,৩৯) বর্ণিত করা হয়েছে।

#ঊর্ধ্বরেতং: বামনপুরাণে(৮৭/৪৭) ভগবান বিষ্ণুকে ঊর্ধ্বরেতা বলা হয়েছে "ত্বমুর্ধ্বকর্ত্তা ঊর্ধ্বশ্চ উর্ধ্বরেতা নমোঽস্তু তে"।

#বিরূপাক্ষং: ব্রহ্মপুরাণের (২২৬/২৬) ভগবান বিষ্ণুকে বিরূপাক্ষ বলা হয়েছে- "যোগমায়াসহস্রাক্ষো বিরূপাক্ষো মহামনাঃ"

#শঙ্করং: মহাভারতের ভগবান নারায়ণকে শিব শঙ্কর নামে অভিহিত করে তার অর্থ বিশ্লেষণ করেন। হরিবংশে(ভবিষ্যপর্ব ৮৮/৪৫) বলছেন- "শঙ্করোহসি সদা দেব ততঃ শঙ্করতাং গতাঃ"- ভগবান বিষ্ণু আপনি সদা শম্(কল্যাণ/শান্তি) প্রদান করেন তাই শঙ্কর নামে প্রসিদ্ধ।

#নীললোহিতম্: ভগবান নারায়ণকে অব্যক্তোপনিষদের (৬/১) বলা হয়েছে- "একঃ শ্যামঃ পুরতোঃ রক্তঃ"। তাছাড়া আনন্দ রামায়ণে (রাজ্যকাণ্ড/ পূর্বার্ধ ১/১১০)ভগবান রামকে নীললোহিত বলা হয়েছে- " নরো নারায়ণঃ শ্যামঃ কদর্পী নীললোহিত"।  আর আনন্দ রামায়ণের প্রমাণিকতা স্বয়ং রামরহস্য উপনিষদের ১ম অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।  অদ্ভূত রামায়ণে (২৬/৪১) মাতা জানকী ভগবান রামচন্দ্রকে নীললোহিত নামে অভিহিত করে বলছেন-

"প্রকৃত্যা নীলরূপস্ত্বং লোহিত রাবণার্দিতঃ।
নীললোহিতরূপেণ ত্বয়া সহবসাম্যহম্।।"
অনুবাদ: হে রাম! আপনি প্রকৃতিতে নীলরূপ, রাবণ অর্দিত হওয়ার দরুন লোহিতবর্ণ হয়েছেন এজন্য নীললোহিত রূপে আপনার সাথে নিবাস করবো।

#উমাপতি: শাস্ত্রে ভগবান নারায়ণকেও উমাপতি এবং উমাকান্ত বলা হয়েছে। স্কন্দপুরাণের(৫/১/৬৩/৯২) বিষ্ণুসহস্রনামে ভগবান বিষ্ণুকে উমাপতি বলে সম্বোধন করা হয়েছে- "বৃষী রুদ্রো ভালচন্দ্রো হ্যুমাপতি"। লক্ষ্মীনারায়ণ সংহিতায় (২/১/১৭) ভগবান নারায়ণকে উমাকান্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে- " শীতলাধিপতয়ে উমাকান্তং বিধেহি শং সদা" নারদীয়পুরাণে (১/৩/১৩) উমাকে ভগবান বিষ্ণুর শক্তি বলে উল্লেখ করা হয়েছে- "উমেতি কেচিদাহুস্তাং শক্তিং লক্ষ্মীং "। সংহিতাত্মক স্কন্দপুরাণের সনৎকুমার-সংহিতার লক্ষ্মীসহস্রনামে ভগবতী লক্ষ্মীকে " উমা" নামে অভিহিত করা হয়েছে। "উমা ভগবতী দুর্গা চান্দ্রী"। তাছাড়া অদ্ভূত রামায়ণে (২৫/২২) ভগবতী সীতাকেও উমা নামে অভিহিত করা হয়েছে- "উমা সর্বাত্মিকা বিদ্যা"। 

#পশুপতি: গোপথ ব্রাহ্মণে (উত্তরভাগ ১/৯) বলা হয়েছে যে ভগবান বিষ্ণু পশুগণকে রক্ষা করেন অতএব  ভগবান বিষ্ণুর ক্ষেত্রে পশুপতি শব্দ প্রযোজ্য। তাছাড়া গরুড়পুরাণে (১/১৫/২২,৩১) ভগবান বিষ্ণুকে পশুপতি বলা হয়েছে- "পশুনাং চ পতিঃ", "পশুনাং পতিরেব চ"।

#পিনাকী: ভগবান নৃসিংহকেও শাস্ত্রে পিনাকী শব্দে অভিহিত করা হয়েছে-
"চক্রং পিনাকং দধতং চন্দ্রসূর্যাগ্নিচক্ষুষম্" (স্কন্দপুরাণ/ বৈষ্ণবখণ্ড ২/২৮/২৮)। তাছাড়া নারদীয়পুরাণেও (১/৭১/১৩৪) বলা হয়েছে ভগবান নৃসিংহ পিনাক নামক ধনু ধারণ করেন- "পিনাকপাণে শীতাংশুশেখর রমেশ্বর পাহি বিষ্ণো"। অব্যক্তোপনিষদেও (৬/১) ভগবান নৃসিংহকে পিনাকী বলা হয়েছে।

#অমিতদ্যুতি: অমিত দ্যুতি অর্থ যার জ্যোতি মিত নয় অর্থাৎ মাপা যায় না অসীম দ্যুতি। নারায়ণ অনুবাকে ভগবান নারায়ণকে পরম জ্যোতি বলা হয়েছে। এখানে পূর্বপক্ষবাদীগণ আপত্তি করে বলেন যে পরম জ্যোতি বললে একমাত্র জ্যোতি নারায়ণ নন। কারণ উষাও শ্রেষ্ঠ জ্যোতি। কিন্তু শিবই একমাত্র জ্যোতি। এই আপত্তির বিপরীতে উত্তরপক্ষবাদীগণ বলেন যে পূর্বপক্ষবাদীগণ বোধহয় নারায়ণ অনুবাক সম্বন্ধে অজ্ঞাত কারণ নারায়ণ অনুবাক পরব্রহ্ম তত্ত্ব নির্ণায়ক সূক্ত। তৈত্তিরীয় নারায়ণ অনুবাকে উপযুক্ত অর্থ বিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে। "সহস্র শীর্ষং দেবম্" দ্বারা নারায়ণ অনুবাক এর প্রারম্ভ হয়। যা বেদের পুরুষসূক্তের সহস্রশীর্ষ পুরুষকে একত্ব করে প্রমাণ করে নারায়ণ সেই পুরুষসূক্তের পুরুষ। বেদশাস্ত্রে পরতত্ত্ব নির্ণয়ক এই সুক্তে "অক্ষর, স্বরাট, শিব, শম্ভু, পরব্রহ্ম, পরমনিত্য, অনন্ত, পরজ্যোতি, পরমাত্মা, পরায়ণ, অচ্যুত, ঈশ্বর, বিশ্বরূপ, সত্যম্, পরমং পদম্, শ্বাশতঃ, পরতত্ত্বঃ, অব্যয় প্রভৃতি শব্দ প্রযুক্ত হয়।এই নারায়ণ অনুবাকে এই সকল শব্দকে নারায়ণে প্রযুক্ত করে দেখানো হয়েছে যে বিভিন্ন বেদশাস্ত্রে এই শব্দ দ্বারা ভগবান নারায়ণই অভিহিত হোন। কেনো না এই শব্দ দ্বারা প্রতিপাদিত হওয়ার প্রত্যেক গুণ নারায়ণেই পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান। এই অর্থের প্রতিপাদন করে নারায়ণ অনুবাক সামনে যাহা সিদ্ধ করে ভগবান শ্রীনারায়ণই জগতের যেসকল চিৎ অচিৎ পদার্থ রয়েছে সেসকল নারায়ণেরই অধীন,  নারায়ণ এসবের অন্তরে এবং বাহিরে ব্যাপ্ত হয়ে বিদ্যমান। নারায়ণই ইহাদের আধার। আর নারায়ণ এ সকলের অধিপতি।  নারায়ণ ইহাদের নিয়ামক তাহারা নারায়ণের নিয়াম্য। নারায়ণ তাহাদের আত্মা তাহারা নারায়ণের শরীর। এই বিশেষতাকে বর্ণন করে নারায়ণ অনুবাক সামনে বর্ণিত করে "স ব্রহ্ম স শিবঃ সেন্দ্রঃ সোক্ষরঃ পরমঃ স্বরাট্" ইত্যাদি শব্দ দ্বারা ব্রহ্মা, রুদ্র, ইন্দ্র আদি দেবগণের অন্তর্যামী নারায়ণই এই নামে অভিহিত হয়ে থাকেন। ব্রহ্মা, শিব, ইন্দ্র ভগবান নারায়ণের বিভূতি তাহারা নারায়ণের অধীনে থাকেন। এই অনুবাক এই প্রকার বর্ণিত করে নারায়ণকেই বিভিন্ন দেবগণের নামে অভিহিত করে দেবগণ বিভূতির কারণ রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। পরব্রহ্ম নারায়ণ নিজেই ব্রহ্মা, শিব, ইন্দ্র আদি দেবশব্দে বাচ্য। পরব্রহ্ম তত্ত্ব নির্ণায়ক সূক্তের উপমা দেবতার সহিত উপমা প্রযুক্ত হতে পারে না। কারণ নারায়ণই যে জ্যোতির জ্যোতি তা এই সূক্তে নিম্নভাবে উল্লেখিত হয়েছে-

"নারায়ণ পরো জ্যোতিরাত্মা নারায়ণঃ পরঃ।
নারায়ণ পরং ব্রহ্ম তত্ত্বং নারায়ণঃ পরঃ।
নারায়ণ পরো ধ্যাতা ধ্যানং নারায়ণঃ পরঃ।।"
( তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০/১৩/৪)
অনুবাদ: নারায়ণ হলো পরমজ্যােতি তিনিই হলেন সকল জীবের হৃদয়ে অবস্থিত পরম আত্মা। নারায়ণ হলেন পরমব্রহ্ম, সেই নারায়ণই হলেন সর্বোচ্চ পরমতত্ত্ব। নারায়ণই হলেন পরমধ্যাতা, তিনিই হলেন পরমধ্যান।

পরব্রহ্ম তত্ত্ব নির্ণয়ের ক্ষেত্রেই কেবল উক্তভাবে মন্ত্র বর্ণিত হয় তা হয়তো পূর্বপক্ষবাদীগণ জানেন না। যেহেতু পরব্রহ্ম তত্ত্ব নির্ণায়ক সকল শব্দই নারায়ণ অনুবাকে বিদ্যমান সেহেতু এখানে নারায়ণ পর জ্যোতি শব্দে নারায়ণ শ্রেষ্ঠ জ্যোতি এমন অর্থ হবে না বরং পর শব্দে এখানে নারায়ণই জ্যোতির চূড়ান্ত সীমা হবে। কারণ নারায়ণ সূক্তে পরব্রহ্ম ভগবান নারায়ণকে অনন্ত বলা হয়েছে সেই যুক্তি অনুসারে সেই নারায়ণের জ্যোতিও অনন্ত হবে এই ন্যায় অনুসারে পর শব্দ শ্রেষ্ঠ অর্থ না হয়ে জ্যোতির চূড়ান্ত সীমা হবে আর শ্রেষ্ঠ জ্যোতি হলেও জগতে চিৎ অচিৎ পদার্থে যে সকল জ্যোতি বিদ্যমান সেই সকল জ্যোতিসমূহের মধ্যে নারায়ণ নামক পরব্রহ্মের জ্যোতই কেবল শ্রেষ্ঠ এই অর্থ হবে। এই অনুবাকের মন্ত্রের ন্যায় শ্লোক মহাভারতেও বর্ণিত হয়েছে- "জ্যোতিষাং চ পরং রূপং স্মৃতঃ নারায়ণাত্মকম্" (মহা০ শান্তি০ ৩৫২/৮২)- জ্যোতির পরঃ রূপও নারায়ণস্বরূপ। তাছাড়া মৈত্রায়ণী আরণ্যকে (২/৯/১) ভগবান নারায়ণকে কেশব নামে অভিহিত করা হয়েছে। এই কেশব নামের অর্থ ভগবান কৃষ্ণ মোক্ষধর্মে বর্ণন করেন-

"সূর্যস্য তপতো লোকানগ্নেঃ সোমস্য চাপ্যুত।
অংশবো যৎ প্রকাশন্তে মমৈতে কেশসংজ্ঞিতা।।
সংজ্ঞাঃ কেশবং তস্মান্মামাহুর্দ্বিজসত্তমাঃ।" (মহাভারত/ শান্তিপর্ব ৩৫০/৪৮-৫০)
অনুবাদ: জগতকে তাপপ্রদানকারী সূর্য তথা অগ্নি আর চন্দ্রের কিরণ প্রকাশিত হয় ঐসকল আমারই কেশ নামে অভিহিত। ঐ কেশ দ্বারা যুক্ত হওয়ার দরুন আমাকে সর্বজ্ঞ দ্বিজগণ আমাকে কেশব নামে অভিহিত করেন।

অর্থাৎ জগতে সূর্য চন্দ্র অগ্নি যে জ্যোতি এবং তেজ প্রকাশিত করেন তা মূলত ভগবানের অংশ প্রকাশ। সূর্যচন্দ্রঅগ্নির জ্যোতির উৎস ভগবান নারায়ণই। তাই অগ্নি চন্দ্র সূর্যও ভগবান নারায়ণের সামনে প্রকাশিত হতে পারে না।  "ন তত্র সূর্যস্তপতি ন সোমঽভিবিরাজতে" (মহা০ শান্তি০ ৩৫৩/৫৯)- শ্রীহরির সম্মুখে সূর্য তাপ প্রদান করতে পারেন না চন্দ্রও প্রকাশিত হতে পারে না।
অতএব ভগবান নারায়ণ সূর্য চন্দ্র অগ্নি জ্যোতিরও জ্যোতি। তাই বেদাশাস্ত্রে তাকে জ্যোতির চূড়ান্ত সীমা বলা হয়েছে। পূর্বপক্ষবাদীগণ বলেন যে রুদ্র একমাত্র জ্যোতি কিন্তু এই উত্তরে উত্তরপক্ষবাদীগণ বলেন যে রুদ্রের মধ্যে যে সকল রুদ্রীয় মহিমা তা সকলই পুরুষমেধ যজ্ঞের দ্বারা ভগবান নারায়ণকে সন্তুষ্ট করে রুদ্র প্রাপ্ত হোন যা ঋগ্বেদে (৭/৪০/৫) "বিদে হি রুদ্র রুদ্রীয়ং মহিত্বং" মন্ত্রে বর্ণিত।

তাই রুদ্রের মধ্যে যে জ্যোতি তা পরজ্যোতিস্বরূপ ভগবান নারায়ণ হতেই রুদ্র প্রাপ্ত হয়।


🔥 শৈবদের পক্ষ থেকে জবাব —

(১) বেদের অর্থের অনর্থ ঘটিয়ে হাস্যকর এসব তিল থেকে তাল বানানো প্রশংসা স্তুতি দেখি পুরাণ আর ইতিহাস থেকে শিবের নাম কে বিষ্ণুর সহস্রনাম ইত্যাদি দিয়ে ঘুরিয়ে নারায়ণের নাম বলে চালানোর মতো অপপ্রয়াসকে পূর্ববর্তী নৃসিংহপূর্বতাপনী উপনিষদের প্রবন্ধেই নিরসন করেছি, এক‌ই দাবী পুনরাবৃত্তি করা বৈষ্ণবদের অসহায়তা ছাড়া আর কিছুই নয় , আমরা শৈবরা মহাপাশুপত শৈব পরম্পরাভুক্ত কারণ আমাদের প্রভু শিবকেই পশুপতি বলে, পশু-পাশ-পতি এই তিন নিয়ে আমাদের পাশুপত পরম্পরা। আপনাদের নারদ পুরাণেও পশুপতি শিবের অদ্বৈত শৈব পাশুপত দর্শনের বিরাট অধ্যায়ে আলোচনা রয়েছে। ওগুলো তুলে আনলে এসব আবোলতাবোল যুক্তি দিয়ে বিষ্ণু কে পশুপতি বলে চালানোর দুঃসাহসের দণ্ড পাবেন, তাই ওসব দিকে গিয়ে কথা বাড়াবো না, বরং আপনারা আমাদের শৈবদের দেওয়া আগের কাউন্টার টি আরেকবার ভালো করে চোখ খুলে পড়ে নিন বৈষ্ণবগণ 👇🥴
https://issgt100.blogspot.com/2025/03/blog-post_5.html


(২) অথর্বশির উপনিষদে(২/২) ও রুদ্রহৃদয় উপনিষদে(১৮ নং মন্ত্রে) সরাসরি বলা হয়েছে বিষ্ণুরূপ ধারণ করে পরমেশ্বর শিব‌ই লীলা করছেন, আবার শিবপত্নী উমা লক্ষ্মীরূপ ধারণ করেছেন ।  যখন বেদেই উমাপতির উল্লেখ ও ব্যাখ্যা রয়েছে, তবে এখানে বিষ্ণুসহস্র নাম টেনে এনে উমাপতি নাম টা বিষ্ণুর বলে চালানো কি কোনো সুস্থ ব্যক্তির কাজ হতে পারে ?
তাহলে তো আমরাও শিবসহস্র নাম, পার্বতী সহস্র নাম থেকে শত শত প্রমাণ দেখাতে পারবো যে এসব বিষ্ণু লক্ষ্মী সব‌ই প্রকৃত পক্ষে শিব ও উমার‌ই ধারণ করা নাম মাত্র। তাহলে বৈষ্ণবেরা কি আমাদের দেওয়া সেই প্রমাণটা মেনে নেবেন ?
নাকি তখন আতে ঘা লেগে যাবে ?? নিজেরাই যুক্তি যুক্তি করেন, অথচ আপনারাই অযৌক্তিক কথাবার্তা লিখে বসে আছেন।

(৩) আপনারা যে নারায়ণকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও একমাত্র পরমব্রহ্ম দাবী করছেন সেই তথাকথিত পরমব্রহ্ম কে বেদ সরাসরি অশ্রেষ্ঠ দাবী করেছে,
পরাৎপরতরো ব্রহ্মা তৎপরাৎপরতো হরিঃ ।
তৎপরাৎপরতো হ্যেষ তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্তু ॥ ১৮  [তথ্যসূত্র - ঋগ্বেদ/আশ্বলায়ণশাখা/১০/১৭১/১৮ , ঋগ্বেদ সংহিতা /খিলানি/ ৪ নং অধ্যায় / ১১ নং এবং শিবসংকল্প উপনিষদ]
এবার যদি বলেন শিবসংকল্পসূক্ত বিষ্ণুকে বুঝিয়েছে তবে তার‌ও খণ্ডন এখানে 👇
https://issgt100.blogspot.com/2025/03/blog-post_3.html

এবার যুক্তি দিন , কেন বিষ্ণুর চেয়ে শিব শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষিত হল বেদে ??

(৩) বেদ নিয়ে কথা বলতে বলতে লাফ দিয়ে মহাভারতে ঢুকে পড়লেন, শুধু মাত্র এই কারণে,যে বেদে আপনাদের ব্যাখ্যার জন্য কোনো প্রয়োজনীয় শব্দ প্রমাণ পাচ্ছেন না। চলুন আপনাদের তবে মহাভারত থেকেও একটু সম্মান করি। 👇
মহাভারতে বলা আছে—
ব্রহ্মা শতক্রতুব্বিষ্ণুব্বিশ্বেদেব! মহর্ষয়ঃ।
ন বিদুস্ত্বাং তু তত্ত্বেন কুতো বেৎস্যামহে বযম্ ॥১৬৷৷
[মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৫/১৬]

মহাদেব! ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ইন্দ্র, বিশ্বদেবগণ এবং মহর্ষিরাও আপনাকে যথার্থ-রূপে জানেন না, সুতরাং আমরা জানবো কি ভাবে ? ॥১৬৷৷

এবার বলুন, বিষ্ণু শিবকে জানতে সক্ষম নয় কেন ??

অসর্বজ্ঞতার দোষ বিষ্ণুর পেছন ছাড়ছে না, বেদ‌ও এ কথা বলেছে, আবার মহাভার‌ত‌ও একথা বলছে, এবার দেখুন আপনাদের প্রাণপ্রিয় পদ্মপুরাণ বলছে,
হরিরুবাচ—
ন শক্তিং ভস্মনো জানে প্রভাবং তে কুতো বিভো।
নমস্তেহস্তু নমস্তেহস্তু ত্বামেব শরণং গতঃ।।২৩৮
[পদ্মপুরাণ- পাতালখণ্ড- অধ্যায়- ৬৪]

অর্থ — হরি বলিলেন,-প্রভো!(সদাশিব) আমি ভস্মেরই মহিমা জানি না, আপনার মহিমা কিরূপে জানিব? (আপনাকে আর অধিক কি বলিব) আপনারই শরণাপন্ন হইলাম।।২৩৮

আপনারা স্কন্দ মহাপুরাণ ব্যবহার করেছিলেন, তাই না ? এই দেখুন স্কন্দ মহাপুরাণ বলছে 👇
যদা দেবা ন বিজানস্তি ব্রহ্মবিষ্ণুপুরোগমাঃ।
[স্কন্দমহাপুরাণ/প্রভাসখণ্ড/ক্ষেত্রমাহাত্ম্য/অধ্যায় ৭/১০০]
অর্থ — ব্রহ্মা, বিষ্ণু প্রভৃতি দেবতাও শিব তত্ত্ব জ্ঞাত নন।।

এবার আপনাদের প্রাণপ্রিয় ভাগবত পুরাণ থেকেও দেখুন 👇 🥴

ন তো গিরিত্রাখিললোকপাল বিরিঞ্চবৈকুণ্ঠসুরেন্দ্রগম্যম্।
জ্যোতিঃ পরং যত্র রজস্তমশ্চ সত্ত্বং ন যদ্ ব্রহ্ম নিরস্তভেদম্ ।।৩১
[ভাগবত পুরাণ/অষ্টম স্কন্দ/অধ্যায় ৭/৩১]
অর্থ — ভগবান্‌! আপনার পরম জ্যোতির্ময় স্বরুপ হলো স্বয়ং ব্রহ্ম। তাতে রজোগুণ,তমোগুণ এবং সত্ত্বগুণ কিছুই নেই, তাতে কোনোপ্রকার ভেদাভেদও নেই। আপনার সেই স্বরূপকে সমস্ত লোকপাল-এমনকি ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং দেবরাজ ইন্দ্রও জানতে পারে না ।।

    — ব্রহ্মের লক্ষণ হল তিনি সর্বজ্ঞ হবেন, কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে আপনারা যে বিষ্ণু কে পরমব্রহ্ম সাজাতে চাইছেন, তার লক্ষণ ব্রহ্মের লক্ষণ এর সাথে মিল খাচ্ছে না,
কিন্তু শ্রুতিতে পরমেশ্বর শিবকেই সর্বজ্ঞ বলা হয়েছে— "বিশ্বাধিপা রুদ্র মহর্ষি" [শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৪/১২] অর্থাৎ যিনি সর্বজ্ঞ রুদ্র।
আরো দেখুন 👇
https://issgt100.blogspot.com/2024/10/The-Brahmavaivarta-Purana-says-that-Krishna-is-not-the-Supreme-Lord.html

(৫) নারায়ণ সূক্তকে বারংবার ব্যবহার করেও কোনো লাভ নেই, কেননা আমরা এর খণ্ডন আপনাদের শাস্ত্র থেকে করে রেখেছি 👇
https://issgt100.blogspot.com/2025/03/blog-post_16.html

(৪) পঞ্চরাত্রের ব্যবহার করে আপনারা আরো অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। তার জবাব এখানে 👇
https://issgt100.blogspot.com/2024/01/Pancharatra-Khandan-story-puran.html

সুতরাং পাতা ভরে আবোলতাবোল লিখে গেলেই নারায়ণ সর্বোচ্চ প্রমাণ হবে না। সঠিক যুক্তি উপস্থাপন করতে হবে, যা আপনাদের বৈষ্ণবদের কর্ম নয়।

________________________________________
🚫 রামানুজী বৈষ্ণব দের দাবী - ৪ 👇

#ঈশানঃ_সর্ববিদ্যানাম্: ভগবান অনিরুদ্ধকেও শাস্ত্রে ঈশান বলা হয়। সে সম্পর্কে মহাভারতে (শান্তিপর্ব ৩২৬/৩৭) বলা হয়েছে- "সোঽনিরুদ্ধঃ স ঈশানো"। তাছাড়া পুরাণেও ভগবান বিষ্ণুকে একাধিক বার ঈশান বলা হয়েছে- " জয় কেশব ঈশান জয় কৃষ্ণ" (বরাহপুরাণ ১৩৯/২৩), "ভূগর্ভ ধ্রুব ঈশান হৃষীকেশ" (ব্রহ্মপুরাণ ১৭৮/১৩০), আর ভগবান নারায়ণই সকল বিদ্যার আধার। সে সম্পর্কে শাস্ত্রে বলা হয়েছে- "আধারঃ সর্ববিদ্যানাম্" (মহাভারত/হরিবংশ ৩/১৮/১৯), "আধারঃ সর্ববিদ্যানাং স্বয়মেব হরিঃ স্থিতঃ" (বিষ্ণুপুরাণ ১/২২/৮১), "নিধান সর্ববিদ্যানাং সর্বপাপপবনানলঃ" (স্কন্দপুরাণ/ অবন্তীখণ্ড/ রেবাখণ্ড ১৯২/৪৯), "প্রভবো সর্ববিদ্যানাং সর্বজ্ঞো জগদীশ্বরৌঃ" (ভাগবতপুরাণ ১০/৪৫/৩০)।

#ঈশ্বরঃ_সর্বভূতানাম্: ভগবান নারায়ণকে শাস্ত্রে সমস্ত ভূতের ঈশ্বর বলে বর্ণন করা হয়েছে- "ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং জগতঃ প্রভবাপ্যয়ম্" (মহাভারত/ শান্তিপর্ব ১১০/২৪),  "ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং দেবদেবঃ প্রতাপবান্" (মহাভারত/ উদ্যোগপর্ব ৮৩/৩৫), "ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেঽর্জুন তিষ্ঠতি" (গীতা ১৮/৬১)।

#ব্রহ্মাধিপতি: ব্রহ্মার অধিপতি অর্থাৎ প্রভু বা কারণ যিনি। শ্রুতিতে ব্রহ্মার উৎপত্তি ও কারণতত্ত্ব সুন্দর রূপে বর্ণিত হয়েছে। কারণ মানব মনে করেন হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মার কোনো কর্তা বা অধিপতি নেই কিন্তু শ্রুতি বলে ব্রহ্মার অধিপতি অর্থাৎ প্রভু রয়েছেন। তিনিই মূলতঃ সেই ব্রহ্মাধিপতি। সে সম্পর্কে শ্রুতি বাক্য-

"হিরণ্যগর্ভ পরমমনত্যুদ্যং জনা বিদু।
স্কম্ভস্তদগ্রে প্রাসিঞ্চদ্ধিরণ্যং লোকে অন্তরা।।"
(অথর্ববেদ ১০/৭/২৮)
অনুবাদ: যে হিরণ্যগর্ভকে মানুষ অবর্ণনীয় জানেন, সেই হিরণ্যগর্ভকে এই লোকে প্রথমে জগতাধারস্বরূপ পরব্রহ্মই প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

এই পরব্রহ্মের নাভিতেই ব্রহ্মার সৃষ্টিকার্যময় সমস্তজগত প্রতিষ্ঠিত-

"তমিদর্গভং প্রথমং দপ্ত আপো যত্র দেবাঃ সমগচ্ছন্ত বিশ্বে।
অজস্য নাভাবধ্যেকর্মপিতং যস্মিন বিশ্বানি ভুবনানি তত্ত্বঃ।।" (ঋগ্বেদ ১০/৮২/৬)
অনুবাদ: সেই অজাত পুরুষের নাভিদেশে যে সৃষ্টি সংস্থাপিত হয়েছিল তাতে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড অবস্থিত আছে। ইহাই জলগণ আপন গর্ভ স্বরূপ ধারণ করেছিল। দেবগণ এখানেই বসবাস করেন।

পরব্রহ্মের নাভিদেশের জলপুষ্পের ওপরই ব্রহ্মার সৃষ্টিকার্যময় বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মায়ার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে-

"যত্র দেবাশ্চ মনুষ্যাহশ্চরা নাভারিব শ্রিতাঃ।
অপাং ত্বা পুষ্প পৃচ্ছামি যত্র তন্মায়য়া হিতম্।।"
(অর্থববেদ ১০/৮/৩৪)
অনুবাদ: যেখানে দেবতা এবং মনুষ্যও আশ্রিত থাকে যেভাবে চক্রের নাভিতে অর্থাৎ কেন্দ্রে আরা যুক্ত থাকে। সেই জলপুষ্প সর্ম্পকে আমি তোমার নিকট জিজ্ঞেস করছি যেখানে তাহা (সমস্ত সংসার) মায়ার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।

এই জলপুষ্প অর্থাৎ পদ্ম প্রজাপতি ব্রহ্মার আধার সে সম্পর্কে মৈত্রায়ণী সংহিতায় (২/৯/১) ব্রহ্মার গায়ত্রী মন্ত্রে ব্রহ্মার স্বরূপ সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে- "তৎ চতুর্মুখায় বিদ্মহে পদ্মাসনায় ধীমহি। তন্নো ব্রহ্মা প্রচোদয়াৎ।।"
অর্থাৎ ব্রহ্মাকে পদ্মাসন বলা হয়েছে যার অর্থ ব্রহ্মার আসন পদ্মপুষ্প। এই জলপুষ্প পদ্মেই পরব্রহ্ম ব্রহ্মাকে সৃষ্টি করেন। সে সম্পর্কে গোপথ-ব্রাহ্মণের (পূর্বভাগ ১/১৬) বর্ণন করা হয়েছে "ব্রহ্ম হ বৈ ব্রহ্মাণং পুষ্করে সসৃজে"-- ব্রহ্ম নিশ্চয় করে ব্রহ্মাকে পুষ্কর অর্থাৎ পদ্মে উৎপন্ন করেন। এই পদ্মের উপর আধারিত হয়েই ব্রহ্মা সমস্ত জগত সৃষ্টি করেন। যেহেতু পদ্মই তার আসন। "যস্মিন্স্তব্ধ্বা প্রজাপতির্লোকান্সর্বাঁ আধারয়ৎ।" (অথর্ববেদ ১০/৭/৭) অনুবাদ: প্রজাপতি(ব্রহ্মা) যেখানে আধারিত হয়ে সমস্ত লোক (সৃষ্টি) রচনা করেন। অর্থাৎ, যেহেতু পরব্রহ্মের নাভিদেশে সমগ্র সৃষ্টি বিদ্যমান এবং পদ্মের উপর এই ব্রহ্মাণ্ড মায়া দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, সমগ্রসৃষ্টি প্রজাপতি ব্রহ্মা করেন পদ্মের ওপর আধারিত হয়ে সেহেতু পরব্রহ্মের নাভি পদ্মেই মূলতঃ ব্রহ্মা উৎপন্ন হয়ে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে সৃষ্টি করে মায়ার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছেন। এবং শ্রুতিতে বলা হয়েছে এই পরব্রহ্ম জলের মধ্যে প্রকাশিত হোন-

"মহদ যক্ষং ভুবনস্য মধ্যে তপসি ক্রান্তং সলিলস্য পৃষ্ঠে।
তস্মিচ্ছ্রয়ন্তে য উ কে চ দেবা বৃক্ষস্য স্বত্বঃ পরিত ইব শাখাঃ।।" (অর্থববেদ ১০/৭/৩৮)
অনুবাদ: এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এক পরমপূজ্য রয়েছে, যিনি জলের উপরে প্রকাশিত হোন, যাকে তপস্যার দ্বারা প্রাপ্ত করা যায়, যেভাবে বৃক্ষের মূলে শাখা আধারিত থাকে ঠিক সেভাবে সমস্ত দেবগণ তাহার আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে।

যেহেতু ব্রহ্মাকে সৃজনকারী পরব্রহ্ম জলে প্রকাশিত হোন সেহেতু শ্রুতিতে পরব্রহ্মকে নারায়ণ বলা হয়েছে "নারায়ণ পরং ব্রহ্ম" (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০/১৩/৪) এবং নারায়ণ পদের অর্থ করলেই জলে শয়নকারী পুরুষই প্রতিপন্ন হয় ""নারাঃ আপঃ। তেষাময়নং আশ্রয়ঃ যস্য স ইতি নারায়ণঃ।" -নারা অথ জল। তাহা যার নিবাস আশ্রয় তিনি নারায়ণ। তাই জলে শয়নকারী পরব্রহ্ম যিনি তার নাভিদেশে উৎপন্ন পদ্মের ওপর প্রজাপতি ব্রহ্মাকে সৃষ্টি করেন এবং তাহার ওপর তাকে আধারিত করে সমস্ত জগত সৃষ্টি করে মায়ার দ্বারা তা প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছেন তিনি নারায়ণ নামক পরব্রহ্মই পুরুষ। অন্যদিকে যেহেতু পরব্রহ্মের নাভিতে পদ্মের উৎপত্তি সেহেতু পরব্রহ্মের এক নাম পদ্মনাভ। উপনিষদে বলা হয়েছে পরব্রহ্ম পুরুষ ভগবান নারায়ণ হতেই হিরণ্যগর্ভস্বরূপ ব্রহ্মা উৎপন্ন হোন- "নারায়ণাদ্ ব্রহ্মা জায়তে" (নারায়ণ অথর্বশীর্ষ উপনিষদ ১ম খণ্ড) "তত্র ব্রহ্মা চতুর্মুখোঽজায়ত" (মহোপনিষৎ ১ম অধ্যায়), "নারায়ণাদ্ধিরণ্যগর্ভো জায়তে। নারায়ণাদণ্ডবিরাট্স্বরূপো জায়তে। নারায়ণাদখিললোকস্রষ্টৃপ্রজাপতয়ো জায়ন্তে।" (ত্রিপাদবিভূতি মহানারায়ণোপনিষৎ ২য় অধ্যায়) যেহেতু পরব্রহ্ম ভগবান নারায়ণের নাভিপদ্ম হতেই হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মার উৎপত্তি সেহেতু ভগবান নারায়ণই ব্রহ্মার অধিপতি।

#ব্রহ্মণোঽধিপতি: এখানে ব্রহ্মের অধিপতি বলতে ঈশ্বরের অধিপতি বোঝানো হয় নি। কারণ ঈশ্বরের অধিপতি হয় না। তাই এখানে ব্রহ্ম বলতে প্রকৃতিতে বোঝানো হয়েছে কারণ মুণ্ডক শ্রুতিতে (১/১/৯) প্রকৃতিকে স্থান বিশেষে ব্রহ্ম বলা হয়েছে। তাই ভগবান কৃষ্ণ গীতা বলছেন সেই প্রকৃতি রূপ ব্রহ্মের তিনি আশ্রয়।

"ব্রহ্মণো হি প্রতিষ্ঠাহমমৃতস্যাব্যয়স্য চ৷
শাশ্বতস্য চ ধর্মস্য সুখস্যৈকান্তিকস্য চ৷" (গীতা ১৪/২৭)
অনুবাদ: আমিই ব্রহ্মের প্রতিষ্ঠা বা আশ্রয়। অমৃতত্ত্ব, অব্যয়ত্ত্ব, নিত্যত্ত্ব‌, নিত্য ধর্ম এবং ঐকান্তিক সুখের আশ্রয় আমিই।

তাই ভগবান নৃসিংহই প্রকৃতিরূপ ব্রহ্মের অধিপতি বা আশ্রয়। এজন্য পুরাণে ভগবান নারায়ণকে ব্রহ্মণোঽধিপতি বলা হয়েছে-

"সর্বজ্ঞ সর্বগং বিষ্ণুং সর্বদেবোভবোদ্ভম্।।
তমাদিপুরুষং ভক্ত্যা পরব্রহ্মস্বরূপিণম্।
ব্রহ্মণোধিপতিং সৃষ্টিস্থিতিসংহারকারণম্।।"
(লিঙ্গপুরাণ/ পূর্বভাগ ৯৫/৩-৪)
অনুবাদ: (প্রহ্লাদ) সর্বজ্ঞ, সর্বব্যাপী, সমস্ত দেবতাদের উৎপত্তির কারণস্বরূপ আদিপুরুষ, পরব্রহ্মস্বরূপ, ব্রহ্মের অধিপতি, সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের কারণ ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত।


🔥 শৈবদের পক্ষ থেকে জবাব —
(১) আবারো বলবো, আপনারা আমাদের শৈবদের দেওয়া আগের কাউন্টার টি আরেকবার ভালো করে চোখ খুলে পড়ে নিন বৈষ্ণবগণ, কারণ ওখানেই এই সকল নামের অর্থ বিকৃতির জবাব আমরা দিয়েছি , সুতরাং এক কাসুন্দি আমরা ঘেটে আবার লিখতে যাবো না। আপনারা এড়িয়ে গিয়ে পুরাতন দাবী পুনরায় লিখে আর কিছু অ আ ক খ লিখে সেটাইকে প্রত্যুত্তর বা খণ্ডন বলে চালিয়ে দেবেন, তা তো হবে না বাছাধন, তাই পুরাতন পোষ্ট টি পড়ুন , ওখানে জবাব দেওয়া হয়ে গিয়েছে 👇🥴
https://issgt100.blogspot.com/2025/03/blog-post_5.html

(২) এখানে ঈশান মন্ত্রের উল্লেখ রয়েছে, যা পরমব্রহ্ম শিবের ঈশান মুখের মন্ত্র, যা তৈত্তিরীয় আরণ্যকে সম্পূর্ণ উপস্থিত রয়েছে।
ঈশান মন্ত্র : ॐ ঈশানঃ সর্ববিদ্যানাং ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং ব্রহ্মাধিপতির্ব্রহ্মণোঽধিপতির্ব্রহ্মা শিবো মে অস্তু সদাশিব ॐ॥
(কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/ তৈত্তিরীয় আরণ্যক / ১০ম প্রপাঠক/১৭ নং অনুবাক)

এবার সেই ঈশান মন্ত্র যে পরমেশ্বর শিবের‌ই তা আলাদা করে ব্যাকারণ পুরাণ থেকে দেখবার প্রয়োজন ই পড়ে না কেননা, পঞ্চব্রহ্ম উপনিষদেই ঐ ঈশানকে শিবের‌ই রূপ বলা হয়েছে। আর শিবকে সচ্চিদানন্দ বলা হয়েছে । আমাদের কাছে ঐ ঈশান মন্ত্রে শিব উপাসনার হাজার প্রমাণ রয়েছে, কিন্তু আমরা বৈষ্ণবদের ঘরের প্রাণপ্রিয় পদ্মপুরাণ থেকেই দেখাবো ঐ ঈশান মন্ত্র শিবের‌ই।
নবভারত প্রকাশিত পদ্মপুরাণের পাতাল খণ্ডের ৬৯ অধ্যায়ের মধ্যে পরমেশ্বর সদাশিবের কাছে হনুমান জী শিবলিঙ্গ অর্চনা করবার বিধি বলতে গিয়ে ৩৪৯নং শ্লোকে বলেছেন —
ঈশানঃ সর্ববিদ্যানামুক্ত্বা শিরসি পাতয়েৎ ।
অর্থাৎ, ভস্ম নিয়ে  ঈশানঃ সর্ববিদ্যানাং মন্ত্র পাঠ করে শিরভাগে ভস্ম প্রদান করবে ।
এখন বৈষ্ণবদের ঐ  নৃসিংহপূর্বতাপনী উপনিষদের সমগ্র “ঈশানঃ সর্ববিদ্যানাং ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং ব্রহ্মাধিপতির্ব্রহ্মণোঽধিপতির্ব্রহ্মা” মন্ত্রটি আর বিষ্ণু র‌ইল না। বরং তা পরমেশ্বর শিবের‌ই মন্ত্র বলে প্রমাণিত হয়ে গেল।
যুক্তিহীন অপব্যাখ্যা করে নিজেদের‌ই শাস্ত্রের কাছে কে ধরা খেল বলুন বৈষ্ণবগণ ??
অর্থাৎ নৃসিংহপূর্বতাপনীতে সমগ্র মন্ত্র‌ই যে পরমেশ্বর শিবের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত তা প্রমাণিত হল ।
আর লিঙ্গ পুরাণকে আপনারা বৈষ্ণবেরা তামসিক বলে বেড়ান, অথচ আর্যসমাজীদের মতো যার নিন্দা করেন সুবিধার্থে তাকেও ব্যবহার করে নিতে লজ্জাও করে না আপনাদের বৈষ্ণবদের, নির্লজ্জ আপনারা।
লিঙ্গ মহাপুরাণে উক্ত বিষ্ণু পরমব্রহ্মের স্বরূপ বলেই কথিত হয়েছেন, সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম নয়। কেননা, লিঙ্গ
মহাপুরাণের উত্তরভাগের/১৭/১৯ - এ বলা হয়েছে পরমব্রহ্ম শিব‌ই ভব-ব্রহ্মা-বিষ্ণু রূপে বিভক্ত হয়ে স্থিত । সেখানেই ২৬ নং শ্লোকে বলা হয়েছে শিব ছাড়া কিছুই নেই, যা আছে শিব‌ই আছে ।
সুতরাং শৈবদের পুরাণ নিয়ে বিষ্ণুপরমত্ত্ব প্রমাণ করতে যাওয়ার অর্থ বৈষ্ণব রা নিজেরাই বলির বকরামুন্ডি হবার জন্য উপস্থিত হ‌ওয়া ।


_________________________________________

🚫রামানুজী বৈষ্ণব দের দাবী — ৫👇

#যজুর্বেদবাচ্য: যজু শব্দটি মূলতঃ √যজ্ ধাতুর সহিত উসি প্রত্যয়ে গঠিত (উনাদিসূত্র ২/১১৯)। "যজ্" ধাতুর অর্থ "যজ্ দেবপুজাসঙ্গতিকরণদানেষু" (পাণিনি ধাতুপাঠ ১/১১৫৭) অর্থাৎ যজ্ ধাতুর এক অর্থ দেবপুজা। নিরুক্তে (৭/১২/৪) বলা হয়েছে "যজুর্যজতে" দেবপুজার্থক বা যজ্ঞসম্পদানার্থক "যজ্" ধাতু হইতে "যজু" শব্দ নিষ্পত্তি। তাই যজু শব্দের অর্থ যজ্ঞ আর বেদ শব্দ  "√বিদ্ জ্ঞানে" ধাতু হইতে উৎপত্তি। অর্থাৎ যজুর্বেদ অর্থ যজ্ঞের জ্ঞান। পরব্রহ্ম নারায়ণকে যজ্ঞরূপ জ্ঞান দ্বারা প্রতিপাদিত করা হয়ে থাকে কারণ পরব্রহ্ম ভগবান বিষ্ণুই যজ্ঞপুরুষ অর্থাৎ তিনিই যজ্ঞ। "যজ্ঞো বৈ বিষ্ণুঃ"- যজ্ঞই বিষ্ণু। (শতপথ ব্রাহ্মণ ১/২/১৩), (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১/২/৫/১),  (শাঙ্খ্যায়ণ ব্রাহ্মণ ৪/২), (তৈত্তিরীয় সংহিতা ১/৭/৪), "যো বৈ বিষ্ণুঃ স যজ্ঞঃ"- যিনি বিষ্ণু তিনিই যজ্ঞ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৫/২/৩/৬)।  আর বেদও সাক্ষাৎ নারায়ণ "বেদো নারায়ণঃ সাক্ষাৎ" (ভাগবতম্ ৬/১/৪০) যেহেতু বেদ ভগবান নারায়ণেরই প্রকাশ তাই বেদবাচ্য শব্দও নারায়ণই। তাই যজুর্বেদ অর্থাৎ যজ্ঞেরজ্ঞান ও ভগবান নৃসিংহেরই বাচ্য শব্দ কারণ যজ্ঞের জ্ঞান দ্বারা যজ্ঞের প্রতিপাদ্য যজ্ঞপুরুষ নারায়ণকেই প্রতিপন্ন করা হয় তাই যজুর্বেদে নারায়ণই উপাস্যতত্ত্ব। শুধু যজুর্বেদেই না তিনি সকল বেদেই প্রতিপাদ্য তত্ত্ব তাই শাস্ত্রে ভগবান বিষ্ণুকে  "বেদান্তবেদ্যায়" বলে উল্লেখ করা হয়েছে অর্থাৎ বেদ দ্বারা জ্ঞাত যিনি। তবে ভগাবন নারায়ণ নিজেকে যজ্ঞরূপে প্রকাশিত হওয়ার দরুন এখানে বিশেষরূপে অন্যান্য বেদ হতে পৃথকরূপে যজ্ঞের জ্ঞানরূপ যজুর্বেদের দ্বারা যজ্ঞপুরুষ নারায়ণ উপাস্যতত্ত্ব তাই প্রকাশ করা হয়েছে মন্ত্রে। একই কথা ভগবান কৃষ্ণও মোক্ষধর্মে বর্ণন করেন-
"ষট্পঞ্চাশতমষ্টৌ চ সপ্তত্রিংশতমিত্যুত।।
যস্মিন্ শাখা যজুর্বেদে সোঽহমাধ্বর্যবে স্মৃতঃ।" (মহা০ শান্তি০ ৩৫২/৩৩)
অনুবাদ: যজুর্বেদের ৫৬+৮+৩৭= ১০১ শাখা বিদ্যমান,  ঐ যজুর্বেদেও আমারই গান করা হয়েছে।
যেহেতু যজুর্বেদে যজ্ঞরূপ জ্ঞান দ্বারা ভগবান নারায়ণই প্রতিপাদ্য তত্ত্ব সেহেতু তিনিই যজুর্বেদবাচ্য।
সর্বোপরি "ঋতং সত্যং" মন্ত্র যে ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্যেই নিবেদন তা ঋষি শৌনক তার ঋগ্বিধানম্ (১২২) এ বর্ণন করে বলেন ভগবান বিষ্ণুর সম্মুখে "ঋতং সত্যং" মন্ত্র ত্রয়অযুত অর্থাৎ ত্রিশহাজার বার জপ করা উচিত। "ঋতস্যেতি জপেসূক্তং ত্র্যযুতং বিষ্ণুসন্নিধৌ"। তাছাড়া বৈখানস ভগবচ্ছাস্ত্রে ভৃগুসংহিতার ক্রিয়াধারঃ (১১/১৫৫) উল্লেখ রয়েছে যে "ঋতং সত্যে'তি মন্ত্রেণ পূজয়েদিতি কেচন"-কেউ কেউ বলেন যে " ঋতং সত্যং" মন্ত্রে ভগবান লক্ষ্মীনৃসিংহের পূজা করা উচিত। পাঞ্চরাত্র ভগবচ্ছাস্ত্রে ভার্গবতন্ত্রে (৬/৬৪) শ্লোকে বর্ণন করা হয়েছে যে "ঋতং সত্যং" মন্ত্রে ভগবান শ্রীহরির অর্চন করার "ঋতং সত্যে'তি মন্ত্রেণ ব্রহ্মাবাহ্য সমর্চয়েৎ"।

🔥 শৈবদের পক্ষ থেকে দাবীর খণ্ডন —

(১) এসব আওফাও কথার খণ্ডন পূর্বেই করা হয়েছে — https://issgt100.blogspot.com/2025/03/blog-post_5.html

(২) ঋতং সত্যং পরং ব্রহ্ম পুরুষং কৃষ্ণপিঙ্গলম্ |
ঊর্ব্বরেতং বিরূপাক্ষ বিশ্বরূপায় বৈ নমঃ — এই মন্ত্রের সম্পূর্ণ অর্থ ভস্মজাবাল উপনিষদের বেদমন্ত্রে দেওয়া আছে। দেখুন —
👉"নমঃ বিরূপেভ্যো বিশ্বরূপেভ্যশ্চ বো নমঃ ||"
(শুক্লযজুর্বেদ/বাজসনেয়ি সংহিতা/৩৬/২৫)

অর্থাৎ পরমেশ্বর রুদ্রই  একাধারে বিরূপ(বিরূপাক্ষ) ও বিশ্বরূপ।

সেই বিরূপাক্ষ, বিশ্বরূপ রুদ্রই যে আদতে সেই নিরাকার পরমেশ্বর তার প্রত্যক্ষ শব্দপ্রমান  আমরা শ্রুতিতেই পেয়ে থাকি -

👉" ঋতং সত্যং পরং ব্রহ্ম পুরুষং কৃষ্ণপিঙ্গলম্ |
ঊর্ব্বরেতং বিরূপাক্ষ বিশ্বরূপায় বৈ নমঃ "
(কৃষ্ণ যজুঃবেদ তৈত্তিরীয় আরণ্যক / দশম প্রপাঠক/২৩ নং অনুবাক)

এই বিশ্বরূপধারী সহস্রশীর্ষ পুরুষ পরমব্রহ্ম সদাশিব/রুদ্র আসলেই যে - হরি, হর(সাকার রুদ্রদেব) এবং ব্রহ্মা(হিরণ্যগর্ভ) এরও জনক তাঁর প্রত্যক্ষ শব্দপ্রমাণও আমরা শ্রুতি শাস্ত্রে পেয়ে থাকি -

👉" পশুপাশবিমোচকং পুরুষং কৃষ্ণপিঙ্গলং ঊর্ধ্বরেতং বিরূপাক্ষং বিশ্বরূপং সহস্রাক্ষং সহস্রশীর্ষং সহস্রচরণং বিশ্বতোবাহুং বিশ্বাত্মানং একং অদ্বৈতং নিষ্কলং নিষ্ক্রিয়ং শান্তং শিবং অক্ষরং অব্যয়ং হরি-হর-হিরণ্যগর্ভস্রষ্টারং অপ্রমেং অনাদ্যন্তং ... | ”
( তথ্যসূত্র - ভস্মজাবাল উপনিষদ/২ঢ় অধ্যায়)
আসলে পরমেশ্বর রুদ্র অর্থাৎ সদাশিবই কল্পভেদে নিজেরই পুত্রস্বরূপ ব্রহ্মার কপাল থেকে অথবা নিজেরই হৃদয় থেকে অথবা পৃষ্ঠদেশ থেকে পূর্ণ সাকার স্বরূপে লীলা প্রদর্শনের দরুন রুদ্র নামে প্রকটিত হন।  সুতরাং সেই অর্থে রুদ্রের জনক তিনি স্বয়ং নিজেই। শিবমহাপুরাণেই এই মীমাংসা উত্তমভাবে বর্ণিত রয়েছে। এখানে হরির স্রষ্ঠা শিব, যা প্রমাণিত হল, আর ঋতং সত্যং মন্ত্র যে প্রভু শিবের তা প্রমাণিত হল। ফলে  নৃসিংহপূর্বতাপনী শ্রুতিও শিবের প্রমাণিত হল।

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ পুনরায় সেই রুদ্রের প্রতি স্তুতি করে বলছে -
👉" বিশ্বতশ্চক্ষুরএত বিশ্বতোমুখো
বিশ্বতোবাহুরুত বিশ্বতস্পাৎ | " (শ্বেতাঃ/৩/৩)
👉" সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ |
স ভূমিং বিশ্বতো বৃত্বা অত্যতিষ্ঠদ্ দশাঙ্গুলম্ ||
(শ্বেতাঃ/৩/১৪)

শ্রুতি শাস্ত্রের অপর একটি শ্লোক যা সেই সাকার পরমেশ্বর সদাশিবেরই বাচক সেই শ্লোক এবার আমরা দেখে নেব -

👉"যা তে রুদ্র শিবা তনূঘোরাহপাপাকাশিনী |
তয়া নস্তুনুবা শন্তময়া গিরিশন্তাভিচাকশীহি ||
যামিষুং গিরিশন্ত হস্তে বিভর্ষ্যস্তবে |
শিবাং গিরিত্রতাং কুরু মা  হিঁংসীঃ পুরুষং জগত্ ||"
(শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৩/৫-৬  এবং শুক্লযজুর্বেদ/বাজসনেয়ি সংহিতা /৩৬/২-৩- রুদ্রসূক্ত)

সুতরাং শ্রুতিশাস্ত্র থেকে সম্পূর্ণরূপে রুদ্র অর্থাৎ সদাশিবের বিশ্বরূপ এবং সর্বব্যাপকত্ব এবং অনন্তময়তাকে প্রমাণ করা হল।

🔘ইতিহাস শাস্ত্র থেকে প্রমাণ -- এখন দেখবো ইতিহাস অর্থাৎ মহাভারত কি বলছে ---

ব্যাস উবাচ্-
👉"সর্বৈর্দেবৈঃ স্তুতো দেবঃ সৈকধা বহুধা চ সঃ |
শতধা সহস্ৰধা চৈব ভূয়ঃ শতসহস্ৰধা || ৮৬ ||
ধাতা চ স বিধাতা চ বিশ্বাত্মা বিশ্বকৰ্ম্মকৃত্ | সৰ্ব্বাসাং দেবতানাঞ্চ ধারয়ত্যবপূর্বপূঃ || ৮৫ || সহস্রাক্ষোহযুতাক্ষো বা সর্ব্বতোহক্ষিময়োহপি বা যচ্চ বিশ্বং মহৎ পাতি মহাদেবস্ততঃ স্মৃতঃ || ১১১ ||
(মহাভারত/ দ্রোণপর্ব/ ১৭০ নং অধ্যায়)
ব্যাসদেব বললেন যে , সেই মহাদেবকে সর্ব দেবগণ স্তুতি করেন । তিনিই একরুপ , বহুরূপ , শতরুপ সহস্ররুপ এবং শতসহস্ররুপ ধারন করেন । তিনিই ধাতা , বিধাতা , বিশ্বাত্মা , সর্বকার্যকারী । তিনি নিরাকার হয়েও সকল দেবতার রুপ ধারন করেন । তিনি সহস্রনয়ন , দশসহস্ৰনয়ন বা বহুনয়ন যুক্ত হয়ে এ সমগ্র জগৎ রক্ষা করেন তাই তিনিই মহাদেব ।

মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ বললেন -
👉"সর্বতঃ পাণিপাদস্ত্বং সৰ্ব্বতোঽক্ষিশিরোমুক্ষঃ || ৪১৫ ||" (মহাভারত/ অনুশাসন পর্ব /১৩ নং অধ্যায়)

এই বিশ্বজগতে সকলজীবের হস্ত সেই শিবের হস্ত,  সকলজীবের অক্ষি সেই শিবের অক্ষি এবং সকল জীবের মস্তক সেই শিবেরই মস্তক।  অর্থাৎ  পরাচৈতন্য শিবই চৈতন্য রুপে সমগ্র জীবদেহে নিবাশ করছেন।  তাই তিনিই জীবাত্মা ও পরমাত্মা উভয়ই।

👉" বিশ্বে দেবাশ্চ যত্তস্মিন্ বিশ্বরুপস্ততঃ স্মৃতঃ " | (মহাভারত/ দ্রোণপর্ব/১৭০ নং অধ্যায় )
সমগ্র দেবগণ সহ সমগ্র জীবকূল সেই শিবের মধ্যেই স্থিত সেই শিবই বিশ্বরুপ।

👉" সহস্রশিরসে চৈব সহস্রনয়নায় চ সহস্রবাহবে চৈব সস্রচরণায়"  (মহাভারত/দ্রোণপর্ব/১৭০/৩১) | 
সহস্রশীর্ষ,  সহস্রাক্ষ,  সহস্রপাত্ সহস্রবাহু বিরাটপুরুষ শিবকে নমষ্কার। 

মহাভারতে আরও বলা আছে যে সেই পরমেশ্বর শিবকেই চিন্তা করে শ্রীবিষ্ণুদেব  ধ্যানমগ্ন হন এবং যোগনেত্রে তাঁকেই অনুভব করে থাকেন।

👉" ব্রহ্মাবিষ্ণুসুরেশানাং স্রষ্টা চ প্রভুরেব চ ব্রহ্মাদয়ঃ পিশাচান্তা যং হি দেবা উপাসতে || ৪ ||
প্রকৃতীনাং পরত্বেন পুরুষেস্য চ যঃ পরঃ |
চিন্ত্যতে যো যোগবিদ্ভিঋষিভিস্তত্বদর্শিভিঃ |
এ অক্ষরং পরমং ব্রহ্ম অসচ্চ সদসচ্চ যঃ || ৫ || কো হি শক্তো ভবং জ্ঞাতুং মদ্বিধঃ পরমেশ্বরম্ |
ঋতে নারায়ণাৎ পুত্র ! শঙ্খচক্রগদাধরাৎ || ৮ ||
এষ বিদ্বান্ গুনশ্রেষ্ঠো বিষ্ণুঃ পরমদুর্জ্জয়ঃ || দিব্যচক্ষুর্মহাতেজা বীক্ষতে যোগচক্ষূষা || ৯ ||"
( ত্রয়োদশোহধ্যায়ঃ , অনুশাসন পৰ্ব্ব , ৩৮ নং খন্ড , মহাভারতম্ )

ভীষ্ম বললেন- যিনি ব্রহ্মা , বিষ্ণু এবং ইন্দ্রেরও সৃষ্টিকর্তা প্রভু , যাকে ব্রহ্মা থেকে পিশাচগণ পর্যন্ত আরাধনা করেন , যিনি পুরুষ প্রকৃতির থেকেও শ্রেষ্ঠ , যিনি অক্ষর - পরমব্রহ্ম এবং সদ অসদেরও উপরে তিনিই মহাদেব । শঙ্খ চক্র গদা পদ্ম ধারী মহাতেজা দিব্যচক্ষু নারায়ন তাঁর ধ্যান নেত্রে সেই পরমেশ্বর মহাদেবকেই দেখে থাকেন । তিনি ভিন্ন আমার মতো কোন লোক সেই পরমেশ্বরকে জানতে সমর্থ হবে ? কৃষ্ণও নিজের ভক্তি দ্বারা সেই পরমেশ্বর রুদ্রকে প্রসন্ন করে জগদব্যাপী হতে পেরেছিলেন ।

🔘 পুরাণ থেকে প্রমাণ - এবারে পুরাণ থেকে দেখে নেওয়া যাক বিশ্বরূপধারী পরমেশ্বরের ব্যাপারে।
👉"অণোরণীয়ান্ মহতো মহীয়ান্ |
মহাদেবঃ প্রোচ্যতে বিশ্বরুপঃ || ১৭ ||
এবং হি যো বেদ_গুহাশয়ং পরং |
প্রভুং পুরাণং পুরুষং বিশ্বরুপম্ || ১৮ ||
হিরন্ময়ং বুদ্ধিমত্তাং পরাং গতিং | ... || ১৯ || "
(অষ্টমোহধ্যায়, শ্রীঈশ্বরগীতা,  উপরিভাগ,  কূর্ম্মমহাপুরাণ)

সূক্ষ্ম হতেও সূক্ষ্ম এবং মহৎ হতেও মহীয়ান মহাদেবই একমাত্র বিশ্বরুপ । একমাত্র তিনিই বেদে গুহ্য , তিনিই পুরাণপুরুষ , তিনিই হিরন্ময় এবং বুদ্ধিমান ( জ্ঞানী ) ব্যক্তিদের পরম গতি ।

আবার শ্রুতির একই বাক্যকে সমর্থন করে শিবগীতা বলছে -

👉" বিশ্বতশ্চক্ষুরুত বিশ্বতোমুখো বিশ্বতো বাহুরুত বিশ্বতস্পাৎ |.....|| ৪৫|| "  ---( শিবগীতা/৬/৪৫)
সমগ্র বিশ্বেই শিবের চক্ষু,  মুখ, হস্ত ও  পদ বিস্তৃত।  তিনিই বিরাট পুরুষ। মানে শিবই পুরো জগৎ।

আবার শ্বেতাশ্বতর উপনিষদকে সমর্থন করে শিবমহাপুরাণ বলছে -

👉"এক এব সদা রুদ্রো ন দ্বিতীয়োহস্তি কশ্চন | সংসৃজ্য বিশ্বভূবনং গোপ্তা তে সংচুকোচ য || ১৪ ||"
( ৬ নং অধ্যায় / বায়বীয় সংহিতা / পূর্বখন্ড / শিবমহাপুরাণ )
এক অদ্বিতীয় রুদ্রই সদা বিরাজিত আছেন , দ্বিতীয় কোনো সত্ত্বা নেই তিনিই জগতের সৃজন করেন , রক্ষা করেন এবং অন্তে সংহার করেন ।

👉"বিশ্বায় বিশ্বরুপায় বিশ্বতোহক্ষিমুখায় চ |সর্ব্বতঃ পাণিপাদায় রুদ্রয়াপ্রমিতায় চ ||"
(ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ/পূর্ব্বখণ্ড/২৬/৩১, নবভারত)
শিবই বিশ্ব,  বিশ্বরূপ,  বিশ্বের সর্বদিকেই তার অক্ষি, মুখ, হস্তও পদ।  সমগ্র জগতই সেই রুদ্র/শিব স্বরুপ। 

👉সহস্রচক্রচরণং সহস্রভুজমৈশ্বরং ||৪৫||"
(বামন পুরাণ/ ৬৭/৪৫)

সহস্রবাহু,  সহস্রপদ যুক্ত ঈশ্বরই মহাদেব।

ঈশ্বরগীতায় বিশ্বরূপ দেখানোর সময় পরমেশ্বর শিব নিজেই বলছেন -
👉" অহং ব্রহ্মময়ঃ শান্তঃ শাশ্বতো নির্মলোহব্যয়ঃ | একাকী ভগবানুক্তঃ কেবলঃ পরমেশ্বরঃ || ২ ||
(ঈশ্বরগীতা/কূর্মপুরাণ/৮)
-আমিই পরমব্রহ্ম , শান্ত , শাশ্বত , নির্মল , অব্যয় । পরমেশ্বর ভগবান রুপে আমিই একাকী বাস করি ।
🔘আগম থেকে প্রমাণ - এবারে আগমশাস্ত্র থেকে দেখে নেব পরমেশ্বর শিবের ব্যাপারে কিছু তথ্য ।

সেই অনন্ত পরমেশ্বরের সম্পর্কে শৈবাগম বীরাগম বলছে-

👉" সর্বতত্ত্বাত্মকং ধ্যেয়ং নাদবিন্দুকলান্বিতম্ | চতুষ্ফষ্টিকলাতীতং নির্বিকল্পং নিরঞ্জনম্ || " ১.১২৯
আদ্যন্তশূণ্যং পুরুষং পুরাতনং শীলান্বিতং তত্ত্বনিধিং সদাশিবম্ | " ২.২২১
(বীরাগম/উত্তরভাগ/বীরমাহেশ্বর তন্ত্র)

ভাবার্থ- কুণ্ডলীনিকে জাগ্রত করে ব্রহ্মরন্ধ্রের সেই হংসপীঠের উপর অবস্থিত গুরুস্বরূপ সদাশিবকে ধ্যান করা উচিৎ । পরমগুরু স্বরূপ সেই সদাশিব সর্বতত্ত্বাত্মক । তিনি নাদ , বিন্দু ও কলা সংযুক্ত । আবার তিনি চৌষট্টি কলার অতীতও বটে অর্থাৎ তিনি তত্ত্বাতীত । তিনি নির্বিকল্প ও নিরঞ্জন । সেই আদি , অন্ত শূণ্য পুরাতন পুরুষই হলেন সাক্ষাৎ সদাশিব ।

👉"নাতঃ পরতরং কিঞ্চিন্নাৎ পরতরং শিবম্ |
নাতঃ পরতরং জ্ঞানমিত্যাহ ভগবান্ শিবঃ || ১৭ || "
[সার্ধত্রিশতিকালোত্তর আগম ( শৈবাগম ) / ২৩ নং পটল]

সেই পরমতর পদই হল শিবপদ । সেই পরম শিবের চেয়ে পরমতম আর কিছুই নেই এবং তাঁর চেয়ে পরমতম জ্ঞানও আর কিছু নেই ।

👉"শিবঃ সর্বোত্তরঃ স্থানুঃ পরমাত্মা মহেশ্বরঃ | সচ্চিদানন্দরুপী যঃ সদসদ্ব্যক্তিবর্জিতঃ || ১ ||"
(অজিতাগম/ক্রিয়াপাদ/দ্বিতীয় পটল)

শিব (পরমশিব) সর্বোপরি , স্থির , পরমাত্মা , তিনিই মহেশ্বর ( সাকারে ) । তিনিই সচ্চিদানন্দরুপি সৎ এবং অসৎ বর্জিত অর্থাৎ এসবেরও ঊর্ধ্বে।  ।

🔶 সুতরাং ঋতং সত্যং বিরূপাক্ষ এসব নাম‌ই পরমেশ্বর শিবের‌ই বাচক।
শৈব আগমোক্ত শুচিমন্ত্রে পরমেশ্বর শিবকে বিরূপাক্ষ বলা হয়েছে,
ॐ অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সর্বাবস্থাং গতোঽপি বা ।
যঃ স্মরেৎ বৈ বিরূপাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তরঃ শুচিঃ ‌‌॥
(তথ্যসূত্র : শৈব আগম/কারণ আগম/তৃতীয় পটল/ ১২ নং মহামন্ত্র)
[ বিরূপাক্ষ - শব্দটির পরমেশ্বর শিবের একটি পরমপবিত্র নাম , যা সকল শাস্ত্রে বর্ণিত রয়েছে, ইহা কখনোই বিষ্ণুর নাম নয়। যা বেদ থেকে প্রমাণিত পূর্বেই করা হয়েছে।]

_________________________________________

🚫 রামানুজী বৈষ্ণব দের দাবী - ৬ 👇

⭕পূর্বপক্ষবাদীগণের ভাষ্যে তারা বেশকিছু আপত্তি তুলে এখন সেই আপত্তি গুলো উত্তরপক্ষবাদীগণ নিরসন করবেন। প্রথমে পূর্বপক্ষবাদীগণ বলেন যে ভগবান নারায়ণ নাকি সর্বজ্ঞ কারণ তিনি ভস্মমহিমা জানেন না তার স্বপক্ষে তারা অপ্রধান উপনিষদ ও তামসিক পুরাণ বাক্য তুলে ধরেন।

👉এর উত্তরে উত্তরপক্ষবাদীগণ বলেন যে এই অপ্রধান উপনিষদ ও তামসিক পুরাণের উক্ত বাক্য যা মূলশ্রুতির বিরুদ্ধে। কারণ শ্রুতিতে বলা হয়েছে যে ভগবান বিষ্ণু সর্বজ্ঞ। এ বিষয়ে মূলশ্রুতির প্রমাণ দেওয়া হয়েছিলো কিন্তু তা পরোয়া না করেই উল্লুকের মতো চলে যায়। ভগবান নারায়ণ যে সর্বজ্ঞ তা নারায়ণ অনুবাকেই বলা হয়েছে-
"অনন্তং অব্যযং #কবিং সমুদ্রেন্তং বিশ্বশম্ভুবম্।"
(তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০/১৩/৬)
অনুবাদ: যিনি অনন্ত অসীম,শ্বাশত অপরিবর্তনীয়, কবি (সর্বজ্ঞ), যিনি সমুদ্রে বাস করেন, যিনি বিশ্বের কল্যাণকারী।
এখানে কবি শব্দটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ কারণ কবি অর্থ যিনি সকল বিষয়ে জ্ঞানী, দক্ষ, পারদর্শী,জ্ঞাত। এই সম্বন্ধে অমরকোষেও বলা হয়েছে-
"বিদ্বান্ বিপশ্চিদ্দোষজ্ঞঃ সন্ সুধীঃ কোবিদো বুধঃ।
ধীরো মনীষী জ্ঞঃ প্রাজ্ঞঃ সংখ্যাবান্ পণ্ডিতঃ #কবিঃ
ধীমান্ সূরিঃ কৃতী কৃষ্টির্লদ্ধবর্ণো বিচক্ষণঃ।
দূরদর্শী দীর্ঘদর্শী ।।"
(অমরকোষ/ ২য় কাণ্ড/ ব্রহ্মবর্গ ১০)
অনুবাদ: পণ্ডিতবাচক শব্দ|- বিদ্বন্স্, বিপশ্চিৎ, দোষজ্ঞ, সন্ত, সুধী, সুধী, কোবিদ, বুধ, ধীর, মনীষিন্, জ্ঞ, প্রাজ্ঞ, সংখ্যাবন্ত, পণ্ডিত, কবি, ধীমন্ত, সূরি, কৃতিন্, কৃষ্টি, লদ্ধবর্ণ, বিচক্ষণ, দূরদর্শিন্, দীর্ঘদর্শিন।
অতএব, কবি শব্দ পণ্ডিতবাচক শব্দ যার সমপর্যায়ভুক্ত শব্দ কোবিদ্, বুধ, দূরদর্শিন। এ থেকে বোধগম্য হয় যে ভগবান নারায়ণ কবি শব্দে সর্বজ্ঞকেই নির্দেশ করা হয়েছে। ভগবান বিষ্ণু তিনি সর্বজ্ঞ বলিয়া ব্রহ্মাণ্ডের সকল লোকসম্পর্কেও তিনিই অবগত আছেন। কিন্তু তিনি জীবের সামর্থ্য ব্যতীত নিজেকে প্রকাশ করলে জীব তাহাকে জ্ঞাত হতে পারেন না। ভগবান সে সম্পর্কে বেদে বলা হয়েছে-
"পরো মাত্রয়া তত্ত্বা বৃধান ন তে মহিমন্বশ্ববস্তি।
উভে তে বিঘ্ন রজসী পৃথিব্যা বিষ্ণো দেব ত্বং পরমস্য বিৎসে।।" (ঋগ্বেদ ৭/৯৯/১)
অনুবাদ:হে বিষ্ণু। তুমি মাত্রার অতীত শরীরে বর্ধমান হলে তোমার মহিমা কেউ জ্ঞাত হতে পারে না, পৃথিবী হতে আরম্ভ করে উভয় লোক আমরা জানি, কিন্তু তুমিই কেবল, হে দেব। পরমলোক অবগত আছ।
যেহেতু ভগবান নারায়ণ উভয়লোক সহ পরমলোক সম্বন্ধে জ্ঞাত সেহেতু তিনি জড়জগতে বিদ্যমান ভস্মের মহিমাও জ্ঞাত। ভগবান নারায়ণই যে সর্বগতঃ অর্থাৎ ঋতঃপুরুষ ইহা প্রতিপাদিত। তাছাড়া ভগবান কৃষ্ণও গীতায় একই কথা বলেছেন-
"বেদাহং সমতীতানি বর্তমানানি চার্জুন৷
ভবিষ্যাণি চ ভূতানি মাং তু বেদ ন কশ্চন৷৷" (গীতা ৭/২৬)
অনুবাদ: হে অর্জুন! ভগবানরুপে আমি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সম্পূর্ণরুপে অবগত। আমি সকলকেই জানি কিন্তু আমাকে কেহই জানে না।

শ্রুতি ও স্মৃতি প্রমাণে প্রতিপাদিত যে ভগবান নারায়ণ সর্বজ্ঞ এবং পূর্বপক্ষবাদীদের আপত্তি শ্রুতিস্মৃতি প্রমাণে অপ্রধান শ্রুতি ও তামসিক পুরাণের বাক্যে খণ্ডিত এবং তা বিষ্ণুদ্বেষী মোহন বাক্য।

🔥 শৈবপক্ষ দ্বারা দাবীর খণ্ডন —
(১) ওহে বকরামুণ্ডি বৈষ্ণবগণ, কত বড় ধূর্ত আর পাল্টিবা জ আপনারা !!! ছিঃ ছিঃ ছিঃ!! এই কি না আপনাদের পাণ্ডিত্যের দৌড় ?? বিষ্ণুর অসর্বজ্ঞতার শ্রুতি বাক্য প্রমাণ কে খণ্ডাতে না পেরে প্রধান উপনিষদ আর অপ্রধান উপনিষদে বিভক্ত করে দিলেন বেদকে ??
কি চরম হাস্যকর যুক্তি আপনাদের ।
আপনারা যে রামতাপনী, মহোপনিষদ, সুবলোপনিষদ ব্যবহার করেন সেই মুহূর্তে এই আপনাদের বলা অপ্রধান উপনিষদের কথা মনে থাকে না ? এমনকি আপনারা যে নৃসিংহপূর্বতাপনী উপনিষদ নিয়ে তর্কাতর্কি করছেন সেটিও শ্রুতি, একথা আপনারাই বলেছেন , আর পোষ্টের ছবিতেও শ্রুতি বলেই লিখেছেন। তাহলে আমরা যখন ভস্মজাবাল উপনিষদ, রুদ্রহৃদয়, অথর্বশির, শরভ উপনিষদ ব্যবহার করছি, তবে সেক্ষেত্রে আপনাদের এগুলো অপ্রধান বলে দোষারোপ করবার মতো যুক্তি কোথায় পেলেন ?
মুক্তিকা উপনিষদ অনুসারে, ১০৮ টি উপনিষদের উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে এই সমগ্র ১০৮ উপনিষদ কে একত্রে শ্রুতি বলা হয়েছে। সেখানে কোথাও প্রধান ও অপ্রধান উপনিষদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তাহলে আপনারা কোন যুক্তিতে ভস্মজাবাল উপনিষদ, রুদ্রহৃদয়, অথর্বশির, শরভ উপনিষদকে অপ্রধান উপনিষদ বলছেন ?
  বিষ্ণুর অসর্বজ্ঞতাকে খণ্ডাতে অক্ষম হয়েই এই চরম হাস্যকর যুক্তি আমদানি করেছেন আপনারা। যাক আমরা শৈবরা আপনাদের লড়াই করবার ক্ষমতার অন্তিম মুহূর্তের সিদ্ধান্তকে জেনে নিতে সক্ষম হলাম।
তবে আপনাদের এ যুক্তি সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। কারণ আপনাদের যুক্তির সপক্ষে কোনো বেদোক্ত প্রমাণ নেই । তাই এই যুক্তিতে বিষ্ণুর অসর্বজ্ঞতা খণ্ডিত হল না। বেদ অনুসারে বিষ্ণুর অসর্বজ্ঞতা বহাল র‌ইল ।
আর শৈবপুরাণগুলিকে তামসিক বলবার খণ্ডন বুঝে নিন 👇
https://issgt100.blogspot.com/2024/10/Between-Shiva-and-Vishnu-who-is-sattvic-and-who-is-tamasik.html

আপনাদের সাত্ত্বিক বৈষ্ণবপুরাণ পদ্মপুরাণে বিষ্ণু অসর্বজ্ঞ প্রমাণিত হয়েছে 👇
হরিরুবাচ—
ন শক্তিং ভস্মনো জানে প্রভাবং তে কুতো বিভো।
নমস্তেহস্তু নমস্তেহস্তু ত্বামেব শরণং গতঃ।।২৩৮
[পদ্মপুরাণ- পাতালখণ্ড- অধ্যায়- ৬৪]
হরি বললেন,-প্রভো!(সদাশিব) আমি ভস্মেরই মহিমা জানি না, আপনার মহিমা কিরূপে জানিব? (আপনাকে আর অধিক কি বলিব) আপনারই শরণাপন্ন হইলাম।।২৩৮

বলুন এর খণ্ডন কি হবে ??

(২) বিষ্ণু যে সর্বোচ্চ নয়, কারণ তিনি অসর্বজ্ঞতার দোষে আবদ্ধ , তাই বেদ বলছে বিষ্ণুর চেয়ে শিব শ্রেষ্ঠ —
পরাৎপরতরো ব্রহ্মা তৎপরাৎপরতো হরিঃ ।
তৎপরাৎপরতো হ্যেষ তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্তু ॥ ১৮  [তথ্যসূত্র - ঋগ্বেদ/আশ্বলায়ণশাখা/১০/১৭১/১৮ , ঋগ্বেদ সংহিতা /খিলানি/ ৪ নং অধ্যায় / ১১ নং এবং শিবসংকল্প উপনিষদ]
এবার যদি বলেন শিবসংকল্পসূক্ত বিষ্ণুকে বুঝিয়েছে তবে তার‌ও খণ্ডন এখানে 👇
https://issgt100.blogspot.com/2025/03/blog-post_3.html

ঋগ্বেদের আশ্বলায়ণশাখাকে মূল সংহিতা ভাগ হিসেবেই মান্য করেন আপনারা বৈষ্ণবেরা। সুতরাং এই প্রমাণটি চুপচাপ করে মেনে নিতে আপনারা বাধ্য।
________________________________________

🚫 রামানুজী বৈষ্ণব দের দাবী - ৭👇

⭕পূর্বপক্ষবাদীদের ২য় আপত্তি হলো যে ভগবান নারায়ণ সত্য নয় অর্থাৎ অনিত্য। 
👉পূর্বপক্ষবাদীদের এই উত্তরে উত্তরপক্ষবাদীগণ বলেন যে শাস্ত্র অধ্যয়নের অনভিজ্ঞতার দরুন এই ভ্রম উৎপন্ন হয়। কারণ শ্রুতিতেই বলা হয়েছে ভগবান নারায়ণ পরম নিত্য শুধু নিত্য নয় বরং পরম নিত্য।
"বিশ্বতঃ পরমান্নিত্যং বিশ্বং নারায়ণং হরিম্" (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০/১৩/২)। ঋগ্বেদেও বর্ণিত হয়েছে ভগবান নারায়ণ পূর্ব হইতে বিদ্যমান।
"যঃ পূৰ্ব্ব্যায় বেধসে নবীয়সে সুমহজানয়ে বিষ্ণবে দদাশতি।
যঃ জাতম অস্য মহতঃ মহি ব্রবৎ সেদু শ্ৰবঃহভিঃ যুজ্যম চিদভ্যসৎ।।" (ঋগ্বেদ ১/১৫৬/২)
সায়নভাষ্য অনুযায়ী অন্বয়:- যঃ=যো মর্ত্যঃ। পূৰ্ব্ব্যায়= নিত্যায়েত্যর্থঃ। বেধসে=বিবিধজগতকর্ত্রে। নবীয়সে= নিত্যনতুনায়। সুমজ্জানয়ে= স্বয়মেবোৎপন্নায়, সুম স্বয়মিত্যর্থঃ ইতি যাস্কঃ (নিরুক্ত ৬/২২)। বিষ্ণবে= উক্তগুনকায় বিষ্ণু।
অনুবাদ: যে ব্যক্তি নিত্য, জগতকর্তা, সদা নবীন, যে বিষ্ণু স্বয়ং জাত(জন্মগ্রহণ করেন) হোন তাহাকে হবি প্রদান করে এবং যে ব্যক্তি মহানুভব বিষ্ণুর কথা বর্ণনা করে সে (বিষ্ণু লোকে) সমীপ্য স্থান লাভ করে।
ঋগ্বেদের মন্ত্র দ্বারা প্রতিপাদিত হয় ভগবান বিষ্ণু পূর্ব হতে বিদ্যমান এবং শৈবদের পরমপ্রিয় সায়ণাচার্য পূর্বায় শব্দের অর্থ নিত্য করেন এবং নবীনয়সে।শব্দের অর্থাৎ নিত্যনতুন করেন যার দ্বারা ভগবান বিষ্ণুর নিত্যত্ব প্রতিপাদিত হয়। পতঞ্জলি যোগসূত্রে(১/২৬) বর্ণিত হয়েছে পরব্রহ্ম কালের দ্বারা অবচ্ছেদ নেই "পূর্বেষাপি গুরু কালেনানবচ্ছেদাৎ"- সেই ঈশ্বর পূর্বজগণেরও গুরু কেনো তার কালের দ্বারা কেনো অবচ্ছেদ নেই। অর্থাৎ পরব্রহ্ম কালের অতীত। তাই শ্রুতি সেই ভগবান বিষ্ণু নিত্য এবং স্মৃতিতেও একই কথা বলা হয়েছে যে ভগবান বিষ্ণু কাল হইতেও মহান।

"কালাৎ স ভগবান্ বিষ্ণুর্যস্য সর্ব্বমিদং জগৎ।
নাদির্ন মধ্যং নৈবাস্তস্তস্য দেবস্য বিদ্যতে।।" (মহাভারত, শান্তিপর্ব, ১৯৯/ ১২)
অনুবাদ: কাল হইতে সেই ভগবান বিষ্ণু মহান্। এই সমগ্র জগত যাহার অধীন, সেই বিষ্ণুদেবের আদি নাই, মধ্য নাই, অন্ত নাই।
এই পরব্রহ্ম ভগবান বিষ্ণু শুধু কালই নয় বরং তিনি মহাকাল অর্থাৎ শিবের কাল তিনি। "মহাকালস্যাপি কালং ত্বং নমঃ পুরুষোত্তম" (স্কন্দপুরাণ/ বৈষ্ণবখণ্ড ৯/১৫/১৯)। তাই মৎস্যপুরাণে শিবের আয়ু সম্পর্কে বলা হয়েছে যে ব্রহ্মার শতবর্ষ শিবের ১দিন আর শিবের শত বর্ষ ভগবান বিষ্ণুর ১নিমেষ মাত্র। 
"ব্রহ্মসংবৎসরশতাদেকাহং শৈবমু্চ্যতে।
শিববর্ষশতাদেকং নিমেষং বৈষ্ণবং বিদুঃ।।"
(মৎস্যপুরাণ ২৯০/২১)
অনুবাদ: ব্রহ্মার শতবর্ষ শিবের একদিন এবং শিবের শতবর্ষ ভগবান বিষ্ণুর এক নিমেষ মাত্র।

অতএব ভগবান বিষ্ণুর যখন জগতে জাগ্রত অবস্থায় বিদ্যমান থাকেন তখন তার ১নিমেষ মাত্র শিবের আয়ুঃকাল। তাই ভগবান বিষ্ণু নন বরং শিবই অনিত্য ও জীব মাত্র। ঋগ্বেদে (১/১৫৫/৬) বর্ণিত হয়েছে ভগবান বিষ্ণুই স্বয়ং কালচক্রকে প্রেরণ করতে থাকেন তাই তিনি কালের দ্বারা প্রেরিত হোন না। এজন্য ভগবান বিষ্ণু নিত্য ও সত্য। তাই পূর্বপক্ষের আপত্তি শ্রুতিস্মৃতি প্রমাণে খণ্ডিত হলো। পূর্বপক্ষবাদীগণ পদ্নপুরাণের পাতালখণ্ডের যে একটি শ্লোক দিয়ে ভগবান বিষ্ণুকে কালের আশ্রিত অনিত্য প্রমাণ করতে চেয়েছে সেই পদ্মপুরাণ সম্পূর্ণরূপে সাত্ত্বিকপুরাণ নয়। গরুড়পুরাণ অনুসারে কেবল বিষ্ণু, ভাগবত আর গরুড়পুরাণই সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক পুরাণ। তাই পদ্মপুরাণের পাতালখণ্ডের উক্ত শ্লোকবাক্য অন্যান্য প্রধান সাত্ত্বিক পুরাণ ও বেদ এবং মহাভারতের বিরুদ্ধ হওয়ায় তা তামসিক অংশের অন্তর্ভুক্ত এবং অগ্রহণীয়।

🔥 শৈবপক্ষ থেকে দাবীর খণ্ডন —

(১) নারায়ণের অনিত্যতা সহ পরমত্ত্ব খণ্ডন বৈষ্ণবদের‌ই শাস্ত্র থেকে 👇
https://issgt100.blogspot.com/2025/03/blog-post_16.html

(২) নাশবান বিষ্ণুর প্রমাণ মহাভারত থেকে —
পরমেশ্বর শিবের  #মহাপাশুপতাস্ত্র -র বর্ণনা  - যা ত্রিভুবনে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং অপ্রতিরোধ্য দিব্য অস্ত্র , যাকে আটকাতে ব্রহ্মা, বিষ্ণুও অক্ষম।

" শরশ্চ সূর্য্যসঙ্কাশঃ কালানলসমদ্যুতি |
এতদস্ত্রং মহাঘোরং দিব্যং পাশুপতং মহৎ ||২৫৭||
অদ্বিতীয়মনির্দ্দেশ্যং সর্বভূতভয়াবহম্ |
সস্ফুলিঙ্গং মহাকায়ং বিসৃজন্তমিবানলম্ ||২৫৮||
একপাদং মহাদংষ্ট্রং সহস্রশিরসোদরম্ |
সহস্রভুজজিহ্বাক্ষমুদ্গিরন্তমিবানলম্ ||২৫৯||
ব্রাক্ষান্নারায়ণাচ্চৈন্দ্রাদাগ্নেয়াদপি বারুণাৎ  |
যদ্বিশিষ্টং মহাবাহো সর্ব্বশস্ত্রবিঘাতকম্ ||২৬০||
নির্দহেত চ যৎ কৃৎস্নং ত্রৈলোক্যং সচরাচরম্ |
মহেশ্বরভুজোৎসৃষ্টং নিমিষার্দ্ধান্নসংশয়ঃ ||২৬২||
নাবধ্যৌ যস্য লোকেহস্মিন্ ব্রহ্মাবিষ্ণুসুরেষ্বপি |....২৬৩|| "
(মহাভারত/অনুশাসন পর্ব/১৩ অধ্যায়)

অর্থ - উপমন্যু জী বললেন - সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল ও প্রলয় কালাগ্নির ন্যায় ভয়ঙ্কর, অদ্বিতীয়, অনির্বচনীয় , অগ্নিস্ফূলিঙ্গ উদ্গিরণ কারী অস্ত্র পাশুপতাস্ত্র। তার এক পা, জিহ্বা,  নয়ন, বিশাল দন্ত, সহস্রমস্তক, উদর ও সহস্রবাহু ছিল। ইহা ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ইন্দ্র, অগ্নি,  বরুণের অস্ত্রের থেকেও শ্রেষ্ঠ , যা দিয়ে মহাদেব ত্রিভুবনকেও দগ্ধ করতে সক্ষম। 
এজগতে পাশুপতাস্ত্রের কাছে ব্রহ্মা,  বিষ্ণু কেউই অবধ্য নয়।

অর্থাৎ বৈষ্ণব দের আরাধ্য বিষ্ণুর‌ও ক্ষমতা নেই এই পাশুপতাস্ত্রের সামনে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর। বিষ্ণুর উপর এই মহাপাশুপতাস্ত্র প্রয়োগ করলে বিষ্ণুও বধ হয়ে যাবে ।
তাই বৈষ্ণব দের সাবধান হ‌ওয়া উচিত। যেখানে বিষ্ণুই নাশবান সেখানে মহাভারতের উপর নির্ভর করে নিত্য ভাবাটা দূরদর্শিতার অভাব মাত্র। বিষ্ণুর মধ্যে শিবসত্ত্বা বর্তমান, তাই শিবের তাত্ত্বিক গত দৃষ্টিতে শাস্ত্রে বিষ্ণুর প্রশংসা মাত্র করা হয়, ঔপাধিক হিসেবে নয়। কারণ, আদিঅন্ত একমাত্র পরমেশ্বর শিবের নেই , তার প্রমাণ হল শিবলিঙ্গের আদিঅন্ত খুঁজতে অপারগ হয়েছিলেন ব্রহ্মা আর বিষ্ণু। তাই একটা প্রশংসা বাক্য দেখিয়ে দিলেই তার দ্বারা বিষ্ণুর পরমত্ত্ব স্থাপন হয় না। কারণ বেদে শিবের চেয়ে বিষ্ণুকে অশ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। বৈষ্ণবরা হয়তো বেদের ঐ বাণী  বিস্মৃত হয়ে যায়। তাই তখন মহাভারতের বচন নিয়ে নিজেদের পিঠ বাঁচাতে হয়।

(৩) কাল রুদ্র উৎপন্ন হন আবার বিলীন হন, এটি আমরা শৈবরা স্বীকার করি, কিন্তু পরমব্রহ্ম শিবের জন্ম মৃত্যু হয় না। আপনারা যে মূর্খ , তাই ত্রিদেবের মধ্যে থাকা কালরুদ্রের উৎপন্ন ও বিলীন হ‌ওয়াকে শিবের বিলীন হয়ে যাওয়া ভেবে ঠাওর করছেন। যে মৎপুরাণ ব্যবহার করে এসব বলতে এলেন, সেই মৎস পুরাণেই বলা আছে যে পরমব্রহ্ম শিবের কোনো জন্ম বা নাশ নেই, বিষ্ণু তথা সকল দেবতার জন্ম মৃত্যু হয় । প্রমাণ দেখুন 👇

https://issgt100.blogspot.com/2022/02/Lord%20Shiva%20is%20not%20born%20and%20dies%20but%20Brahma%20Vishnu%20and%20all%20others%20are%20born%20and%20die.html


(৪) এখন আপনারা বৈষ্ণবেরা নিজেদের মান্য করা সাত্ত্বিক পদ্মপুরাণের কিছু অংশকেই তামসিক বলে হাস্যকর মন্তব্য করছেন। 🥴🤣😂
যখন আমরা পদ্মপুরাণ থেকে আপনাদের খণ্ডন গুলো লিখছিলাম তখন‌ই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বলেছিলাম, এসব দেখার পর কোন যুক্তি খুঁজে না পেয়ে, নিজেদের অপযুক্তিকে সামাল দেবার জন্য বৈষ্ণবেরা পদ্মপুরাণকেই তামসিক বলে বসবে।

 আর আজকে আমাদের সেই কৌতুক করে ভাবতে থাকা ধারণা আপনারা সত্য করে আমাদের দূরদর্শীতাকে সত্য প্রমাণ করে দিলেন। চমৎকার ! আপনাদের এই বক্তব্যের দ্বারা বোঝা গেল আপনাদের বৈষ্ণব পুরাণ গুলোর মধ্যেই অসঙ্গতি ভরে ভরে রয়েছে, আর পদ্ম পুরাণের ওই অংশগুলো যদি তামসিক হয় তাহলে অন্য অংশগুলো যে তামসিক নয় তার নিশ্চয়তা কোথায় ?
আমাদের কাছে তো সমগ্র পদ্মপুরাণই গ্রহণযোগ্য, কারণ আমরা পদ্মপুরাণের ঘটনাগুলিকে একটি বিশেষ কল্পে বিষ্ণুর মাহাত্ম্য প্রকাশিত হয়েছে বলে গ্রহণ করে নিয়েছি। কিন্তু আপনাদের কি বিড়ম্বনা দেখুন ! আপনারা যে যুক্তি দিয়েছেন সেই যুক্তি পদ্মপুরাণ খণ্ডে দিচ্ছে, আর সেই প্রাণপ্রিয় পদ্মপুরাণকে আপনারাই এতদিন সাত্ত্বিক বলবার পর আজ তামসিক বলে দাবি করছেন। এর থেকে প্রমাণিত হলো পদ্মপুরাণে যে অংশে শৈব পুরাণ গুলিকে তামসিক বলা হয়েছে সেই বাক্য‌ও তামসিক। ওগুলি যে তামসিক নয় এটি আপনারা প্রমাণ করতে পারবেন ??
গরুড় পুরাণ অনুযায়ী যদি শুধু ভাগবত পুরাণ সাত্ত্বিক হয় তবুও বিষ্ণুর অসর্বজ্ঞতা প্রমাণিত হয়, দেখুন 👇
ন তো গিরিত্রাখিললোকপাল বিরিঞ্চবৈকুণ্ঠসুরেন্দ্রগম্যম্।
জ্যোতিঃ পরং যত্র রজস্তমশ্চ সত্ত্বং ন যদ্ ব্রহ্ম নিরস্তভেদম্ ।।৩১
[ভাগবত পুরাণ/অষ্টম স্কন্দ/অধ্যায় ৭/৩১]
অর্থ — ভগবান্‌! আপনার পরম জ্যোতির্ময় স্বরুপ হলো স্বয়ং ব্রহ্ম। তাতে রজোগুণ,তমোগুণ এবং সত্ত্বগুণ কিছুই নেই, তাতে কোনোপ্রকার ভেদাভেদও নেই। আপনার সেই স্বরূপকে সমস্ত লোকপাল-এমনকি ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং দেবরাজ ইন্দ্রও জানতে পারে না ।।
এবার কি বলবেন বৈষ্ণবগণ ?
বিষ্ণুর অসর্বজ্ঞতার দোষ ধরা পড়ে গেল তো।
আর গরুড় পুরাণ অনুযায়ী আপনাদের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই আপনাদের পেজের নামটাও invalid 🚫

যদিও সাত্ত্বিক তামসিকের কাউন্টার উপরেই করে দিয়েছি। তাই ১০৮ উপনিষদের মধ্যে থাকা বৃহৎজাবাল শ্রুতি ও পদ্মপুরাণের বাক্যের মধ্যে সামঞ্জস্যতা থাকায় আপনাদের নারায়ণের অসর্বজ্ঞতা বহাল র‌ইল।
আমরা নিশ্চিত ! বৈষ্ণবদের তার কেটে যাবে এসব যুক্তি খণ্ডাতে গিয়ে।
_________________________________________

🚫 রামানুজী বৈষ্ণব দের দাবী - ৮ 👇

⭕পূর্বপক্ষবাদীগণের ৩য় আপত্তি হলো যে নৃসিংহপূর্বতাপনী উপনিষদের মন্ত্রে সদাশিব বলা হয়েছে তাই এই উপনিষদের উপাস্যতত্ত্ব ভগবান শ্রীহরি নারায়ণ নৃসিংহ নন বরং শৈবদের আরাধ্য শিব।

👉পূর্বপক্ষবাদীগণের উক্ত আপত্তিতে উত্তরপক্ষবাদীগণ প্রথমত বলেন যে সদাশিব ভগবান নারায়ণেরই অভিধা।
"হরিঃ সদাশিবো ব্রহ্মা মহেন্দ্রঃ পরমঃ স্বরট্।
সর্ব্বেশ্বরস্য তস্যৈতে পর্য্যায়াঃ পরিকীর্তিতাঃ॥"
(স্কন্দপুরাণ/ বিষ্ণুখণ্ড/ বেঙ্কটাচলমাহাত্ম্য/ ৩৫/৩৫)
অনুবাদ: সর্বেশ্বর হরিরই পর্য্যায়ে সদাশিব, ব্রহ্মা, মহেন্দ্র, পরম ও স্বরাট্ এই সকল অভিধান জানিবে।
দ্বিতীয়ত উত্তরপক্ষবাদীগণ বলেন যে অব্যক্তোপনিষদে (৬/১) ভগবান বিষ্ণুকে পিনাকী বলা হয়েছে  এখন শৈবগণ যদি ভগবান নারায়ণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য প্রসিদ্ধ দেববাচক নাম দেখে তাদের আরাধ্য প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তা হতে পারে না, কেনো না তা যেনো না করতে পারে এবং  এমন বিকৃতি ঘটাতে না পারে এজন্য এই উপনিষদের অন্তিম মন্ত্রে ৭খণ্ডে বর্ণিত হয়েছে "নাবিষ্ণুভক্তায়" অর্থাৎ অব্যক্তোপনিষদের নৃসিংহব্রহ্মবিদ্যা বিষ্ণুভক্ত ব্যতীত জীবকে প্রদান করা যাবে না। কারণ বিষ্ণুভক্ত বৈষ্ণব ব্যতীত জীব অব্যক্তোপনিষদে ভগবান নৃসিংহকে পিনাকী দেখেই শিব পরত্ব স্থাপিত করতে গিয়ে শ্রুতির বিকৃতি ঘটাবে এজন্য বিষ্ণুভক্তই এই বিদ্যার অধিকারী তদ্রুপ ভাবেই শৈবগণ  বিষ্ণুভক্ত না নৃসিংহতাপনী উপনিষদের মন্ত্রের শিবপরক ভাষ্য করতে গিয়ে শ্রুতি মন্ত্রের বিকৃতি করেছেন। এই ন্যায় দ্বারা জ্ঞাত হওয়া যায় যে নৃসিংহতাপনী উপনিষদের মন্ত্রের শিবপরক ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। নৃসিংহপূর্বতাপনী উপনিষদের "ঋতং সত্যং" মন্ত্রের পূর্বে ১/৫নং মন্ত্রে ভগবান নৃসিংহদেবকে ক্ষীরোদার্ণবশায়ী বলা হয়েছে।

"প্রজাপতিঃ ক্ষীরোদার্ণবশায়িনং নৃকেসরিবিগ্রহং যোগিধ্যেয়ং" যদি শিবপরক ব্যাখ্যা করা হয় তাহলে শিব ক্ষীরোদসমুদ্রে শয়ন করেন এমন ভাষ্য করা যায় না কারণ সমস্ত প্রামাণ্য শাস্ত্রমতে ভগবান নারায়ণই ক্ষীরোদসমুদ্রে শয়ন করেন এমন উল্লেখ পাওয়া যায়।

"এষ নারায়ণঃ শ্রীমান্ক্ষীরার্ণবনিকেতনঃ" (মহাভারত/ বনপর্ব ৮৬/২৪, হরিবংশ/ বিষ্ণুপর্ব ৫৫/৬১)----এই সেই শ্রীমন্নারায়ণ যিনি ক্ষীরার্ণবে বিরাজ করেন। তাছাড়া নৃসিংহপূর্বতাপনী উপনিষদে ২/১৩ মন্ত্র যা ঋগ্বেদের বিষ্ণুসূক্তের অনুরূপ-
"প্রতদ্বিষ্ণুঃ স্তবতে বীর্যায় মৃগো ন ভীমঃ কুচরো গিরিষ্ঠাঃ। যস্যোরুষু ত্রিষু বিক্রমণেষ্বধিক্ষিয়ন্তি ভুবনানি বিশ্বা তস্মাদুচ্যতে নৃসিংহমিতি॥"
তাই বিষ্ণুসূক্তের এই মন্ত্রের অনুরূপ হওয়া বোধগম্য হয় যে এই মন্ত্রের দেবতা ভগবান বিষ্ণুই শিব নয়। তাছাড়া এই মন্ত্রে মন্ত্রোক্ত দেবতা সম্বন্ধে বলা হয়েছে "ত্রিষু বিক্রমণে" অর্থাৎ ত্রিবিক্রম। যিনি তার তিন বিশাল পদক্ষেপের আশ্রয়ে (পৃথ্বী, দ্যুলোক, অন্তরীক্ষ) সম্পূর্ণ বিশ্বভূবন নিবাস করেন। অতএব ত্রিবিক্রম ভগবান বামনরূপধারী ভগবান নারায়ণই উক্ত মন্ত্রের দেবতা শিব নন। নৃসিংহতাপনী উপনিষদের নৃসিংহ মন্ত্ররাজ বলা হয় "উগ্রং বীরং মহাবিষ্ণুং...............মৃত্যুমৃত্যুং নম্যাম্যঽম্" "মন্ত্ররাজস্য নারসিংহস্য শক্তিং বীজং নো" (নৃ০ পূ০ তা০ উ০ ৩/১)

মন্ত্রকে। এই মন্ত্রের কথা স্কন্দপুরাণের বিষ্ণুখণ্ডের (২/২৮) বর্ণিত, সেই অধ্যায়ের ১৭ নম্বর শ্লোকে বলা হচ্ছে-- "মন্ত্ররাজং সাক্ষাদাথর্ব্বণোদিতম্- নৃসিংহ মন্ত্ররাজ সাক্ষাৎ অথর্ববেদোক্ত। এবং এই বিষ্ণুখণ্ড কার উদ্দেশ্যে নিবেদিত তা সকলেরই বোধগম্য। এখন এই নৃসিংহ মন্ত্ররাজ কেবল অর্থববেদোক্ত নৃসিংহতাপনী উপনিষদ আর ত্রিপাদবিভূতি মহানারায়ণ উপনিষদেই বর্ণিত। তাই নৃসিংহতাপনী উপনিষদের নৃসিংহ মন্ত্ররাজের উপাস্য তত্ত্ব যদি শিব হয় শিবপরক ভাষ্যে তাহলে পূর্বপক্ষবাদীগণ সেই একই অথর্ববেদের ত্রিপাদবিভূতি মহানারায়ণ উপনিষদ যেখানে নৃসিংহ মন্ত্ররাজ বর্ণিত সেই উপনিষদের পূর্বপক্ষবাদগণ শিবপরক ভাষ্য করে দেখাক। তাই বলা যায় যে বিষ্ণুখণ্ডে বর্ণিত অথর্ববেদোক্ত নৃসিংহতাপনী উপনিষদের মন্ত্ররাজ পরব্রহ্ম ভগবান নারায়ণকেই প্রতিপাদিত করে। পূর্বপক্ষবাদীগণ  বলতে পারেন যে নৃসিংহোত্তরতাপনী উপনিষদে রুদ্র সূক্ত "মৃড়া জরিত্রে রুদ্রস্তবানো" (অথর্ববেদ ১৮/১/৪০) মন্ত্র এসেছে তাই নৃসিংহতাপনী উপনিষদের দেবতা ভগবান শিব। তার উত্তরে উত্তরপক্ষবাদীগণ বলেন যে নৃসিংহোত্তরতাপনী উপনিষদের রুদ্রসূক্তটি মূলত "মৃড়া জরিত্রে সিংহস্তবানে" দিয়ে শুরু যার দরুন এখানে মন্ত্রের অর্থ পরিবর্তিত হয়ে রুদ্রকে বোঝাচ্ছে না বরং সিংহরূপী ভগবান নারায়ণকে বোঝাচ্ছে। হে রুদ্র এর পরিবর্তে হে নৃসিংহ বলে মন্ত্রের দেবতাকে আহ্বান করা হয়েছে।

🔥 শৈবদের পক্ষ থেকে দাবীর খণ্ডন —

(১) আপনারা এতক্ষণ তামসিক পুরাণের প্রমাণ গণ্য নয় বলে লাফালাফি করে আমাদের প্রমাণ অমান্য করছিলেন, অথচ নিজের মতবাদ সিদ্ধ করবার জন্য হঠাৎ করে আপনারা যাকে তামসিক পুরাণ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন, সেই আপনাদের কথিত তামসিক পুরাণ স্কন্দ পুরাণকে প্রামানিক হিসেবে কেমন করে ধরে নিলেন ?
এ কেমন দ্বিচারিতা ?
স্কন্দমহাপুরাণেও বিষ্ণুর অসর্বজ্ঞতার প্রমাণ রয়েছে, দেখুন 👇 🥴
যদা দেবা ন বিজানস্তি ব্রহ্মবিষ্ণুপুরোগমাঃ।
[স্কন্দমহাপুরাণ/প্রভাসখণ্ড/ক্ষেত্রমাহাত্ম্য/অধ্যায় ৭/১০০]
ব্রহ্মা, বিষ্ণু প্রভৃতি দেবতাও শিব তত্ত্ব জ্ঞাত নন।।
হরির রূপ যে পরমেশ্বর শিব‌ই ধারণ করেন তা বেদেই বলা আছে, ফলে সকল দেবতার নাম‌ই  হরির নাম হয়ে থাকে এমনটাও বলা হয় তাতে ঔপাধিক দৃষ্টিতে নয় বরং তাত্ত্বিক গত দৃষ্টিতে বলা হয়েছে। প্রমাণ দেখুন স্কন্দমহাপুরাণ থেকেই 👇
পরতত্ত্বৈকতাবুদ্ধ্যা ব্রহ্মাণং বিষ্ণুমীশ্বরম্‌ ।
পরতত্ত্বতয়া বেদা বদন্তি স্মৃতয়োঽপি চ ।। ২০
(তথ্যসূত্র - স্কন্দমহাপুরাণ/সূতসংহিতা/যজ্ঞবৈভবখণ্ড/উপরিভাগ/(সূতগীতা)  অধ্যায় ২/শ্লোক ২০)
বেদ বা  অন্য শাস্ত্রের মধ্যে কোথাও কোথাও ব্রহ্মা বা বিষ্ণু কে পরমেশ্বর বলা হয়েছে , কিন্তু তা তাদের ঔপাধিক রূপের দৃষ্টিতে নয় বরং তাদের অন্তরস্থ সত্ত্বা পরতত্ত্ব - এই দৃষ্টিতে বলা হয়েছে মাত্র ।
দেখুন মহাভারত ই বলছে 👇
নারায়ণের সকল নাম মূলত পরমেশ্বর শিবের নাম

অহং ত্বং সর্বগো দেব ত্বমেবাহং জনার্দন। আবয়োরন্তযং নাস্তি শব্দৈরর্থৈর্জগৎপতে ॥ ৬০ নামানি তব গোবিন্দ যানি লোকে মহান্তি চ। তান্যেব মম নামানি নাত্র কার্যা বিচারণা । ৬১
(তথ্যসূত্র – মহাভারত/খিল (হরিবংশ পুরাণ)/ভবিষ্যপর্ব/৮৮ অধ্যায়)
অর্থ – হে দেব! মূলত আমি শিবই সর্বব্যাপী রূপে জনার্দন হয়েছি, আর তুমি বিষ্ণু হলে মূলত আমি শিবই। শব্দ ও অর্থের মধ্যে যেমন ভেদ নেই তেমনই তোমার মূলস্বরূপ আমাতে, ভেদ নেই ॥৬০ গোবিন্দ আদি যত তোমার নাম আছে, সেসব আসলেই আমার অর্থাৎ শিবের নাম, এর অন্যথা ভাবা উচিত নয় ॥৬১

ব্যাখ্যা - পরমেশ্বর শিব যেহেতু নারায়ণরূপ ধারণ করেন তাই নারায়ণের সকল নাম মূলত শিবেরই নাম, একথা স্কন্দমহাপুরাণের সূতসংহিতা যজ্ঞবৈভবখণ্ডের পূর্বভাগের অধ্যায় ২-র ৬৪-৬৫ নং শ্লোক বলছে 'বিষ্ণু সহ সকল দেবতার নাম হল একমাত্র শিবের'- এমন ভাবনা যারা করে তারাই মোক্ষ লাভ করে, কিন্ত যারা শিবকে অপরম বলে দাবী করে বলে যে, 'বিষ্ণু বা অন্য দেবতা শিব নাম ধারণ করে বলে ভাবে' তারা মুক্তি পায় না। অর্থাৎ বিষ্ণুর সকল নাম যে একমাত্র পরমেশ্বর শিবেরই বিভিন্ন নাম মাত্র তা প্রমাণিত হল মহাভারতের নিরিখে।

(২) বিষ্ণু খণ্ডে নির্দেশিত অথর্ববেদের নৃসিংহ মন্ত্র উল্লেখিত হলেও, তা শিব পরখ ই। কারণ বিষ্ণু রূপটিই পরমেশ্বর শিব ধারণ করেছেন। তাই বিষ্ণুর জন্য নৃসিংহ মন্ত্র ব্যবহার করলেও বিষ্ণু বা নৃসিংহ উভয়েই শিবের স্বরূপ মাত্র।
তাই এসব আলাদা করে শিবপরক প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই।

(৩) সবচেয়ে বড় কথা আপনারা একটু আগেই বললেন যে অপ্রধান উপনিষদের কথা মান্য নয়, তাহলে নৃসিংহ নৃসিংহপূর্বতাপনী উপনিষদকে অথর্ববেদের নৃসিংহ মন্ত্র বলে কি করে দাবী করলেন ?
আমাদের শৈব উপনিষদ গুলিকেও তো সমস্ত শৈবপুরাণ গুলি শ্রুতি মন্ত্র বলেই উল্লেখ করেছে। তাহলে শুধুমাত্র নিজেদের মতবাদ কে দাড় করাবার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিভাবে প্রধান ও অপ্রধান উপনিষদের ভাগাভাগি শুরু করেছিলেন ? এখানেই আপনাদের যুক্তির অসঙ্গতি ধরা পড়ে, তথা আপনারা যে স্ববিরোধী সেটিও ধরা পড়ছে। এই মিথ্যাচারের মাধ্যমে আপনাদের যুক্তি যে গ্রহণযোগ্য নয় তা প্রমাণিত হলো।।

_________________________________________

🚫 রামানুজী বৈষ্ণব দের দাবী - ৯ 👇

⭕পূর্বপক্ষবাদীগণের ৪র্থ দাবি হলো নৃসিংহরূপ শৈবদের আরাধ্য শিবের স্বরূপ এবং তা ভগবান বিষ্ণু শিবের কাছ থেকে প্রাপ্ত হোন।

👉পূর্বপক্ষবাদীগণের এমন দাবিতে উত্তরপক্ষবাদীগণ বলেন যে নৃসিংহরূপ যদি শিবেরই হয় তাহলে শিব শৈবদের তামসিকপুরাণ অনুসারে শরভ নিজেই নিজের রূপকে হত্যা করেন তাহলে এখানে শৈবগণ ভগবান নারায়ণকে কোন যুক্তিতে জীবত্ব প্রমাণ করে শিবের পরত্ব স্থাপিত করেন?

🔥শৈবপক্ষ দ্বারা দাবীর খণ্ডন —
হা হা হা ! যাক শেষ পর্যন্ত আমাদের যুক্তিকে পরোক্ষভাবে হলেও মানতে বাধ্য হয়েছেন দেখে আনন্দ পেলাম । তবে আপনারা বৈষ্ণবেরা একটু আগেই পদ্মপু্রাণের বচনকে তামসিক আখ্যা দিয়েছেন, তাহলে তামসিক পদ্মপুরাণ যদি শৈবপুরাণ গুলিকে তামসিক বলে থাকে, তবে সেটাও তো তামসিক বাক্য, অর্থাৎ পদ্মপুরাণের বচন আপনাদের কাছে এখন আর গ্রহণযোগ্য হবার মতো নয়। তাহলে আপনার কোন যুক্তিতে শৈবপুরাণ গুলিকে তামসিক বলছেন ? মস্তিষ্কে আদৌও বুদ্ধি আছে আপনাদের ??

যে পাতে আহার করেন, সেই পাতেই মলত্যাগ করছন, ছিঃ ছিঃ ছিঃ।  এত বড় দ্বিচারিতা কি করে করলেন আপনারা বৈষ্ণবেরা ? লজ্জা করলো না একবারো ??

আর পুরণের কথা রাখুন, আমরা তো শরভ উপনিষদ থেকেই দেখিয়েছিলাম যে, নৃসিংহ কে শরভেশ্বর বধ করেছেন। তাহলে সেটা কি চোখে দেখতে পাননি ? নাকি না দেখার ভান করেছেন ?

এবার বলি, শিব কিভাবে নিজেই নিজের রূপকে সংহার করেছেন।

শুনুন বৈষ্ণবগণ, বেদ অনুসারে পরমেশ্বর শিব জগতে মায়ার দ্বারা সমস্ত কিছু রচনা করেন, এ কথা পুরাণেও বলা রয়েছে। মায়ার দ্বারা বহু দেবতা উৎপন্ন হয়। যেমন কেন উপনিষদে ইন্দ্র বায়ু আদি দেবতারা অহংকারে মোহিত হয়েছিল, কিন্তু পরমব্রহ্ম যক্ষ শিব সেখানে প্রকটিত হয়ে সেই দেবতাদের মোহভঙ্গ করেছিলেন। আর দেবতারা কি ঈশ্বরের থেকে প্রকাশিত হয়নি ? আপনারাই বলুন.. দেবতারা কি ঈশ্বরের থেকে প্রকট হন না ?
আপনারা নিজেরাই তো দিনরাত বলতে থাকেন ব্রহ্মা ও অন্যান্য দেবতারা থেকে প্রকট হয়, সুতরাং এক্ষেত্রে নিশ্চয়ই আপনাদের অমত থাকবে না। সেই যুক্তির উপর নির্ভর করে বলছি, স্বয়ং পরম ব্রহ্ম নিজে মায়ার দ্বারা দেবতাদের রূপ ধারণ করে, যেমন ভাবে তাদের মোহভঙ্গ করেন, তেমনভাবেই প্রয়োজনে তার বাহ্যিক মায়ার দ্বারা তৈরি দেহকে মোহিত করে তাকে হত্যাও করতে পারেন। আর এই কথা শরভ উপনিষদে বর্ণিত রয়েছে, যা সাক্ষাৎ বেদ শাস্ত্র। এই শাস্ত্র থেকেই বিষ্ণুর জীবত্ব প্রমাণিত। ছাড়ুন, আপনাদের মহ উপনিষদের ৩/৫১ থেকেই বিষ্ণুর মৃত্যু প্রমাণিত হয়।
আমরা সেই যুক্তিতেই বিষ্ণুকে জীব বলে থাকি।

পারলে উপযুক্ত যুক্তি তর্ক দ্বারা নিজেদের স্ববিরোধত্ত্ব দোষ খণ্ডে তারপর আমাদের ISSGT শৈবদের সাথে তর্কে আসবার সাহস দেখাবেন, নচেৎ আপনারা বকরামুণ্ডি বলেই আমাদের কাছে সম্মানিত হবেন।


শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তে 🚩
হর হর মহাদেব

অপপ্রচার দমনে - শ্রী নন্দীনাথ শৈব আচার্য জী
কপিরাইট ও প্রচারে — International Shiva Shakti Gyan Tirtha

#ISSGT #বৈষ্ণবমতবাদখণ্ডন #অপপ্রচারখণ্ডন #বিষ্ণুপরমত্ত্বখণ্ডন
#বিশিষ্টাদ্বৈতবাদHypocrisy

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ